আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর, বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন করার ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসন শেষে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রিয় স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন থেকেই তাঁর পিছু নিয়েছিল ঘাতকের বুলেট। দেশের মানুষের অধিকার আর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নামার পর থেকে তাঁকে অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আর সেই ধারাবাহিকতায় প্রথম বড় ও সুপরিকল্পিত হামলাটি হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে।

 

আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস, January 24, 1988 Chittagong massacre, ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম গণহত্যা

 

 

লালদীঘির সেই রক্তাক্ত দুপুর

সেদিন ছিল রোববার। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের দাবিতে লালদীঘি ময়দানে আটদলীয় জোটের মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে খোলা ট্রাকে করে জনতা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি যখন লালদীঘি ময়দানের কাছাকাছি কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় পৌঁছান, ঠিক তখনই কোনো উসকানি ছাড়াই শুরু হয় নারকীয় তাণ্ডব।

তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার রকিবুল হুদার নির্দেশে পুলিশ ও বিডিআর সমবেত জনতার ওপর চারিদিক থেকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। লালদীঘি, কেসি দে রোড, কোতোয়ালী মোড় থেকে জেলরোড পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাতাসে ওড়ে শুধু বারুদের গন্ধ আর মানুষের আর্তনাদ।

 

আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস, January 24, 1988 Chittagong massacre, ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম গণহত্যা

 

অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ও আইনজীবীদের মানববর্ম

সেই দিন শেখ হাসিনাকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়তির এক অবিশ্বাস্য লিখনে তিনি বেঁচে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, একজন পুলিশ সদস্য যখন শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে রাইফেল তাক করেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য এক পুলিশ সদস্য (মতান্তরে এক খালাসী বা সাধারণ মানুষ) রাইফেলের কানেকশন বেল্ট বা ট্রিগারে হ্যাঁচকা টান দেওয়ায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় গুলি।

গুলি শুরু হওয়ার সাথে সাথে চট্টগ্রামের বীর আইনজীবীরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে এক অবিশ্বাস্য সাহসী পদক্ষেপ নেন। তারা তৎকালীন আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র নেতাদের নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে একটি ‘মানববর্ম’ বা হিউম্যান কর্ডন তৈরি করেন। চারদিকে তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট উড়ছে। সেই বুলেটের বৃষ্টি উপেক্ষা করে আইনজীবীরা শেখ হাসিনাকে অক্ষত অবস্থায় টেনে কোর্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরে আইনজীবী সমিতি ভবনে নিয়ে যান এবং একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে তাঁর জীবন রক্ষা করেন।

 

আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস, January 24, 1988 Chittagong massacre, ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম গণহত্যা

 

২৪টি তাজা প্রাণ ও লাশের অপার্থিব গুম

পরদিন, ২৫ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলা হয়েছিল— এই হামলা কোনো সাধারণ লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া ছিল না, এটি ছিল সরাসরি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশ ও বিডিআরের যৌথ ব্রাশফায়ার।

সরকারি হিসাবে সেদিনের গুলিতে ২৪ জন নেতাকর্মী শহীদ হন এবং আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। কিন্তু ঘটনার নৃশংসতা এখানেই শেষ হয়নি। স্বৈরশাসকের নির্দেশে নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর তো দূরের কথা, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন বা সৎকারও করতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ গভীর রাতে বলপ্রয়োগ করে শহীদদের মরদেহ চট্টগ্রামের বলুয়ারদিঘী মহাশ্মশানে নিয়ে একসঙ্গে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এই অমানবিক ঘটনাটি প্রমাণ করে, স্বৈরাচার কতটা ভীত ও নৃশংস ছিল।

 

আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস, January 24, 1988 Chittagong massacre, ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম গণহত্যা

 

লালদীঘির ২৪ জন সূর্যসন্তান

সেদিনের সেই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডে যারা গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তারা হলেন: মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত।

 

দীর্ঘ লড়াই ও বিচারের বাণী

এই গণহত্যার দীর্ঘ এক যুগ পর, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে এই মামলার ডায়েরি পুনরুজ্জীবিত হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০০ সালের ২০ মে চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সিএমপির তৎকালীন কমিশনার রকিবুল হুদাসহ ৫ পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চট্টগ্রামের মানুষ এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের আংশিক বিচার দেখতে পায়।

 

আজ ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস, January 24, 1988 Chittagong massacre, ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম গণহত্যা

 

২৪ জানুয়ারির চট্টগ্রাম গণহত্যা কেবল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কালো দিন নয়, এটি মূলত এদেশের মানুষের আত্মত্যাগের এক অনন্য স্মারক। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে নেত্রীকে বাঁচানোর যে দৃষ্টান্ত চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরা সেদিন রেখেছিলেন, তা পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি আসে আমাদের সেই শহীদদের বীরত্ব গাঁথা স্মরণ করাতে এবং মনে করিয়ে দিতে— এদেশের গণতন্ত্রের প্রতিটি অক্ষর সাধারণ মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা।

 

আরও দেখুন: