চেম্বার মিউজিক | চেম্বার সঙ্গীত । পশ্চিমা বা পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীতের (Western Classical Music) সুবিশাল ক্যানভাসে ‘চেম্বার মিউজিক’ (Chamber Music) বা ‘কক্ষ সংগীত’ এক অনন্য ও মহিমান্বিত শিল্পরূপ। যেখানে বিশাল অর্কেস্ট্রা হলের মেগাফোনিক শব্দতরঙ্গ এবং শতসংখ্যক যন্ত্রশিল্পীর যৌথ সুরের হুংকার শ্রোতাকে বিমোহিত করে, সেখানে চেম্বার মিউজিক শ্রোতাকে আহ্বান জানায় এক নিবিড়, গভীর ও ব্যক্তিগত সুরের জগতে। এটি কেবল সংগীতের কোনো বিশেষ পরিবেশনা নয়; বরং কোনো সুর-পরিচালক (Conductor) বা দলনেতা ছাড়াই কয়েকজন বিশিষ্ট যন্ত্রশিল্পীর মধ্যে এক সুসূক্ষ্ম, সমতাবাদী ও বাক্‌পটু সংবাদ।

ইতালীয় শব্দ ‘মিউজিকা দা ক্যামেরা’ (Musica da camera) থেকে উদ্ভূত এই ধারাটি ইতিহাসজুড়ে রাজপ্রাসাদের ড্রয়িংরুম ও অভিজাত রাজন্যবর্গের ব্যক্তিগত ঘরোয়া আসর থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্বের বিখ্যাত কনসার্ট হল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। জার্মান মহাকবি ও দার্শনিক ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে (Johann Wolfgang von Goethe) স্ট্রিং কোয়ার্টেট সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন: “এখানে চারজন বুদ্ধিমান মানুষ পরস্পর বাক্যালাপে মগ্ন; তাদের কথা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে এবং তারা যে যন্ত্রগুলো বাজাচ্ছে তাও অনুধাবন করার মতো।” চেম্বার মিউজিকের ইতিহাস, এর গঠনশৈলী এবং বৈশ্বিক বিবর্তন বোঝার জন্য এই সুনির্দিষ্ট শিল্পধারার গভীরে প্রবেশ করা প্রয়োজন।

Table of Contents

একনজরে: চেম্বার মিউজিকের সার্বিক রূপরেখা

মূল বিষয়বিস্তারিত তথ্য
সংজ্ঞা ও শব্দউৎপত্তিইতালীয় Musica da camera (কক্ষের জন্য রচিত সংগীত); ছোট ঘরে পরিবেশনোপযোগী সংহত ক্লাসিক্যাল ধারা
প্রধান বৈশিষ্ট্যপ্রতিটি নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের পার্টে কেবল একজন বাদক (One player per part); কন্ডাক্টর বা পরিচালকহীন দলগত সুরসংগতি
উৎপত্তিকাল ও অঞ্চলরেনেসাঁ ও বারোক যুগ (১৬০০–১৭৫০); মূলত ইউরোপের রাজপ্রাসাদ, সামন্তীয় ড্রয়িংরুম ও গির্জা
সংগীতের স্বর্ণযুগঅষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে উনবিংশ শতক (ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক যুগ)
সর্বশ্রেষ্ঠ দলগত রূপস্ট্রিং কোয়ার্টেট (প্রথম বেহালা, দ্বিতীয় বেহালা, ভায়োলা ও চেলো)
প্রধান রূপকারগণজোসেফ হাইডন (চেম্বার মিউজিকের জনক), মোৎসার্ট, বিথোভেন, শুবার্ট, ব্রামস, শোস্টাকোভিচ
সামাজিক রূপান্তররাজকীয় বৈঠকখানার ঘরোয়া বিনোদন থেকে আধুনিক বিশ্বমানের পাবলিক কনসার্ট আর্টে রূপান্তর
পরিবেশনার নান্দনিকতাতীব্র মনোযোগ, পারস্পরিক চোখের সংকেত (Eye contact), যৌথ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতা

১. চেম্বার মিউজিকের সংজ্ঞা, দার্শনিক ভিত্তি ও মূল নান্দনিকতা

চেম্বার মিউজিকের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে এর ভৌগোলিক সংহতি এবং বাদকদের পারস্পরিক আত্মিক যোগাযোগের মধ্যে।
চেম্বার মিউজিকের নান্দনিক ধারা:
১. ঘরোয়া বা সংহত পরিসর (Chamber/Salon)
২. এক একক যন্ত্রে এক একক শিল্পী (One Player per Part)
৩. কন্ডাক্টরহীন সমতাবাদী সংহত পরিবেশনা (No Conductor)
৪. যন্ত্রশিল্পীদের পারস্পরিক বাক্‌পটু সুর-সংবাদ (Musical Dialogue)

১.১. ‘মিউজিকা দা ক্যামেরা’ থেকে আধুনিক রূপায়ণ

ঐতিহাসিকভাবে, ‘মিউজিকা দা ক্যামেরা’ শব্দটি ব্যবহৃত হতো গির্জার সংগীত (Musica da chiesa) এবং অপেরার থিয়েটারসংগীত (Musica da theatrical) থেকে ঘরোয়া পরিসরের সংগীতকে আলাদা করতে। এর প্রধান শর্তই ছিল এমন এক সুরবিন্যাস তৈরি করা, যা কোনো বিশালাকার কনসার্ট হল বা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি সৃষ্টিকারী ক্যাথেড্রালের সাহায্য ছাড়াই একটি সাধারণ কক্ষে প্রাকৃতিক Acoustics-এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সংগীত অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

১.২. কন্ডাক্টরহীন সমতাবাদ: শিল্পের গণতান্ত্রিক রূপ

বৃহৎ অর্কেস্ট্রায় একজন কন্ডাক্টর সম্পূর্ণ দলকে তাঁর কাঠির (Baton) ইশারায় শাসন করেন। কিন্তু চেম্বার মিউজিক সম্পূর্ণ কন্ডাক্টরহীন। এখানে চার বা পাঁচজন শিল্পীর প্রত্যেকেই সমান গুরুত্ব বহন করেন। এখানে কেউ একক নায়ক নন; বরং একে অপরের সুরের প্রতিধ্বনি এবং উত্তরদাতা। শিল্পীরা একে অপরের চোখের ইশারা, হাতের সূক্ষ্ম নাড়াচাড়া এবং সম্মিলিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দের ওপর নির্ভর করে সুরের গতি ও লয় নির্ধারণ করেন। এটি সংগীত জগতের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ও সমতাবাদী কাঠামো।

১.৩. অর্কেস্ট্রাল ও একক পরিবেশনার সাথে মৌলিক বৈপরীত্য

  • সোলো পারফরম্যান্স (Solo): একজন একক শিল্পী তাঁর নিজস্ব অভিপ্রায় ও কৌশলে পুরো পরিবেশনা পরিচালনা করেন।
  • সিমফনি বা অর্কেস্ট্রা (Orchestra): একই সুরে একাধিক বেহালা বা চেলো একত্রে বাজে (উদ্বৃত্তবাদক বা Sections থাকে) এবং কন্ডাক্টরের নির্দেশ মেনে চলে।
  • চেম্বার মিউজিক (Chamber Music): একটি নির্দিষ্ট পার্ট বা সুরের লাইনের জন্য কেবল একজনই শিল্পী নির্ধারিত থাকেন। ফলে একজন বাদকের ছোট একটি ভুলও পুরো পরিবেশনায় স্পষ্ট ধরা পড়ে।

২. ঐতিহাসিক বিবর্তন: রেনেসাঁ থেকে বিশ শতক

চেম্বার মিউজিকের রূপান্তর ইউরোপীয় শিল্পকলা ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সমান্তরালভাবে ঘটেছিল।

২.১. বারোক যুগ (১৬০০–১৭৫০): ‘সোনাটা দা ক্যামেরা’ ও বাসো কন্টিনিউও

বারোক যুগে রাজপরিবার ও অভিজাতদের গৃহে সংগীত পরিবেশনার জন্য ‘সোনাটা দা ক্যামেরা’ (Sonata da camera) রচিত হতো। এ যুগে মূল ভিত্তিমূল ছিল বাসো কন্টিনিউও (Basso continuo)—যেখানে হার্পসিকর্ড বা অর্গান এবং চেলো যৌথভাবে একটি স্থায়ী সুরের ভিত্তি (Bassline) তৈরি করত এবং তার ওপর একক বা দ্বৈত বেহালা মেলোডি বাজাত। এই সময়ের প্রখ্যাত ট্রিয়ো সোনাটাগুলো (Trio Sonata) আধুনিক চেম্বার মিউজিকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

২.২. ক্লাসিক্যাল যুগ (১৭৫০–১৮২০): হাইডন, মোৎসার্ট ও সুবর্ণ সময়

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সুরের গঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। জোসেফ হাইডন (Joseph Haydn) বারোক যুগের জাঁকজমকপূর্ণ হার্পসিকর্ড বাদ দিয়ে চার তারের যন্ত্রের সমন্বয়ে স্ট্রিং কোয়ার্টেট (String Quartet)-এর উদ্ভাবন করেন। হাইডনের পর উলফগ্যাংক আমাদেউস মোৎসার্ট এই ফর্মকে আরও মার্জিত ও সুরময় করে তোলেন। এই যুগেই ঘরোয়া আসরের সুর আন্তর্জাতিক কনসার্ট ফর্মের মর্যাদায় উন্নীত হয়।

২.৩. রোমান্টিক যুগ (১৮২০–১৯০০): আবেগময় সংঘাত ও স্ফীত আয়তন

উনবিংশ শতকে শিল্পীদের ব্যক্তিগত আবেগ, ট্র্যাজেডি এবং রোমান্টিক দর্শন সংগীতের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। লুডভিগ ভ্যান বিথোভেনের শেষ জীবনের কোয়ার্টেটগুলো চেম্বার মিউজিকের সীমা অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছায়। ফ্রাঞ্জ শুবার্ট, জোহানেস ব্রামস, ফেলিক্স মেন্ডেলসোন এবং রবার্ট শুমান চেম্বার মিউজিকের সাথে পিয়ানো যুক্ত করে ‘পিয়ানো কুইনটেট’ ও ‘পিয়ানো ট্রায়ো’-র মতো সমৃদ্ধ কাঠামোর জন্ম দেন।

২.৪. বিশ শতক ও আধুনিক কাল: অ্যাভান্ট-গার্ড ও রাজনৈতিক সংঘাত

বিংশ শতকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা চেম্বার মিউজিকের সুর কাঠামোতেও ছায়া ফেলে। সোভিয়েত সুরকার দিমিত্রি শোস্টাকোভিচ (Dmitri Shostakovich) তাঁর ১৫টি স্ট্রিং কোয়ার্টেটে স্বৈরাচার, যুদ্ধ ও মানবিক যন্ত্রণার করুণ ইতিহাস তুলে ধরেন। বেলা বারতো (Béla Bartók) লোকজ সুরের সাথে অ্যাভান্ট-গার্ড (Avant-garde) ডিসোন্যান্সের মিশ্রণ ঘটিয়ে এই শিল্পরূপকে নতুন মাত্রা প্রদান করেন।

৩. চেম্বার মিউজিকের প্রধান দল ও বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাস

চেম্বার মিউজিক বিভিন্ন দলগত সংমিশ্রণে পরিবেশিত হতে পারে। সদস্যসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে ডুও (২), ট্রায়ো (৩), কোয়ার্টেট (৪), কুইনটেট (৫), সেক্সটেট (৬), সেপ্টেম্বর (৭) এবং অকটেট (৮) নামে অভিহিত করা হয়।
প্রধান দলগত কাঠামোর রূপরেখা:
  • স্ট্রিং কোয়ার্টেট: ২ বেহালা, ১ ভায়োলা, ১ চেলো
  • পিয়ানো ট্রায়ো: ১ পিয়ানো, ১ বেহালা, ১ চেলো
  • উইন্ড কুইনটেট: বাঁশি, ওবো, ক্ল্যারিনেট, বাসুন, ফ্রেঞ্চ হর্ন
  • ব্রাস কুইনটেট: ২ ট্রাম্পেট, ফ্রেঞ্চ হর্ন, ট্রোম্বোন, টুবা

৩.১. স্ট্রিং কোয়ার্টেট (String Quartet): চেম্বার মিউজিকের মুকুট

স্ট্রিং কোয়ার্টেটকে বলা হয় চেম্বার মিউজিকের সবচেয়ে নিখুঁত ও বিশুদ্ধতম বিন্যাস। এতে থাকে:
  • প্রথম বেহালা (First Violin): মূলত প্রধান মেলোডি বা মূল সুরের বার্তা নিয়ে কাজ করে।
  • দ্বিতীয় বেহালা (Second Violin): হারমোনি বা সুরের ভেতরের গঠন শক্ত করে।
  • ভায়োলা (Viola): মধ্যম পিচের (Alto register) সুরের মেলবন্ধন তৈরি করে।
  • চেলো (Cello): গম্ভীর বেস সুরের (Bass alignment) ভিত্তি তৈরি করে।

৩.২. পিয়ানো ট্রায়ো, কোয়ার্টেট ও কুইনটেট

তারের যন্ত্রের (Strings) সাথে পিয়ানোর সংমিশ্রণ গতিশীলতার নতুন দ্বার উন্মোচন করে। পিয়ানো ট্রায়োতে থাকে পিয়ানো, বেহালা ও চেলো। রবার্ট শুমান ও জোহানেস ব্রামসের ‘পিয়ানো কুইনটেট’ বিশ্ব সংগীতে মেলোডিক জটিলতার এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন উপহার দিয়েছে।

৩.৩. উইন্ড কুইনটেট ও ব্রাস এনসেম্বল

কেবল তারের বাদ্যযন্ত্র নয়, কাষ্ঠবাতজ (Woodwinds) এবং পিতলবাতজ (Brass) বাদ্যযন্ত্র দিয়েও চেম্বার মিউজিক রচিত হয়। উইন্ড কুইনটেটে বাঁশি (Flute), ওবো (Oboe), ক্ল্যারিনেট (Clarinet), বাসুন (Bassoon) এবং ফ্রেঞ্চ হর্ন (French Horn)-এর বর্ণিল সুরের মিশ্রণ ঘটে।

৪. দলগত কাঠামোর তুলনামূলক সারণি

দলগত রূপ (Ensemble Type)বাদ্যযন্ত্র বিন্যাস (Instrumentation)প্রবর্তক / শীর্ষ রূপকারকালজয়ী ও বিখ্যাত কাজ
স্ট্রিং কোয়ার্টেট২ বেহালা, ১ ভায়োলা, ১ চেলোজোসেফ হাইডনহাইডন: Opus 76; বিথোভেন: Late Quartets
পিয়ানো ট্রায়ো১ পিয়ানো, ১ বেহালা, ১ চেলোমোৎসার্ট, বিথোভেনবিথোভেন: Archduke Trio; শুবার্ট: Piano Trio No. 2
পিয়ানো কুইনটেট১ পিয়ানো, ২ বেহালা, ১ ভায়োলা, ১ চেলোশুমান, ব্রামসশুবার্ট: Trout Quintet; ব্রামস: Piano Quintet in F minor
স্ট্রিং কুইনটেট২ বেহালা, ২ ভায়োলা, ১ চেলো (অথবা ১ ভায়োলা, ২ চেলো)মোৎসার্ট, শুবার্টমোৎসার্ট: String Quintet in G minor; শুবার্ট: Cell Quintet in C major
উইন্ড কুইনটেটবাঁশি, ওবো, ক্ল্যারিনেট, বাসুন, ফ্রেঞ্চ হর্নঅ্যান্টন রাইখা (Anton Reicha)রাইখা: Wind Quintet Op. 88; কার্ল নিলসেন: Wind Quintet
অকটেট৪ বেহালা, ২ ভায়োলা, ২ চেলোফেলিক্স মেন্ডেলসোনমেন্ডেলসোন: Octet in E-flat major, Op. 20

৫. চেম্বার মিউজিকের কালজয়ী মহারথী ও তাঁদের সেরা সৃষ্টি

কিছু নির্দিষ্ট সুরকারের নাম ছাড়া চেম্বার মিউজিকের ইতিহাস সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ।

৫.১. জোসেফ হাইডন: ‘চেম্বার মিউজিকের জনক’

জোসেফ হাইডন ৬৮টি স্ট্রিং কোয়ার্টেট রচনার মাধ্যমে এই ধারাটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি চারজন বাদকের মধ্যে সমান গুরুত্ব ভাগ করে দিয়ে সুরের কাঠামোকে প্রথম আধুনিক রূপ দেন। তাঁর রচিত Opus 33 এবং Opus 76 বিশ্ব সংগীতে মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।

৫.২. উলফগ্যাংক আমাদেউস মোৎসার্ট: সুরের কমনীয়তা ও ‘হাইডন কোয়ার্টেটস’

গুরু হাইডনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মোৎসার্ট ৬টি চমৎকার স্ট্রিং কোয়ার্টেট উৎসর্গ করেছিলেন, যা ‘হাইডন কোয়ার্টেটস’ নামে খ্যাত। এছাড়া তাঁর রচিত হালকা মেজাজের চেম্বার ওয়ার্ক Eine kleine Nachtmusik (একটি ছোট সান্ধ্যসংগীত) বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক পরিচিত ক্লাসিক্যাল পিসগুলোর একটি।

৫.৩. লুডভিগ ভ্যান বিথোভেন: দার্শনিক উচ্চতা ও ‘লেট কোয়ার্টেটস’

বিথোভেন চেম্বার মিউজিককে অভিজাত ড্রয়িংরুমের গণ্ডি থেকে বের করে মানবাত্মার চরম অনুভূতির স্তরে নিয়ে যান। তাঁর ১৬টি স্ট্রিং কোয়ার্টেটকে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়—প্রথম, মধ্য এবং শেষ যুগ। সম্পূর্ণ বধির অবস্থায় জীবনের শেষভাগে লিখিত তাঁর ‘লেট কোয়ার্টেটস’ (Große Fuge, Op. 130, Op. 131)-কে পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীতাঙ্গনে সর্বকালের সেরা দার্শনিক সৃষ্টিগুলোর অন্যতম মনে করা হয়।

৫.৪. ফ্রাঞ্জ শুবার্ট: গভীর বিষাদ ও ‘ডেস টড অ্যান্ড দাস মেডখেন’

মাত্র ৩১ বছর বয়সে প্রয়াত হওয়া অস্ট্রিয়ান সুরকার ফ্রাঞ্জ শুবার্ট চেম্বার মিউজিককে উপহার দিয়েছেন অপরূপ সুরের মূর্ছনা। তাঁর String Quartet No. 14 (যা ‘Death and the Maiden’ নামে পরিচিত) এবং Trout Quintet প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং জীবনের ট্র্যাজেডির এক অদ্ভুত ভারসাম্য।

৫.৫. জোহানেস ব্রামস ও দিমিত্রি শোস্টাকোভিচ

ব্রামস তাঁর নিখুঁত টেকনিক্যাল পরিপক্বতা দিয়ে উনবিংশ শতকের চেম্বার মিউজিককে সমৃদ্ধ করেন। বিংশ শতকে শোস্টাকোভিচ তাঁর স্ট্রিং কোয়ার্টেটগুলোতে সোভিয়েত শাসনামলের ভয়াবহতা, গোপন ক্ষোভ এবং ব্যক্তিগত বিষাদকে করুণ সুরের ভাষায় রূপ দেন।

৬. সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্থানিক প্রেক্ষাপট: ড্রয়িংরুম থেকে কনসার্ট হল

চেম্বার মিউজিক কেবল সংগীতিহাসের অংশ নয়; এটি ইউরোপের সামাজিক বিবর্তনের প্রামাণ্য দলিল।
সামাজিক ও স্থানিক বিবর্তন:
১. রাজপ্রাসাদের ব্যক্তিগত কক্ষ ও আসর (Private Courts)
২. ইউরোপীয় গৃহস্থালি ও বুর্জোয়া ড্রয়িংরুম (Salon Culture)
৩. পেশাদার চেম্বার মিউজিক সোসাইটি গঠন
৪. আধুনিক পাবলিক কনসার্ট হল ও বিশ্ব রেকর্ড কারখানা

৬.১. সালোন সংস্কৃতি (Salon Culture) ও অপেশাদারদের আসর

অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ইউরোপে মধ্যবিত্ত বুর্জোয়াদের উত্থানের ফলে গৃহস্থালি সংগীত আসরের (Hausmusik) প্রচলন ঘটে। ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারাটা সামাজিক মার্জিত সংস্কৃতির লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতো। সান্ধ্যকালীন আড্ডায় বন্ধু-বান্ধবেরা মিলে বেহালা বা চেলো নিয়ে চেম্বার মিউজিক বাজাতেন।

৬.২. ঘরোয়া গণ্ডি পেরিয়ে পেশাদার মঞ্চে

উনবিংশ শতকের শেষের দিকে চেম্বার মিউজিক অপেশাদার ঘরোয়া আসর থেকে পেশাদার পারফর্মিং আর্টে রূপান্তরিত হয়। গড়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত পেশাদার কোয়ার্টেট দল (যেমন: ইয়েল কোয়ার্টেট, বুদাপেস্ট কোয়ার্টেট, এবং পরবর্তীতে জুলিয়ার্ড ও এমারসন কোয়ার্টেট)। সাধারণ মানুষ টিকিট কেটে কনসার্ট হলে এসে এই নিবিড় সুরের জাদু উপভোগ করতে শুরু করে।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

  1. Baron, John H. Intimate Music: A History of the Idea of Chamber Music. Pendragon Press, 1998. (চেম্বার মিউজিকের বৈশ্বিক ধারণা ও ঐতিহাসিক বিকাশের একাডেমিক বিশ্বকোষ)।
  2. Cobbett, Walter Willson. Cobbett’s Cyclopedic Survey of Chamber Music. Oxford University Press, 1929. (চেম্বার মিউজিকের বিভিন্ন কাজ ও সুরকারদের বিশদ তালিকা)।
  3. Radcliffe, Philip. Beethoven’s String Quartets. Cambridge University Press, 1978. (বিথোভেনের ঐতিহাসিক কোয়ার্টেটগুলোর গঠনমূলক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ)।
  4. Ulrich, Homer. Chamber Music. Columbia University Press, 1966. (রেনেসাঁ থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত চেম্বার মিউজিকের বিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস)।
  5. Geiringer, Karl. Haydn: A Creative Life in Music. University of California Press, 1982. (জোসেফ হাইডনের জীবন এবং স্ট্রিং কোয়ার্টেট উদ্ভাবনের বিশদ বিবরণ)।
  6. Griffiths, Paul. The String Quartet: A History. Thames & Hudson, 1983. (স্ট্রিং কোয়ার্টেটের শুরু থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ)।