সঙ্গীতকে যদি একটি সুরম্য প্রাসাদ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে সেখানে কিছু সুরের যাত্রা শুরু হয় আপন আলয় থেকে, তারপর তা অজানা কোনো সুন্দর উদ্যানে ঘুরে বেড়ায়, এবং দিনশেষে আবার নিজের প্রিয় ঘরেই ফিরে আসে। পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও বিশ্বসঙ্গীতের অন্যতম জনপ্রিয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী সুর-কাঠামোর নাম হলো টার্নারি ফর্ম (Ternary Form)। সাধারণ কথায়, এটি তিন অধ্যায়ের এক সুরের যাত্রা—যাকে সংক্ষেপে A – B – A ফর্ম বলা হয়।
ল্যাটিন শব্দ ‘টার্নারিয়াস’ (Ternarius — যার অর্থ ‘তিন দিয়ে গঠিত’ বা ‘ত্রিমাত্রিক’) থেকে এই ফর্মের উদ্ভব। একটি চমৎকার গল্প যেমন সূচনা, মধ্যভাগের দ্বন্দ্ব এবং আনন্দময় সমাপ্তির মাধ্যমে পূর্ণতা পায়; টার্নারি ফর্মও তেমনি প্রথম থিম উপস্থাপন (A অংশ), সুরের নতুন বৈচিত্র্য (B অংশ), এবং পুনরায় প্রথম থিমে প্রত্যাবর্তন (A অংশ)-এর মাধ্যমে শ্রোতার মনে এক পরম তৃপ্তিদায়ক পূর্ণতা এনে দেয়।
একনজরে: টার্নারি ফর্মের সার্বিক রূপরেখা
| বিষয় | বিস্তারিত ও প্রাঞ্জল তথ্য |
| সহজ সংজ্ঞা | তিনটি সুনির্দিষ্ট অংশে (A – B – A) বিভক্ত সুরের গঠনকাঠামো, যেখানে ১ম ও ৩য় অংশ অভিন্ন এবং ২য় অংশ বৈচিত্র্যময়। |
| শব্দগত উৎপত্তি | ল্যাটিন ‘টার্নারিয়াস’ (Ternarius) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘ত্রিমাত্রিক’ বা ‘তিনটি উপাদানের সমাহার’। |
| মৌলিক রূপরেখা | A (প্রারম্ভিক থিম) -> B (বৈচিত্র্য বা বৈপরীত্য) -> A (পুনরাগমন বা রিটার্ন)। |
| হারমোনিক ভিত্তি | টোনিক স্কেলে সূচনা (A অংশ), অন্য কোনো স্কেল বা মোডে প্রস্থান (B অংশ), এবং পুনরায় মূল স্কেলে স্বস্তিদায়ক প্রত্যাবর্তন (A অংশ)। |
| প্রধান প্রকারভেদ | সিম্পল টার্নারি, কম্পাউন্ড বা কম্পোজিট টার্নারি (Minuet & Trio), এবং ডা কাপো আরিয়া (Da Capo Aria)। |
| ঐতিহাসিক ভূমিকা | বারোক যুগের অপেরা আরিয়া, ক্লাসিক্যাল যুগের সিমফনির ৩য় মুভমেন্ট এবং রোমান্টিক যুগের পিয়ানো রচনার প্রাণকেন্দ্র। |
| প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্য | পাশ্চাত্যে স্কেল ও থিমের চক্রাকার প্রত্যাবর্তন; প্রাচ্যে (বাংলা গানে) ‘স্থায়ী – অন্তরা – স্থায়ী’ মেলবন্ধনের রূপকথা। |
১. টার্নারি ফর্ম কী? সংজ্ঞা, দর্শন ও সুরের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র
- প্রারম্ভিক থিম উপস্থাপন (A অংশ – Statement): মূল স্কেলে (Tonic Key) একটি শক্তিশালী, চেনা ও আকর্ষণীয় সুর শ্রোতার সামনে তুলে ধরা।
- বৈপরীত্য ও নতুন ভাবধারায় প্রস্থান (B অংশ – Contrast / Departure): ভিন্ন স্কেলে, ভিন্ন ছন্দে বা ভিন্ন মেজাজে সুরকে নিয়ে যাওয়া, যা শ্রোতার মনে নতুন উত্তেজনা ও কৌতুহল তৈরি করে।
- চেনা নীড়ে প্রত্যাবর্তন (A অংশ – Return / Recapitulation): B অংশের উত্তেজনা শেষে পুনরায় প্রারম্ভিক A অংশের সুরে ফিরে আসা, যা মানসিক শান্তি জোগায়।
- সমাপ্তি বা বিস্তার (Coda – ঐচ্ছিক): অনেক সময় গানটি সুন্দরভাবে শেষ করতে A অংশের পরে একটি ক্ষুদ্র সমাপ্তিসূচক অংশ (Coda) যোগ করা হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ: টার্নারি ফর্ম হলো মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন। আমরা আমাদের চেনা পরিবেশ (A) থেকে অজানা জগতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি (B), সেখানে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করি এবং সব শেষে আবার নিজের আপন নীড়ে ফিরে আসি (A)। তবে এই ফিরে আসা কেবল ফেরা নয়; এটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এক নতুন উপলব্ধি।
২. টার্নারি ফর্মের মূল প্রকারভেদ
২.১. সিম্পল টার্নারি (Simple Ternary — A – B – A)
- গঠন: A, B এবং A—এই তিনটি অংশই একদম স্পষ্ট এবং প্রতিটি অংশ দৈর্ঘ্যে প্রায় সমান হয়।
- চরিত্র: প্রথম A অংশে সুর শেষ হওয়ার পর একটি স্পষ্ট বিরতি থাকে। B অংশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাজে এবং শেষ হলে পুনরায় প্রথম A অংশ বাজানো হয়।
২.২. ভ্যারাইড টার্নারি (Varied Ternary — A – B – A’)
- গঠন: এখানে ৩য় অংশটি ১ম A অংশের হুবহু অনুকরণ নয়; বরং ১ম সুরটিকে কিছুটা অলংকৃত করে, তাল বা বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তন ঘটিয়ে (A’) উপস্থাপন করা হয়।
- চরিত্র: এটি শ্রোতাকে একঘেয়েমি থেকে মুক্ত রাখে এবং চেনা সুরকেই এক নতুন আভায় প্রকাশ করে।
২.৩. ডা কাপো আরিয়া (Da Capo Aria — A – B – D.C.)
- গঠন: বারোক যুগের অপেরায় এই ফর্ম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। স্বরলিপিতে ৩য় A অংশটি নতুন করে লেখা হতো না; তার বদলে B অংশের শেষে ইতালীয় ভাষায় লেখা থাকত “Da Capo” (ডি.সি.), যার অর্থ ‘শুরু থেকে বাজাও’।
- প্রয়োগ: হ্যান্ডেল বা বাখের অপেরা ও ওরাটোরিওতে গায়করা ৩য় অংশে ডি.সি. দেখে পুনরায় A অংশে ফিরে যেতেন এবং নিজেদের গায়কী ক্ষমতার পরিচয়ে নতুন অলঙ্কার (Improvisation) যোগ করতেন।
২.৪. কম্পাউন্ড বা কম্পোজিট টার্নারি (Compound / Composite Ternary)
- গঠন: যখন A এবং B অংশের প্রতিটির ভেতরেই আবার ছোট ছোট নিজস্ব রূপকাঠামো (যেমন বাইনারি ফর্ম) থাকে।
- উদাহরণ (Minuet and Trio):
- প্রথম অংশ: মিনুয়েট (Minuet – যার ভেতরে নিজস্ব a-b গঠন আছে)
- দ্বিতীয় অংশ: ট্রায়ো (Trio – যার ভেতরে নিজস্ব c-d গঠন আছে)
- তৃতীয় অংশ: পুনরায় মিনুয়েট (Minuet – a-b)
- প্রয়োগ: ক্লাসিক্যাল যুগের সিমফনি ও স্ট্রিং কোয়ার্টেটের ৩য় মুভমেন্টে এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হতো।
৩. হারমোনিক রসায়ন ও মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ন
- মেজর স্কেলের ক্ষেত্রে (Major Key):
- A অংশ: মূল স্কেলে (Tonic – I) সুর শুরু ও শেষ হয়, যা একটি স্বাবলম্বী অনুভূতির জন্ম দেয়।
- B অংশ: সাধারণত ৫ম স্কেলে (Dominant – V) বা সমান্তরাল মাইনর স্কেলে চলে যায়, যা কিছুটা নাটকীয় বৈপরীত্য তৈরি করে।
- A অংশ: পুনরায় মূল স্কেলে (Tonic – I) ফিরে এসে পরম তৃপ্তি দেয়।
- মাইনর স্কেলের ক্ষেত্রে (Minor Key):
- A অংশ: মূল মাইনর স্কেলে শুরু হয়।
- B অংশ: সমান্তরাল মেজর স্কেলে (Relative Major) গিয়ে সুরটি হঠাৎ উজ্জ্বল ও আলোকময় হয়ে ওঠে।
- A অংশ: পুনরায় গভীর ও আবেগপূর্ণ মাইনর স্কেলে ফিরে আসে।
৪. বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে টার্নারি ফর্মের বিবর্তন
| ঐতিহাসিক যুগ | টার্নারি ফর্মের স্থান | গাঠনিক রূপচিত্র ও বিকাশ | কালজয়ী প্রতিনিধি ও উদাহরণ |
| বারোক যুগ (১৬০০-১৭৫০) | অপেরা ও ভোকালে একচ্ছত্র আধিপত্য। | ‘ডা কাপো আরিয়া’ (Da Capo Aria) ফর্মের মাধ্যমে একক কণ্ঠের আধিপত্য। | জে. এস. বাখ, জর্জ ফ্রাইডরিশ হ্যান্ডেল। |
| ক্লাসিক্যাল (১৭৫০-১৮২০) | ইনস্ট্রুমেন্টাল ও সিমফনিতে প্রবেশ। | ‘মিনিউয়েট অ্যান্ড ট্রায়ো’ এবং সোনাটার ৩য় মুভমেন্টে টার্নারি ফর্মের প্রয়োগ। | ভি. এ. মোৎসার্ট, ইয়োসেফ হাইডন। |
| রোমান্টিক (১৮২০-১৯১০) | ছোট লিরিক্যাল ও আবেগীয় পিস। | পিয়ানো নক্টার্ন, ড্রিম পিস ও ওয়াল্টজে টার্নারি ফর্মের অসাধারণ আবেগীয় ব্যবহার। | ফ্রাঁসোয়া শোপ্যাঁ, ফেলিক্স মেন্ডেলসোন, চাইকোভস্কি। |
| আধুনিক ও বিংশ শতক | পপ ও আধুনিক সঙ্গীতে রূপান্তর। | প্রথাগত ক্লাসিক্যাল ফর্ম ভেঙে আধুনিক ভার্স-কোরাস ও ব্রিজ গঠনে রূপান্তরিত। | ইগর স্ট্রাভিনস্কি, আধুনিক পপ ও ফিল্ম স্কোর। |
৫. প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্য: ত্রিমাত্রিক রূপায়ণ
- পাশ্চাত্যের টার্নারি গঠন (Symmetrical Balance): পাশ্চাত্যে A – B – A ফর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো কাঠামোগত ভারসাম্য। A অংশ যে স্কেল বা আবেগ নিয়ে শুরু হয়, B অংশে তার বিপরীতে গিয়ে পুনরায় A অংশে ফিরে এসে রচনার একটি নিখুঁত ‘গোলকীয়’ সমাপ্তি আনা হয়।
- বাংলা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে টার্নারি রূপকাল:ভারতীয় সঙ্গীত ও বিশেষ করে বাংলা গানে টার্নারি ফর্মের গভীর ও প্রাঞ্জল প্রয়োগ দেখা যায়:
- স্থায়ী (Asthai – A অংশ): মূল সুর ও ভাবের সূচনা।
- অন্তরা (Antara – B অংশ): উঁচুর দিকে উঠে সুরের বৈচিত্র্য ও নতুন কাব্যিক ভাবের বিস্তার।
- স্থায়ীতে ফেরা (Return to Asthai – A অংশ): অন্তরা শেষে পুনরায় স্থায়ী বা মুখড়ায় ফিরে এসে গানটিকে একটি বৃত্তাকার পূর্ণতা দেওয়া।
- রবীন্দ্রসঙ্গীতের ম্যাজিক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে’, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’ বা ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’-র মতো অজস্র গানে A – B – A কাঠামোর এক অলৌকিক ও নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে, যা শ্রোতার হৃদয়কে মুহূর্তেই স্পর্শ করে।
৬. প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তব সত্য
- ভুল ধারণা ১: বাইনারি ফর্মের দুই অংশ রিপিট করে বাজালেই তা টার্নারি ফর্ম হয়ে যায়।
- বাস্তব সত্য: বাইনারি ফর্মে দুটি প্রধান সুর থাকে (A এবং B)। আর টার্নারি ফর্মে স্পষ্টভাবে তিনটি অধ্যায় থাকে, যার শেষ অংশটি প্রারম্ভিক A অংশের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করে।
- ভুল ধারণা ২: A এবং B অংশের মাঝে সবসময় বিশাল পার্থক্য থাকতে হবে।
- বাস্তব সত্য: B অংশটি একই গতি বা তালে থেকে কেবল স্কেল বদলে বা সামান্য মেলোডি বদলে তৈরি হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজেরও হতে পারে।
- ভুল ধারণা ৩: ৩য় A অংশটি সবসময় ১ম A অংশের হুবহু প্রতিচ্ছবি হতে হয়।
- বাস্তব সত্য: ৩য় A অংশটিতে প্রায়শই সুরকার অলংকার, নতুন হারমোনি বা বৈচিত্র্যময় তাল যোগ করেন, যাকে A’ (A Prime) বলা হয়।
৭. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)
উত্তর: পপ গানে যখন প্রথম ভার্স ও কোরাস বাজে (A অংশ), তারপর সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরের ‘ব্রিজ’ অংশ আসে (B অংশ), এবং শেষে পুনরায় মূল কোরাস বাজানো হয় (A অংশ)—এটি মূলত টার্নারি ফর্মেরই আধুনিক ও পপ সংস্করণ।
উত্তর: ফ্রাঁসোয়া শোপ্যাঁ তাঁর পিয়ানো নক্টার্নে টার্নারি ফর্মের জাদুকরী ব্যবহার করেছেন। প্রথমার্ধে শান্ত ও কোমল সুর (A), মাঝে তীব্র ঝড়ো বা আবেগপূর্ণ সুর (B), এবং শেষে পুনরায় পরম শান্ত সুরের প্রত্যাবর্তন (A)—শ্রোতাকে এক অলৌকিক অনুভূতির ভেতর নিয়ে যায়।
উত্তর: কডা মূল তিন অধ্যায়ের (A – B – A) অংশ নয়; এটি একটি ঐচ্ছিক সমাপ্তিমূলক টুকরো। ৩য় A অংশ বাজানো শেষ হওয়ার পর রচনাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে কডা যোগ করা হয়।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
- Green, Douglass M. Form in Tonal Music: An Approach to Analysis. Harcourt Brace Jovanovich, 1979. (টার্নারি ও টোনাল স্ট্রাকচারের একাডেমিক বিশ্লেষণ)।
- Caplin, William E. Classical Form: A Theory of Formal Functions for the Instrumental Music of Haydn, Mozart, and Beethoven. Oxford University Press, 1998. (ক্লাসিক্যাল আমলের টার্নারি ও কম্পাউন্ড ফর্মের রূপরেখা)।
- Schoenberg, Arnold. Fundamentals of Musical Composition. Faber and Faber, 1967. (সুর তৈরি ও রন্ডো/টার্নারি ফর্মের গঠনবিজ্ঞান)।
- Taruskin, Richard. The Oxford History of Western Music. Oxford University Press, 2005.