চীনা সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে চীনা সঙ্গীতের নাম সবার আগে আসবে। প্রায় আট হাজার বছরের পুরনো এই সুরযাত্রার পেছনে রয়েছে গভীর এক জীবনদর্শন। প্রাচীন চীনে সঙ্গীতকে স্রেফ চিত্তবিনোদনের মাধ্যম মনে করা হতো না, বরং একে দেখা হতো মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা এবং মানুষের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে। তৎকালীন রাজবুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট—একটি সাম্রাজ্য কতটা শান্তিতে থাকবে তা নির্ভর করে তার সুরের শুদ্ধতার ওপর। সুর যদি সঠিক ব্যাকরণ মেনে চলে তবে রাজ্য সুশাসিত হয়, আর সঙ্গীত বেসুরো ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলে তা সাম্রাজ্যের পতনের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হতো।

চীনা সঙ্গীত
চীনা সঙ্গীত

কনফুসীয় নিয়ম আর তাওবাদী নীরবতার মেলবন্ধন

চীনা সঙ্গীতের আত্মাকে বুঝতে হলে প্রথমে এর ভেতরের দার্শনিক দ্বৈরথটিকে জানা প্রয়োজন। এই সুরের ধারাটি গড়ে উঠেছে মূলত দুটি ভিন্নধর্মী চিন্তাভাবনার ওপর ভিত্তি করে। একদিকে রয়েছে কনফুসীয় মতবাদ, যা মনে করে সঙ্গীত হলো মানুষের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি। কনফুসিয়াসের মতে, ভালো সঙ্গীত মানুষকে মার্জিত ও সমাজসচেতন করে তোলে। রাজদরবারের যে আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, যাকে বলা হতো ‘ইয়াইউয়ে’, তা মূলত এই কঠোর সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুনেরই একটি সাঙ্গীতিক রূপ।

এর ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে লাও জু এবং ঝুয়াং ঝুর তাওবাদী দর্শন। এই ধারাটি সঙ্গীতকে দরবারের কৃত্রিম নিয়ম থেকে বের করে নিয়ে যায় প্রকৃতির একদম কাছাকাছি। তাওবাদীদের কাছে সুর মানে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, পাতার মর্মর বা পাহাড়ী ঝরনার কলতান। তাঁদের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর সেটাই, যা নীরবতার একদম কাছাকাছি থাকে। এই দুই দর্শনের অদ্ভুত মিলনেই চীনা সঙ্গীত এক অনন্য রূপ পেয়েছে—যেখানে একদিকে রয়েছে দরবারের কঠোর সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ, আর অন্যদিকে রয়েছে প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাওয়ার অবাধ স্বাধীনতা।

পঞ্চস্বরের মহাজাগতিক বৃত্ত

পশ্চিমা সঙ্গীতে যেখানে সাতটি প্রধান স্বর ব্যবহার করা হয়, সেখানে চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি স্বরের ওপর, যাকে আমরা পেন্টাটোনিক স্কেল বলি। যদিও চীনা সঙ্গীততত্ত্বে বারোটি স্বর বা ‘লু’ -এর অস্তিত্ব রয়েছে, তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচটি স্বরই পুরো সুরজগৎ শাসন করে। মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন চীনারা এই পাঁচটি স্বরকে প্রকৃতির পাঁচটি মূল উপাদান এবং সামাজিক অবস্থানের প্রতীক মনে করতেন।

যেমন, প্রথম স্বর ‘কুং’ হলো পৃথিবীর প্রতীক, যা সরাসরি সম্রাটের সামাজিক উচ্চতাকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয় স্বর ‘শাং’ ধাতুর প্রতীক হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করে রাজ্যের সাধারণ প্রজাদের। ‘চিও’ স্বরটি কাঠের রূপক হয়ে সুরের মধ্যে প্রকৃতির রূপ ফুটিয়ে তোলে, আর ‘চি’ স্বরটি আগুনের প্রতীক হিসেবে রাজকার্য ও সেবার কথা বলে। শেষ স্বর ‘ইউ’ জলের প্রতীক হয়ে সুরের মধ্যে নিয়ে আসে আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্জগতের গভীরতা। এই পাঁচটি স্বরের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস ও ওঠানামা থেকেই চীনা সঙ্গীতের সেই চেনা সুরটি তৈরি হয়, যা প্রথম শুনলেই যেকোনো মানুষের মনে ড্রাগনের দেশের আবহ তৈরি করে।

দরবার থেকে লোকালয়: সুরের নানা ধারা

চীনা সঙ্গীত কেবল রাজপ্রাসাদের চার দেওয়ালে আটকে ছিল না, বরং তা সমান তালে বিকশিত হয়েছিল সাধারণ মানুষের কফিহাউস থেকে শুরু করে থিয়েটারের মঞ্চ পর্যন্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত ধারাটি হলো ‘ইয়াইউয়ে’, যার অর্থ মার্জিত সঙ্গীত। ঝোউ রাজবংশের সময় থেকে রাজকীয় আচার-অনুষ্ঠান ও দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই গুরুগম্ভীর ও ধীরগতির সঙ্গীত বাজানো হতো। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি বিশাল বিশাল ঘণ্টা এবং সুনির্দিষ্ট মাপে কাটা পাথরের চাইম (Chimes)-এর গম্ভীর আওয়াজ।

এর পাশাপাশি চিনের একটি বড় সাংস্কৃতিক সম্পদ হলো তাদের অপেরা বা ‘শিকু’। এটি মূলত গান, নাচ, অভিনয় এবং ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্টের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। পুরো চীনজুড়ে প্রায় ৩০০টিরও বেশি আঞ্চলিক অপেরার চল থাকলেও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে নাম করেছে ‘পিকিং অপেরা’। অষ্টাদশ শতকে চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অপেরার মূল আকর্ষণ হলো কুশীলবদের মুখভর্তি রঙিন মেকআপ, জমকালো পোশাক, উচ্চগ্রামের গান আর তলোয়ার চালনার দারুণ কসরত। তবে এর চেয়েও প্রাচীন ও সাহিত্যনির্ভর আরেকটি ধারা হলো ‘কুনকু অপেরা’, যাকে চীনা অপেরার আদি জননী বলা হয়।

সাধারণ মানুষের ঘরের খুব কাছের সঙ্গীত হলো ‘জিউয়ানকুই’, যার আক্ষরিক অর্থ রেশম ও বাঁশ। চীনের দক্ষিণাঞ্চলের এই লোকসঙ্গীতে রেশমি সুতোর তৈরি তারবাদ্য এবং বাঁশের তৈরি বাঁশি একসঙ্গে বাজানো হতো বলে এর এমন নাম। লোকালয়ের চা-ঘর বা ঘরোয়া আড্ডায় এই সুর অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর বাইরে বৌদ্ধ ও তাওবাদী মঠগুলোর জপ-সঙ্গীত এবং মন্দিরের ড্রামের আওয়াজ চীনা সঙ্গীতে এক অপার্থিব ধ্যানের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

রেশম, বাঁশ আর মাটির বাদ্যযন্ত্র

চীনা বাদ্যযন্ত্রের সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো এদের উপাদানের ভিত্তিতে করা শ্রেণীবিন্যাস, যাকে প্রাচীন পরিভাষায় বলা হয় ‘বায়িন’ বা আটটি উপাদান। সোনা, পাথর, রেশম, বাঁশ, লাউ, মাটি, চামড়া এবং কাঠ—এই আটটি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি হতো চিনের সব ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।

এই যন্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র মনে করা হতো ‘গুচিন’-কে। এটি সাতটি তারের একটি শান্ত ও গম্ভীর বাদ্যযন্ত্র, যা প্রাচীন চীনের পণ্ডিত ও শিক্ষিত সমাজের ধ্যানজ্ঞানের অংশ ছিল। খোদ কনফুসিয়াস এই যন্ত্রটি বাজাতেন। অন্যদিকে নাশপাতি আকৃতির চার তারের লিউট জাতীয় যন্ত্র ‘পিপা’ তার দ্রুতগতির সুরের জন্য বিখ্যাত। এটি বাজানোর কৌশল অত্যন্ত কঠিন এবং এর মাধ্যমে যুদ্ধের দামামা থেকে শুরু করে প্রেমের নরম অনুভূতি—সবই ফুটিয়ে তোলা যায়।

মানুষের কান্নার সাথে তুলনা করা হয় ‘এরহু’ নামের দুই তারের একটি বিশেষ বেহালresource-কে। এর ধনুকটি দুই তারের মাঝখান দিয়ে টেনে বাজাতে হয় বলে এর সুর বুক চিরে এক দীর্ঘস্থায়ী মরমী রেশ রেখে যায়। আর বর্তমান চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় যন্ত্র হলো ‘গুঝেং’, যা ১৬ থেকে ২১ বা তার বেশি তারের একটি বড় টেবিল-জিথার। এর সুর শুনলে মনে হয় যেন কোনো ঝরনার জলতরঙ্গ গড়িয়ে পড়ছে। উৎসব আর বিয়ের আনন্দে আবার বাজানো হয় ‘সুওনা’, যা আমাদের দেশের সানাইয়ের মতোই তীব্র ও আনন্দদায়ক এক আবহ তৈরি করে।

সুরের প্রকাশভঙ্গি ও অলঙ্করণ

পশ্চিমা সঙ্গীতে যেখানে একের পর এক সুরের স্তর সাজিয়ে ‘হারমনি’ তৈরি করা হয়, চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সেখানে একদম একরৈখিক বা মোনোফনিক। অর্থাৎ, এখানে মূল সুরটি একটাই থাকে, কিন্তু সেই সুরের ভেতরের অলঙ্করণ, গিটকিরি বা সূক্ষ্ম মোচড়ের ওপর সমস্ত জোর দেওয়া হয়। ভারতীয় রাগের মতোই চীনা শিল্পীরা দুই স্বরের মাঝখানের অতি সূক্ষ্ম শ্রুতি বা মাইক্রোটোনগুলো এত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে পারেন যে সুরের আবেদন বহুগুণ গভীর হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, চীনা সঙ্গীতের প্রতিটি সুরের পেছনে একটি নির্দিষ্ট গল্প বা প্রাকৃতিক দৃশ্য লুকিয়ে থাকে। যেমন, কোনো সুরের নাম ‘বসন্তের গঙ্গা নদী’, আবার কোনোটির নাম ‘উচ্চ পাহাড় ও প্রবাহিত জল’। একজন দক্ষ শিল্পী যখন বাজান, তখন শ্রোতা কেবল সুর শোনেন না, বরং তাঁর বন্ধ চোখের সামনে সেই শান্ত নদী বা বিশাল পাহাড়ের দৃশ্যটি জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে।

চীনা সঙ্গীত
চীনা সঙ্গীত

আধুনিকতার হাওয়া ও বিশ্বায়ন

বিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চিমা দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের ফলে চীনা সঙ্গীতে এক বড় ধরণের রূপান্তর ঘটে। জ্যাজ মিউজিকের সাথে চীনা লোকগীতির সংমিশ্রণে তৈরি হয় ‘শিউদান মিউজিক’। এরপর ১৯৪ Did সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর গণসঙ্গীত ও দেশাত্মবোধক গান তৈরি হয়েছিল।

আজকের দিনে সেই ঐতিহ্য বিবর্তিত হয়ে বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগিয়েছে ‘সি-পপ’ বা চীনা পপ মিউজিকের মাধ্যমে। জয় চৌ-এর মতো আধুনিক তারকারা পশ্চিমা পপ ড্রামসের সাথে ঐতিহ্যবাহী গুচিন বা এরহুর সুর মিশিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক ঘরানার জন্ম দিয়েছেন। শুধু পপ গানই নয়, ট্যান ডুন-এর মতো সুরকাররা অস্কারজয়ী ‘ক্রাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন’ চলচ্চিত্রের আবহ সঙ্গীতে চীনা ঐতিহ্যবাহী সুরকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যা প্রাচ্যের এই সুরকে হলিউড তথা বিশ্বমঞ্চের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দিনশেষে, চীনা সঙ্গীত কেবল কিছু স্বরের সমষ্টি নয়, এটি আসলে মানুষের সাথে প্রকৃতির আদিম সম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল। বাঁশির নিভৃত কান্না কিংবা গুচিনের ধীর পদক্ষেপে এই সুর আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক যোগাযোগের একমাত্র সেতুটি হলো সঙ্গীত।