তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি: প্রচারণা বনাম বাস্তবতা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যে কয়েকটি বিষয়কে আবেগ, ক্ষোভ এবং ভূরাজনৈতিক মারপ্যাঁচে জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে—“তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি”

আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত ও কট্টর ভারত-বিরোধী শক্তিগুলো বছরের পর বছর ধরে জনগণের সামনে একটি একমুখী ন্যারেটিভ বা প্রচারণা দাঁড় করিয়েছে। তাদের মূল বক্তব্য হলো—“ভারত একতরফাভাবে সব পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছে, আর আমাদের সরকার নতজানু হয়ে দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে।” কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, ভূপ্রকৃতির বাস্তব পরিবর্তন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব বিজ্ঞানসম্মত বিকল্পগুলো নিয়ে এই দলগুলো কখনোই কথা বলে না। আজ আমরা কোনো সস্তা আবেগ বা রাজনৈতিক চশমা না পরে, একদম তথ্য ও বাস্তবতার নিরিখে বোঝার চেষ্টা করব—তিস্তা সমস্যার আসল জটটা কোথায়, কেন চুক্তিটি আটকে আছে এবং কীভাবে বাংলাদেশ এই সংকটকে নিজের শক্তিতে জয় করতে পারে।

Table of Contents

তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি: প্রচারণা বনাম বাস্তবতা

১. তিস্তা নদী ও আমাদের ‘তিস্তা ব্যারাজ’: মূল সংকটটি কোথায়?

বিষয়টি একদম গোড়া থেকে এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় বোঝা যাক। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী, যা ভারতের সিকিম পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী সীমান্ত দিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। এরপর এটি কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিলিত হয়েছে।

বাংলাদেশ অংশে এই নদীর ওপর রয়েছে আমাদের বিখ্যাত “তিস্তা ব্যারাজ” (সেচ প্রকল্প)। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে যখন এই প্রকল্প নেওয়া হয়, তখন মূল উদ্দেশ্য ছিল শীতকাল ও খরা মৌসুমে উত্তরবঙ্গের (রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া) লাখ লাখ হেক্টর জমিতে তিস্তার পানি দিয়ে চাষাবাদ করা।

তাহলে সমস্যাটা কী?

সমস্যাটা হলো ঋতুভিত্তিক পানির বৈষম্য।

  • বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর): তিস্তায় এত বেশি পানি থাকে যে দুই কূল ছেপে বন্যা হয়। তখন ভারত তাদের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেয়, কারণ তাদের নিজেদেরই বন্যা ঠেকানো দরকার।
  • শীত ও খরাকালে (ডিসেম্বর-মার্চ): তিস্তায় পানির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে ভারত যখন তাদের নিজেদের কৃষির জন্য পানি সরিয়ে নেয়, তখন বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্রায় শুকিয়ে যায়। আমাদের তিস্তা ব্যারাজ সচল রাখতে খরা মৌসুমে অন্তত ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ কিউসেক পানি প্রয়োজন, কিন্তু অনেক সময় তা নেমে আসে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ কিউসেকে। এই খরা মৌসুমের পানির ভাগাভাগি নিয়েই মূল বিরোধ।

২. কেন ২০১১ সাল থেকে চুক্তিটি আটকে আছে? (দিল্লী বনাম কোলকাতার টানাপোড়েন)

ভারত-বিরোধী দলগুলো সবসময় প্রচার করে যে—”ভারত আমাদের পানি দিতে চায় না।” কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভেতরের খবরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার (দিল্লী) বাংলাদেশের সাথে এই চুক্তি করতে একাধিকবার শতভাগ রাজি হয়েছিল, কিন্তু চুক্তিটি আটকে গেছে ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতায়।

২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকায় আসেন, তখন তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। চুক্তি অনুযায়ী, তিস্তার পানির ৩৭.৫% বাংলাদেশ এবং ৪২.৫% ভারত পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঁকে বসেন এবং ঢাকা সফরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে চুক্তিটি স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরও মমতার একই আপত্তির কারণে চুক্তিটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

ভারতের সংবিধান কী বলে?

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই তো চুক্তি সই করতে পারে, মমতার কথা শুনবে কেন? এখানেই আইনের মারপ্যাঁচ। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, “পানি” (Water) হলো রাজ্যের বিষয় (State Subject), কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সায় বা অনাপত্তি পত্র (No Objection Certificate) ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তি করলেও তা ভারতের ভেতরে বাস্তবায়ন করতে আইনি জটিলতায় পড়বে। মমতা ব্যানার্জির যুক্তি হলো—শীতকালে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও উত্তর দিনাজপুরের কৃষকদের জন্যই তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি থাকে না, তাই বাংলাদেশকে পানি দিলে তাদের নিজেদের উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হয়ে যাবে। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ভোটব্যাংকের লড়াই, যা বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন করে সমাধান করা সম্ভব নয়।

৩. রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বনাম বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ

বিএনপি-জামায়াত জোট যে অপপ্রচারগুলো চালায়, তার বিপরীতে আসল সত্যগুলো আমাদের জানা দরকার:

অপপ্রচার ১: “সরকারের নতজানু নীতির কারণে ভারত পানি দিচ্ছে না।”

বাস্তবতা: পানি নিয়ে দরকষাকষিতে বাংলাদেশ কখনোই পিছিয়ে ছিল না। বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনের ঐতিহাসিক চুক্তি সই করতে পেরেছে। গঙ্গা পানি চুক্তিও সফলভাবে চলছে। তিস্তার ক্ষেত্রে সমস্যাটি ভারত রাষ্ট্রের ভেতরের ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ দ্বন্দ্ব। বিএনপি-জামায়াত ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালীন ভারতের সাথে সম্পর্ক এমন এক বৈরী পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে, তখন তিস্তা নিয়ে আলোচনার টেবিলটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা ৫ বছরে একটা খসড়াও তৈরি করতে পারেনি, অথচ এখন রাজপথে সস্তা স্লোগান দিচ্ছে।

অপপ্রচার ২: “তিস্তা চুক্তি না হলে উত্তরবঙ্গ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।”

বাস্তবতা: তিস্তা চুক্তি হলে অবশ্যই ভালো, তবে চুক্তি না হওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে সিকিমের পাহাড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তিস্তায় এমনিতেই পানির উৎস কমে গেছে। চুক্তি হলেও খরা মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবেই নদীতে পানি কম থাকবে। তাই শুধু চুক্তির আশায় বসে না থেকে বাংলাদেশ অলরেডি বিকল্প বিজ্ঞানসম্মত পথ খোঁজা শুরু করেছে।

৪. বাংলাদেশের তুরুপের তাস: “তিস্তা মহাপরিকল্পনা” (Teesta Mega Plan)

কূটনৈতিক টেবিলে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা যেমন জারি রাখতে হবে, তেমনি একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে। আর এই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের “তিস্তা মহাপরিকল্পনা” (Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project)

এই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদীর জন্য ভারতের পানির ওপর আমাদের নির্ভরতা প্রায় ৯০% কমে যাবে। এই প্রজেক্টের মূল দিকগুলো হলো:

  • নদী ড্রেজিং ও শাসন: তিস্তা নদী এখন অনেক চওড়া হয়ে গেছে (কোথাও কোথাও ৫-৬ কিলোমিটার) এবং এর তলদেশ বালিতে ভরাট হয়ে গেছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীটিকে সরু (১ থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে) এবং গভীর করা হবে, যাতে বর্ষাকালের পানি নদী নিজেই ধরে রাখতে পারে।
  • বিশাল জলাধার বা মেগা রিজার্ভার নির্মাণ: বর্ষাকালে ভারত যে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়, তা বন্যায় ভেসে না দিয়ে এই গভীর জলাধারে ধরে রাখা হবে। শীতকালে যখন ভারত পানি আটকে দেবে, তখন এই জলাধারের পানি দিয়ে উত্তরবঙ্গের কৃষিকাজ অনায়াসে চালানো যাবে।
  • ভূমি উদ্ধার ও অর্থনৈতিক অঞ্চল: নদীকে সুনির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আনলে দুই পাশে হাজার হাজার একর জমি উদ্ধার হবে। সেখানে আধুনিক কৃষি খামার, ইপিজেড, কলকারখানা এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক চেহারা চিরতরে বদলে দেবে।

এই মহাপরিকল্পনায় চীন এবং ভারত—দুই পক্ষই বড় অংকের অর্থায়নের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। বাংলাদেশ এখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

৫. কেন এই অন্ধ বিরোধিতা ও সস্তা রাজনীতি?

এতসব অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশ আর দ্বিপাক্ষিক লাভের খতিয়ান দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগে—তাহলে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ কেন এই তিস্তার বিরুদ্ধে এত তীব্র বিষোদগার করে? কেন সাধারণ মানুষের মনে “দেশ বিক্রি হয়ে গেল” নামক একটা কাল্পনিক ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়?

এর উত্তর কোনো অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক থিওরিতে নেই, এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দেশের “পোলারাইজড” বা চরম মেরুকরণের নোংরা রাজনীতিতে এবং নিজেদের অতীত ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টায়।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাজারে একটা চিরন্তন ফর্মুলা আছে—যখনই কোনো দল জনসমর্থনে পিছিয়ে পড়ে বা সুনির্দিষ্ট কোনো ইস্যু খুঁজে পায় না, তখনই তারা “সস্তা দেশপ্রেম” বিক্রি করা শুরু করে। আর এই আবেগ বিক্রির সবচেয়ে সহজ এবং আদিম হাতিয়ার হলো “ভারত-বিরোধিতা”। কোনো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভালো-মন্দ বিচার না করে, লাইনে লাইনে কী লাভ-ক্ষতি আছে তা খতিয়ে না দেখে, স্রেফ সেটি ভারতের সাথে করা হয়েছে বলেই তার বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়ে যাওয়া—এটি এক ধরণের সস্তা রাজনৈতিক দেউলিযাত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।

ঐতিহাসিক সত্য: ক্ষমতায় থেকে “কথা বলতে ভুলে যাওয়া”র রাজনীতি

যারা আজ রাজপথে তিস্তার পানি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করছেন, তাদের নিজেদের ট্র্যাক রেকর্ড বা অতীত ইতিহাস কিন্তু চরম আত্মতুষ্টি, উদাসীনতা এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতায় ভরা।

এর সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে ১৯৯২ সালের মে মাসে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন ভারত সফরে যান, তখন বাংলাদেশের মানুষের প্রধান দাবি ও প্রত্যাশা ছিল ভারতের সাথে ফারাক্কা বাঁধ ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিস্ময়করভাবে, সেই রাষ্ট্রীয় সফরে পানি সমস্যা নিয়ে ভারতের সাথে কোনো কার্যকর আলোচনাই করা হয়নি।

সফর শেষে দেশে ফেরার পর ঢাকার বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা যখন বেগম জিয়াকে প্রশ্ন করেছিলেন—“ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফারাক্কার পানি চুক্তি বা যৌথ নদী কমিশনের বিষয়ে কী আলোচনা হলো?” তখন তিনি সাংবাদিকদের সামনে অকপটে জবাব দিয়েছিলেন:

“ওহ! ফারাক্কার পানির কথা তো বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।”

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী যখন প্রতিবেশীর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে নিজের দেশের কোটি কোটি কৃষকের জীবন-মরণ সমস্যা নিয়ে “কথা বলতে ভুলে যান”, তখন তা স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের কাছে এই পানি সমস্যাটি আসলে রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের ইস্যু নয়, বরং স্রেফ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহারের একটা হাতিয়ার।

বিএনপি-জামায়াত জোটের ৫ বছরের চরম স্থবিরতা (২০০১-২০০৬)

পরবর্তীতে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা হীন রাজনৈতিক স্বার্থ ও ভারত-বিদ্বেষী ন্যারেটিভ বজায় রাখতে গিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ককে এমন এক বৈরী ও সংঘাতময় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

নদী বা পানির অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিনিয়ত টেকনিক্যাল ডাটা বিনিময় ও কূটনৈতিক দরকষাকষি করতে হয়। কিন্তু সেই ৫ বছরে তারা তিস্তা চুক্তির কোনো খসড়াও তৈরি করতে পারেনি, যৌথ নদী কমিশনের (JRC) বৈঠকগুলোকে অচল করে রেখেছিল এবং কোনো একটি আন্তর্জাতিক ফোরামেও বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত কোনো যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি। যার খেসারত দিতে হয়েছে দেশের নদী ও উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিকে।

তারা চায় সমস্যাটা চিরকাল টিকে থাকুক। কারণ তারা ভালো করেই জানে, তিস্তা সমস্যার স্থায়ী বৈজ্ঞানিক বা কূটনৈতিক সমাধান হয়ে গেলে তাদের “ভারত-বিরোধিতা”র সস্তা রাজনৈতিক দোকানটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তারা চায় প্রতি বছর বন্যার সময় বা খরার সময় সাধারণ মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে সরকারের বিরুদ্ধে “দেশ বিক্রির” মিথ্যা ও মুখরোচক স্লোগান দিতে।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো দেশই নিজেকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানিয়ে রাখতে পারে না। আমাদের দেশেও এই অন্ধ রাজনৈতিক জুজু এবং অপপ্রচারের মেয়াদ শেষ হওয়া দরকার। তিস্তা বা অন্য কোনো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন কোনো দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি। সস্তা রাজনৈতিক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের চোখ রাখতে হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমৃদ্ধির দিকে।

আমারা কি করবো : কান্নাকাটি নাকি আত্মনির্ভরশীলতা?

সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ কখনোই ভারতের কাছে মাথা নত করবে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি পাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে এবং কূটনৈতিক টেবিলে সেই লড়াই কড়াভাবেই চলছে। কিন্তু একই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে, একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ আর কারও করুণার ওপর বেঁচে থাকা কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয়।

যদি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মারপ্যাঁচে তিস্তা চুক্তি আরও বিলম্বিত হয়, তবে আমাদের কাঁদাকাঁদি করার বা সস্তা রাজনীতিতে মেতে ওঠার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের আছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বানানোর অর্থনৈতিক শক্তি, আমাদের আছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা। সস্তা রাজনৈতিক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের চোখ রাখতে হবে আত্মনির্ভরশীলতার দিকে। ভারত পানি দিলে ভালো, না দিলেও বাংলাদেশ তার উত্তরবঙ্গকে নিজের শক্তিতেই সবুজ ও সমৃদ্ধ রাখতে জানে—এটাই হোক একটি আত্মবিশ্বাসী স্বাধীন জাতির আসল ন্যারেটিভ।

আরও দেখুন: