জুঙ্গলী গ্রাম, ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

জুঙ্গলী গ্রাম, ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত জুঙ্গলী গ্রামটি একটি ঐতিহ্যবাহী এবং কৃষিপ্রধান জনপদ। গড়াই নদীর অববাহিকা সংলগ্ন এই গ্রামটি তার নিরিবিলি পরিবেশ এবং সুসংগঠিত সামাজিক কাঠামোর জন্য পরিচিত। নিচে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্যের ভিত্তিতে গ্রামটির একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো:

প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান

জুঙ্গলী গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক বিচারে গ্রামটি ইউনিয়নের পশ্চিমাংশে অবস্থিত। এর সীমানা উত্তর দিকে কাঞ্চনপুর গ্রাম, দক্ষিণে নাভদিয়া, পূর্বে চাঁদপুর (সদর) এবং পশ্চিমে বাটিকামারা ইউনিয়নের সীমানা। গ্রামের সরকারি মৌজা নাম জুঙ্গলী। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ অনুযায়ী, এই গ্রামের বসতি এলাকাগুলো মূলত উঁচু ভিটা জমিতে গড়ে উঠেছে এবং চারপাশ বিস্তৃত দোফসলী ও তিনফসলী কৃষি জমি দ্বারা বেষ্টিত।

জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ জনশুমারি এবং ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জুঙ্গলী গ্রামের মোট জনসংখ্যা ২,০৪৭ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১,০৩৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ১,০১৩ জন। নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় ১০০:৯৮। গ্রামে মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৪৫০টি। ভোটার সংখ্যা আনুমানিক ১,৩৫০ জন। আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রায় ২০% বাড়ি পাকা ও আধা-পাকা এবং ৮০% বাড়ি মূলত টিনশেড ও বাঁশ-কাঠের তৈরি ঘর।

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চিত্র

ব্যানবেইস (BANBEIS) ও স্থানীয় শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুঙ্গলী গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৬০.৫%। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী চাঁদপুর ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কুমারখালী উপজেলা সদরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তব ও জামে মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। স্থানীয় তরুণদের মাঝে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।

কৃষি ও ভূমি ব্যবহার

জুঙ্গলী গ্রামের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, গ্রামের জমি অত্যন্ত উর্বর। এখানকার প্রধান কৃষি পণ্য হলো ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ এবং তামাক। এছাড়াও রবি শস্যের মধ্যে মসুর ও সরিষার ফলন এখানে বেশ ভালো হয়। গ্রামে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। গড়াই নদীর পলি সমৃদ্ধ মাটি হওয়ায় এখানকার জমিতে ফলন বেশ ভালো হয় এবং কৃষকরা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের ম্যাপ অনুযায়ী, জুঙ্গলী গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। গ্রামটি চাঁদপুর-কুমারখালী প্রধান সড়কের সাথে সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত। গ্রামে পাকা রাস্তার পরিমাণ প্রায় ৩ কিলোমিটার এবং সলিং ও কাঁচা রাস্তা রয়েছে প্রায় ৪ কিলোমিটার। বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে ৪টি কালভার্ট রয়েছে। বড় ধরনের কেনাকাটা বা বাণিজ্যের জন্য গ্রামবাসী চাঁদপুর বাজার ও কুমারখালী বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা

জুঙ্গলী গ্রাম ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ ও ১টি স্থায়ী ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। গ্রামের মসজিদগুলো স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়। এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে এবং উভয় সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করছে। গ্রামের দক্ষিণ পাশে একটি সামাজিক কবরস্থান রয়েছে।

স্থানীয় নেতৃত্ব ও জননিরাপত্তা

প্রশাসনিকভাবে ৭ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করেন। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন মোঃ আলমগীর হোসেন (মোবাইল: ০১৯১৯৮৬৬৩৪২)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা এখানে নিয়মিত টহল প্রদান করেন। গ্রামের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিবাদ নিরসনে স্থানীয় মুরুব্বি ও মাতব্বরদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গ্রামের কাঁচা রাস্তা সংস্কার ও সোলার লাইট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা

জুঙ্গলী গ্রামে অনেক কর্মঠ ও মেধাবী মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন যারা কৃষি বিপ্লব ও স্থানীয় ব্যবসায় অবদান রাখছেন। বিশেষ করে এই গ্রামের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। গ্রামের প্রধান সামাজিক সমস্যা হিসেবে বর্ষা মৌসুমে কিছু নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে কিছু অভ্যন্তরীণ রাস্তার অপ্রশস্ততা লক্ষ্য করা যায়। তবে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং কৃষি নির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে জুঙ্গলী গ্রামটি কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে পরিচিত।

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।