হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল পরিসরে এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলো প্রথম শুনলেই মনে হয়—এ যেন সুরের দৌড়, কণ্ঠের খেলা, আর তানের ঝিলিক। টপ্পা সেই বিরল ধারাগুলোর একটি। যদি খেয়াল হয় এক সুগঠিত, ধীরস্থির স্থাপত্য, তবে টপ্পা যেন তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক চঞ্চল স্রোত—দ্রুত, প্রাণবন্ত, আর আশ্চর্যরকম জটিল। এই গায়কির আসল আকর্ষণ তার গতি, তার ভঙ্গি, আর তার অদম্য উচ্ছ্বাস।
উটের পিঠ থেকে সভামঞ্চে: টপ্পার জন্মকথা
টপ্পার জন্ম কোনো রাজদরবারে নয়—বরং ধুলো-মাখা পথের ওপর, পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। উটচালকরা যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেন, তখন তাদের কণ্ঠে ভেসে উঠত এক বিশেষ ধরনের গান—যার সুরে ছিল দোল, ছন্দে ছিল ঝাঁকুনি, আর তানে ছিল দ্রুত ওঠানামা। উটের চলার সেই দুলুনিই যেন এই সুরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল।
এই লোকজ সুরকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিমণ্ডলে এনে নতুন রূপ দেন আঠারো শতকের গায়ক গোলাম নবী, যিনি ‘শোরা মিয়াঁ’ নামে পরিচিত। লখনউয়ের নবাবি দরবারে তিনি এই সুরকে রাগ ও তালের শৃঙ্খলায় বেঁধে এক নতুন গায়নরীতির জন্ম দেন—যার নাম হয় টপ্পা। লোকজ সহজতা আর শাস্ত্রীয় কারুকার্যের এই মেলবন্ধনই টপ্পাকে করে তোলে অনন্য।
কণ্ঠের ক্ষিপ্রতা: টপ্পার আসল পরিচয়
টপ্পা গাওয়া মানে শুধু সুরে থাকা নয়—এ যেন কণ্ঠের এক অবিরাম দৌড়। এখানে প্রতিটি স্বর দ্রুত উঠে যায়, নেমে আসে, আবার ফিরে যায়—সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে শ্রোতার মনে হয়, সুর যেন স্থির হতে চায় না।
টপ্পার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার জমজমা ও দানা তান—যেখানে স্বরগুলো ছোট ছোট খণ্ডে ভেঙে একের পর এক ছুটে চলে। এই তানে এক ধরনের কম্পন বা ‘হিল্লোল’ তৈরি হয়, যা শুনলে মনে হয় সুর যেন ঢেউ খেলছে। এখানে মীড়ের দীর্ঘ টান কম, বরং মুরকি, গিটকিরি, খাটকা—এই সূক্ষ্ম অলংকারগুলোই বেশি ব্যবহৃত হয়।
বন্দিশও ছোট—সংক্ষিপ্ত কয়েকটি পংক্তি, কিন্তু তার মধ্যেই শিল্পীকে ফুটিয়ে তুলতে হয় তার সমস্ত দক্ষতা। কোনো ধীর আলাপ বা বিস্তারের সুযোগ নেই; শুরু থেকেই গতি, আর সেই গতিই শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
রাগ ও তালের বুনন
টপ্পা সাধারণত সেইসব রাগে বেশি মানানসই, যেগুলোর স্বভাব চপল ও প্রাণবন্ত। ভৈরবী, খামাজ, কাফি, দেশ, ঝিনঝোঁটি—এই রাগগুলোতে টপ্পার সুর যেন স্বাভাবিকভাবেই ফুটে ওঠে। গম্ভীর, গুরুগম্ভীর রাগে টপ্পা খুব একটা দেখা যায় না, কারণ তার স্বভাবই ভিন্ন।
তালের দিক থেকেও টপ্পা বিশেষভাবে চেনা যায়। পাঞ্জাবি দাদরা বা সিতারাখানি তাল এখানে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে টপ্পায় তাল যেন পেছনে থাকে—সামনে থাকে সুরের দৌড়, তানের খেলা। তাল এখানে কাঠামো দেয়, কিন্তু মূল আকর্ষণ থাকে কণ্ঠের গতিতে।
প্রেম, বিরহ ও ভাষার স্বাদ
আদি টপ্পার ভাষা ছিল পাঞ্জাবি, আর তার বিষয়বস্তু—প্রেম ও বিরহ। লোককথার নায়ক-নায়িকা, বিশেষ করে হীর-রাঞ্জার প্রেমকাহিনি, টপ্পার গানে বারবার ফিরে আসে। এই প্রেম সরল, কখনো আকুল, কখনো অভিমানী—কিন্তু সবসময়ই প্রাণবন্ত।
পরবর্তীকালে টপ্পা বিভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে, কিন্তু তার মূল আবেগ—চপল প্রেম আর অস্থির আকাঙ্ক্ষা—অপরিবর্তিত থেকেছে।
বাংলা টপ্পা: এক নতুন রূপ
বাংলা সংগীতে টপ্পা এক নতুন জীবন পায় রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর হাতে। তিনি হিন্দুস্থানি টপ্পার দ্রুত তানকে বাংলার সুরের কোমলতার সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেন এক স্বতন্ত্র ধারা—বাংলা টপ্পা।
নিধুবাবুর টপ্পায় আবেগ আরও কোমল, আরও অন্তর্মুখী। এখানে দ্রুত তানের ভেতরেও এক ধরনের বিষণ্ণতা লুকিয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বহু গানে টপ্পার এই অলংকার ব্যবহার করেছেন, যা প্রমাণ করে এই ধারার প্রভাব কত গভীর।
টপ্পা-অঙ্গ: শৈলীর বিস্তার
টপ্পা সবসময় আলাদা করে গাওয়া হয় না; অনেক সময় এটি অন্য গায়নধারার ভেতরেও প্রবেশ করে। খেয়াল বা ঠুমরির শেষে যখন শিল্পী হঠাৎ দ্রুত তানের ঝলক দেখান, তখন তাকে বলা হয় টপ্পা-অঙ্গ। এই আঙ্গিকটি বিশেষ করে বেনারস ও গোয়ালিয়র ঘরানায় খুব জনপ্রিয়।