খণ্ডারবাণী (Khandar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ধ্রুপদে  খণ্ডারবাণী তার বীরত্বব্যঞ্জক প্রকাশ, কণ্ঠের জোর এবং যন্ত্রের মতো সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য শাস্ত্রীয় সংগীতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 খণ্ডারবাণী (Khandar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নামকরণ

খণ্ডারবাণী নামটি এসেছে রাজস্থানের ‘খণ্ডার’ নামক স্থান থেকে। ঐতিহাসিক মতে, এই বাণীর প্রবর্তক ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ রাজা সমোকন সিং (যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর নওবত খাঁ নামে পরিচিত হন)।

  • বংশলতিকা: নওবত খাঁ ছিলেন তিলক সিং-এর পুত্র এবং বিখ্যাত তানসেনের জামাতা। তাঁর বংশধরাই পরবর্তীকালে ‘সেনিয়া ঘরানা’ এবং খণ্ডারবাণীর প্রধান ধারক হয়ে ওঠেন।
  • বিবর্তনের ধারা: খণ্ডারবাণী মূলত যন্ত্রী বা ইনস্ট্রুমেন্টাল স্টাইল দ্বারা প্রভাবিত। বিশেষ করে রুদ্রবীণা বাদনের কৌশল এই বাণীর গায়নশৈলীতে গভীরভাবে মিশে আছে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 খণ্ডারবাণী (Khandar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

খণ্ডারবাণীর প্রধান কারিগরি বৈশিষ্ট্য

খণ্ডারবাণীকে বলা হয় ‘বীর রস’-এর গায়কি। এর কিছু অনন্য কারিগরি দিক হলো:

  • কণ্ঠের তেজ ও গাম্ভীর্য: এই বাণীতে কণ্ঠস্বরের প্রয়োগ হয় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ওজস্বী। গায়ককে বুক থেকে সরাসরি স্বর নিক্ষেপ করতে হয়, যা শ্রোতার মনে এক ধরনের রাজকীয় অনুভূতির সৃষ্টি করে।
  • গমকের প্রাধান্য: খণ্ডারবাণীর প্রাণ হলো ভারী এবং দ্রুত ‘গমক’। এখানে স্বরগুলো এক একটি অস্ত্রের মতো নিক্ষিপ্ত হয়। একে অনেক সময় ‘খণ্ড’ বা তলোয়ারের আঘাতের সাথে তুলনা করা হয়।
  • লয়কারী ও ছন্দ: ডাগরবাণীর মতো দীর্ঘ আলাপ নয়, বরং খণ্ডারবাণীতে তালের সাথে জটিল লয়কারী এবং ত্বরিত ছন্দের কাজ বেশি দেখা যায়।
  • যান্ত্রিক অনুকরণ: রুদ্রবীণা বা বীণার তারে যেভাবে মিজরাব দিয়ে আঘাত করা হয়, কণ্ঠস্বরেও সেই ধরনের স্পন্দন বা ঝংকার তৈরি করা খণ্ডারবাণীর বিশেষত্ব।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 খণ্ডারবাণী (Khandar Vani) | হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কন্ঠশিল্পি ঘরানা (Vocal Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

খণ্ডারবাণীর প্রচারক ও ঘরানা

যদিও আজ বিশুদ্ধ খণ্ডারবাণী গাওয়া শিল্পী কমে এসেছে, তবুও কিছু নির্দিষ্ট ঘরানায় এর প্রভাব আজও অমলিন:

১. দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga): বিহারের দরভাঙ্গা ঘরানার ধ্রুপদ গায়কি মূলত খণ্ডারবাণী দ্বারা প্রভাবিত। এখানকার মালিক বংশের শিল্পীরা (যেমন- রাম চতুর মালিক) লয়কারী এবং গমকের যে কাজ করেন, তা খণ্ডারবাণীরই অংশ।

২. সেনিয়া ঘরানা: নওবত খাঁ-র বংশধররা, যাঁরা মূলত বীণকার ছিলেন, তাঁরা এই বাণীকে যন্ত্রে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বিখ্যাত রুদ্রবীণা বাদক উস্তাদ আসাদ আলী খাঁ সাহেব এই খণ্ডারবাণীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন।

৩. তলোয়ান্ডি ঘরানা (Talwandi): পাঞ্জাব অঞ্চলের এই ঘরানাতেও খণ্ডারবাণীর বীরত্বপূর্ণ গায়কি এবং দ্রুত আলাপের আধিক্য দেখা যায়।

ডাগরবাণী বনাম খণ্ডারবাণী: একটি তুলনামূলক ছক

বৈশিষ্ট্যডাগরবাণী (Dagar Vani)খণ্ডারবাণী (Khandar Vani)
প্রধান রসশান্ত ও ভক্তি রসবীর ও রুদ্র রস
আলাপঅতি-বিলম্বিত ও ধ্যানমগ্নদ্রুত ও ওজস্বী
গমককোমল ও সূক্ষ্মভারী ও ঝংকৃত
প্রভাবকণ্ঠসংগীত প্রধানযন্ত্র (বীণা) প্রধান

আরও দেখুন: