একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পূর্বে যেমন তার নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা প্রয়োজন, তেমনি একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে তার আদর্শিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বিশ্বমানচিত্রে ‘পাকিস্তান’ নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার ভিত্তিটিই রোপিত হয়েছিল এক চরম আদর্শিক ‘বিভ্রান্তি’ (Ideological Confusion) এবং দার্শনিক স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়ে।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক চাল বা দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর একটি ‘বাফার স্টেট’ (Buffer State) হিসেবে ব্যবহারের প্রচ্ছন্ন এজেন্ডাকে আড়ালে রেখে, সাধারণ মুসলিম জনতার সামনে আনা হয়েছিল ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-এর আবেগঘন সাম্প্রদায়িক জোয়ার। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই দ্বিজাতি তত্ত্বের যিনি প্রধান স্থপতি ও ফেরিওয়ালা ছিলেন—সেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেই জানতেন না এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র, শাসনতন্ত্র ও আদর্শিক রূপরেখা আসলে কী হবে!
রাষ্ট্রের এই জন্মগত অন্ধত্ব, দিকহীনতা এবং কোনো লিখিত সংবিধান ছাড়া যাত্রা শুরু করার খেসারত পাকিস্তান আজও দিচ্ছে। জিন্নাহর রেখে যাওয়া সেই বিশাল আদর্শিক শূন্যতার ভেতরেই ডালপালা মেলার সুযোগ পেয়েছিল পাকিস্তানের কুখ্যাত ‘মোল্লা-মিলিটারি-আমলাতন্ত্র ও জমিদার’ চক্র। ক্ষমতার স্বার্থে ও অর্থনৈতিক মুনাফা হাসিলের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ উগ্র ধর্মীয় দলগুলো, লোভী মিলিটারি জেনারেলরা, ব্রিটিশদের তৈরি করা সিভিল আমলাতন্ত্র এবং সিন্ধু-পাঞ্জাবের শোষক জমিদার শ্রেণী—সবাই এই আদর্শিক বিভ্রান্তিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে। তারা কেউ এই রাষ্ট্রকে একটি সুনির্দিষ্ট আধুনিক ডিরেকশন দিতে পারেনি, বরং প্রত্যেকে নিজেদের আখের গোছাতে দেশটিকে আজ পর্যন্ত একটি ‘আধ-খেঁচড়া ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঝুলিয়ে রেখেছে।

প্রথম অধ্যায়: জিন্নাহর দার্শনিক দেউলিয়াত্ব এবং পাকিস্তানের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’
১. জিন্নাহ: একজন ঝানু ব্যারিস্টার, কিন্তু দূরদর্শী রাষ্ট্র-দার্শনিক নন
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ফিটফাট, সাহেবি পোশাকধারী, ইংরেজিভাষী এবং লন্ডনের লিংকনস ইনের একজন অত্যন্ত চতুর ও দামি আইনজীবী (Barrister) ছিলেন। সাক্ষীকে জেরা করা, আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে নিজের মক্কেলের পক্ষে রায় নিয়ে আসা এবং নিখুঁত যুক্তির জালে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মম সত্য হলো—একজন ভালো আইনজীবী হওয়া আর একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া বা দূরদর্শী ‘রাষ্ট্র-দার্শনিক’ (State Philosopher) হওয়া এক জিনিস নয়।
জিন্নাহর সমগ্র রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বক্তৃতামালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর চিন্তার গভীরতা ছিল মূলত ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিক্রিয়াশীল, ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা দূরদর্শী নয়। কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক কিংবা জওহরলাল নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিক্রিয়ায় তিনি উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধার দাবি তুলতে তুলতে একপর্যায়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ বা ভূখণ্ডের দাবিতে এসে থিতু হন। কিন্তু এই ভূখণ্ডটি অর্জিত হওয়ার পর তার ভেতরের সমাজ কাঠামো কেমন হবে, সম্পদ বণ্টন কীভাবে হবে, বিভিন্ন জাতিসত্তা ও ভাষার মেলবন্ধন কীভাবে ঘটবে—তা নিয়ে জিন্নাহর কোনো সমাজতাত্ত্বিক (Sociological) আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা বোঝাপড়া ছিল না।
রাষ্ট্রের একটি ‘ফিলোসফিক্যাল হাইট’ (Philosophical Height) বা দার্শনিক উচ্চতা থাকে, যা নির্ধারণ করে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা আগামী এক শতাব্দী ধরে কোন আদর্শকে বুকে নিয়ে বাঁচবে। আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারদের (যেমন থমাস জেফারসন বা জেমস ম্যাডিসন) যেমন গভীর রাজনৈতিক দর্শন ছিল, কিংবা তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের যেমন একটি সুনির্দিষ্ট আধুনিকীকরণ ও সেক্যুলার ভিশন ছিল—জিন্নাহর ক্ষেত্রে তার কিছুই ছিল না। তাঁর ব্যক্তিত্ব সুগঠিত বা ‘ওয়েলফর্মড’ ছিল না বলেই তিনি মনে করেছিলেন যে, শুধু ‘ধর্মের’ সাধারণ একটি সুতো দিয়ে হাজার মাইলের ব্যবধানে থাকা পূর্ব বাংলা এবং সিন্ধু-পাঞ্জাব-বেলুচিস্তানের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষকে একটি শোষক কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব।
২. লিখিত ইতিহাসের অনুপস্থিতি: জিন্নাহর বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা
জিন্নাহর পুরো রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় নিজের রাজনৈতিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা ব্যাখ্যা করে কোনো বই লিখে যাননি। এমনকি সমসাময়িক কোনো বড় বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী কিংবা আন্তর্জাতিক পত্রিকার সম্পাদকের কাছেও এমন কোনো দীর্ঘ, তাত্ত্বিক চিঠি লেখেননি যা থেকে তাঁর কোনো দার্শনিক গভীরতা পরিমাপ করা যায়।
তাঁর সমসাময়িক জওহরলাল নেহেরু যেখানে বছরের পর বছর জেলে বসে ‘The Discovery of India’ বা ‘Glimpses of World History’-র মতো বিশ্বমানের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচনা করছেন (যেখানে তাঁর গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও বিশ্বরাজনীতি বিষয়ক চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে); সেখানে জিন্নাহর ঝুলিতে রয়েছে কেবল কিছু রাজনৈতিক বিবৃতি, নির্বাচনী জনসভার উগ্র ভাষণ এবং ব্রিটিশ ভাইসরয়দের সাথে আইনি দরকষাকষির কিছু খসড়া চিঠি। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার কারণে জিন্নাহ রাষ্ট্র বলতে স্রেফ একটি ভৌগোলিক মানচিত্র এবং তার প্রশাসনিক কিছু করণিক বা আমলাতন্ত্রের (Bureaucracy) যোগফলই বুঝেছিলেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়: জিন্নাহর বক্তৃতায় স্ববিরোধিতার খতিয়ান ও আদর্শিক কনফিউশনের প্রমাণ
যেহেতু জিন্নাহর কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুসংহত রাজনৈতিক দর্শন ছিল না, তাই পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের ঠিক আগমুহূর্তে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি চরম বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি একেক সময় একেক শ্রোতার মনস্তত্ত্ব জয় করার জন্য গিরগিটির মতো তাঁর রাজনৈতিক বয়ান পরিবর্তন করতেন। নিচে তাঁর সেই স্ববিরোধী বক্তব্যগুলোর প্রামাণিক খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
১. ইহুদিদের ইসরায়েলের সাথে তুলনা (১৯৪৬)
১৯৪৬ সালের দিকে যখন পাকিস্তানের দাবি আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন জিন্নাহ পশ্চিমা বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ধর্মকে একটি বড় রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করেন। মিশরের ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিন’ (মুসলিম ব্রাদারহুড) এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজন্যবর্গের সাথে যোগাযোগের সময় মুসলিম লীগের তরফ থেকে প্রচার করা হয়েছিল যে, পাকিস্তান হবে আধুনিক বিশ্বে মুসলমানদের প্রথম পুনরুত্থিত আদর্শিক রাষ্ট্র। জিন্নাহ ইহুদিদের ‘ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার দাবির সাথে তুলনা করে মুসলমানদের একটি ধর্মীয় বা বাফার স্টেটের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ একটি থিওক্র্যাটিক (Theocratic) বা ধর্মভিত্তিক কার্ড।
২. করাচি বার অ্যাসোসিয়েশন (জানুয়ারি, ১৯৪৮): শরিয়ত আইনের আইনি স্বীকৃতি
১৯৪৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি করাচি বার অ্যাসোসিয়েশনে আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ভাষণে জিন্নাহ কট্টরপন্থী মুসলিম জনতাকে শান্ত করতে এবং তাদের সমর্থন ধরে রাখতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
“কারা বলে পাকিস্তানের constitution ইসলামিক হবে না? আমি তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারছি না যারা এই অপপ্রচার চালাচ্ছে। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইসলামের নবী আমাদের একটি নিখুঁত শাসনতন্ত্র ও আইনি কাঠামো দিয়ে গেছেন। পাকিস্তানের আইন ও সংবিধান হবে সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।”
এই বক্তৃতার মাধ্যমে জিন্নাহ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থাকে একটি ধর্মীয় ও শরিয়াহ আইনের কাঠামোর মধ্যে ফেলার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা প্রগতিশীল ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিমদের মনে গভীর চিন্তার উদ্রেক করেছিল।
৩. ১১ই আগস্টের বক্তৃতা (১৯৪৭): সেক্যুলারিজমের নাটকীয় ইউ-টার্ন
অথচ, করাচি বারের বক্তৃতার মাত্র কয়েক মাস আগে, ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদের (Constituent Assembly) উদ্বোধনী অধিবেশনে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও নাটকীয় ‘ইউ-টার্ন’টি নেন। পাকিস্তানের সংবিধান তৈরির প্রাক্কালে দেওয়া এই ভাষণে তিনি বলেন:
“আপনারা স্বাধীন। আপনারা আপনাদের মন্দিরে যান, মসজিদে যান বা এই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যান—তাতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। রাষ্ট্রের কাছে আপনারা কোন ধর্মের, তা দেখার বিষয় নয়… সময়ের পরিক্রমায় আপনারা দেখবেন, হিন্দুরা আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমানরা আর মুসলমান থাকবে না; ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, কারণ ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই এক।”
এই বক্তৃতাটি পড়ার পর যেকোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চরম ধাঁধায় পড়ে যেতে বাধ্য হন। যে মানুষটি দীর্ঘ এক দশক ধরে ‘হাজার বছর ধরে হিন্দু এবং মুসলমান দুটি আলাদা জাতি, তারা একসাথে বাস করতে পারে না, তাদের সংস্কৃতি-ধর্ম-আইন সম্পূর্ণ ভিন্ন’—এই দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রচার করে একটি আস্ত দেশ ভাগ করলেন; সেই মানুষটিই দেশভাগের মাত্র তিন দিন আগে গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলছেন যে ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয় এবং রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমানের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না!
এটি কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের সুসংহত দর্শন ছিল না, এটি ছিল একজন চতুর আইনজীবীর শেষ মুহূর্তের ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষতি সামাল দেওয়ার অপচেষ্টা। তিনি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছিলেন যে ধর্মের যে জিনটিকে তিনি বোতল থেকে বের করেছেন, তা পুরো উপমহাদেশকে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই বিপুল বিভ্রান্তি ও জিন্নাহর রেখে যাওয়া ‘আদর্শিক শূন্যতা’র কারণেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর কোনো সংবিধান তৈরি হতে পারেনি এবং রাষ্ট্রটি চিরতরে দিক হারিয়ে ফেলে।

তৃতীয় অধ্যায়: জিন্নাহ-উত্তর পাকিস্তান—সংবিধানহীনতা এবং ক্ষমতার চার স্তম্ভের উত্থান
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে যখন কোনো লিখিত সংবিধান বা রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা না রেখেই মৃত্যুবরণ করেন, তখন পাকিস্তান এক অথৈ সাগরে পতিত হয়। একটি নবজাত রাষ্ট্রের জন্য যা হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস—অর্থাৎ তার ‘আইডিওলজি’ বা দর্শন—সেটিই হয়ে দাঁড়ায় তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। জিন্নাহর রেখে যাওয়া এই বিশাল ‘আদর্শিক শূন্যতা’ ও ‘কনফিউশন’-এর সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা দ্রুত চার শোষক শ্রেণীর পকেটে চলে যায়। এই চার স্তম্ভের স্বার্থের আবর্তেই ঘুরপাক খেতে থাকে পাকিস্তানের রাজনীতি:
১. ব্রিটিশের মানসিক উত্তরাধিকার: সিভিল আমলাতন্ত্র (Civil Bureaucracy)
পাকিস্তানের জন্মের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগ ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অসংগঠিত। জিন্নাহর মৃত্যুর পর দলে কোনো দক্ষ নেতা ছিলেন না যিনি একটি বিশাল রাষ্ট্র চালাতে পারেন। এই সুযোগে রাষ্ট্রের চাবিকাঠি চলে যায় ব্রিটিশদের প্রশিক্ষিত সিভিল আমলাদের হাতে, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম মোহাম্মদ এবং চৌধুরী মুহাম্মদ আলীর মতো চতুর আমলারা।
এই আমলাতন্ত্রের কোনো দার্শনিক বা রাজনৈতিক আদর্শ ছিল না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুদের মতো করে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। তারা খুব ভালো করেই জানত, দেশে যদি একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরি হয়, তবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আমলাদের হাত থেকে চলে যাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে। তাই তারা প্রথম থেকেই সংবিধান তৈরিতে নানা মারপ্যাঁচ ও কালক্ষেপণ করতে থাকে।
২. শোষণের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: সিন্ধু-পাঞ্জাবের জমিদার শ্রেণী (Feudal Landlords)
পশ্চিম পাকিস্তানের (বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধু) রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল সেখানকার হাজার হাজার একর জমির মালিক শোষক জমিদার শ্রেণী বা ‘জাগিরদাররা’। ভারতের নেহেরু সরকার যেমন দেশভাগের পরপরই জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে ভূমি সংস্কার (Land Reform) করেছিল, পাকিস্তানের জিন্নাহ বা মুসলিম লীগ তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। কারণ মুসলিম লীগের বড় বড় নেতারাই ছিলেন একেকজন বিশাল জমিদার।
এই জমিদাররা বুঝতে পেরেছিল, পাকিস্তান যদি একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সমঅধিকারের রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে তাদের জমিদারি টিকবে না। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের (বাঙালিদের) মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনাকে তারা নিজেদের শোষণের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করত। তাই এই সামন্তবাদী জমিদার শ্রেণী নিজেদের অর্থনৈতিক মুনাফা ও সামাজিক রমরমা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের ‘আদর্শিক বিভ্রান্তি’কে টিকিয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।
৩. রক্ষক যখন ভক্ষক: মিলিটারি জেনারেলদের উত্থান
পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক নেতৃত্বহীনতা এবং সিভিল আমলাদের কোন্দলের দিকে গভীর নজর রাখছিল সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান এবং তাঁর সহযোগী জেনারেলরা বুঝতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্রটির কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক ডিরেকশন নেই।
আমেরিকান ও পশ্চিমা শক্তিগুলো যখন কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের যুগে সমাজতন্ত্র ঠেকানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ‘বাফার স্টেট’ এবং অনুগত সামরিক বাহিনীর সন্ধান করছিল, পাকিস্তানি জেনারেলরা সানন্দে সেই পশ্চিমা প্রভুদের তল্পিবাহক হতে রাজি হন। দেশের সীমানা রক্ষা করার চেয়ে রাষ্ট্রে নিজেদের বাজেট, ব্যবসা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করাই হয়ে ওঠে মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের মূল এজেন্ডা। আর এই এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল একটি ‘অস্থির ও আদর্শহীন’ পাকিস্তান, যেখানে সবসময় যুদ্ধের বা বিপদের জুজু দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করে রাখা যায়।
৪. ক্ষমতার লাইসেন্সধারী: সুবিধাবাদী মোল্লাতন্ত্র (Mullahocracy)
এই ত্রিভুজ জোটে (আমলা-জমিদার-মিলিটারি) চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে যুক্ত হয় মোল্লাতন্ত্র বা উগ্র ধর্মীয় দলগুলো (যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ছিল অন্যতম)। জিন্নাহর সময়ে যে মোল্লারা পাকিস্তানকে ‘কাফের রাষ্ট্র’ বলে গালি দিয়েছিল, জিন্নাহর মৃত্যুর পর তারা সুর বদলে ফেলে।
তারা দেখতে পায়, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ধর্মীয় আবেগ রয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো আধুনিক রূপরেখা নেই। এই সুযোগে তারা ‘ইসলাম বিপন্ন’ এবং ‘ইসলামী রাষ্ট্র’-এর স্লোগান তুলে রাজনীতির মাঠে নিজেদের অপরিহার্য করে তোলে। আমলা ও মিলিটারি জেনারেলরা যখনই দেখত যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বা প্রগতিশীল জনতা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবি তুলছে, তখনই তারা এই মোল্লাদের লেলিয়ে দিত। মোল্লারা তখন ফতোয়া দিত যে—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি মূলত ‘ইসলাম ও পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার ভারতীয় চক্রান্ত’।

চতুর্থ অধ্যায়: ১৯৪৯ সালের ‘মূলনীতি প্রস্তাব’ (Objectives Resolution)—বিভ্রান্তির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে যে ‘অবজেক্টিভস রেজোলিউশন’ বা মূলনীতি প্রস্তাব পাস করেন, তা ছিল জিন্নাহর রেখে যাওয়া কনফিউশন বা বিভ্রান্তিকে রাষ্ট্রের সংবিধানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রথম আইনি দলিল।
এই প্রস্তাবে একদিকে বলা হলো, “সমগ্র মহাবিশ্বের ওপর সার্বভৌমত্ব একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর”; আবার অন্যদিকে বলা হলো, “রাষ্ট্র তার ক্ষমতা চর্চা করবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।”
এই প্রস্তাবটি ছিল এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, সার্বভৌমত্ব হয় কোনো অলৌকিক ঐশ্বরিক শক্তির হবে (Theocracy), না হয় তা জনগণের হবে (Democracy)। এই দুই স্ববিরোধী ধারণাকে একসাথে জুড়ে দিয়ে লিয়াকত আলী খান মূলত মোল্লাদেরও খুশি করতে চেয়েছিলেন, আবার আধুনিক বিশ্বকেও দেখাতে চেয়েছিলেন যে তাঁরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বানাচ্ছেন।
এর চূড়ান্ত কুফল যা হলো:
পূর্ব পাকিস্তানের ওপর আঘাত:
এই ‘ইসলামিক’ কার্ড ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক ও জমিদাররা পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের রাজনৈতিক কণ্ঠরোধ করার অজুহাত পেয়ে যায়। তারা প্রচার করতে শুরু করে যে, যেহেতু সার্বভৌমত্ব আল্লাহর এবং পাকিস্তান একটি ইসলামিক রাষ্ট্র, তাই রাষ্ট্রের ভাষা হবে একমাত্র ‘উর্দু’ (কারণ উর্দুকে তারা ইসলামের ভাষা মনে করত)। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যে আঘাত ১৯৫২ সালে এসেছিল, তার মূল বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল এই জন্মগত আদর্শিক বিভ্রান্তির মাধ্যমেই।
সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্নতা:
জিন্নাহ ১১ই আগস্টের বক্তৃতায় যে অসাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের কথা বলেছিলেন, এই অবজেক্টিভস রেজোলিউশনের মাধ্যমে তার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়। পাকিস্তানের লাখ লাখ অমুসলিম নাগরিক (হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ) রাতারাতি নিজেদের এই রাষ্ট্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হতে দেখে।
পাকিস্তানের জন্মলগ্নের এই আদর্শিক ধোঁয়াশাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রটি কোনো সুনির্দিষ্ট দর্শন নিয়ে যাত্রা শুরু করেনি। এর ফলে ক্ষমতার চার স্তম্ভ—আমলা, জমিদার, মিলিটারি এবং মোল্লারা—প্রত্যেকে নিজেদের আখের গোছাতে এই জগাখিচুড়ি অবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে। পরিণামে পাকিস্তান কখনোই একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পারেনি; বরং বারবার নানা কনফিউশনের মধ্য দিয়ে একটি ব্যর্থ ও আধ-খেঁচড়া ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
![Muhammad Ali Jinnah জিন্নাহর দার্শনিক শূন্যতা থেকে পাকিস্তানের জন্মগত ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ 6 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ [ Muhammad Ali Jinnah ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2014/02/Muhammad-Ali-Jinnah.jpg)
পঞ্চম অধ্যায়: ১৯৫৬ সালের সংবিধান এবং ৯ বছরের শাসনতান্ত্রিক তামাশা
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পর যেখানে সর্বোচ্চ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান তৈরি হওয়া উচিত, সেখানে পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী শাসকগোষ্ঠীর ৯ বছর সময় লেগেছিল একটি খসড়া সংবিধান পাস করতে। এই দীর্ঘ ৯ বছর ধরে পাকিস্তান পরিচালিত হয়েছিল ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ‘১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন’ (Government of India Act 1935) দিয়ে। এই দীর্ঘস্থায়ী শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সিভিল আমলাতন্ত্র, সিন্ধু-পাঞ্জাবের শোষক জমিদার শ্রেণী এবং মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের যৌথ চক্রান্তের ফসল।
১. ১৯৫৬ সালের প্রথম ‘আধ-খেঁচড়া’ সংবিধান
দীর্ঘ রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি, একাধিক প্রধানমন্ত্রীর পতন এবং গভর্নর জেনারেলদের স্বৈরাচারী ফরমানের পর অবশেষে ১৯৫৬ সালের ২৯শে মার্চ পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান কার্যকর হয়। কিন্তু এই সংবিধানটি কোনো আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও দূরদর্শী দলিল ছিল না; এটি ছিল জিন্নাহর রেখে যাওয়া ‘আদর্শিক বিভ্রান্তি’ এবং ক্ষমতার চার স্তম্ভের স্বার্থের এক চূড়ান্ত জগাখিচুড়ি বা আপস-নামা।
নামকরণে ভণ্ডামি:
আলেম ও মোল্লাদের শান্ত রাখতে রাষ্ট্রকে ঘোষণা করা হলো “ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান” (Islamic Republic of Pakistan)। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই সংবিধানে শরিয়াহ আইনের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা রূপরেখা ছিল না। এটি ছিল স্রেফ একটি জাঁকজমকপূর্ণ ধর্মীয় লেবেল, যার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সব কালো আইন।
বাঙালিদের পিঠে চুরিকাঘাত (প্যারেটি ফর্মুলা):
এই সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এক চতুর ফাঁদ পাতা হয়েছিল। জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছিল মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদে বাঙালিদের আসন বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমের জমিদার ও আমলারা ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব’ ও ‘সাম্য’-এর ভুয়া দোহাই দিয়ে “প্যারেটি ফর্মুলা” বা সংখ্যাসাম্য নীতি চাপিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আসন সংখ্যা সমান (১৫০টি করে) করা হয়। অর্থাৎ, ইসলামের নাম ব্যবহার করে বাঙালিদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সংখ্যাধিক্যের যৌক্তিক শক্তিকে রাতারাতি খর্ব করা হলো।
২. কেন এই সংবিধান দুই বছরও টিকল না?
১৯৫৬ সালের এই আধ-খেঁচড়া সংবিধানটি কার্যকর হওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালে কাগজের টুকরোর মতো ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল—এই সংবিধানে ক্ষমতার মূল দ্বন্দ্বগুলোর কোনো দার্শনিক সমাধান ছিল না। এটি না পেরেছিল কট্টর মোল্লাদের খুশি করতে, না পেরেছিল পূর্ব বাংলার প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ জনতাকে সন্তুষ্ট করতে। সবচেয়ে বড় কথা, এই সংবিধানের ভেতর দিয়ে সিভিল আমলা ও মিলিটারি জেনারেলরা বুঝতে পেরেছিলেন যে—দেশে যদি এই ত্রুটিপূর্ণ সংবিধানের অধীনেও একটি সাধারণ নির্বাচন হয়ে যায়, তবে ক্ষমতার চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার সচেতন মধ্যবিত্ত ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতে চলে যাবে। পশ্চিমের জমিদার ও সামরিক এলিটদের কাছে এটি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো।

ষষ্ঠ অধ্যায়: ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান—গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক
যখনই ১৯৫৬ সালের সংবিধানের অধীনে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছিল (যা ১৯৫৯ সালের গোড়ার দিকে হওয়ার কথা ছিল), তখনই পাকিস্তানের আসল শাসকরা তাদের মুখোশ খুলে ফেলে। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা দেশে সামরিক আইন (Martial Law) জারি করেন এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর, ২৭শে অক্টোবর সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কান্দার মির্জাকে তাড়িয়ে নিজেই পাকিস্তানের সর্বেসর্বা ডিকটেটর বা সামরিক শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১. রক্ষক যখন ভক্ষক: ‘মিলিটারি-আমলাতন্ত্র’ রাজত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
জেনারেল আইয়ুব খানের এই ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে জিন্নাহর রেখে যাওয়া ‘আদর্শিক বিভ্রান্তি’ এক নতুন বাঁক নেয়। আইয়ুব খান ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত, সেক্যুলার ও আধুনিক মনস্তত্ত্বের মানুষ। তিনি মোল্লাদের কট্টরপন্থা ও শরিয়তি রাষ্ট্রের ধারণাকে তীব্র অপছন্দ করতেন। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ট্র্যাজেডি হলো—একজন সামরিক শাসকের নিজের ক্ষমতার কোনো ‘গণতান্ত্রিক বৈধতা’ (Democratic Legitimacy) থাকে না। ফলে নিজের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে আইয়ুব খানকেও শেষ পর্যন্ত সেই ‘ধর্মীয় কার্ড’ এবং ‘আদর্শিক ধোঁয়াশা’র আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
বেসিক ডেমোক্রেসি (মৌলিক গণতন্ত্র) নামক প্রহসন:
আইয়ুব খান পাকিস্তানের জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ নামক এক অদ্ভুত শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেন, যেখানে মাত্র ৮০,০০০ কাউন্সিলরের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। এই কাউন্সিলরদের সিংহভাগই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্তবাদী জমিদার ও তাদের অনুগত দালাল শ্রেণী।
সংবিধান নিয়ে তামাশা (১৯৬২):
১৯৬২ সালে আইয়ুব খান নিজের মতো করে একটি নতুন সংবিধান তৈরি করেন। সেখানে তিনি প্রথমে রাষ্ট্রের নাম থেকে “ইসলামী” শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু “প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান” করেছিলেন। কিন্তু এর পরপরই কট্টরপন্থী মোল্লা ও জামায়াতের আন্দোলনের মুখে এবং নিজের রাজনৈতিক দল (কনভেনশন মুসলিম লীগ)-এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রের নাম “ইসলামী প্রজাতন্ত্র” করতে বাধ্য হন।
২. মোল্লা-মিলিটারি নেক্সাসের গভীর মনস্তত্ত্ব
আইয়ুব খানের এই আমল থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘মোল্লা-মিলিটারি নেক্সাস’ বা সামরিক জান্তা ও উগ্র ধর্মীয় শক্তির মধ্যকার সেই বিখ্যাত ও কুখ্যাত গোপন বোঝাপড়াটি পাকাপোক্ত রূপ পায়। এই জোটের মূল মনস্তত্ত্বটি ছিল অত্যন্ত চতুর:
মিলিটারি জেনারেলরা জানতেন, তাঁদের ক্ষমতার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে স্তিমিত করতে এবং নিজেদের শাসনকে ‘পবিত্র’ প্রমাণ করতে তাঁদের মাঝে মাঝেই আড়ালে মোল্লাদের ফতোয়া ও ইসলামের স্লোগান ব্যবহার করতে হতো।
অন্যদিকে, সুবিধাবাদী মোল্লা ও জামায়াতের মতো দলগুলো খুব ভালো করেই জানত, ব্যালট বাক্সে বা ভোটের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ তাদের কোনোদিন ভোট দেবে না। তাই তারা সামরিক জান্তার কোলে চড়ে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (যেমন ISI) তল্পিবাহক হয়ে পর্দার আড়ালে ক্ষমতার অংশীদার হতে এবং বিপুল অর্থনৈতিক মুনাফা হাসিল করতে পছন্দ করত।
এইভাবে, যে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল জিন্নাহর এক চরম দার্শনিক ও আদর্শিক অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে, তা স্বাধীনতার মাত্র এক দশকের মধ্যে চিরতরে একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। দেশটিকে রূপান্তরিত করা হয় ক্ষমতার লোভী মিলিটারি জেনারেল, শোষক জমিদার শ্রেণী এবং ধর্ম ব্যবসায়ী মোল্লাদের এক যৌথ লুটপাটের চারণভূমিতে।

সপ্তম অধ্যায়: ১৯৭১ সালের মহাসংকট—আদর্শিক বিভ্রান্তির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ
১৯৪৭ সালে জিন্নাহ যে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ এবং অবাস্তব ভৌগোলিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি খাড়া করেছিলেন, তার আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ২৪ বছর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো প্রতিষ্ঠিত সূত্র দিয়ে হাজার মাইলের ব্যবধানে থাকা, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দুটি জনগোষ্ঠীকে স্রেফ ‘ধর্মের’ জোড়াতালি দিয়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। জিন্নাহর রেখে যাওয়া সেই আদর্শিক শূন্যতা যখন পশ্চিমের সিভিল আমলা, সিন্ধু-পাঞ্জাবের জমিদার এবং সামরিক জান্তার শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হলো, তখন ১৯৭১ সালের বিস্ফোরণ হয়ে দাঁড়াল এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা।
১. ১৯৭০ এর নির্বাচন: ব্যালটের মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের কবর রচনা
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম এবং শেষবারের মতো একটি অবাধ ও বৈষম্যহীন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে জিন্নাহর সেই বহু-প্রচারিত ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’-এর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সমগ্র পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা পাওয়ার আইনি ম্যান্ডেট লাভ করে। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ উগ্র ধর্মান্ধ দলগুলো চরমভাবে পরাস্ত হয়। এই নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট প্রমাণ করে দেয় যে—রাষ্ট্রের জন্মগত ‘ইসলামিক জগাখিচুড়ি’র বয়ানকে ছুড়ে ফেলে বাঙালিরা একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল এবং ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদের পক্ষে রায় দিয়েছে।
২. ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও ক্ষমতার অপবিত্র অক্ষের শেষ কামড়
ভোটের এই গণতান্ত্রিক রায় পশ্চিমের ক্ষমতার চার স্তম্ভ—মিলিটারি জেনারেল (যেমন জেনারেল ইয়াহিয়া খান), সামন্তবাদী জমিদার (যেমন জুলফিকার আলী ভুট্টো), আমলাতন্ত্র এবং সুবিধাবাদী মোল্লাতন্ত্রের (যেমন মওদুদীর জামায়াতে ইসলামী) পায়ের তলার মাটি কাঁপিয়ে দেয়। তারা খুব ভালো করেই জানত, ক্ষমতা যদি বাঙালির হাতে চলে যায়, তবে পাকিস্তানের এই দীর্ঘ শোষণের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে।
এই মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব থেকেই তারা ব্যালটের রায়কে বুটের তলায় পিষে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। আর এই গণহত্যাকে ধর্মীয় ও আদর্শিক বৈধতা দিতে মাঠে নামে পাকিস্তানের সুবিধাবাদী মোল্লা ও জামায়াতের মতো কট্টরপন্থী দলগুলো। তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তল্পিবাহক হয়ে আল-বدر ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে সাধারণ বাঙালি ও মেধাচ্ছন্ন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে শুরু করে।
তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করত যে—পাকিস্তান টিকিয়ে রাখা মানেই ইসলাম টিকিয়ে রাখা, আর বাঙালির স্বাধীনতার লড়াই মূলত এক ‘কুফরি চক্রান্ত’। কিন্তু ইতিহাস তাদের এই উগ্র ভণ্ডামিকে ক্ষমা করেনি। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জিন্নাহর সেই দিকহীন, বিভ্রান্ত ও কৃত্রিম পাকিস্তানের চিরতরে মৃত্যু ঘটে এবং জন্ম নেয় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

অষ্টম অধ্যায়: সমকালীন পাকিস্তান—একটি আধ-খেঁচড়া ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের জীবন্ত দলিল
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরেও বর্তমানের অবশিষ্টাংশ পাকিস্তান (পশ্চিম পাকিস্তান) তার জন্মগত ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা আদর্শিক ধোঁয়াশা থেকে এক ইঞ্চিও বের হতে পারেনি। জিন্নাহ ও তাঁর সহযোগীরা যে বিভ্রান্তির বীজ বপন করেছিলেন, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রকেই গিলে খাচ্ছে। আজ পর্যন্ত পাকিস্তান যে একটি ‘আধ-খেঁচড়া ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে পৃথিবীর বুকে ঝুলে আছে, তার পেছনে কাজ করছে একই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা:
১. জুলফিকার আলী ভুট্টোর সুবিধাবাদী ইসলামীকরণ (১৯৭৩)
১৯৭১-এর পরাজয়ের পর ক্ষমতালোভী জমিদার জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে একজন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত, সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে দাবি করলেও, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনিও জিন্নাহর মতোই ‘ধর্মীয় কার্ড’ খেলেন। ১৯৭৩ সালের সংবিধানে তিনি কট্টরপন্থীদের সন্তুষ্ট করতে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করেন এবং মদ্যপান ও জুয়া নিষিদ্ধ করার মতো লোকদেখানো ইসলামিক আইন পাস করেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক বা শাসনতান্ত্রিক সংস্কার না করে তিনি জিন্নাহর সেই পুরনো কনফিউশনকেই পুনরুজ্জীবিত করেন।
২. জেনারেল জিয়ার কট্টর ‘ইসলামাইজেশন’ ও জেহাদি সংস্কৃতির জন্ম (১৯৭৭-১৯৮৮)
১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে পাকিস্তানের ‘মোল্লা-মিলিটারি নেক্সাস’ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ও কুৎসিত রূপে আত্মপ্রকাশ করে। জিয়াউল হক নিজের অবৈধ সামরিক একনায়কতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং আমেরিকার ডলারে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ (Soviet-Afghan War) চালাতে পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটি ‘জেহাদি কারখানায়’ রূপান্তর করেন।
তিনি সংবিধানে হুুদুদ অধ্যাদেশ (Hudood Ordinance) জারি করেন, ব্লাসফেমি আইন কড়া করেন এবং হাজার হাজার উগ্রবাদী মাদরাসা গড়ে তোলেন। এর ফলে পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা এবং সমাজব্যবস্থা এক মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।
৩. আজকের পাকিস্তান: দেউলিয়া অর্থনীতি এবং পারমাণবিক বোমাসমৃদ্ধ উপজাতীয় স্বর্গরাজ্য
আজকের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি আমরা পাকিস্তানের দিকে তাকাই, তবে দেখব রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণের ওপর শ্বাস নেওয়া একটি আইসিইউ-তে থাকা অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ এই রাষ্ট্রের কাছে রয়েছে পারমাণবিক বোমা এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী।
মিলিটারির বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য:
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখন আর স্রেফ বর্ডার পাহারা দেয় না; তারা করপোরেট ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট, ব্যাংক এবং সিমেন্ট ফ্যাক্টরি চালায়—যাকে আন্তর্জাতিক গবেষকরা ‘মিলবাস’ (Milbus) বা মিলিটারি বিজনেস বলে অভিহিত করেন।
মোল্লাতন্ত্রের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন:
যে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে মিলিটারি এতদিন নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল, তারা আজ ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (TTP)-এর মতো ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ওপরেই আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে।
সিভিল সমাজ ও জমিদারের শোষণ:
দেশটির সিভিল সমাজ সম্পূর্ণ মেরুদণ্ডহীন এবং সিন্ধু-পাঞ্জাবের জমিদাররা আজও দেশের সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত করে সাধারণ জনগণকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে দিয়েছে।

ইতিহাসের এক অমোঘ শিক্ষা
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামক একজন প্রাজ্ঞ কিন্তু ‘দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক উচ্চতাহীন’ আইনজীবীর হাত ধরে যে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। একটি রাষ্ট্র যে কেবল একটি মানচিত্র, কিছু ব্যুরোক্র্যাট, শোষক জমিদার আর সামরিক বুটের জোর দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না—তার জীবন্ত প্রমাণ আজকের পাকিস্তান।
জিন্নাহ যদি এই রাষ্ট্রটিকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও লিখিত সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা দিয়ে যেতে পারতেন, তবে হয়তো এর পরিণতি এমন হতো না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গভীর ‘আদর্শিক বিভ্রান্তি’র কারণেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সঠিক ডিরেকশন বা পথ খুঁজে পায়নি।
এই আদর্শিক শূন্যতার কারণেই দেশটিতে বারবার সিভিল আমলাতন্ত্র, শোষক জমিদার শ্রেণী, লোভী মিলিটারি জেনারেল এবং সুবিধাবাদী মোল্লাতন্ত্রের এক অপবিত্র জোট (Nexus) রাষ্ট্রযন্ত্রকে জিম্মি করার সুযোগ পেয়েছে। তারা প্রত্যেকে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ইসলামের পবিত্র নামকে এবং এই জন্মগত কনফিউশনকে একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করেছে। পরিণামে ১৯৭১ সালে এই রাষ্ট্র ভেঙে বাঙালিরা নিজেদের মুক্ত করেছে, আর অবশিষ্ট পাকিস্তান আজ এক দিকহীন, দেউলিয়া, আধ-খেঁচড়া ও ব্যর্থ ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে এক করুণ দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝুলে আছে।
তথ্যসূত্র ও প্রامাণিক উৎসসমূহ (Bibliography):
১. The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan — Ayesha Jalal (Cambridge University Press).
২. Pakistan: Between Mosque and Military — Husain Haqqani (Husain Haqqani is a former Pakistani diplomat and scholar).
৩. The Vanguard of the Islamic Revolution — Seyyed Vali Reza Nasr.
৪. Military Inc.: Inside Pakistan’s Military Economy — Ayesha Siddiqa (An অকাট্য প্রামাণিক দলিল on Pakistan’s military economy).
৫. Constitutional Development in Pakistan — G. W. Choudhury.
৬. পাকিস্তানের গণপরিষদের কার্যবিবরণী (১৯৪৭-১৯৫৬) — অফিসিয়াল আর্কাইভাল রেকর্ডস।
আরও দেখুন:
