শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মানে শুধুমাত্র গান-বাজনা বা নৃত্য নয়, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মানে একটি সম্পূর্ণ জীবনবোধ—একটি কমপ্লিট লাইফস্টাইল। শিল্পীদের জীবনের গল্প, তাঁদের বড় হয়ে ওঠার লড়াই, কঠোর তালিম আর অন্তহীন রেয়াজের গল্প, জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার চমকপ্রদ ঘটনা—সবই এই সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। শুধু শিল্পী নন, এই সুরের পেছনের সমঝদার আয়োজক, রসিক শ্রোতা ও সঙ্গীত সমালোচকদের জীবনের গল্পও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মূল সুরের সাথে বাঁধা।
এসব মিলিয়েই তৈরি হয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসল রং ও রূপ। সুরের পেছনের সেই অচেনা ও অনুপ্রেরণাদায়ী মানবিক গল্পগুলোই আপনাদের সেবায় তুলে আনছি এই সিরিজে।
চলুন দেখি:
- গানের নেশায় ভীমসেন যোশীর ঘর ছেড়ে পালানো
- ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ: সুরের সন্ধানে এক চির যাযাবর
- সঙ্গীতের রেয়াজের চিল্লা কাটানো
- মুঘল-ই-আজম-এর সেই বিখ্যাত প্লেব্যাকের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা!
- ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ ও বরোদার মহারাজার পরস্পরের প্রতি সম্মান
১/ পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী এবং কড়া পড়া আঙুলের অদ্ভুত জেদ
বিশ্ববিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী ছিলেন চরম নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ একজন সাধক। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর এই সুযোগ্য শিষ্য দৈনিক ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সেতার রেয়াজ করতেন। সেতারের লোহার তারের ঘর্ষণে তাঁর ডান হাতের তর্জনীর ডগার চামড়া ফেটে রক্ত পড়ত। রক্ত পড়া বন্ধ করতে এবং চামড়া শক্ত রাখতে তিনি আঙুলের ডগায় গরম মোম গলিয়ে লাগিয়ে রাখতেন এবং আবারও রেয়াজে বসে যেতেন!
একবার কোলকাতার এক চিকিৎসক তাঁর আঙুল দেখে আঁতকে উঠে বলেছিলেন, “নিখিলবাবু, আপনি কি পাগল? এই আঙুল নিয়ে সেতার বাজালে তো গ্যাংগ্রিন হয়ে যাবে!” নিখিলবাবু মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “ডাক্তারবাবু, এই আঙুল যদি তারের ব্যথায় কাঁদে, তবে আমার সেতারের তারগুলো কাঁদবে কী করে? সেতারের কান্না ফোটানোর জন্যই তো আমার আঙুলের এই রক্তপাত!” —
২/ ওস্তাদ আমীর খাঁর রেলগাড়িতে বসে তামাকের নেশা ছাড়ার প্রতিজ্ঞা
ইন্দোর ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ আমীর খাঁ ছিলেন অসম্ভব গম্ভীর এবং অভিজাত গায়কির মানুষ। তবে তাঁর একটা বড় আসক্তি ছিল—তিনি প্রচুর পান খেতেন আর তামাক সেবন করতেন। একবার তিনি ট্রেনে করে কোলকাতা থেকে বোম্বে (মুম্বাই) যাচ্ছেন এক বড় জলসায় গান গাইতে। ট্রেনের কামরায় বসে তিনি যখন আয়েশ করে তামাক মুখে দিচ্ছেন, তখন এক সহযাত্রী ভদ্রলোক নাক কুঁচকে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বললেন, “ছিঃ! আপনি দেখতে এত সুপুরুষ, এত সুন্দর পোশাক পরেছেন, অথচ মুখটা তামাকের গন্ধে ভরিয়ে রেখেছেন!” ভদ্রলোক জানতেন না ইনি ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতগুণী ওস্তাদ আমীর খাঁ। খাঁ সাহেব বিন্দুমাত্র রেগে গেলেন না। তিনি শান্তভাবে জানালার বাইরে তামাকটুকু ফেলে দিলেন। এরপর পকেট থেকে তামাকের কৌটোটি বের করে চলন্ত ট্রেনের বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলেন! তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন—যে জিনিস মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে, তা আজ থেকে চিরতরে ত্যাগ করলাম। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওস্তাদ আমীর খাঁ আর কোনোদিন তামাক ছোঁননি। এই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ!
৩/ মহাত্মা গান্ধীর অসুস্থতার সময় পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের গান
পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অনন্য জাদুকর। তাঁর গায়কিতে এত বেশি আবেগ এবং নাট্যগুণ ছিল যে শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতেন। একবার মহাত্মা গান্ধী পুনেতে অসুস্থ হয়ে বিশ্রামে ছিলেন। পণ্ডিতজি খবর পেয়ে বাপুজির সাথে দেখা করতে গেলেন এবং তাঁর সামনে গান গাওয়ার অনুমতি চাইলেন।
পণ্ডিতজি তম্বুরা হাতে তুলে নিয়ে গাইলেন ভৈরবী রাগে মীরাবাঈয়ের বিখ্যাত ভজন—“পাগ ঘুঙঘুর বাঁধ মীরা নাচি রে”। পণ্ডিতজির উদাত্ত এবং আবেগঘন কণ্ঠে ভজনটি শুনতে শুনতে মহাত্মা গান্ধী নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। বাপুজির চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। গান শেষে গান্ধীজি অশ্রুসিক্ত চোখে বলেছিলেন, “পণ্ডিতজি, আপনার কণ্ঠের এই সুর আমার সমস্ত শারীরিক ক্লান্তি আর অসুস্থতাকে নিমেষেই ধুয়ে মুছে দিল। এটি গান নয়, এটি ঈশ্বরের প্রার্থনা!” —
৪/ পণ্ডিত ভীমসেন যোশী এবং এক কাপ চায়ের পরম তৃপ্তি
কিরানা ঘরানার ভারতরত্ন পণ্ডিত ভীমসেন যোশী যখন গানের টানে ঘর ছেড়ে পালিয়েছিলেন, তখন তাঁর পকেটে একটা পয়সাও ছিল না। ট্রেনের টিকিট কাটার টাকা নেই, পেটে ভাত নেই। ট্রেনের কামরায় বসেই তিনি আপনমনে তান ভাঁজতেন। সহযাত্রীরা তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ট্রেনের টিকিট চেকারকে (TTE) অনুরোধ করতেন যেন তাঁকে বিনা টিকিটে যেতে দেওয়া হয়।
ক্ষুধার্ত ভীমসেন একবার এক ছোট্ট স্টেশনে নেমে শীতে কাঁপছিলেন। এক চায়ের দোকানি তাঁর অবস্থা দেখে এক কাপ গরম চা আর দুটো বিস্কুট বাড়িয়ে দিলেন। কিশোর ভীমসেন কৃতজ্ঞতায় সেই চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই ভোরের ভৈরব রাগ গাইতে শুরু করলেন। চায়ের দোকানি ও স্টেশনের যাত্রীরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরিণত বয়সে ভারতরত্ন পাওয়ার পর ভীমসেন যোশী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে আমি গর্বিত, কিন্তু ক্ষুধার্ত পেটে সেই অচেনা চায়ের দোকানির এক কাপ গরম চায়ের বিনিময়ে গান গেয়ে আমি যে তৃপ্তি পেয়েছিলাম, তা এই জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি!”
৫/ ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ এবং তাঁর প্রিয় সারমেয় ‘ভিটু’
কিরানা ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ সাহেব বিশ্বাস করতেন যে সুর কেবল মানুষের নয়, সমস্ত জীবের একক ভাষা। তাঁর একটি পোষা কুকুর ছিল, যার নাম ছিল ‘ভিটু’। খাঁ সাহেব যখন রেয়াজে বসতেন, ভিটু চুপচাপ তাঁর পাশে এসে বসত।
একবার পুনেতে এক প্রকাশ্য সঙ্গীত জলসায় খাঁ সাহেব গান গাইছেন। হাজার হাজার শ্রোতার সামনে খাঁ সাহেব তানপুরা নিয়ে বসলেন এবং পাশে বসালেন ভিটু-কে! খাঁ সাহেব একটি বিশেষ রাগের স্বরলিপি গাইলেন এবং ভিটু-র দিকে তাকালেন। অবিশ্বাস্যভাবে, ভিটু ঠিক সেই সুরের কম্পাঙ্ক (Frequency) মিলিয়ে মৃদু স্বরে ডেকে উঠল! উপস্থিত শ্রোতারা অবাক হয়ে দেখলেন, একটি অবলা প্রাণীও ওস্তাদের সান্নিধ্যে এসে সুরের সমঝদার হয়ে উঠেছে। খাঁ সাহেব প্রমাণ করেছিলেন, সুরের সাধনা নিখাদ হলে তা প্রকৃতির পশুপাখির আত্মাকেও স্পর্শ করতে পারে।
৬/ উস্তাদ আমীর খাঁ এবং ভিখারির সুরের সমঝদারি
ইন্দোর ঘরানার কিংবদন্তি উস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব একবার কোলকাতার রাস্তায় হাঁটছিলেন। হঠাৎ ফুটপাতে বসে থাকা এক অন্ধ ভিখারির গুনগুনানি শুনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। ভিখারিটি আপনমনে মারওয়া রাগের একটি খুব কঠিন বিস্তার নিখুঁতভাবে ভাঁজছিল। খাঁ সাহেব সেখানেই রাস্তার ধুলোয় বসে পড়লেন এবং ভিখারির সাথে সুর মেলাতে শুরু করলেন।
রাস্তার সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে দেখল, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং দামি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী রাস্তার এক অন্ধ ভিখারির সাথে মাটিতে বসে গান গাইছেন! খাঁ সাহেবকে যখন পরে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি রাস্তার ধুলোয় বসে গেলেন? তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, “আরে ভাই, সুরের কোনো জাত নেই, কোনো শ্রেণি নেই। যে মারওয়া রাগের নিখুঁত বিস্তার নিখিল ব্যানার্জী বা রবিশঙ্করের সেতারে মানায়, সেই সুর যখন এক ভিখারির গলায় শুনি, তখন বুঝতে হবে ঈশ্বর তাঁর কণ্ঠে ভর করেছেন। ঈশ্বরের সামনে ধুলোয় বসতে কোনো লজ্জা নেই!”
৭/ যখন ওস্তাদ আমীর খাঁ সস্তা হোটেলের ডাল-রুটি খেলেন!
ইন্দোর ঘরানার প্রবাদপুরুষ ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন এবং আভিজাত্যপূর্ণ মানুষ। সবসময় পাটভাঙা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতেন, চোখে থাকত দামি চশমা। একবার কোলকাতায় এক বড় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর শেষে বেশ রাত হয়ে গেছে। আয়োজকরা খাঁ সাহেবকে কোনো নামী রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু খাঁ সাহেব হঠাৎ গাড়ি থামাতে বললেন ধর্মতলার এক সাধারণ, সস্তা ফুটপাতের হোটেলের সামনে। যেখানে রিকশাচালক আর দিনমজুরেরা খাচ্ছিলেন। সবাই তো অবাক! খাঁ সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সেই কাঠের বেঞ্চিতে বসলেন এবং হুকুম দিলেন—“ভাই, গরম ডাল আর তন্দুরি রুটি দাও!” আয়োজকরা যখন কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “খাঁ সাহেব, এখানে খাবেন? আপনার শরীর খারাপ করবে!” খাঁ সাহেব হেসে উত্তর দিলেন, “আরে ভাই, আজ জলসায় গাওয়া শেষ করে মনটা একদম হালকা হয়ে গেছে। এই গরিব মানুষগুলোর সাথে বসে খাওয়ার যে অনাবিল আনন্দ, তা কি ফাইভ-স্টার হোটেলের এসি রুমে বসে পাওয়া যায়?” শিল্পের চূড়ায় বসেও মাটির মানুষের সাথে এই একাত্মতা কেবল আমীর খাঁ সাহেবের পক্ষেই সম্ভব ছিল!
৮/ বড় গোলাম আলী খাঁ ও মহাত্মা গান্ধীর সেই আধ্যাত্মিক আড্ডা
একবার দিল্লীতে মহাত্মা গান্ধীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন উস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেব। বাপুজি গান শুনতে খুব ভালোবাসতেন, বিশেষ করে ভজন। খাঁ সাহেব বাপুজির সামনে বসে কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল কণ্ঠের জাদুতে রামধুন গাইতে শুরু করলেন—“রঘুপতি রাঘব রাজা রাম…”।
খাঁ সাহেবের সেই গমগমে শাহী আওয়াজে যখন ভজনটি গুমরে উঠল, গান্ধীজি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। গান শেষে গান্ধীজি খাঁ সাহেবের হাত দুটি ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “খাঁ সাহেব, আপনার এই কণ্ঠে যে ঈশ্বর বাস করেন, তা আজ আমি নিজে অনুভব করলাম।” খাঁ সাহেবও বিনয়ে মাথা নিচু করে বলেছিলেন, “বাপুজি, সুর হলো ঈশ্বরের ইবাদত। আমি কেবল তাঁর এক সামান্য গোলাম মাত্র!” রাজনীতির মহীরুহ আর সুরের সম্রাটের এই নীরব আত্মিক মিলন ভারতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়।
৯/ কুমার গন্ধর্বের নীরব সাধনা ও এক নতুন সুরের জন্ম
কিংবদন্তি পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব ছিলেন এক আশ্চর্য প্রতিভা। খুব অল্প বয়সেই তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আলোড়ন তুলেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে যৌবনেই তিনি যক্ষ্মা (Tuberculosis) রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা কড়া নির্দেশ দিলেন—টানা কয়েক বছর গান গাওয়া তো দূরের কথা, জোরে শ্বাস নেওয়া বা কথা বলাও নিষেধ! একজন সঙ্গীতশিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?
কুমার গন্ধর্ব দমে যাননি। তিনি মধ্যপ্রদেশের দেওয়াসের এক নিভৃত গ্রামে চলে গেলেন। পাঁচ বছর তিনি বিছানায় শুয়ে রইলেন, মুখে কোনো রা নেই। কিন্তু কান দুটো খোলা ছিল! তিনি শুয়ে শুয়ে শুনতেন মালব অঞ্চলের লোকশিল্পীদের গান, বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক আর প্রকৃতির না-বলা সুর।
পাঁচ বছর পর যখন তিনি রোগমুক্ত হয়ে ফিরলেন, তখন চিকিৎসকরা অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর ফুসফুসের ক্ষমতা বা শ্বাস কিছুটা কমলেও সঙ্গীতবোধ এবং গায়কির ধার বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং প্রকৃতির সেই নিস্তব্ধতা থেকে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে ফিরেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক গায়কি। নীরবতাও যে সুরের সবচেয়ে বড় সাধনা হতে পারে, কুমার গন্ধর্ব তার জীবন্ত প্রমাণ!
১০/ উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ এবং গঙ্গার তীরের সেই অলৌকিক সাধনা
ভারত রত্ন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেবের সানাইয়ের সুর শুনলে মনে হতো যেন স্বর্গ থেকে সুর নেমে আসছে। খাঁ সাহেব আজীবন বেনারসের গঙ্গার ঘাটে বসে রেয়াজ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মা গঙ্গা এবং বেনারসের বিশ্বনাথ মন্দিরের আশীর্বাদ ছাড়া সানাইয়ে সুর ধরে না।
একবার আমেরিকার এক বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হলো—“খাঁ সাহেব, আপনি আমেরিকায় চলে আসুন। আপনার জন্য আমরা বেনারসের মতো হুবহু ঘরবাড়ি বানিয়ে দেবো, আপনার সমস্ত ছাত্র এখানে এসে শিখবে।” খাঁ সাহেব মৃদু হেসে আমেরিকান প্রতিনিধিকে জিজ্ঞেস করলেন, “সবই তো বানিয়ে দেবেন সাহেব, কিন্তু আমার বেনারসের গঙ্গা নদীটাকে কীভাবে আমেরিকায় নিয়ে আসবেন? গঙ্গার জল আর হাওয়া ছাড়া তো আমার সানাই কথা বলবে না!” কোটি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে খাঁ সাহেব বেনারসের ভাঙা ঘরের এক চিলতে বারান্দাতেই থেকে গেলেন। সুরের জন্য মাটির প্রতি এই টান আজ সত্যিই বিরল!
১১/ পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের ‘হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা’ রূপ!
পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে এক অদ্ভুত বশীকরণ ক্ষমতা ছিল। একবার তিনি মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) এক উন্মুক্ত মাঠে ভোরের রাগে গান গাইছেন। আসর জমে উঠেছে। ঠিক এমন সময় কোত্থেকে একদল বুনো ঘুঘু আর পায়রা উড়ে এসে তাঁর ঠিক সামনে বসল। পণ্ডিতজি গান থামালেন না। তিনি সুরের এমন এক নিখুঁত কম্পন (Frequency) তৈরি করলেন যে পাখিগুলো ঘাড় বাঁকিয়ে স্থির হয়ে সেই গান শুনতে লাগল!
গান শেষ হওয়ার পর পণ্ডিতজি যখন তম্বুরা রাখলেন, তখনই কেবল পাখিগুলো ডানা মেলে উড়ে গেল। উপস্থিত হাজার হাজার সমঝদার সেই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সুর দিয়ে প্রকৃতি ও পশুপাখিকে বশ করার যে প্রাচীন ভারতীয় মিথ বা রূপকথা আমরা শুনি, পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর সেদিন তা বাস্তবে করে দেখিয়েছিলেন।
১২/ ওস্তাদ আমির খাঁ এবং রেডিওর সেই নিখুঁত ঘড়ি!
ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেব ছিলেন সময়ের ব্যাপারে অসম্ভব খুঁতখুঁতে এবং নিয়মানুবর্তী। একবার অল ইন্ডিয়া রেডিওতে (AIR) তাঁর সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ প্রোগ্রামের স্লট ছিল ঠিক রাত ৯টা থেকে ১০টা। খাঁ সাহেব ঠিক ৮টা ৪৫ মিনিটে স্টুডিওতে ঢুকলেন। আয়েশ করে তামাকের পাইপটা একপাশে রেখে তম্বুরা মেলাতে শুরু করলেন।
রাত ঠিক ৯টায় লাল বাতি জ্বলে উঠল—’অন এয়ার’। খাঁ সাহেব চোখ বন্ধ করে আলাপ শুরু করলেন। পুরো এক ঘণ্টা তিনি নিখুঁত বিস্তারে গান গাইলেন। ঠিক যখন ঘড়ির কাঁটা ১০টার ঘরে পৌঁছাল, ঠিক সেই সেকেন্ডে খাঁ সাহেব তাঁর গানের সমে (সমাপ্তি) এসে থামলেন! রেডিওর টেকনিশিয়ান ও পরিচালকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কোনো যান্ত্রিক ঘড়ি না দেখেও একজন মানুষ এক ঘণ্টার একটি রাগপ্রকৃতিকে এমন নিখুঁত সেকেন্ডের কাটায় শেষ করতে পারেন, তা আমির খাঁ সাহেবের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
১৩/ ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ ও আমের আভিজাত্য!
উস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেব যেমন গান গাইতে ভালোবাসতেন, তেমনি ভালোবাসতেন রাজকীয় খাওয়াদাওয়া করতে। একবার গ্রীষ্মকালে লখনউয়ের এক জলসায় গান গাইতে গেছেন তিনি। আয়োজকরা তাঁর ঘরে এক ঝুড়ি বিখ্যাত ল্যাংড়া আম পাঠিয়ে দিলেন। খাঁ সাহেব আম খাওয়া শুরু করলেন। একটার পর একটা আম খেয়ে যখন ঝুড়ি ফাঁকা করলেন, তখন তাঁর হাত ও মুখ রসে মাখামাখি।
ঠিক তখনই আয়োজকরা এসে কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “খাঁ সাহেব, আসরে বসার সময় হয়ে গেছে। শ্রোতারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।” খাঁ সাহেব বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন, “আরে ভাই, আমের রস তো পেটে গেল, এবার সেই রসই তো রাগ হয়ে গলার সুর দিয়ে বের হবে!” সেদিন আসরে বসে খাঁ সাহেব যখন তাঁর শাহী গলায় ঠুমরি ধরলেন, শ্রোতারা সত্যিই অনুভব করেছিলেন—সুর আর মিষ্টতা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে!
১৪/ ওস্তাদ আমির খাঁ এবং লতা মঙ্গেশকরের সেই প্রথম রেকর্ডিং!
কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক বসন্ত দেশাই ১৯৫৮ সালের ‘গুঞ্জ উঠি শেহনাই’ সিনেমার জন্য একটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দ্বৈত গান (Duet) তৈরি করছিলেন। একদিকে স্বয়ং ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেব, অন্যদিকে তরুণী লতা মঙ্গেশকর। গানের রেকর্ডিংয়ের দিন স্টুডিওতে লতা মঙ্গেশকর ভীষণ ভয়ে কাঁপছিলেন। আমির খাঁ সাহেবের মতো মহীরুহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গাইবেন কীভাবে?
খাঁ সাহেব লতাজির এই জড়তা ও ভয় বুঝতে পারলেন। তিনি তামাকের পাইপটা একপাশে রেখে মৃদু হেসে বললেন, “আরে বেটি! তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? তুমি তো মা সরস্বতীর বরপুত্র। এসো, আমরা দুজনে মিলে একটু সুর ভাঁজি।” খাঁ সাহেবের এই এক চিলতে প্রশ্রয় আর স্নেহের বশে লতাজির সমস্ত ভয় কেটে গেল। সেদিন স্টুডিওর ভেতরে খাঁ সাহেবের গমগমে গম্ভীর কণ্ঠ আর লতাজির সরু নিখুঁত সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সিনেমার প্লেব্যাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আভিজাত্য বজায় রাখার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল সেই গান!
১৫/ পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসনের সেই কড়া শাসন!
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বখ্যাত পপ ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’ (The Beatles)-এর গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসন ভারতীয় সেতারের প্রেমে পড়েন। তিনি পণ্ডিত রবিশঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। জর্জ হ্যারিসন তখন বিশ্বজুড়ে এক মহাতারকা, তরুণ প্রজন্মের ক্রেজ! কিন্তু রবিশঙ্করের কাছে তিনি ছিলেন কেবলই একজন ছাত্র।
রবিশঙ্কর জর্জকে শ্রীনগরের এক হাউসবোটে নিয়ে গেলেন সেতার শেখানোর জন্য। প্রথম দিনেই জর্জ যখন সেতারটি নিয়ে মেঝেতে রাখলেন এবং ভুলবশত তাঁর পা সেতারের কাঠের গায়ে ঠেকল, রবিশঙ্কর গর্জে উঠলেন! তিনি কঠোর গলায় বললেন, “জর্জ! পাশ্চাত্য দুনিয়ায় গিটার হয়তো কেবলই এক বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষে বাদ্যযন্ত্র হলো দেবতা! পা ঠেকানো মানে ঈশ্বরকে অপমান করা। সুর শিখতে হলে আগে বাদ্যযন্ত্রকে প্রণাম করতে শেখো।” বিশ্বজোড়া অহংকার এক নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেল জর্জ হ্যারিসনের। তিনি হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন এবং মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সেতারকে প্রণাম করলেন। এই ছিল ভারতীয় গুরুর শাসনের ক্ষমতা!
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
