ট্রেড লাইসেন্স: প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয়তা ও ফি নির্ধারণী পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা । উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি

বাংলাদেশে যেকোনো বৈধ ব্যবসার সূচনা করার প্রথম এবং প্রধান আইনি পদক্ষেপ হলো ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা। আপনি দেশের যে প্রান্তেই ব্যবসা করুন না কেন—তা হোক ছোট মুদি দোকান, ই-কমার্স বা বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান—ট্রেড লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১০৮৪ ধরনের ব্যবসার ক্যাটাগরি রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন (কর) বিধি ২০০৯-এর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। অনেক উদ্যোক্তাই সঠিক তথ্যের অভাবে দালালের খপ্পরে পড়েন বা অসাধু কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত টাকা প্রদান করেন। এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো আপনাকে সচেতন করা এবং সঠিক পথে লাইসেন্স পেতে সহায়তা করা।

ট্রেড লাইসেন্স কেন প্রয়োজন?

আইনিভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য এটি একটি অনুমতিপত্র। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের আবেদন করা, আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স (ERC/IRC) করা এবং ব্যবসায়িক ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজের জন্য এই লাইসেন্স ছাড়া আপনি এক কদমও এগোতে পারবেন না। এটি আপনার ব্যবসার বৈধ পরিচিতি বহন করে।

ট্রেড লাইসেন্সের প্রকারভেদ ও আবেদনকারী সংস্থা

ব্যবসার ধরণ এবং অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আবেদনের জায়গা পরিবর্তিত হয়। আপনি যদি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় থাকেন, তবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল (Zone) থেকে এটি সংগ্রহ করতে হবে। পৌরসভার বাসিন্দারা পৌরসভা অফিস এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের উদ্যোক্তারা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই লাইসেন্স পাবেন। বর্তমান সময়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অধিকাংশ সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভায় ‘ই-ট্রেড লাইসেন্স’ বা অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

সাধারণ ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র:

১. জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ফটোকপি।

২. আবেদনকারীর তিন কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

৩. ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জায়গার ভাড়ার রসিদ অথবা চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি।

৪. নিজস্ব জায়গা হলে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের সর্বশেষ রসিদের কপি।

৫. ব্যবসা যদি যৌথ মালিকানাধীন হয়, তবে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে পার্টনারশিপ ডিড বা অংশীদারি চুক্তিনামা।

লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যা লাগবে:

১. কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস।

২. সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন (RJSC কর্তৃক প্রদত্ত)।

শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ নথিপত্র:

সাধারণ নথিপত্র ছাড়াও বড় কারখানা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু কাগজ লাগে যেমন:

১. পরিবেশ সংক্রান্ত অনাপত্তি পত্র (পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে)।

২. প্রতিষ্ঠানের অবস্থান চিহ্নিত মানচিত্র।

৩. অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতি সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র (ফায়ার লাইসেন্স)।

৪. সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা কর্তৃপক্ষের নিয়মাবলী মেনে চলার অঙ্গীকারনামা (সাধারণত ১৫০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে)।

৫. ফ্যাক্টরি লে-আউট প্ল্যান।

অনলাইন ব্যবসার (E-commerce/F-commerce) জন্য ট্রেড লাইসেন্স:

বর্তমানে ঘরে বসে বা ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসার জন্যও ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার বাসার ঠিকানাকেই অফিস হিসেবে ব্যবহার করে ‘আইটি’ বা ‘অনলাইন রিটেইল’ ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স নিতে পারেন। ডিবিআইডি (DBID) বা ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি নম্বর নেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রেড লাইসেন্স প্রাথমিক শর্ত।

ফি নির্ধারণের সাধারণ নিয়ম:

মনে রাখবেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ফি সাধারণত বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। জেলা শহর, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ লেভেলে এই ফি ক্রমান্বয়ে অনেক কম হয়। তাই আপনার এলাকার স্থানীয় সরকার অফিসের নোটিশ বোর্ড বা ওয়েবসাইট যাচাই করে সঠিক ফি জেনে নিন। নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা থেকে বিরত থাকুন।

বিভিন্ন খাতের ফি এর নমুনা (তথ্যসূত্র: সিটি কর্পোরেশন গেজেট অনুযায়ী):

ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত:

এনজিও (শাখা অফিস) পরিচালনার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে নির্ধারিত ফি ৫০০০ টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা বা বীমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ফি এলাকাভেদে ২৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংক্রান্ত:

১. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ঢাকা দক্ষিণ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে ফি ৫০০০ টাকা।

২. বেসরকারি কলেজের জন্য উভয় সিটি কর্পোরেশনে ফি ৩০০০ টাকা।

৩. কিন্ডারগার্টেন স্কুলের জন্য ফি ২০০০ টাকা।

৪. সাধারণ ট্রেনিং সেন্টার বা কোচিং সেন্টারের জন্য ফি ১০০০ টাকা।

৫. কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য ফি ১০০০ টাকা।

মনে রাখবেন, শিক্ষার প্রসারে ফি তুলনামূলক কম রাখা হলেও প্রতিষ্ঠান বড় হলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ফি কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া:

একটি ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ সাধারণত ৩০ জুন পর্যন্ত থাকে। প্রতি বছর জুলাই মাসে এটি নবায়ন করতে হয়। নবায়ন ফি সাধারণত মূল ফি’র সমান হয়, সাথে ১৫% ভ্যাট যুক্ত থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না করলে প্রতি মাসের জন্য জরিমানা বা সারচার্জ দিতে হতে পারে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের গেজেট অনুযায়ী বর্তমান নবায়ন প্রক্রিয়া অনেক সহজ করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমেই সরাসরি ফি জমা দেওয়া যায়।

প্রতারণা এড়াতে কিছু জরুরি পরামর্শ:

১. লাইসেন্স করার আগে নিজেই সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে ফরম সংগ্রহ করুন অথবা অনলাইনে আবেদন করুন।

২. দালালের মাধ্যমে কাজ করালে অনেক সময় ভুয়া বা জাল লাইসেন্স পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৩. প্রতিটি লেনদেনের জন্য সরকারি রসিদ (Challan/Receipt) বুঝে নিন।

৪. ক্যাশ হ্যান্ডলিং সরাসরি সরকারি কাউন্টারে বা নির্দিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে করুন।

৫. লাইসেন্সে দেওয়া আপনার ব্যবসার ধরণ বা ক্যাটাগরি ঠিক আছে কি না দেখে নিন, কারণ ভুল ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা হতে পারে।

একজন সচেতন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার ব্যবসার স্বচ্ছতা বজায় রাখা আপনার প্রথম দায়িত্ব। ট্রেড লাইসেন্স কেবল একটি কাগজ নয়, এটি আপনার ব্যবসার সক্ষমতার সনদ। তাই সঠিক তথ্য জেনে, সঠিক ফি জমা দিয়ে সরাসরি লাইসেন্স সংগ্রহ করুন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখুন।

আরও দেখুন: