আজ দীর্ঘ ৬৮ বছরের একটা চরম অমানবিক অধ্যায়ের চিরতরে অবসান ঘটলো। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সেই ঐতিহাসিক ছিটমহল সমস্যার একটা স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো। সত্যি বলতে, এই ছিটমহলবাসীর দুঃখ, বেদনা আর অবহেলার গভীরতা আমরা বাইরে থেকে কখনোই পুরোপুরি ফিল করতে বা বুঝতে পারব না—যদি না আমরা কখনো কোনো ছিটমহলে নিজে গিয়ে থাকি কিংবা সেখানকার কোনো অভাগা মানুষের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয় থাকে।
পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল, অদ্ভুত আর নির্মম অধ্যায়গুলোর একটি ছিল এই ‘ছিটমহল’ বা এনক্লেভ (Enclave)। মানচিত্রের ভেতরে আরেকটা মানচিত্র, তার ভেতরে আবার আরেকটা—এমন এক পরাবাস্তব ও অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বন্দি ছিলেন লাখ লাখ মানুষ। যেখানে না ছিল কোনো দেশের পরিচয়, না ছিল মৌলিক অধিকার, না ছিল সুশাসন। অবশেষে ২০১৫ সালের ৩১শে জুলাই মধ্যরাতের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৮ বছরের সেই মানবিক অবমাননা আর ভৌগোলিক জটিলতার অবসান ঘটে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এই ছিটমহল বিনিময় কিন্তু স্রেফ কাগজের কলমে দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমানা কাটাকাটি করার গল্প নয়; এটি ছিল যুগের পর যুগ ধরে ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে বেঁচে থাকা লাখো মানুষের নিজেদের মৌলিক অধিকার, নাগরিকত্ব আর স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাশ ফিরে পাওয়ার গল্প। এটি ছিল একটা ঐতিহাসিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত এবং বিশ্বরাজনীতিতে যুদ্ধ ছাড়া, রক্তপাত ছাড়া শান্তিপূর্ণ কূটনীতির এক অনন্য ও কালজয়ী দলিল।
ছিটমহল বিনিময় ইতিহাস
ছিটমহল কী এবং এর পরাবাস্তব ভৌগোলিক জটিলতা
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ছিটমহল হলো একটা স্বাধীন দেশের এমন কিছু টুকরো ভূখণ্ড—যা ভৌগোলিকভাবে অন্য একটা স্বাধীন দেশের সীমানার ভেতরে চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা বন্দি অবস্থায় থাকে।
বাংলাদেশ আর ভারতের ক্ষেত্রে এই ম্যাপের জটিলতাটা ছিল চরম মাথা নষ্ট করার মতো! ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে ম্যাপের মাঝখানে ছিল বাংলাদেশের ছিটমহল, আর আমাদের বাংলাদেশের ম্যাপের ভেতরে দ্বীপের মতো স্বাধীনভাবে জেগে ছিল ভারতের ছিটমহল। কিন্তু বিস্ময়ের শেষ এখানেই নয়; এর চেয়েও অবিশ্বাস্য বিষয় ছিল ‘কাউন্টার এনক্লেভ’ (অর্থাৎ ছিটমহলের ভেতরের ছিটমহল) এবং ‘কাউন্টার-কাউন্টার এনক্লেভ’ (ছিটমহলের ভেতরের ছিটমহল, তার ভেতরে আবার আরেকটা ছিটমহল)!
সারা বিশ্বের একমাত্র ‘কাউন্টার-কাউন্টার এনক্লেভ’ বা তৃতীয় স্তরের ছিটমহলটি ছিল আমাদের বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থিত ভারতের ‘দাহলা খাগড়াবাড়ি’। হিসাবটা একটু খেয়াল করুন: এটি ছিল বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের একটা ছিটমহল, তার ভেতরে ছিল আবার বাংলাদেশের একটা ছোট্ট ভূখণ্ড এবং সেই টুকরো বাংলাদেশের ভেতরে ছিল মাত্র ৭,০০০ বর্গমিটারের আরেকটি ভারতীয় ভূখণ্ড—যা ছিল স্রেফ একটা পাটের খেত! ভাবা যায়, একটা পাটের খেত দেখতে হলে আপনাকে তিনবার আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হতে হতো!
ছিটমহলের উৎপত্তি: দাবা খেলার বাজি বনাম আসল ইতিহাস
ছিটমহলের জন্ম কীভাবে হলো, তা নিয়ে চমৎকার একটা মুখরোচক লোককথা বা গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়—বহু বছর আগে কোচবিহারের মহারাজা আর রংপুরের মুঘল ফৌজদারের মধ্যে নিয়মিত দাবা বা তাস খেলা হতো। খেলায় বাজি ধরে তাঁরা নাকি একে অপরের গ্রামের মালিকানা এদিক-ওদিক করতেন এবং জেতার পর কাগজের টুকরোয় সেই গ্রামের নাম লিখে রাখতেন। পরবর্তীতে কাগজের সেই টুকরো বা ‘ছিট’ থেকেই নাকি ‘ছিটমহল’ নামের উৎপত্তি।
গল্পটা শুনতে বেশ সিনেমার মতো লাগলেও, আসল ঐতিহাসিক ও দাপ্তরিক সত্যটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি মূলত ছিল মুঘল সাম্রাজ্য এবং কোচবিহারের মহারাজার মধ্যকার দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক চুক্তির এক অমীমাংসিত ফসল।
মুঘল-কোচবিহার যুদ্ধ (১৬৮২-১৭১৩): মুঘলরা যখন কোচবিহারের কিছু অংশ দখল করে নেয়, তখন কিছু অঞ্চলের প্রজারা বা স্থানীয় জমিদাররা মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার না করে কোচবিহারের রাজার প্রতিই অনুগত থেকে যান। আবার মুঘলদের অগ্রবর্তী কিছু সেনাঘাঁটি বা ক্যাম্প কোচবিহারের সীমানার ভেতরেই আটকা পড়ে যায়। ১৭১৩ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে তাঁদের মধ্যকার যুদ্ধ থামলেও, এই বিচ্ছিন্ন ছিটকে পড়া ভূখণ্ডগুলোর মালিকানার আর কোনো সুরাহা হয়নি।
ব্রিটিশ আমল: পরবর্তীতে ব্রিটিশরা যখন এই ভারতবর্ষের শাসনভার নেয়, তখন তারা স্রেফ কর বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে কোচবিহারকে একটি দেশীয় রাজ্য (Princely State) হিসেবে রেখে দেয় এবং রংপুরকে সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু ভেতরের এই অদ্ভুত, বিচ্ছিন্ন সীমানাগুলো পুনর্গঠন বা সোজা করার কোনো মাথাব্যথা তাদের ছিল না। তারা যেভাবে ছিল, সেভাবেই এই ক্ষতটাকে রেখে চলে যায়।
১৯৪৭-এর দেশভাগ: স্যার রেডক্লিফের চূড়ান্ত অবহেলা
ছিটমহলগুলোর সাধারণ বাসিন্দাদের জন্য আসল ট্র্যাজেডি আর নরকযন্ত্রণা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। ব্রিটিশ সাহেব স্যার সাইরিল রেডক্লিফ যখন টেবিল-চেয়ারে বসে ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের মানচিত্র আঁকেন, তখন তিনি এই পকেট ভূখণ্ডগুলোর জটিলতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন। তাঁর একটা অবহেলা লাখো মানুষের জীবনকে এক লহমায় নরক বানিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে কোচবিহার রাজ্যটি ১৯৪৯ সালে ভারতের সাথে যুক্ত হয় এবং রংপুর অংশটি চলে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (যা আজ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ)। এর ফলে কোচবিহারের ভেতরের পাকিস্তানি (পরবর্তীতে বাংলাদেশি) ভূখণ্ডগুলো ভারতের পেটে এবং রংপুরের ভেতরের ভারতীয় ভূখণ্ডগুলো বাংলাদেশের পেটে চিরতরে বন্দি হয়ে পড়ে। দুই দেশের সীমান্তে এভাবে মোট ১৬২টি ছিটমহল তৈরি হয়—যার মধ্যে বাংলাদেশের ম্যাপের ভেতরে ছিল ভারতের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের ম্যাপের ভেতরে ছিল বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল।
রাষ্ট্রহীন মানুষের ৬৮ বছরের অমানবিক জীবন: এক জীবন্ত নরক
২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানকার বাসিন্দাদের জীবন কেমন ছিল জানেন? স্রেফ একটা জীবন্ত নরক! তাঁরা কাগজে-কলমে একটা দেশের নাগরিক হলেও, সেই দেশের সরকার বা প্রশাসন তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারত না। আবার যে দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে তাঁরা দিন-রাত বাস করতেন, সেই দেশের কোনো আইনগত অধিকার বা সুযোগ-সুবিধাও তাঁরা পেতেন না।
অধিকারহীন জীবন: এই ছিটমহলগুলোতে কোনো স্কুল ছিল না, কলেজ ছিল না, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কিংবা একটা পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত ছিল না। রাস্তাঘাট বা কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সেখানে ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব।
পরিচয়ের চরম সংকট: কোনো ছিটমহলে শিশু জন্মগ্রহণ করলে তার কোনো জন্মনিবন্ধন হতো না। একটু উন্নত চিকিৎসার জন্য ছিটমহলের বাইরের হাসপাতালে যেতে হলে কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হলে তাঁদের প্রতিনিয়ত নিজেদের ধর্ম, নাম ও পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ঠিকানা বা বাইরের কোনো আত্মীয়ের নাম ব্যবহার করতে হতো। ভাবা যায়, একটা শিশুকে স্কুলে পড়ানোর জন্যও বাবা-মাকে প্রতিনিয়ত মিথ্যা পরিচয় দিতে হতো!
অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য: ছিটমহলগুলো ছিল কার্যত সম্পূর্ণ আইনহীন। সেখানে কোনো খুন-খারাবি বা বড় অপরাধ হলেও বাইরের দেশের পুলিশ আইনি জটিলতায় সেখানে ঢুকতে পারত না। ফলে এই অঞ্চলগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই চোরাচালান ও দাগী অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। সেখানকার সাধারণ মানুষ সবসময় এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতেন।
ঐতিহাসিক চুক্তি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা: দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প
এই চরম মানবিক সংকট সমাধানের জন্য দুই দেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ভেতরের রাজনৈতিক জটিলতায় তা বারবার থমকে গেছে।
ক) নেহরু-নুন চুক্তি (১৯৫৮)
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন ১৯৫৮ সালে ছিটমহল বিনিময়ের একটি চুক্তি করেন। এই চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময় এবং বেরুবাড়ির দক্ষিণাংশ পাকিস্তানকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তখন রায় দেয় যে—সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া ভারতের কোনো ভূখণ্ড অন্য দেশকে দেওয়া যাবে না। ফলে সেই চুক্তি আর আলোর মুখ দেখেনি।
খ) মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি (১৯৭৪)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই, এই মানবিক সংকট দূর করতে ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটি ঐতিহাসিক ‘ভূমি সীমানা চুক্তি’ (Land Boundary Agreement) স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশ এই চুক্তিটিকে সম্মান জানিয়ে খুব দ্রুত নিজেদের সংসদে অনুমোদন (Ratify) করে এবং চুক্তি অনুযায়ী তিন বিঘা করিডোর বাদে বাকি অংশ কার্যকর করার সব পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে তখন সংবিধান সংশোধনী পাস না হওয়ায় এই চুক্তিটি দীর্ঘ ৪১ বছর ঝুলে থাকে। তবে বঙ্গবন্ধুর করে যাওয়া এই দূরদর্শী চুক্তির আলোকেই পরবর্তীতে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রটোকলটিই মূলত ছিটমহলবাসীর নিখুঁত মাথা গণনা এবং তাঁদের চূড়ান্তভাবে স্বাধীন নাগরিকত্ব পাওয়ার পথটি একদম পরিষ্কার করে দিয়েছিল।
২০১৫ সালের চূড়ান্ত বিনিময়: বন্দিজীবন থেকে মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ
২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যা সমাধানের গতি হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়। অবশেষে ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় সবার সম্মতিতে ‘১১৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল’ পাস হয়—যা মূলত ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর করে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’রই একটি চূড়ান্ত আইনি রূপ।
৩১শে জুলাই, ২০১৫—মুক্তির সেই রাত:
২০১৫ সালের ৩১শে জুলাই মধ্যরাতে (১লা আগস্টের প্রথম প্রহরে) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়। এক লহমায় বদলে যায় ইতিহাসের ম্যাপ:
- বাংলাদেশের জয়: আমাদের ম্যাপের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭,১৬০ একর জমি) চিরতরে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের অংশ হয়ে যায়।
- ভারতের লাভ: অন্যদিকে ভারতের ম্যাপের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (৭,১১০ একর জমি) ভারতের মূল ভূখণ্ডের অংশ হয়ে যায়।
নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা:
ছিটমহল বিনিময়ের ঠিক আগে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে বাসিন্দাদের নিখুঁত মাথা গণনা (Head-count) করা হয়েছিল। সবচেয়ে সুন্দর বিষয় ছিল—সেখানকার বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলের প্রায় ৩৭,০০০ মানুষের মধ্যে মাত্র ৯৮৯ জন ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহলের ১৪,০০০ বাসিন্দার সবাই ভারতের নাগরিকত্ব বেছে নেন; নিজের চেনা ভিটেমাটি ছেড়ে কেউ বাংলাদেশে আসেননি।
রাষ্ট্রহীনতার কলঙ্ক মোচনের মহাকাব্য
ছিটমহল বিনিময়ের পর বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় সরকারই নিজ নিজ অংশে যুক্ত হওয়া এই নতুন নাগরিকদের পুনর্বাসন ও এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করে। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর এই মানুষগুলো একটা আসল জাতীয় পরিচয় খুঁজে পায়, পায় স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দেওয়ার অধিকার।
আজ যদি আপনি সেই পুরোনো ছিটমহলগুলোতে যান, তবে আর সেই জরাজীর্ণ নরক দেখতে পাবেন না। সেখানে আজ গড়ে উঠেছে চোখ জুড়ানো পাকা রাস্তা, শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, আধুনিক কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ডিজিটাল সেবাকেন্দ্র। অন্ধকার কুপি-লণ্ঠনের যুগ পেরিয়ে সেই মানুষগুলো এখন আধুনিক জীবনের আলো দেখছেন।
যদি স্রেফ ভৌগোলিক হিসাব করি, তবে বাংলাদেশ এই চুক্তির মাধ্যমে নেট প্রায় ১০,০৫০ একর জমি বেশি পেয়েছে। তবে এই প্রাপ্তিটাকে কেবল জমির মাপে আটকে রাখলে ভুল হবে। ছিটমহল বিনিময়ের এই শান্তিপূর্ণ ইতিহাস বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরল ও অনন্য নজির। যেখানে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সীমানা বা ভূখণ্ড নিয়ে যুদ্ধ, রক্তপাত, আর হাজার হাজার মানুষের লাশ পড়া নিত্যদিনের ঘটনা—সেখানে বাংলাদেশ ও ভারত কোনো যুদ্ধ বা তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই, স্রেফ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি আর সদিচ্ছার জোরে এত বড় একটা জটিল মানবিক সংকটের অবসান ঘটিয়েছে। ছিটমহল বিনিময় তাই মানব ইতিহাসের মানচিত্র থেকে রাষ্ট্রহীনতার কলঙ্ক মুছে ফেলার এক গৌরবোজ্জ্বল মহাকাব্যের নাম।
আরও দেখুন:
