কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, যা ঐতিহাসিকভাবে ‘গুগাক’ (Gugak) নামে পরিচিত, তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর। চীনের প্রভাব থাকলেও কোরীয় সঙ্গীতের ছন্দ (Rhythm) এবং সুরের অলঙ্করণ একেবারেই নিজস্ব। জাপানি সঙ্গীতের মতো এখানেও বৌদ্ধ ও কনফুসীয় দর্শনের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা কোরীয় উপদ্বীপের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সুরশৈলী নিয়ে আলোচনা করব।

কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত: রাজকীয় গাম্ভীর্য ও লোকজ প্রাণের মেলবন্ধন

কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: জং-আক (Jeong-ak) বা উচ্চবিত্ত ও রাজদরবারের সঙ্গীত এবং মিনসোক-আক (Minsok-ak) বা সাধারণ মানুষের লোকজ সঙ্গীত।

১. প্রধান জনরাসমূহ (Key Genres)

  • আ-আক (A-ak): এটি মূলত কনফুসীয় ধর্মীয় আচার ও রাজকীয় উৎসবের সঙ্গীত। ১১৪৪ সালে চীন থেকে এটি কোরিয়ায় আসে। এর সুর অত্যন্ত ধীর এবং গম্ভীর, যা আত্মার শুদ্ধি ঘটায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
  • হিয়াং-আক (Hyang-ak): এটি কোরিয়ার নিজস্ব আদিবাসী বা স্থানীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। রাজকীয় ভোজ এবং সাধারণ উৎসবে এটি পরিবেশিত হতো। এতে বাঁশি ও তারযুক্ত যন্ত্রের প্রাধান্য থাকে।
  • পানসোরি (Pansori): এটি কোরীয় সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এটি মূলত একক কণ্ঠের সঙ্গীতনাট্য, যেখানে একজন গায়ক (Gwangdae) একটি ড্রামের (Buk) তালে তালে দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেন। ইউনেস্কো একে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
  • সামুল নোরি (Samul Nori): এটি চার ধরণের ঘাতযন্ত্রের (Percussion) খেলা। এতে ড্রাম এবং গং-এর মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী তাল তৈরি করা হয়।
  • সানজো (Sanjo): এটি একক বাদ্যযন্ত্রের ইমপ্রোভাইজেশন স্টাইল। এতে কোনো ড্রামের তাল ছাড়াই শিল্পী তাঁর যন্ত্রের সর্বোচ্চ দক্ষতা ও আবেগ প্রকাশ করেন।

২. কোরীয় সঙ্গীতের প্রধান বাদ্যযন্ত্র

কোরীয় যন্ত্রগুলো মূলত মাটি, রেশম, বাঁশ এবং পাথর থেকে তৈরি, যা প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করে:

  • গায়াগিউম (Gayageum): এটি ১২টি তারবিশিষ্ট একটি বোর্ড-জিথার (Zither)। এটি জাপানি কোতোর মতো হলেও এর বাজানোর ধরন এবং সুর অনেক বেশি কোমল।
  • হেগিউম (Haegeum): এটি দুই তারের একটি বেহালা জাতীয় যন্ত্র। এর তীক্ষ্ণ ও মানুষের কান্নার মতো সুর কোরীয় সঙ্গীতের প্রাণ।
  • পিড়ি (Piri): এটি বাঁশের তৈরি একটি দ্বৈত-রীড বিশিষ্ট বাঁশি, যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মন্দ্র ধ্বনি উৎপন্ন করে।
  • দেগিউম (Daegeum): এটি একটি বড় আড়াআড়ি বাঁশি, যাতে বিশেষ একটি কম্পনকারী পর্দা থাকে যা সুরকে অনন্য টেক্সচার দেয়।

৩. কারিগরি বৈশিষ্ট্য: সিগিমসে (Sigimsae)

কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক হলো ‘সিগিমসে’। এটি সুরের অলঙ্করণ বা ‘ভাইব্রাটো’ (Vibrato)। কোরীয় সঙ্গীতে একটি স্থির নোট খুব কমই বাজানো হয়; বরং প্রতিটি নোটকে কাঁপিয়ে, টেনে বা দ্রুত গিটকিরি দিয়ে অলঙ্কৃত করা হয়। এই বিশেষ অলঙ্করণই কোরীয় সুরকে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ এবং দীর্ঘস্থায়ী আমেজ দেয়।

৪. ছন্দ বা জংদান (Jangdan)

কোরীয় সঙ্গীতে পশ্চিমা ৪/৪ তালের বদলে ১২/৮ বা তেরিজা তালের জটিল ব্যবহার দেখা যায়। এই রিদম বা তালকে বলা হয় জংদান। এটি মূলত মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতির সাথে তাল মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা শ্রোতাকে এক ধরণের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি দেয়।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা ‘গুগাক’ কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, এটি আধুনিক কে-পপ (K-pop) যুগেও কোরীয়দের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং পানসোরির মতো আবেগপ্রবণ কাহিনী গাওয়ার পদ্ধতি বিশ্ব সঙ্গীতের এক অনন্য সম্পদ।