ধ্রুপদ সংগীতের চারটি প্রধান গায়নশৈলী বা ‘বাণী’র মধ্যে ‘গওহারবাণী’ (Gauharbani) অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম হিসেবে স্বীকৃত। এই বাণীটি মূলত সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার প্রধান সংগীতজ্ঞ মিঞা তানসেনের নিজস্ব গায়নশৈলী থেকে উদ্ভূত। গওহারবাণীকে ধ্রুপদের ‘রাজকীয়’ ধারা বলা হয় কারণ এটি রাজদরবারের গাম্ভীর্য এবং বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলে।
গওহারবাণীর উৎস ও ইতিহাস
‘গওহারবাণী’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে সংগীত গবেষকদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও অধিকাংশের মতে এটি তানসেনের পূর্বাশ্রমের নাম অথবা তাঁর উপাধির সাথে সম্পর্কিত। তানসেন গোয়ালিয়রের অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁর গায়নশৈলী থেকেই এই বাণীর জন্ম।
- মূল পুরুষ: মিঞা তানসেন।
- বিবর্তন: মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে ধ্রুপদ যখন তার শিখরে পৌঁছায়, তখন তানসেনের প্রবর্তিত এই শৈলীটিই ‘গওহারবাণী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তানসেনের বংশধররা (সেনিয়া ঘরানা) পরবর্তীকালে এই বাণীকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সচল রাখেন।
গওহারবাণীর কারিগরি বৈশিষ্ট্য
গওহারবাণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা, গাম্ভীর্য এবং শুদ্ধতা। একে অনেক সময় ‘শুদ্ধ বাণী’ও বলা হয়। নিচে এর মূল কারিগরি দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
ক. গায়ন ভঙ্গি (Structure and Flow):
এই বাণীর গতি ধীর এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। অন্য বাণীর মতো এতে খুব বেশি চপলতা বা অকারণ অলংকরণ থাকে না। এখানে স্বরের স্থায়িত্ব এবং গভীরতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
খ. মিড় ও আন্দোলনের প্রাধান্য:
গওহারবাণীর প্রাণ হলো ‘মিড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে মসৃণভাবে যাওয়া)। স্বরগুলোকে এখানে সোজাভাবে লাগানো হয় না, বরং একটি স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার সময় যে রেশ তৈরি হয়, তা অত্যন্ত শৈল্পিক। এতে স্বরের অতি-সূক্ষ্ম আন্দোলন রাগের ভাবকে গম্ভীর করে তোলে।
গ. লয় ও তাল:
এই বাণীতে সাধারণত চৌতাল (১২ মাত্রা) বা সুরফাঁকতাল (১০ মাত্রা)-এর প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। তালের জটিল লয়কারীর চেয়ে এখানে তালের ছন্দময় গাম্ভীর্য বজায় রাখা হয়।
ঘ. অলংকরণহীন সৌন্দর্য:
গওহারবাণীতে ‘গমক’ বা ‘হুড়ক’-এর চেয়ে স্বরের শুদ্ধতা ও ‘আকার’-এর স্পষ্টতার ওপর গুরুত্ব বেশি। এর গায়নশৈলীকে বলা হয় ‘সরল কিন্তু রাজকীয়’।
দর্শনের নিরিখে গওহারবাণী
প্রাচীন সংগীতশাস্ত্রে চারটি বাণীকে প্রকৃতির চারটি উপাদানের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, গওহারবাণীকে ধরা হয় ‘আকাশ’ বা **’শূন্যতা’**র প্রতীক। যেমন আকাশ স্থির এবং অসীম, গওহারবাণীও তেমনি শান্ত এবং প্রসন্ন। এটি শ্রোতার মনে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক ধ্যানের জন্ম দেয়।
গওহারবাণী ও সেনিয়া ঘরানা
তানসেনের পরিবারের দুই প্রধান শাখা—রবাবী (যাঁরা রবাব বাজাতেন) এবং বীণকার (যাঁরা বীণা বাজাতেন)—উভয়ই গওহারবাণীর ধারক ছিলেন। পরবর্তীকালে ডাগরবাণী বা খণ্ডারবাণীর ওপরও গওহারবাণীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে দর্ভাঙ্গা ঘরানার ধ্রুপদ গায়কিতে গওহারবাণীর কিছু ছাপ পাওয়া যায়।
বর্তমান অবস্থা
আধুনিক কালে খাঁটি গওহারবাণী এককভাবে খুব কম শোনা যায়। অধিকাংশ ধ্রুপদ শিল্পী বর্তমানে বিভিন্ন বাণীর সংমিশ্রণে গান করেন। তবে সেনিয়া ঘরানার যন্ত্রবাদক এবং কিছু প্রবীণ ধ্রুপদ শিল্পীর গায়কিতে আজও এই বাণীর সেই আদি ও অকৃত্রিম গাম্ভীর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আরও দেখুন: