বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার ও রক্তাক্ত অধ্যায় হলো সত্তরের দশকের শেষভাগ এবং আশির দশকের শুরু। বিশেষ করে সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকাল (১৯৭৫-১৯৮১) ছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরে এক অবিরাম রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস। সাম্প্রতিক সময়ে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধোঁয়াশার ওপর নতুন করে আলো ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এক সুদীর্ঘ পর্যালোচনায় তিনি দাবি করেছেন, জিয়ার আমলে সামরিক বাহিনীতে অন্তত ২৬টির মতো অভ্যুত্থান বা অভ্যুত্থানচেষ্টা ঘটেছিল, যার পরিণতিতে প্রায় আড়াই হাজার সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানকে জীবন দিতে হয়েছিল।
এই নির্মম সত্যের পেছনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম নির্মমতা যেমন লুকিয়ে আছে, তেমনি লুকিয়ে আছে ইতিহাসের বহু প্রমাণ মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত চক্রান্ত।

১. অভ্যুত্থানের দীর্ঘ মিছিল ও রক্তগঙ্গা (১৯৭৫-১৯৮১)
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ঠিক কতটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাষ্যে এই সংখ্যাটি ২৬টি বলা হলেও, কোনো কোনো গবেষকের মতে সংখ্যাটি ২১। তবে সংখ্যার এই এদিক-ওদিক নির্মম সত্যটাকে আড়াল করতে পারে না।
এই দীর্ঘ অভ্যুত্থানের মিছিলের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর। এই একটিমাত্র অভ্যুত্থান এবং তা দমনের নামে যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল, সে সম্পর্কেই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ২০-২৫টি অভ্যুত্থানের ঘটনা আজও এক রহস্যময় ধোঁয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে।
১৯৭৭ সালের অক্টোবরের সেই রক্তাক্ত দিনটিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন শতাধিক সেনা অফিসার। অনেকে নিহত হয়েছিলেন অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে সম্মুখ সমরে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ট্র্যাজেডিটি ঘটেছিল অভ্যুত্থান দমনের পরবর্তী দিনগুলোতে। বিচারের নামে, প্রহসনের ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে নির্বিচারে মেরে ফেলা হয় শত শত সেনাকে। বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র ও গবেষণার তথ্য মেলালে দেখা যায়—সব মিলিয়ে এই নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
এক নজরে সেই ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান:
- ১,৩০০ জনেরও বেশি: সেনা সদস্য ও জওয়ানকে স্রেফ ফাঁসি এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ডে হত্যা করা হয়।
- বাকি ১,২০০+ জন: এদের মৃত্যুর কোনো দালিলিক প্রমাণ বা রেকর্ড আজ আর রাষ্ট্রীয় নথিতে পাওয়া যায় না। সেই সময় থেকে আজও তাঁরা তাঁদের পরিবারের কাছে স্রেফ ‘নিখোঁজ’।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিয়ার আমলে নিহত সেই সামরিক কর্মকর্তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এত বছর পর একটি নিখুঁত তালিকা তৈরি করা কতটা সম্ভব? কারণ, সেই সময়ের বেশির ভাগ প্রত্যক্ষদর্শী আজ আর বেঁচে নেই, আর রাষ্ট্রীয় অনেক দালিলিক প্রমাণ ধ্বংস করার অভিযোগও রয়েছে বেশ পুরনো।
২. ইতিহাসের প্রমাণ লোপাট: পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে নথি
জিয়ার আমলের এই গণফাঁসি ও বিনা বিচারে হত্যার বড় সংকটটি হলো প্রমাণের অভাব। কারণ, পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী খুব পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের প্রমাণগুলো রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ থেকে মুছে দিয়েছিল।
এ বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক জায়েদুল আহসান পিন্টু। তাঁর মতে, কাজটা অত্যন্ত কঠিন হলেও একেবারেই অসম্ভব নয়। তিনি তাঁর দীর্ঘ গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে জানান—
- ১৯টি অভ্যুত্থানের হদিস: তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে ৫ বছরে কমপক্ষে ১৯টি অভ্যুত্থানের সুনির্দিষ্ট ঘটনা খুঁজে পেয়েছেন। তবে নিহতের একক ও সমন্বিত কোনো তালিকা কোনো একটি নির্দিষ্ট দপ্তরে রাখা হয়নি, তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
- দলিল ধ্বংসের চক্রান্ত: জিয়া এবং পরবর্তীতে এরশাদ—উভয় আমল মিলেই এই বিচারহীনতার ও নির্বিচার হত্যার দলিল-দস্তাবেজগুলো পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। তবে এখনও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বা কিছু পুরোনো ফাইলে কিছু দালিলিক প্রমাণ টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জায়েদুল আহসান পিন্টুর মতে, এখনই উপযুক্ত সময় একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘তথ্য অনুসন্ধান কমিশন’ গঠন করার। এই কমিশন দলিল-দস্তাবেজ খোঁজার পাশাপাশি এখনও বেঁচে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ও শহীদ পরিবারের মৌল খসড়া ও মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণ করবে।
এই কমিশন গঠনের দুটি চমৎকার মডেল হতে পারে:
১. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা বিচারপতির নেতৃত্বে এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিশন।
২. অথবা একটি শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি।
তবে এই কমিটিকে অবশ্যই বিশেষ আইনি ক্ষমতা (High-Powered) দিতে হবে—যাতে তথ্য চেয়ে তারা দেশের যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক সেনাপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীকেও তলব করতে পারে এবং তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।
৩. দীর্ঘদিনের অবহেলা ও গবেষকদের মূল্যায়ন
এই জাতীয় ট্র্যাজেডি নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের দীর্ঘদিনের এক ধরণের অনীহা কাজ করেছে। লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার কবির আক্ষেপ করে জানান, জিয়ার আমলে সশস্ত্র বাহিনীতে চলা এই গণহত্যা ও গণফাঁসি নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি কিন্তু নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন প্রথম দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় আসে, তখনই জাতীয় সংসদে এই দাবি উঠেছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা বইয়ের সূত্র ধরে সংসদ সদস্যরা একাধিকবার এই ইস্যুটি সামনে এনেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আজ পর্যন্ত কোনো কমিশনও হয়নি, সেই অভাগা সেনাদের আত্মত্যাগের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা তালিকাও তৈরি হয়নি।
তবে ভিন্ন এক আশার বাণী শুনিয়েছেন প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, সরকার যদি সত্যিই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়, তবে এই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা খুব বেশি কঠিন হবে না। তাঁর যুক্তি হলো—
“এর প্রতিটি ঘটনারই কোনো না কোনো রেকর্ড সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা দপ্তরে এখনও সংরক্ষিত আছে। বিশেষ করে যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তাদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট রেকর্ড তো দেশের কেন্দ্রীয় জেলখানাগুলোতে (ঢাকা, বগুড়া, কুমিল্লা, রাজশাহী সেন্ট্রাল জেল) থাকার কথা। সরকার চাইলে এই সমস্ত তথ্য এক জায়গায় জড়ো করা সম্ভব।”

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার দায়
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া, স্রেফ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে হাজারো সেনাকে রাতের অন্ধকারে ফাঁসি দেওয়া বা নিখোঁজ করে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম কলঙ্কজনক। জিয়াউর রহমানের আমলের সেই ২৬টি অভ্যুত্থানের পেছনের আসল কুশীলব কারা ছিল, আর কারা নির্দোষ থেকেও স্রেফ রাজনীতির বলি হয়েছিল—তা উন্মোচিত হওয়া দরকার।
দেরিতে হলেও এখন যদি একটি শক্তিশালী ‘তথ্য অনুসন্ধান কমিশন’ গঠন করা না হয়, তবে আগামী ১০ বছর পর এই ইতিহাসের শেষ সাক্ষীটুকুও হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে এবং দেশের সামরিক বাহিনীকে চিরতরে বিতর্কহীন রাখতে এই ‘সেনা হত্যার’ বিচার ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা আজ সময়ের দাবি।
আরও দেখুন:
