কোরীয় ঐতিহ্যে সঙ্গীতকে মূলত দুটি সমান্তরাল ধারায় ভাগ করা যায়। একটি হলো ‘জং-আক’, যা উচ্চবিত্ত, পণ্ডিত এবং রাজদরবারের মানুষদের রুচি মেনে তৈরি। অন্যটি হলো ‘মিনসোক-আক’, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ, উৎসব আর লোকজ আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
দরবারের ঐতিহ্য এবং লোকজ নাট্যের মেলবন্ধন
কোরীয় সঙ্গীতের প্রধান ধারাগুলোর দিকে তাকালে সমাজ ও ধর্মের এক নিখুঁত সাঙ্গীতিক রূপান্তর চোখে পড়ে। যেমন, দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন থেকে আসা ‘আ-আক’ ধারাটি মূলত কনফুসীয় ধর্মীয় আচার ও রাজকীয় উৎসবের জন্য নির্ধারিত ছিল। এর সুর এতটাই ধীর এবং গম্ভীর যে, প্রাচীন কোরীয়রা বিশ্বাস করতেন এই সুর মানুষের আত্মাকে সমস্ত জাগতিক কলুষতা থেকে মুক্ত করে পরিশুদ্ধ করে তোলে। এর পাশাপাশি রয়েছে কোরিয়ার নিজস্ব মাটির আদিবাসী সুর ‘হিয়াং-আক’। রাজকীয় ভোজসভা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বড় উৎসবেও এই ধারাটি পরিবেশন করা হতো, যেখানে বাঁশি আর তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের প্রাধান্য থাকত।
তবে কোরীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ও সমৃদ্ধ সম্পদ হলো ‘পানসোরি’। এটি মূলত একক কণ্ঠের একটি অনন্য সঙ্গীতনাট্য। এখানে একজন গায়ক বা গায়িকা কেবল একটিমাত্র ড্রামের তালের ওপর ভর করে পুরো একটি দীর্ঘ কাহিনী বা উপাখ্যান অভিনয়ের ভঙ্গিতে গেয়ে শোনান। গায়কের কণ্ঠের এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা এবং পারফরম্যান্সের গভীরতার কারণে ইউনেস্কো একে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। সাধারণ মানুষের লড়াকু জীবন থেকে জন্ম নেওয়া আরেকটি চমৎকার রূপ হলো ‘সামুল নোরি’। এটি মূলত চার ধরণের ঐতিহ্যবাহী ঘাতবাদ্য বা পারকাশনের এক দারুণ খেলা, যা অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী তালের ঝড় তুলে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে। আর সম্পূর্ণ কোনো ড্রাম বা তালবাদ্যের সহযোগিতা ছাড়া, শিল্পী যখন নিজের বাদ্যযন্ত্রের ওপর একক ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর সর্বোচ্চ কারিগরি দক্ষতা ও আবেগ ঢেলে দেন, তখন সেই শৈলীকে বলা হয় ‘সানজো’।
প্রকৃতি থেকে উঠে আসা বাদ্যযন্ত্র
চীনা বা জাপানি ঐতিহ্যের মতোই কোরীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর তৈরির উপাদানের সাথে প্রকৃতির এক গভীর আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে। মাটি, রেশম সুতো, বাঁশ আর পাথর—এসব উপাদান দিয়েই তৈরি হয় গুগাকের প্রধান বাদ্যযন্ত্রগুলো।
এই যন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ‘গায়াগিউম’। এটি বারোটি তারবিশিষ্ট একটি বড় বোর্ড-জিথার, যা দেখতে জাপানি ‘কোতো’ যন্ত্রের মতো হলেও এর বাজানোর কায়দা এবং সুরের রেশ অনেক বেশি নরম ও মায়াবী। আর কোরীয় সুরের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে ‘হেগিউম’ নামের দুই তারের একটি বিশেষ বেহালা জাতীয় যন্ত্রের মধ্যে। এর ধনুকটি তারের মাঝখান দিয়ে টেনে যখন বাজানো হয়, তখন যে তীক্ষ্ণ ও দরদী সুর বের হয়, তা অনেক সময় মানুষের বুকভাঙা কান্নার প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়।
ফুঁ দিয়ে বাজানোর যন্ত্রের মধ্যে ‘পিড়ি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশের তৈরি ডাবল-রীড বিশিষ্ট এই ছোট বাঁশিটি আকারে ছোট হলেও এর সুর অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মন্দ্র। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘দেগিউম’, যা একটি বড় আড়াআড়ি বাঁশি। এই বাঁশির গায়ে একটি বিশেষ ধরনের কম্পনকারী পর্দা বা মেমব্রেন লাগানো থাকে, যার ফলে ফুঁ দেওয়ার সাথে সাথে সুরের মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত ও অনন্য টেক্সচার তৈরি হয় যা অন্য কোনো বাঁশিতে সচরাচর শোনা যায়)।
সুরের কম্পন ও মানুষের শ্বাসের ছন্দ
কোরীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কারিগরি রহস্য লুকিয়ে আছে ‘সিগিমসে’ নামের একটি বিশেষ টেকনিকে। এটি মূলত সুরের অলঙ্করণ বা নোট কাঁপানোর এক অনন্য পদ্ধতি। কোরীয় সঙ্গীতে কোনো সোজা বা ফ্ল্যাট নোট বাজানো প্রায় নিষিদ্ধ। শিল্পী যখনই কোনো স্বর স্পর্শ করেন, তখনই তাকে চমৎকারভাবে কাঁপিয়ে, টেনে বা দ্রুত গিটকিরির মোচড় দিয়ে এক ধরণের আবেগ তৈরি করেন। এই সিগিমসের কারণেই কোরীয় সুর এতটা মরমী এবং দীর্ঘস্থায়ী এক সাঙ্গীতিক রেশ রেখে যায়।
একইভাবে এদের তালের হিসাবটাও বেশ চমৎকার, যাকে বলা হয় ‘জংদান’। পশ্চিমা সঙ্গীতের চেনা ৪/৪ ছন্দের বদলে কোরীয় সঙ্গীতে ১২/৮ বা তেরিজা তালের মতো জটিল ছন্দচক্র ব্যবহার করা হয়। এই রিদমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি কোনো যান্ত্রিক ঘড়ির কাঁটা মেপে তৈরি করা হয়নি; বরং মানুষের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। আর এই কারণেই এই সঙ্গীত শোনার সময় মানুষের শরীর ও মনে এক ধরণের গভীর প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা নেমে আসে।
আজকের এই আধুনিক কে-পপ (K-pop) যুগে দাঁড়িয়েও কোরীয়রা কিন্তু তাঁদের এই সহস্রাব্দের পুরনো সুরের শেকড়কে ভুলে যাননি। গুগাক আজকেও তাঁদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজদরবারের সেই ধীরস্থির গাম্ভীর্য আর পানসোরির মরমী গায়কির এই মেলবন্ধন বিশ্বসঙ্গীতের দরবারে কোরীয় উপদ্বীপকে এক চিরন্তন ও অনন্য মর্যাদায় টিকিয়ে রেখেছে।
আরও দেখুন:
