জারি গান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বাংলার মাটির পরতে পরতে মিশে আছে জারি গানের সুর। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং এটি বাঙালির হৃদয়ের হাহাকার এবং কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার এক গীতিময় উপস্থাপন। ‘অসুরের সুরলোকযাত্রা’ সিরিজের এই পর্বে আমরা ডুব দেব সেই শোকের সমুদ্রে, যেখানে কান্না রূপ নিয়েছে সুরে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 জারি গান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

জারি গান

জারি গানের ব্যুৎপত্তি ও ইতিহাস

‘জারি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে আগত, যার আভিধানিক অর্থ হলো—বিলাপ, ক্রন্দন বা শোক প্রকাশ করা। ১৭শ শতকের দিকে বাংলায় এই গানের ধারা শুরু হয়। মূলত মুহাররম উৎসবকে কেন্দ্র করে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাতবরণের শোকাবহ কাহিনীকে স্মরণ করতেই এই গানের উদ্ভব। তবে বাংলার লোককবিরা এই আরবীয় কাহিনীর সাথে বাংলার নিজস্ব আবেগ ও আবহকে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে, জারি গান আজ সম্পূর্ণভাবেই একটি বাঙালি লোকজ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশনারীতি: বীরত্ব ও করুণ রসের সংমিশ্রণ

ইসলামের ইতিহাস ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার মধ্যে জারি গান সর্বাধিক জনপ্রিয়। এর পরিবেশনা যেমন বর্ণাঢ্য, তেমনই হৃদয়স্পর্শী।

  • দলগত পরিবেশনা: জারি গান সাধারণত দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়। দলের প্রধান গায়ককে বলা হয় ‘বয়াতি’ বা ‘মূল গায়েন’। তাকে সাহায্য করার জন্য একদল সহকারী থাকে যাদের বলা হয় ‘দোহার’ বা ‘পালি’।
  • নৃত্য ও তাল: জারি গানে এক সময় বীরত্বব্যঞ্জক নৃত্যের প্রচলন ছিল। হাতে রুমাল বা লাঠি নিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে পায়ের তালের সাথে ঢোল, খঞ্জনি ও মন্দিরা সহযোগে এই গান গাওয়া হয়। এর সুরের মধ্যে যেমন হাহাকার থাকে, তেমনই যুদ্ধের বর্ণনায় থাকে ওজস্বিতা।
  • আহাজারি ও মার্সিয়া: গানের প্রতিটি অন্তরা শেষে দোহাররা সমস্বরে ধুয়ো ধরে এবং বুক চাপড়ে এক ধরনের শোকাতুর আবহ তৈরি করে, যা শ্রোতাদের মনে কারবালার সেই বিষাদময় দৃশ্যটি জীবন্ত করে তোলে।

বিবর্তন ও বিস্তৃতি

সময়ের সাথে সাথে জারি গানের উপজীব্য কেবল কারবালার কাহিনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলার লোককবিরা সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় নৈতিকতা, লৌকিক অলৌকিক কাহিনী এবং এমনকি সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়গুলোকেও জারির সুরে গেঁথেছেন। কোথাও কোথাও কবিগানের মতো দুই দলের মধ্যে তর্কমূলক জারির লড়াইও দেখা যায়। ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলে জারি গানের ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়।

অস্তিত্বের সংকট ও বর্তমান অবস্থা

এক সময় গ্রামবাংলার হাটে-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে সারা রাত ধরে জারি গানের আসর বসত। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে এবং সংরক্ষণের অভাবে এই লোকনাট্য ধারাটি কিছুটা ম্লান হয়ে এলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখনো পল্লী বাংলার নিভৃত জনপদে মহররমের চাঁদ উঠলে বুক চেরা কান্নার সুরে বেজে ওঠে— “হায় হোসেন! হায় হোসেন!” https://www.google.com/search?q=%23https://www.google.com/search?q=%23https://www.google.com/search?q=%23https://www.google.com/search?q=%23 উপসংহার জারি গান আমাদের শেকড়ের গান। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয় এবং কীভাবে বিয়োগান্তক ইতিহাসকেও সুরের মালা দিয়ে আগলে রাখতে হয়। ডিজিটাল যুগে এই অমূল্য লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

 

আরও দেখুন: