১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের এই কালো দিনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পরিষদ ভবনের টিভি রুমে সমবেত হয়েছিলেন কয়েক শশিক্ষার্থী। উপলক্ষ ছিল তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকশুকতারা` দেখা। পরের দিনই সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হওয়ার কথা। হলজুড়ে ছিল এক নির্মল ছুটির আমেজ। আনন্দটা আরও বেশি ছিল কারণ সেই নাটকে অভিনয় করছিলেন হলেরই এক কৃতি সতীর্থ মনন অধিকারী। প্রিয় বন্ধুর অভিনয় দেখতে অডিটোরিয়ামটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু রাত পৌনে নয়টায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সেই মুহূর্তটি নিমিষেই পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় নারকীয়তায়। প্রচণ্ড শব্দে ধসে পড়ে পরিষদ ভবনের ছাদ। মুহূর্তে টিভি রুমটি পরিণত হয় কংক্রিটের এক ধ্বংসস্তূপে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পুরনো চুন-সুরকির ছাদটি ভার সইতে পারেনি। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৩৯ জন ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ও অতিথি প্রাণ হারান। আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থী, যাঁদের অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
জগন্নাথ হলের এই পরিষদ ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নে, অর্থাৎ ১৯২১ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৬৪ বছর পর ১৯৮৫ সালে এসে ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জগন্নাথ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র সংখ্যালঘু ছাত্রদের হল হওয়ায় এখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর চাপ ছিল বহুগুণ বেশি। এই আবাসন সংকট মেটানোর জন্য কোনো যথাযথ কারিগরি পর্যালোচনা ছাড়াই ভবনটিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। উপযুক্ত সংস্কারের অভাব এবং প্রশাসনের উদাসীনতার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ৩৯টি তরতাজা প্রাণকে।
আজ ২০১৫ সাল। সেই ভয়ংকর ট্রাজেডির পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০টি বছর। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবরকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় সত্য, কিন্তু আবাসিক হলগুলোর জীবনের ঝুঁকি কি আদৌ কমেছে?
২০১৫ সালে দাঁড়িয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো আবাসিক হলগুলোর ছাদ ও পলেস্তারা ধসে পড়ার খবর আমরা প্রায়ই সংবাদপত্রে দেখি। জগন্নাথ হল ট্রাজেডির পর পরিষদ ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং নতুন ভবন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্যান্য হলের ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিয়ে আজও আমরা চরম উদাসীন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, অথচ সেই তুলনায় মানসম্মত ও নিরাপদ আবাসন বাড়ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে ঝুঁকিপূর্ণ গণরুমে থাকছেন। ৩০ বছর আগের সেই পুরনো চুন-সুরকির ছাদ ধসে পড়ার পেছনের মূল কারণ ছিল—ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং সময়মতো সংস্কার না করার অনীহা। ২০১৫ সালে এসেও যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাদের আস্তর খসে পড়ার খবর আসে, তখন মনে হয় আমরা ৩০ বছরেও যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারিনি।
জগন্নাথ হল ট্রাজেডির ৩০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ কেবল আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ নয়, বরং প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ভবনগুলোর স্ট্রাকচারাল অডিট (Structural Audit) করা এবং আধুনিক ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
