ডিসেম্বর: বিজয়ের মাস । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

ডিসেম্বর এলে বাঙালির মনোজগতে এক অদ্ভুত অনুভূতির দোলাচল শুরু হয়। একদিকে বিজয়ের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস, লাল-সবুজের পতাকায় নতুন সূর্যকে স্পর্শ করার তীব্র আনন্দ; অন্যদিকে পরম স্বজন হারানোর গভীর বিষাদ। এই একটি মাসেই ঘনীভূত হয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের বঞ্চনার অবসান আর রক্তস্নাত স্বাধীন সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্মগাথা।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) যে ইতিহাসের ফাইনাল স্বাক্ষর হয়েছিল, তা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা কিংবা নিছকই একটি সামরিক জয়ের গল্প নয়। এটি ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের বহু বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রাম, রক্তের নদী পার হওয়া এবং ভূরাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অসামান্য মহাকাব্য।

১. স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা: রাজনৈতিক লড়ায়ের দীর্ঘ পথপরিক্রমা

একাত্তরের ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এর প্রকৃত রাজনৈতিক গভীরতা অনুধাবন করা অসম্ভব। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন কেবল মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার লড়াই ছিল না; তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক প্রতিবাদ। এই আন্দোলনের গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
পরবর্তী দুই দশকে এই চেতনা প্রতিটি ধাপে আরও পরিণত ও শাণিত হয়:
  • ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও সামরিক শাসন: নির্বাচনে বাঙালির বিপুল বিজয়কে তোয়াক্কা না করে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি করা প্রমাণ করেছিল—পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক কাঠামোয় বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকারের কোনো স্থান নেই।
  • ১৯৬৬-র ৬ দফা: বাঙালির মুক্তিসনদ: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা ছিল বাঙালির বাঁচার দাবি। এটি কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না, বরং অর্থনৈতিক শোষণ থেকে বাঙালিকে মুক্ত করার এক অকাট্য সনদ।
  • ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ‘৭০-এর নির্বাচন: ৬ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা তীব্র গণআন্দোলন আইয়ুব শাহীর পতন ঘটায়। এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় নিরঙ্কুশ বিজয় বাঙালিকে পূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি এনে দেয়।
  • ৭ মার্চের মহাকাব্যিক নির্দেশ: সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র চক্রান্ত করে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ঘোষণা: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই একটি ভাষণই সাড়ে সাত কোটি মানুষকে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।

২. একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর: রক্তাক্ত পথ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ

২৫ মার্চের কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে যে বর্বর গণহত্যা শুরু হয়েছিল, তার জবাব বাঙালি দিয়েছিল নিজের বুকের রক্ত দিয়ে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR) এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সদস্যরা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব—এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।”
— জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (৭ মার্চ, ১৯৭১)
  • মুজিবনগর সরকার ও প্রশাসনিক ভিত্তি: ১০ এপ্রিল গঠিত ও ১৭ এপ্রিল শপথ নেওয়া ‘মুজিবনগর সরকার’ মুক্তিসংগ্রামকে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক কাঠামো দেয়।
  • গেরিলা যুদ্ধ ও সেক্টর বিভাজন: সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় সাধারণ তরুণদের নিয়ে গঠিত ‘মুক্তিবাহিনী’। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রদের নিয়ে গঠিত এই গেরিলা বাহিনী চটজলদি আক্রমণে (Hit and Run) পাক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
  • অপারেশন জ্যাকপট: ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে নৌ-কমান্ডোদের অকুতোভয় হামলা চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি রণতরী ও রসদবাহী জাহাজ নিমজ্জিত করে গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়।

৩. বিশ্ব রাজনীতির দাবাখেলা ও পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ

একাত্তরের যুদ্ধ কেবল ঢাকা বা কলকাতার সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে।
  • সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের ভূমিকা: ভারত এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র জুগিয়ে যে মানবিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যুদ্ধবিরতি ও পাক-বান্ধব প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর্যুপরি ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান: হেনরি কিসিঞ্জার ও নিক্সন প্রশাসন মানবাধিকার ও গণহত্যার সত্যকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়, এমনকি বঙ্গোপসাগরে ৭ম নৌবহর পাঠানোর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে। কিন্তু ভারতীয় ও সোভিয়েত সামরিক সতর্কতায় তা নিষ্ফল হয়।
  • বিশ্ববিবেক ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশংকরের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, কিংবা সায়মন ড্রিং ও অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ভয়াল গণহত্যার বিবরণ বিশ্ব জনমতকে বাঙালির মুক্তির পক্ষে নিয়ে এসেছিল।

৪. মেধানিধনের পৈশাচিক চক্রান্ত ও ১৪ ডিসেম্বরের ট্র্যাজেডি

পরাজয় যখন একদম দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দেশীয় দোসর—রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী—বাঙালিকে চিরতরে পঙ্গু করার এক ভয়াবহ চক্রান্তে মেতে ওঠে।

১৪ ডিসেম্বরের কালরাতে তারা খুঁজে খুঁজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক, প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও বিজ্ঞানীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে জাতিকে মেধাশূন্য করার এই জঘন্য হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই কারণেই ডিসেম্বর কেবল বিজয়ের উল্লাস নয়, পরম স্বজন হারানোর বেদনায় নতজানু হওয়ারও সময়।

৫. ১৬ ডিসেম্বর: অবিনশ্বর বিজয় ও স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ‘যৌথ কমান্ড’ তিন দিক থেকে স্থল, আকাশ ও নৌপথে বীরদর্পে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কোণঠাসা পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহ ও পালিয়ে যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্নে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের উপস্থিতিতে ৯৩ হাজারের বেশি সশস্ত্র সেনাসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বিশালসংখ্যক সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে আর ঘটেনি। বিশ্ব মানচিত্রে রক্তে খোদাই হয়ে যায় একটি নতুন নাম—গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

৬. বিজয়ের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

একাত্তরের বিজয় কেবল একটি সামরিক সাফল্য ছিল না; তা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি শোষণহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। ১৯৭১-এর চেতনা কোনো অতীত ইতিহাস মাত্র নয়, তা আমাদের রাষ্ট্রের এক জীবন্ত দর্শন।
আজকের প্রেক্ষাপটে বিজয়ের চেতনার অর্থ:
  • সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা: জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সর্বদা সোচ্চার থাকা।
  • বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠন: স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল যেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়—এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
  • ইতিহাসের সত্যকে ধারণ করা: নতুন প্রজন্মের কাছে প্রোপাগান্ডামুক্ত, সঠিক ইতিহাস ও ত্যাগের গাথা তুলে ধরা।
রক্তের অক্ষরে লেখা একাত্তরের বিজয়ের ইতিহাস বাঙালি জাতির অহংকার ও অস্তিত্বের চিরন্তন উৎস। এই ডিসেম্বর আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—আমাদের এই স্বাধীনতা কারো অনুগ্রহে পাওয়া নয়, এটি লাখো প্রাণ আর সমুদ্রসম অশ্রুর বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা এক অমূল্য অধিকার।