১৯৭১ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নে সংঘটিত ডাঁশা চাষী ক্লাব যুদ্ধ ও বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত ডাঁশা গণকবর বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের এক অনন্য ইতিহাস।
১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট (২২ জুলাই, ১৯৭১)
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে কুষ্টিয়া অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ২২ জুলাই ভোরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের ডাঁশা গ্রামে স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন ডাঁশা গ্রামের ‘চাষী ক্লাব’ (তৎকালীন ওয়াপদা ভবন সংলগ্ন) এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
২. সম্মুখ সমর ও বীরত্বপূর্ণ শাহাদাত
মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আঞ্চলিক কমান্ডার লুৎফর রহমান। স্থানীয় রাজাকারদের একটি বড় দল অতর্কিতে আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে রাজাকারদের সংখ্যাধিক্য এবং বিশ্বাসঘাতকতায় মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়েন। সম্মুখ যুদ্ধে নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে ৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তাঁরা হলেন:
শহীদ লুৎফর রহমান (কমান্ডার)
শহীদ ইকবাল হোসেন
শহীদ গোপাল চন্দ্র
শহীদ আনছার আলী
শহীদ আব্দুল কুদ্দুস
এই যুদ্ধে আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন, যারা পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে পুনরায় যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।
৩. ডাঁশা গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ
যুদ্ধের পর স্থানীয় গ্রামবাসী ও সহযোদ্ধারা মিলে শহীদ হওয়া এই পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ডাঁশা গ্রামের চাষী ক্লাবের অদূরে একটি স্থানে একত্রে সমাহিত করেন। এটিই বর্তমানে ‘ডাঁশা গণকবর’ হিসেবে পরিচিত। এটি একটি বিরল গণকবর, যেখানে কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং ৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। ২০০৯-২০১০ সালের দিকে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।
ডাঁশা গণকবর কেবল একটি সমাধি নয়, এটি কুমারখালী তথা কুষ্টিয়াবাসীর কাছে বীরত্বের প্রতীক। প্রতি বছর ২২শে জুলাই স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (দশম খণ্ড): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এই দলিলে কুষ্টিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক যুদ্ধের বিবরণে এই সম্মুখ সমরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
২. কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধ (গ্রন্থ): কুষ্টিয়ার স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষক মুন্সী আবু সাঈফ রচিত এই গ্রন্থে ডাঁশা চাষী ক্লাব যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ এবং শহীদদের তালিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৩. জাতীয় তথ্য বাতায়ন (কুমারখালী উপজেলা): কুমারখালী উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল পোর্টালে (kumarkhali.kushtia.gov.bd) “মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা” ট্যাবে ডাঁশা গণকবরকে একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
৪. স্থানীয় স্মৃতিফলক: ডাঁশা গ্রামের গণকবর সংলগ্ন স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা শহীদদের নাম এবং যুদ্ধের তারিখ (২২ জুলাই ১৯৭১)।
৫. কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের রেকর্ড: জেলা পরিষদের তালিকাভুক্ত কুষ্টিয়ার ১২টি প্রধান গণকবরের তালিকায় ডাঁশা গণকবরটি অন্তর্ভুক্ত।