গতবার দিল্লিতে কাজের অবসরে মুঘল আমলে নির্মিত শিখ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উপাসনালয় “গুরুদ্বোয়ারা বাংলা সাহেব” দেখতে গিয়েছিলাম। দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম চিত্তাকর্ষক এবং প্রশান্তিময় একটি জায়গা। এই ভ্রমণে আমার সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে ছিলেন প্রিয় নাজমুল করিম চৌধুরী।

প্রতিটি ধর্মের আদর্শ, ধর্মাচার এবং ধর্মাবলম্বীদের জীবনবোধ সম্পর্কে জানা আমার পুরনো আগ্রহের বিষয়। আমি সবসময়ই দেখার চেষ্টা করি তাঁদের বিশ্বাসের সাথে আমাদের সাদৃশ্য বা অমিল ঠিক কোথায়। গুরুদ্বোয়ারা বাংলা সাহেবের পরিবেশ মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক দারুণ দৃষ্টান্ত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জলাশয়ের অলৌকিকতা
এই গুরুদ্বোয়ারাটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে শিখ ধর্মের ইতিহাস।
রাজা জয়সিংহের বাংলো:
সপ্তদশ শতকে এটি ছিল অম্বর (জয়পুর)-এর শাসক রাজা জয়সিংহের একটি রাজকীয় বাংলো (বাংলো থেকেই ‘বাংলা সাহেব’ নামের উৎপত্তি)।
অষ্টম শিখ গুরু:
১৬৬৪ সালে শিখদের অষ্টম ধর্মগুরু, গুরু হর কিষণ সাহেব দিল্লিতে অবস্থানকালে এই বাংলোতে অবস্থান করেছিলেন।
‘সরোবর’ বা পবিত্র জলাশয়:
সেই সময় দিল্লিতে গুটিবসন্ত (Smallpox) ও কলেরার মহামারী দেখা দেয়। গুরু হর কিষণ সাহেব এই বাংলোর কুয়ো থেকে জল তুলে নিজে রোগীদের সেবা করেন এবং রোগমুক্ত করেন। পরবর্তীতে রাজা জয়সিংহ ওই কুয়োর ওপর একটি জলাশয় নির্মাণ করেন, যা আজ ‘সরোবর’ নামে পরিচিত। শিখ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন এই জলের নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে।

গুরুদ্বোয়ারা ব্যবস্থার সবচেয়ে সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী দিক হলো তাঁদের “লঙ্গর” বা উন্মুক্ত রান্নাঘর। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ কিংবা জাত-পাতের কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই যে কেউ এখানে এসে সারিবদ্ধভাবে বসে খাবার খেতে পারেন।
এখানে পরিবেশনকারীরা জাত-ধর্ম তো দূরের কথা, কারো সামাজিক পরিচয়ও জানতে চান না। আর কেউ যত বেশিই খাক না কেন, তাঁরা মুখে অমলিন হাসি নিয়ে পরম স্নেহে খাওয়াতেই থাকেন। এই লঙ্গরখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবার তৈরি হয় সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবার (যাকে শিখ ধর্মে ‘সেবা’ বলা হয়) ভিত্তিতে। থালাবাসন মাজা থেকে শুরু করে রান্না করা—সবকিছুই ভক্তরা নিজেরা করেন। এটি বিনয় ও সাম্যের এক পরম শিক্ষা।