হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে বাদ্যযন্ত্রকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: তত (তার), সুষির (বায়ু), অবনদ্ধ (চামড়াজাত) এবং ঘানা (Ghan)। ‘ঘানা’ বা ‘ইডিওফোন’ (Idiophone) হলো সেই সব বাদ্যযন্ত্র, যেগুলোতে কোনো তার বা পর্দা থাকে না, বরং কঠিন বস্তুর গায়ে আঘাত বা ঘর্ষণের ফলে সরাসরি নাদ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে আদিম সংগীত অনুষঙ্গ। এই যন্ত্রের তেমন কোন প্রসিদ্ধ ঘরানা নেই।
ঘানা বাদ্যের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব
ঘানা বাদ্য মূলত ছন্দের স্থায়িত্ব এবং তালের অলংকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পন: যন্ত্রের মূল দেহটিই এখানে কম্পন তৈরি করে শব্দ উৎপন্ন করে।
- লয় রক্ষা: শাস্ত্রীয় সংগীত, বিশেষ করে ধ্রুপদ ও সংকীর্তনে ধ্রুব লয় ধরে রাখতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
- স্বর ও ঝংকার: কিছু ঘানা বাদ্য নির্দিষ্ট স্বরে (যেমন: ঘটম) বাঁধা যায়, আবার কিছু কেবল ঝংকার বা মেটালিক সাউন্ড তৈরি করে।
প্রধান ঘানা বাদ্যসমূহ ও তাদের প্রয়োগ
শাস্ত্রীয় ও উপ-শাস্ত্রীয় সংগীতে বহুল ব্যবহৃত কিছু ঘানা বাদ্য হলো:
- ঘটম (Ghatam): এটি একটি বিশেষ মাটির কলস। দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সংগীতে এটি একটি প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলেও উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতে এর প্রয়োগ দেখা যায়।
- মঞ্জিরা বা মন্দিরা (Manjira): পিতল বা ব্রোঞ্জের তৈরি ছোট করতাল। ধ্রুপদ গায়কির সাথে লয় রক্ষায় এটি অপরিহার্য।
- কর্তাল (Kartal): কাঠের ফ্রেমে ছোট ধাতব পাত লাগানো থাকে। মূলত ভজন ও সূফী সংগীতে ব্যবহৃত হয়।
- কাষ্ঠতরঙ্গ ও জলতরঙ্গ: কাষ্ঠতরঙ্গ কাঠের দণ্ড দিয়ে তৈরি এবং জলতরঙ্গ চিনামাটির পাত্রে জল ভরে সুর তৈরি করে। এগুলোকে ‘মেলোডিক ইডিওফোন’ বলা হয়।
- ঝাঞ্জ ও ঘণ্টা: মন্দির ও ধর্মীয় শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানে তালের গম্ভীরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়।
ঘানা বাদ্যের ‘ঘরানা’ বা ঐতিহ্য
ঘানা বাদ্যের ক্ষেত্রে কন্ঠ বা তবলার মতো সুনির্দিষ্ট ‘বংশপরম্পরাগত ঘরানা’ খুব কম দেখা যায়। তবে এর নির্দিষ্ট কিছু শৈলী বা ঘরানাগত প্রয়োগ (Stylistic Traditions) লক্ষ্য করা যায়:
ক. মন্দির ও কীর্তন ঐতিহ্য (Temple Tradition):
এটি ঘানা বাদ্যের সবচেয়ে প্রাচীন ঘরানা। ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে ধ্রুপদ ও হাভেলি সংগীতের সাথে মঞ্জিরা ও ঝাঞ্জ বাজানোর একটি নির্দিষ্ট ব্যাকরণ আছে। এখানে লয়কে ‘চতুস্র’ বা ‘তস্র’ জাতিতে ভাগ করে বাজানোর বিশেষ ঢং অনুসরণ করা হয়।
খ. কর্ণাটকী ঘরানার প্রভাব (Carnatic Influence):
ঘানা বাদ্যের মধ্যে ঘটম-এর একটি শক্তিশালী ঘরানা রয়েছে। পন্ডিত বিক্কু বিনায়করম এই যন্ত্রটিকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেছেন। উত্তর ভারতেও এখন তালবাদ্য কচেরিতে ঘটমের এই ঘরানাগত চলন দেখা যাচ্ছে।
গ. লোক-শাস্ত্রীয় সংমিশ্রণ (Folk-Classical Fusion):
রাজস্থান ও গুজরাটের ‘খড়তাল’ বাদনের নিজস্ব ঘরানা রয়েছে। ল্যাঙ্গা ও মাঙ্গানিয়ার শিল্পীরা খড়তাল দিয়ে যে জটিল লয়কারী প্রদর্শন করেন, তা উচ্চাঙ্গ সংগীতের যেকোনো ঘরানার চেয়ে কম নয়।
কারিগরি দিক: ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি
ঘানা বাদ্যের বাদনশৈলীতে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ:
১. আঘাতের স্থান (Point of Impact): যন্ত্রের ঠিক কোথায় আঘাত করলে সবচেয়ে মধুর নাদ বের হবে, তা একজন বাদক দীর্ঘ সাধনায় আয়ত্ত করেন।
২. প্রতিধ্বনি নিয়ন্ত্রণ (Resonance Control): হাত বা কাপড়ের মাধ্যমে যন্ত্রের কম্পনকে থামিয়ে বা বাড়িয়ে ‘গুমক’ বা ‘ছুট’ তৈরি করা হয়।
ঘানা বাদ্য ঘরানা যদিও এককভাবে খুব বেশি প্রচার পায়নি, কিন্তু এটি ছাড়া হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের পূর্ণতা অসম্ভব। এটি গানের অলঙ্কার নয়, বরং গানের ভিত্তি।
আরও দেখুন: