পাতিয়ালা ঘরানা হলো হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই ধারা, যা কণ্ঠস্বরের অকল্পনীয় নিয়ন্ত্রণ, দ্রুতগতির তান এবং অত্যন্ত সুমধুর হরকতের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই ঘরানা মূলত একটি ‘সম্পূর্ণ প্যাকেজ’, যেখানে গায়কীর মধ্যে যেমন ধ্রুপদী গাম্ভীর্য থাকে, তেমনই থাকে উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (যেমন ঠুমরি) লাবণ্য। পাঞ্জাব অঞ্চলের মাটির গন্ধ আর রাজকীয় দরবারের আভিজাত্য মিশে এই ঘরানাটি তৈরি হয়েছে। পাতিয়ালা ঘরানার গায়কী শুনলে মনে হয় যেন এক অবাধ্য ঝরনা ধারা বয়ে চলেছে, যা একইসাথে শক্তিশালী আবার অত্যন্ত কোমল। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ সাহেবের জাদুকরী কণ্ঠের মাধ্যমে এই ঘরানা বিংশ শতাব্দীতে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিল, যা আজও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে এক অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।
খেয়ালে পাতিয়ালা ঘরানা

উৎপত্তি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পাতিয়ালা ঘরানার শেকড় লুকিয়ে আছে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের পাতিয়ালা নামক রাজদরবারে। এই ঘরানার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দুজন মহান ওস্তাদের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়—ওস্তাদ আলী বখশ খাঁ (Ustad Ali Baksh Khan) এবং ওস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ (Ustad Fateh Ali Khan)। তাঁরা সঙ্গীত জগতে ‘আলি-ফতু’ (Ali-Fatu) জোড়ি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁরা মূলত গোয়ালিয়র ঘরানার ওস্তাদ হাদদু-হাস্সু খাঁ সাহেবের শিষ্য উস্তাদ তানরাস খাঁ সাহেবের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
১৮-১৯ শতকের শেষভাগে পাঞ্জাবের মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানা সমৃদ্ধ হয়। পাতিয়ালা ঘরানার উৎপত্তির পেছনে একটি বিশেষ কৌশল কাজ করেছিল—প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদরা কেবল একটি নির্দিষ্ট শৈলীতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁরা গোয়ালিয়র ঘরানার কাঠামোর সাথে জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার জটিল তান এবং পাঞ্জাবের লোকসঙ্গীতের মিষ্টতা মিশিয়ে এক নতুন ‘পাঞ্জাবি অঙ্গ’-এর জন্ম দেন। তবে এই ঘরানা প্রকৃত অর্থে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ (Ustad Bade Ghulam Ali Khan) সাহেবের হাত ধরে। তিনি পাতিয়ালার এই ধারাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান যেখানে খেয়ালের ব্যাকরণ আর ঠুমরির আবেদন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

খেয়াল গায়নে পাতিয়ালা ঘরানার ভূমিকা
খেয়াল গানের বিবর্তনে পাতিয়ালা ঘরানার ভূমিকা বৈপ্লবিক। অন্যান্য ঘরানা যখন কেবল নির্দিষ্ট রাগের গাণিতিক বিস্তারে মগ্ন ছিল, পাতিয়ালা ঘরানা তখন দেখিয়েছিল যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কতটা ‘শ্রবণমধুর’ (Melodious) হতে পারে। এই ঘরানা খেয়াল গায়নে ‘হরকত’ এবং ‘মুর্কি’-র ব্যবহারকে এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। পাতিয়ালার শিল্পীরা প্রমাণ করেছেন যে, অতি দ্রুত গতিতে তান গাইলেও রাগের বিশুদ্ধতা হারানো হয় না।
এই ঘরানার আরও একটি বড় ভূমিকা হলো খেয়াল এবং ঠুমরির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা। পাতিয়ালা ঘরানার প্রভাবেই খেয়ালের ভেতর ‘বোল-বনাও’-এর কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও হৃদয়স্পর্শী হয়েছে। পাঞ্জাবি অঙ্গের এই গায়কী খেয়াল গানকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। কণ্ঠস্বরের নমনীয়তা (Flexibility) এবং তিন সপ্তকে সমানভাবে বিচরণ করার যে কৌশল পাতিয়ালা শিখিয়েছে, তা আধুনিক খেয়াল গায়কদের জন্য এক পরম শিক্ষা।

গায়নশৈলীর প্রধান কারিগরি বৈশিষ্ট্যসমূহ (Technical Details)
পাতিয়ালা ঘরানার মূল দর্শন হলো—”সুর যেন কানে আরাম দেয়, আর তান যেন চোখের পলকে বিদ্যুৎ খেলে যায়।” এই লক্ষ্য অর্জনে তাঁরা নিচের কারিগরি কৌশলগুলো ব্যবহার করেন:
১. কণ্ঠস্বরের নমনীয়তা ও তিন সপ্তকে বিচরণ (Technique of Voice Range)
পাতিয়ালা ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠ কেবল তিন সপ্তকে পৌঁছায় না, বরং প্রতিটি সপ্তকে কণ্ঠের ‘ভলিউম’ এবং ‘টেক্সচার’ সমান থাকে।
- মন্দ্র সপ্তক (খাদ): এখানে স্বরগুলো কেবল গম্ভীর নয়, বরং অত্যন্ত দানাযুক্ত এবং স্পষ্ট হয়। সাধনা এমনভাবে করা হয় যাতে সা থেকে নিচের পা পর্যন্ত নামলেও স্বর অস্পষ্ট না হয়।
- তার সপ্তক (উচ্চ): পাতিয়ালার বিশেষত্ব হলো উচ্চ সপ্তকে ‘চিৎকার’ না করে ‘সুর’ লাগানো। তাঁরা কণ্ঠের মাথার দিকের অংশ (Head Voice) এবং বুক (Chest Voice)-এর এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটান। ওস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ সাহেব বলতেন, উঁচু স্বরে যাওয়ার সময় গলাকে সরু না করে বরং আরও প্রশস্ত করতে হয়, যাতে স্বরটি তীক্ষ্ণ না হয়ে বরং ভরাট শোনায়। এই নমনীয়তার কারণেই তাঁরা দ্রুত গতির কাজগুলো করার সময় কণ্ঠকে রেশমের মতো বাঁকিয়ে নিতে পারেন।
২. দ্রুতগতির তান ও বিশেষ অলঙ্করণ (The Mastery of Speed and Ornamentation)
এই ঘরানার তানের গতি সাধারণ গায়কির চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এর পেছনে কাজ করে কিছু বিশেষ অলঙ্কার:
- ভৃগু-তান ও সাপাট তান: পাতিয়ালার সাপাট তান (সরল তান) পড়ার সময় স্বরগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে যায় না। যেমন: সা রে গা মা পা ধা নী র্সা — এটি যখন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে গাওয়া হয়, তখন প্রতিটি স্বরের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রাখা হয়।
- মুর্কি ও খটকা (Short Embellishments): মুর্কি হলো দুই বা তিনটি স্বরের একটি দ্রুত বৃত্তাকার কাজ। পাতিয়ালার শিল্পীরা এক একটি তানের মাঝখানে কয়েক ডজন মুর্কি ঢুকিয়ে দেন। যেমন একটি সাধারণ তানের পরিবর্তে তাঁরা গাইবেন—সা(রেগা) রে(গামা) গা(মাপধ)…। এই বন্ধনীভুক্ত স্বরগুলো এত দ্রুত গাওয়া হয় যে তা কানে একটি সূক্ষ্ম দোলা দিয়ে যায়।
- বক্র তান: পাতিয়ালার তানগুলো সোজা পথে চলার চেয়ে আঁকাবাঁকা পথে বা ‘কূট’ বিন্যাসে বেশি চলে। যেমন— সা গা রে মা গা পা মা ধা…। এই বক্রতা তানের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও রোমাঞ্চ তৈরি করে।
৩. বন্দিশ ও বোল-বনাও: খেয়াল ও ঠুমরির মহাকাব্যিক মেলবন্ধন
পাতিয়ালা ঘরানা প্রথম সার্থকভাবে দেখিয়েছিল যে খেয়াল গায়কি কেবল রাগ-বিস্তার নয়, এটি একটি কাব্যিক অনুভূতি।
- বোল-বনাও: এটি মূলত ঠুমরির অঙ্গ। খেয়াল গাওয়ার সময় বন্দিশের একটি বিশেষ কথা, ধরুন “পিয়া পালানিয়া”, একে যখন গায়ক ধরেন, তখন তিনি কেবল নোটেশন গান না; বরং বিরহ বা মিলনের আকুতি অনুযায়ী সুরকে ভাঙা-গড়া করেন।
- হরকত: শব্দের ভাঁজে ভাঁজে গলার যে সূক্ষ্ম কাজ, তাকেই হরকত বলে। পাতিয়ালা ঘরানায় খেয়ালের বন্দিশ গাওয়ার সময় পাঞ্জাবি অঙ্গের ঠুমরির মতো গলার মিহি কাজ ব্যবহার করা হয়, যা গায়কিকে সাধারণ খেয়ালের চেয়ে অনেক বেশি ‘কালারফুল’ বা রঙিন করে তোলে। একারণেই পাতিয়ালার খেয়াল সাধারণ মানুষের কাছেও এত জনপ্রিয়।
৪. তাল, লয় এবং ‘সম’ আসার জাদুকরী কৌশল
পাতিয়ালা ঘরানায় তাল কেবল একটি সময়-মাপক যন্ত্র নয়, এটি গায়কের জন্য একটি খেলার মাঠ।
- লয়কারী: এই ঘরানার শিল্পীরা বিলম্বিত লয়েও তালের প্রতিটি মাত্রার ফাঁকে ফাঁকে সুরের ছোট ছোট নকশা করেন। তাঁদের ‘দুগুণ’, ‘তিগুণ’ এবং ‘চৌগুণ’ লয়ের কাজগুলো অত্যন্ত নিখুঁত।
- সমে আসার চমৎকারিত্ব: পাতিয়ালার শিল্পীরা সমে আসার আগে এক দীর্ঘ এবং জটিল তানের জাল বুনেন। শ্রোতা যখন মনে করেন শিল্পী হয়তো তালের হিসেব হারিয়ে ফেলেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে এক অবিশ্বাস্য তানের ঢেউ শেষ করে তাঁরা একেবারে নির্ভুলভাবে বন্দিশের ‘মুখড়া’ ধরে ‘সম’-এ এসে থামেন। এই পদ্ধতিটি শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরণের ‘থ্রিল’ বা উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
- পাঞ্জাবি ঠ্যাকা: তাঁরা অনেক সময় ত্রিতাল বা রূপকের মতো প্রচলিত তালের বাইরেও পাঞ্জাবি লোকজ ছন্দের প্রভাব গায়কির মধ্যে নিয়ে আসেন, যা এক অনন্য ‘গ্রুভ’ তৈরি করে।
কারিগরি সংক্ষিপ্তসার (Table of Technical Nuances)
| বৈশিষ্ট্য | পাতিয়ালা ঘরানার কৌশল | কারিগরি নাম/বিবরণ |
| স্বর প্রক্ষেপণ | ওজস্বী অথচ নমনীয় | খোলা গলার আওয়াজ (Open Voice) |
| তানের গতি | অত্যন্ত দ্রুত ও দানাদার | ভৃগু-তান / বিদ্যুৎ গতি |
| বিশেষ অলঙ্কার | মুর্কি, খটকা ও জমজমা | পাঞ্জাবি আঙ্গিক (Panjabi Style) |
| আলাপ | বন্দিশের মাধ্যমে বিস্তার | বোল-আলাপ ও বোল-বনাও |
| ভাবনা | বীরত্ব ও শৃঙ্গার রসের মিশ্রণ | রয়্যাল ও রোমান্টিক মিক্স |
পাতিয়ালার এই গায়নশৈলী আয়ত্ত করার জন্য বছরের পর বছর কেবল ‘পল্টা’ বা স্বরের বিভিন্ন বিন্যাসের রেওয়াজ করতে হয়। এই ঘরানার গায়কিকে বলা হয় ‘প্রস্তুত’ গায়কি, কারণ এখানে ভুল করার বা দুর্বল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

পাতিয়ালা ঘরানার শিক্ষণপদ্ধতি (Technical Pedagogical Details)
পাতিয়ালা ঘরানার শিক্ষা পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক এবং কৌশলগত। এখানে কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং কণ্ঠকে একটি যন্ত্রের মতো তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হয়:
১. মেড়খন্ড ও পল্টা সাধনা (Combinatorial Exercises)
শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘মেড়খন্ড’ পদ্ধতিতে স্বরের হাজার হাজার কম্বিনেশন বা বিন্যাস শেখানো হয়। যেমন—সা রে গা, সা গা রে, রে সা গা… ইত্যাদি। এই কঠিন গাণিতিক চর্চা শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক ও কণ্ঠকে এতটাই ক্ষিপ্র করে তোলে যে, পরবর্তীতে যেকোনো জটিল তান সে অনায়াসে গাইতে পারে। কয়েক বছর ধরে কেবল এই ‘পল্টা’ সাধনা করার ফলেই পাতিয়ালার শিল্পীদের কণ্ঠ অতটা নমনীয় হয়।
২. স্বরের উজ্জ্বলতা ও শ্বাস নিয়ন্ত্রণ (Breath Control)
এই ঘরানায় দীর্ঘক্ষণ শ্বাস ধরে রাখার (Breath control) বিশেষ ব্যায়াম করানো হয়, যাতে একজন শিল্পী দীর্ঘ এবং জটিল তানগুলো এক নিশ্বাসে শেষ করতে পারেন। স্বর প্রক্ষেপণের সময় কণ্ঠের উজ্জ্বলতা (Brilliance) বজায় রাখার জন্য ‘আকার’ ও ‘উকার’ সাধনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গুরু শিষ্যকে শেখান কীভাবে উচ্চ সপ্তকে চিৎকার না করে অত্যন্ত মাধুর্যের সাথে স্বর লাগাতে হয়।
৩. বাদ্যযন্ত্রের অনুকরণ
পাতিয়ালা ঘরানার অনেক ওস্তাদ সারঙ্গী বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানতেন। তাই শিক্ষাদান কালে শিষ্যকে শেখানো হয় কীভাবে কণ্ঠ দিয়ে বাদ্যযন্ত্রের মতো কঠিন ও দ্রুত কাজগুলো ফুটিয়ে তোলা যায়। এই কারণেই পাতিয়ালার গায়কি অনেক সময় বাদ্যযন্ত্রের মতো নির্ভুল ও শৈল্পিক হয়।

পাতিয়ালা ঘরানার অতীত ও বর্তমানের বিখ্যাত শিল্পীরা
পাতিয়ালা ঘরানা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র উপহার দিয়েছে, যাঁরা খেয়াল গায়কিকে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দনে পরিণত করেছেন। এই ঘরানার আভিজাত্য ও জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছেন নিচের মহীরুহগণ:
অতীতের কিংবদন্তি শিল্পীরা:
- উস্তাদ আলী বখশ খাঁ ও উস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ (আলি-ফতু): এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা জোড়ি। তাঁদের গায়কির ক্ষিপ্রতা ও মিষ্টতা পাতিয়ালাকে রাজদরবার থেকে ভারতের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দিয়েছিল।
- উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ: পাতিয়ালা ঘরানার ইতিহাসের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। তাঁকে ‘বিংশ শতাব্দীর তানসেন’ বলা হয়। তাঁর কণ্ঠের নমনীয়তা, তিন সপ্তকে অনায়াস বিচরণ এবং খেয়ালের সাথে ঠুমরির যে অপূর্ব মিশ্রণ তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
- উস্তাদ বরকত আলী খাঁ: বড় গুলাম আলী খাঁ সাহেবের ভাই। তিনি বিশেষ করে ঠুমরি, দাদরা ও গজল গায়নে পাতিয়ালা অঙ্গকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
- উস্তাদ আমানত আলী খাঁ ও উস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ (পাকিস্তান): দেশভাগের পর পাকিস্তানে পাতিয়ালা ঘরানার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন এই দুই ভাই। তাঁদের গায়কি অত্যন্ত ওজস্বী ও শৈল্পিক ছিল।
- পণ্ডিত জগদীশ প্রসাদ: বড় গুলাম আলী খাঁ সাহেবের অন্যতম প্রধান শিষ্য, যিনি ভারতে এই ঘরানার শুদ্ধ রূপটি আজীবন লালন করেছেন।
সমসাময়িক ও আধুনিককালের শিল্পীরা:
- পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী: বর্তমান সময়ের পাতিয়ালা ঘরানার শ্রেষ্ঠতম ধবজাধারী। বড় গুলাম আলী খাঁ সাহেবের সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি এই ঘরানার গায়কিকে এক আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দিয়েছেন।
- উস্তাদ হামিদ আলী খাঁ: পাকিস্তানের পাতিয়ালা বংশের উত্তরাধিকারী, যিনি ধ্রুপদী খেয়ালের আভিজাত্য ধরে রেখেছেন।
- বিদুষী বেগম পারভীন সুলতানা: তাঁর কণ্ঠের অবিশ্বাস্য পাল্লা এবং উচ্চ সপ্তকে তীক্ষ্ণ অথচ সুমধুর কাজের জন্য তিনি ‘পাতিয়ালা রাজকুমারী’ হিসেবে পরিচিত।
- পণ্ডিত শান্তনু ভট্টাচার্য ও বিদুষী কৌশিকী চক্রবর্তী: বর্তমান প্রজন্মের এই শিল্পীরা পাতিয়ালা ঘরানার সেই রাজকীয় ক্ষিপ্রতা ও লালিত্যকে বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে উপস্থাপন করছেন।

পাতিয়ালা ঘরানা হলো ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের সেই ধারা, যা প্রমাণ করেছে যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কেবল কঠিন ব্যাকরণ নয়, বরং তা এক পরম নান্দনিক আনন্দ। যেখানে অন্যান্য ঘরানা অনেক সময় কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে সীমাবদ্ধ থাকে, পাতিয়ালা সেখানে হৃদয়ের আবেগ আর কণ্ঠের জাদুকরী কসরত দিয়ে শ্রোতাকে আবিষ্ট করে। উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ সাহেবের সেই বিখ্যাত উক্তি—“সুর যদি ঠিক থাকে, তবে ঈশ্বর স্বয়ং সেখানে বিরাজ করেন”—এই ঘরানার মূল মন্ত্র। আধুনিক খেয়াল ও উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে রূপ আজ আমরা দেখি, তার সিংহভাগ সৌন্দর্য ও কারিগরি উৎকর্ষ এই পাতিয়ালা ঘরানারই দান। সুরের এই রাজকীয় ঝরনাধারা ভবিষ্যতেও সঙ্গীতপ্রেমীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাবে।
