দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য | আমার সংস্কৃতি সিরিজ

আমাদের সাহিত্য পাঠের ও তার রস নেবার অভ্যাস নেই বললেই চলে। তার পরেও ছোটবেলা থেকে আমাদের সাহিত্যচর্চা সাধারণত দুটি ভাষার গণ্ডিতেই আটকে থাকে—বাংলা আর ইংরেজি। অবশ্য আমাদের মধ্যে যাঁরা মাদ্রাসায় পড়েছেন, তাঁদের কিছুটা উর্দু বা আরবি সাহিত্য পড়ার সুযোগ হয়। আর বড় হওয়ার দিনগুলোতে যদি বলিউড সিনেমার ভূত মাথায় চেপে থাকে, তবে লিরিক আর সংলাপের সুবাদে উর্দুর সাথে বোঝাপড়াটা একটু বাড়ে। কিন্তু এই গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্য কোনো সাহিত্যের খোঁজ নেওয়া—সেটা রসিক পাঠক বা গবেষক ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে সহজে ঘটে না। এমনকি আমাদের একদম ঘরের কাছের, অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষার সাহিত্য নিয়েও আমাদের তেমন কোনো কৌতূহল জাগে না। আমাদের দেশের অনেক উচ্চশিক্ষিত এবং নিয়মিত সাহিত্য পড়েন এমন মানুষকেও আমি দেখেছি, যাঁদের বাংলা আর ইংরেজির বাইরে আর কোনো সাহিত্য নিয়ে ন্যূনতম ধারণাটুকু নেই। অথচ অসমীয়া, ওড়িয়া, মৈথিলী, ভোজপুরী, নেপালি বা হিন্দির মতো ভাষাগুলোর সাথে আমাদের বাংলার এত গভীর মিল; তা সত্ত্বেও আমরা এই ভাষাগুলোর বড় দু-চারজন লেখকের নামও জানি না।

আমি সাহিত্যপাঠক নই, তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতাও আমার নেই। তাই এই বিষয়ে কোনো একাডেমিক মন্তব্য করার অথরিটি আমার নেই। তবে আমার মনে হয়, সুদূর পাশ্চাত্যের সাহিত্য জানার পাশাপাশি নিজের ঘরের পাশের প্রতিবেশীদের সাহিত্যটা জানা আমাদের জন্য ভীষণ জরুরি। কারণ, আমাদের নেটিভ বা একদম মাটির কাছের মানুষের সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতির গল্পগুলো বিদেশি সাহিত্যের চেয়ে এই প্রতিবেশী সাহিত্যেই সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে ফুটে ওঠে। মানুষ হিসেবে আমরা একে অপরের খুব কাছাকাছি; আমাদের ইতিহাস এক, পুরাণের গল্পগুলো এক, আবহাওয়া এক এবং সম্রাট অশোক থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রাজত্ব পর্যন্ত বারবার শাসক বদলালেও আমরা একই ভূখণ্ডে পাশাপাশিই থেকেছি। আমাদের মধ্যে যাতায়াত ছিল, সংস্কৃতির লেনদেন ছিল। তাই আমাদের ভেতরের সুরটাও এত মিলে যায়।

আপনি যখন অসমীয়া ভাষার হযরত আজান ফকির কিংবা শ্রীমন্ত শংকরদেবের ‘দেহবিচারর গীত’ শুনবেন, তখন আপনার মনে হতে বাধ্য—তাঁদের সাথে আমাদের লালন সাঁইজীর কোনো আত্মিক যোগাযোগ ছিল। একইভাবে লালনকে আপনি খুঁজে পাবেন ওড়িয়া ভাষায় মহাত্মা ভীমা ভোইয়ের লেখায়। অবিকল সেই একই মরমী সুরে কথা বলবেন মৈথিলী ও ব্রজবুলিতে সন্ত দরিয়া দাস, কিংবা ভোজপুরীতে সন্ত দরিয়া দাস। আবার নেপালি ভাষায় সেই চেনা বাউল সুরের প্রতিধ্বনি পাবেন লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটা কিংবা ভানুভক্ত আচার্যের গানে।

 যখন আপনি অসমীয়া ভাষায় ভূপেন হাজারিকা কিংবা বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার মেহনতি মানুষের মুক্তির গান শুনবেন, তখন মনে হবে বাংলার হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিংবা সলিল চৌধুরীই যেন অন্য ভাষায় কথা বলছেন। সাম্যবাদ আর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে হেমাঙ্গ-সলিলকে আপনি খুঁজে পাবেন ওড়িয়া ভাষায় মনমোহন মিশ্র বা সচ্চিদানন্দ রাউতরায়ের গণসংগীতে। একই শোষিত জনতার বিপ্লবের সুর বেজে উঠবে মৈথিলী ভাষায় নাগার্জুন (যাত্রী), কিংবা ভোজপুরীতে ভিখারী ঠাকুর ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের কলমে। আর নেপালি ভাষায় মেহনতি মানুষের অধিকারের সেই একই দ্রোহী সুর পাবেন রামেশ শ্রেষ্ঠ কিংবা শ্যাম তামাং-এর জীবনঘনিষ্ঠ গানে। সাধারণ মানুষের দুঃখ, দুর্দশা আর জীবনসংগ্রামের যে গল্প এদের গানে পাওয়া যায়, ঠিক একই আর্তি ও ক্ষোভ দেখতে পাবেন উর্দু সাহিত্যের প্রগতিশীল কবিদের কবিতায়। সাহির লুধিয়ানভি, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আলি সরদার জাফরি, মখদুম মহিউদ্দিন, মাজরুহ সুলতানপুরী, কাফি আজমি, জান নিসার আখতার, ইশতিয়াক হুসাইন আরিফ (মাজাজ লখনভি), জোশ মালিহাবাদী, ফিরাক গোরাখপুরী, আহমেদ নাদিম কাসমি, হাবিব জালিব, ফাহমিদা রিয়াজ, কিশোর নাহিদ, ইবনে ইনশা, মুস্তফা জাইদি কিংবা শওকত আলি খানের (ফানি বদায়ুনী) মতো কালজয়ীদের ধারালো লেখায় সেই একই মানুষের গল্প উঠে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ) শত শত ভাষা ও উপভাষা ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ভাষার রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ইতিহাস, আবার কোনোটির সাহিত্য যাত্রা শুরু হয়েছে আধুনিক যুগে। এই প্রতিটি ভাষা আমাদের প্রতিবেশীদের ভাষা, আমাদের আত্মার আত্মীয়দের সাহিত্য।

এজন্যই আমি মনে করি, আমাদের এই প্রতিবেশীদের চেনা দরকার। আর সেই তাগিদ থেকেই আমার “আমার সংস্কৃতি সিরিজ” এর “দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য” নিয়ে এই আয়োজনটি। এখানে আমি আমাদের সহ আমাদের সকল প্রতিবেশী সাহিত্যিকদের একটি সহজ পরিচিতি বা ইনডেক্স তৈরি করার চেষ্টা করব। আজ শুরু করলাম, দেখা যাক কতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। আমার অন্য সব কাজের মতোই হয়তো এটাও কোনো এক মোড়ে গিয়ে অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে, তারপরও চেষ্টাটা অন্তত করতে চাই।

Table of Contents

দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

বাংলা সাহিত্য

বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাংলা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী ও মরমী গানের ঐতিহ্য পেরিয়ে আধুনিক যুগে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে কবিতা, কথাসাহিত্য (ছোটগল্প ও উপন্যাস), নাট্যসাহিত্য এবং অনন্য শিশুসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। বাংলা সাহিত্যে প্রগতি লেখক সংঘ, ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং দলিত আন্দোলনের মতো প্রগতিশীল চেতনার এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মাইকেল মধুসূদন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান মূলত এই ভাষার সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়েরই এক ঐতিহাসিক বৈশ্বিক জয়জয়কার।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই বিশাল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. কবিতা ও গীতিকাব্য

বাংলা সাহিত্যের আদি উৎসই হলো কবিতা। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী এবং বাউল ও মরমী গানের (লালন সাঁই, হাছন রাজা) আধ্যাত্মিক সুধা বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। আধুনিক যুগে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে বাংলা কবিতা মধ্যযুগীয় শেকল ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের যুগে প্রবেশ করে। রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’ একে বিশ্বমানের আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক উচ্চতা দেয়। পরবর্তীতে জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং তিরিশের দশকের আধুনিক কবিদের মাধ্যমে কবিতা গভীর মনস্তাত্ত্বিক, পরাবাস্তববাদী ও নাগরিক রূপ লাভ করে।

খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলা উপন্যাসের সার্থক যাত্রা শুরু। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্পের এমন এক নিখুঁত রূপ দেন যা বিশ্বসাহিত্যের মোপাসাঁ বা চেশভের সমতুল্য। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ ও নারীর মনস্তত্ত্বকে চমৎকারভাবে ধারণ করেন। পরবর্তীতে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বন্দ্যত্রয়ী’ উপন্যাসে আঞ্চলিক জনজীবন ও বাস্তবতাবাদকে এক মহাকাব্যিক রূপ দেন। উত্তর-আধুনিক যুগে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখনী এই ধারাকে বিশ্বমানে উন্নীত করেছে।

গ. নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটার

উনিশ শতকে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে বাংলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের থিয়েটার শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথের রূপক-প্রতীকী নাটক (যেমন- রক্তকরবী, ডাকঘর) এবং বিংশ শতাব্দীতে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেলিম আল দীন, মুনীর চৌধুরী এবং কলকাতায় বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’ আন্দোলন বাংলা নাটককে নিজস্ব লোকজ আঙ্গিক ও আন্তর্জাতিক আধুনিকতা দান করে।

ঘ. শিশু ও কিশোর সাহিত্য (Children’s Literature)

বাংলা শিশুসাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও বৈচিত্র্যময়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়ের ননসেন্স রাইম (আবোল তাবোল), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ এবং পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’, এবং মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন কিশোর মননকে দশকের পর দশক ধরে সমৃদ্ধ করে আসছে।

কাজী নজরুল ইসলাম

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

বাংলা সাহিত্যে শোষিত, বঞ্চিত এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই ও রাজনৈতিক সচেতনতার এক গৌরবময় প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • কল্লোল যুগ ও তিরিশের আধুনিকতা: ১৯২০-এর দশকে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে প্রথাবদ্ধ রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রথম এক প্রকার প্রগতিশীল বিদ্রোহ শুরু হয়, যা সাহিত্যে অবদমিত কাম, দারিদ্র্য এবং রূঢ় বাস্তবতাকে স্থান দেয়।
  • প্রগতি লেখক সংঘ ও আইপিটিএ (IPTA): ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংঘের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মার্ক্সীয় দর্শন ও মেহনতি মানুষের বিপ্লবের বাণী সরাসরি প্রতিফলিত হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য, সোমেন চন্দ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের লেখনী এবং গণসংগীতের মাধ্যমে সামন্তবাদ ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
  • ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল বাঁক। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন এবং জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ এর অন্যতম বড় উদাহরণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলা কথাসাহিত্যে জন্ম দেয় এক বিশাল দ্রোহ ও ট্র্যাজেডির আখ্যান (যেমন- শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ বা জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’)।
  • দলিত ও হাংরি আন্দোলন: ষাটের দশকে মলয় রায়চৌধুরীদের ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে মহাশ্বেতা দেবীর হাত ধরে দলিত, সাঁওতাল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রগতিশীল সাহিত্য এক নতুন মাত্রা পায়।

 

জীবনানন্দ দাশ
জীবনানন্দ দাশ

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

বাংলা সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): বাংলা সাহিত্যের ‘বিশ্বকবি’। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সংগীতে তাঁর একক অবদান বাংলা সংস্কৃতিকে আধুনিক রূপ দিয়েছে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য এশিয়ার প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
  • কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ এবং বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’। তাঁর কবিতা ও গান ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তিনি বাংলা গজল ও রাগপ্রধান গানেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার।
  • মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক আধুনিক ও প্রথাবিরোধী কবি ও নাট্যকার। তাঁর মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪): বাংলা উপন্যাসের জনক এবং ‘সাহিত্য সম্রাট’। তাঁর ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কপালকুণ্ডলা’ বাংলা কথাসাহিত্যের আদি ভিত্তি।
  • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮): উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, যাঁর ‘দেবদাস’, ‘চরিত্রহীন’ ও ‘শ্রীকান্ত’ তৎকালীন সমাজ ও নারী হৃদয়ের গভীর রূপায়ণ।
  • জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪): রবীন্দ্র-উত্তর যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক কবি। ‘রূপসী বাংলা’ ও ‘বনলতা সেন’ এর মাধ্যমে তিনি প্রকৃতি, নির্জনতা ও পরাবাস্তববাদের এক মায়াবী জগৎ তৈরি করেছেন।
  • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাস্তবতাবাদী ও মার্ক্সীয় চেতনার ঔপনিবেশিক। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের এক অনবদ্য দলিল।
  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩–১৯৯৭): বাংলা মহাকাব্যিক উপন্যাসের জাদুকর। মাত্র দুটি উপন্যাস (‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’) এবং কয়েকটি গল্প দিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যের স্তরে স্থান করে নিয়েছেন।
  • মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬–২০১৬): প্রখ্যাত প্রগতিশীল লেখিকা ও সমাজকর্মী, যিনি তাঁর ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে আদিবাসী ও রাজনৈতিকভাবে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
  • হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২): আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে পাঠক জাগরণের এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছিলেন।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | Rabindranath Tagore

 

সংস্কৃত সাহিত্য

প্রাচীন ও শাস্ত্রীয় ভাষা হিসেবে মূলত সমগ্র ভারত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বিস্তৃত সংস্কৃত ভাষা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, বৈজ্ঞানিক ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বৈদিক স্তোত্র ও উপনিষদের আধ্যাত্মিক দর্শন থেকে শুরু করে ধ্রুপদী যুগের মহাকাব্য, নাটক ও ব্যাকরণতত্ত্বের মধ্য দিয়ে এই সাহিত্য এক সুগভীর তাত্ত্বিক মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে মহাকাব্যিক কবিতা, ধ্রুপদী নাট্যসাহিত্য, দার্শনিক সন্দর্ভ এবং নীতিশিক্ষামূলক গল্পের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। সংস্কৃত সাহিত্যে প্রাচীন ভারতের চার্বাক দর্শন (বস্তুবাদ), বৌদ্ধ ও জৈন সংস্কৃতির প্রগতিশীল ধারা এবং ঔপনিবেশিক আমল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী ও পুনর্জাগরণবাদী চেতনার এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহর্ষি বেদব্যাস, আদিকবি বাল্মীকি, কবিগুরু কালিদাস, নাট্যকার ভাস, দার্শনিক শংকরাচার্য এবং আধুনিক যুগের পন্ডিত ভট্ট মথুরানাথ শাস্ত্রীর মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও অপার্থিব উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন বিশ্বসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন এবং আধুনিক ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহের জননী হিসেবে এই ভাষার সাহিত্যিক ও ব্যাকরণগত অবদান মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক বৈশ্বিক জয়জয়কার।

ব্যাস
ব্যাস

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

সংস্কৃত সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই বিশাল ও শাস্ত্রীয় যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বৈদিক ও দার্শনিক সাহিত্য (Vedic & Philosophical Literature): সংস্কৃত সাহিত্যের আদি উৎস হলো বেদ (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ)। উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন এবং ষড়দর্শনের (ন্যায়, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা ইত্যাদি) গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা এই সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কর্মযোগ ও আধ্যাত্মিক সুধা বিশ্বজুড়ে দার্শনিক চিন্তার এক অনন্য মাইলফলক।

খ. মহাকাব্য ও পুরাণ (Epics & Puranas): আদিকবি বাল্মীকির ‘রামায়ণ’ এবং মহর্ষি বেদব্যাসের ‘মহাভারত’—এই দুটি বিশাল মহাকাব্য ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সাহিত্যের মূল ভিত্তি। এছাড়া ১৮টি পুরাণ ও উপপুরাণ ঐতিহাসিক আখ্যান ও রূপকের মাধ্যমে মানব জীবনের জটিল মনস্তত্ত্বকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে।

গ. ধ্রুপদী কাব্য ও নাট্যসাহিত্য (Classical Kavya & Drama): খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে কবি কালিদাসের হাত ধরে সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। তাঁর ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’ নাটক এবং ‘মেঘদূতম’ কাব্য বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক আখ্যানগুলোর সমতুল্য। এছাড়া শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিকম’ (বাস্তবতাবাদী নাটক) এবং বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’ (রাজনৈতিক নাটক) এই ধারাকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।

ঘ. নীতি ও কথাসাহিত্য (Fables & Didactic Literature): সংস্কৃত নীতিসাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও শিক্ষণীয় আখ্যান। পন্ডিত বিষ্ণু শর্মার ‘পঞ্চতন্ত্র’ এবং নারায়ণ পন্ডিতের ‘হিতোপদেশ’ পশুপাখির রূপক গল্পের মাধ্যমে রাজনীতি, সমাজনীতি ও বাস্তব জীবনের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের শত শত ভাষায় অনূদিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে।

কালিদাস
কালিদাস

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

সংস্কৃত সাহিত্যকে সাধারণত রক্ষণশীল ভাবা হলেও এর ভেতরে প্রাচীনকাল থেকেই তীব্র প্রথাবিরোধী ও প্রগতিশীল চিন্তার চর্চা ছিল:

  • চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন: প্রাচীন ভারতে বেদ ও ঈশ্বরকেন্দ্রিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে গিয়ে চার্বাক দর্শন সম্পূর্ণ বস্তুত্ববাদী, ইহজাগতিক এবং প্রগতিশীল চিন্তার জন্ম দিয়েছিল, যা সংস্কৃত সাহিত্যের আস্তিক ধারাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
  • শূদ্রক ও প্রান্তিক বাস্তবতা: ধ্রুপদী নাট্যকার শূদ্রক তাঁর ‘মৃচ্ছকটিকম’ নাটকে কোনো রাজা বা দেবতাকে নায়ক না করে একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও একজন গণিকাকে মূল চরিত্র করে সামাজিক বৈষম্য, জুয়াড়ি, চোর এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের এক প্রগতিশীল চিত্র এঁকেছিলেন।
  • আধুনিক সংস্কৃত পুনর্জাগরণ: বিংশ শতাব্দীতে এসে সংস্কৃত সাহিত্যকে দেব-দেবী ও রাজদরবারের বৃত্ত থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দেশভাগ, নারীবাদ এবং দেশাত্মবোধক প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত করা হয়।

 

পাণিনি
পাণিনি

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

সংস্কৃত সাহিত্যের আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • বেদব্যাস ও বাল্মীকি (প্রাচীন যুগ): যথাক্রমে ‘মহাভারত’ ও ‘রামায়ণ’-এর রচয়িতা। এই দুই ঋষি-কবি উপমহাদেশের কথাসাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির চিরন্তন রূপরেখা তৈরি করে গেছেন।
  • কালিদাস (খ্রিষ্টীয় ৪র্থ-৫ম শতাব্দী): সংস্কৃত সাহিত্যের ‘মহাকবি’ ও নাট্যসম্রাট। ‘রঘুবংশম’, ‘কুমারসম্ভবম’, ‘মেঘদূতম’ এবং ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এর মাধ্যমে তিনি নান্দনিকতা ও উপমার এক অবিসংবাদিত শিখরে আরোহণ করেন।
  • পাণিনি (খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী): বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী ও ব্যাকরণবিদ। তাঁর রচিত ‘অষ্টাধ্যায়ী’ সংস্কৃত ভাষাকে একটি নিখুঁত, গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দান করে যা আধুনিক কম্পিউটার কোডিং-এর ক্ষেত্রেও সমাদৃত।
  • ভাস (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-৪র্থ শতাব্দী): কালিদাসের পূর্ববর্তী শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, যাঁর ‘স্বপ্নবাসব দত্তাম’ এবং মহাভারতের পটভূমিতে লেখা নাটকগুলো থিয়েটারের আদি ও সার্থক রূপ।
  • বাণভট্ট (খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দী): সংস্কৃত গদ্য সাহিত্যের রাজপুত্র। রাজা হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’কে বিশ্বের আদি উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • ভট্ট মথুরানাথ শাস্ত্রী (১৮৮৯–১৯৬৪): আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রাচীন ছন্দের সাথে আধুনিক যুগের রাজনৈতিক সচেতনতা, গল্প ও উপন্যাসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সংস্কৃতকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন।

 

 

মুন্সী প্রেমচন্দ
মুন্সী প্রেমচন্দ

 

 

হিন্দি সাহিত্য

ভারতের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল প্রবাসী ভারতীয় সমাজ জুড়ে বিস্তৃত হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। একাদশ শতাব্দীর চারণ কাব্য ও বীরগাথা কাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ভক্তি ও রীতিকাব্য এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা হিন্দি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী কবিতা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল নাটক এবং মননশীল ললিত-নিবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। হিন্দি সাহিত্যে ছায়াবাদ (রোমান্টিক আন্দোলন), প্রগতিশীল লেখক সংঘ, প্রয়োগবাদ এবং নয়ী কবিতা আন্দোলনের মতো প্রগতিশীল ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে সন্ত তুলসীদাস, কবি কबीर, মুন্সী প্রেমচন্দ (কথাসাহিত্য সম্রাট), জয়শঙ্কর প্রসাদ, মহাদেবী বর্মা ও সচ্চিদানন্দ বাৎস্যায়ন ‘অজ্ঞেয়’-এর মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক কথাসাহিত্যে অনন্য অবদান রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক জয়জয়কার।

তুলসীদাস
তুলসীদাস

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

হিন্দি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই গতিশীল ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. কবিতা ও ভক্তিগীতি (Poetry & Bhakti Lyrics): হিন্দি কবিতার আদি উৎস বীরগাথা হলেও মধ্যযুগে কबीर, তুলসীদাস, সুরদাস ও মীরা বাঈয়ের হাত ধরে ভক্তি ও সুফী কাব্যের এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। আধুনিক যুগে এসে ‘ছায়াবাদ’ আন্দোলনের মাধ্যমে কবিতা আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে গভীর মানবিক অনুভূতি, প্রকৃতি প্রেম ও রহস্যবাদে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ‘নয়ী কবিতা’ আন্দোলনের মাধ্যমে কবিতা হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ও নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।

খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): মুন্সী প্রেমচন্দের হাত ধরে হিন্দি উপন্যাসের বাস্তবতাবাদী ও আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি জমিদার ও মহাজনদের দ্বারা শোষিত গ্রামীণ ভারতের যে নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন, তা বিশ্বমানের। পরবর্তীতে ফণিশ্বর নাথ ‘রেণু’ হিন্দি কথাসাহিত্যে ‘আঞ্চলিক উপন্যাসের’ এক জাদুকরী ধারা তৈরি করেন। উত্তর-আধুনিক ও সমসাময়িক যুগে মোহন রাকেশ, মৈত্রেয়ী পুষ্পা ও কৃষ্ণ সোবতির লেখনী এই ধারাকে মনস্তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত করেছে।

গ. নাট্যসাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ (Drama & Theatre): আধুনিক হিন্দি নাটকের ভিত্তি গড়েন ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র। বিংশ শতাব্দীতে জয়শঙ্কর প্রসাদের ঐতিহাসিক নাটকগুলো এবং পরবর্তীতে মোহন রাকেশের ‘আষাঢ় কা এক দিন’ বা ‘আধূ আধূরে’-এর মতো নাটকগুলো হিন্দি থিয়েটারকে রাজদরবার ও পৌরাণিক আখ্যান থেকে বের করে সাধারণ মানুষের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

ঘ. ললিত-নিবন্ধ ও গদ্য (Essays & Literary Prose): হিন্দি সাহিত্যে প্রবন্ধ বা নিবন্ধের এক অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল এবং পরবর্তীতে কুবেবনাথ রাইয়ের মতো ললিত-নিবন্ধকারেরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও আধুনিক বিশ্বদর্শনের মেলবন্ধনে হিন্দি মননশীল গদ্যকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছেন।

কবীর
কবীর

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

হিন্দি সাহিত্যে শোষিত মেহনতি মানুষ ও নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক দীর্ঘ ও শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • প্রগতিশীল লেখক সংঘ (১৯৩৬): লক্ষ্ণৌতে মুন্সী প্রেমচন্দের সভাপতিত্বে প্রগতিশীল লেখক সংঘের প্রথম ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে হিন্দি সাহিত্যে পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের পক্ষে মার্ক্সীয় দর্শনের এক শক্তিশালী জোয়ার আসে।
  • ছায়াবাদ ও নারী মুক্তি: ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে মহাদেবী বর্মা ও সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ‘নিরালা’-র লেখনীতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রগতিশীল বাণী উচ্চকিত হয়।
  • দলিত ও গ্রামীণ চেতনা: উত্তর-আধুনিক যুগে ওমপ্রকাশ বাল্মীকি (তাঁর কালজয়ী আত্মজীবনী ‘জুটন’-এর মাধ্যমে) ও মৈত্রেয়ী পুষ্পার হাত ধরে হিন্দি সাহিত্যে জাতপাত বৈষম্য, কুসংস্কার এবং প্রান্তিক অন্ত্যজ মানুষের অধিকারের লড়াই এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা পায়।

 

ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র
ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

হিন্দি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • মুন্সী প্রেমচন্দ (১৮৮০–১৯৩৬): হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যের ‘উপন্যাস সম্রাট’। তাঁর ‘গোদান’, ‘গবন’ এবং ‘কফন’-এর মতো কালজয়ী ছোটগল্প ও উপন্যাস গ্রামীণ ভারতের শোষিত মানুষের এক চিরন্তন ও জীবন্ত দলিল।
  • তুলসীদাস ও কবীর (মধ্যযুগ): তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ এবং কীবরের প্রথাবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক ‘দোহা’ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে হিন্দি ভাষার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
  • ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র (১৮৫০–১৮৮৫): আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের জনক। তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার ও সাংবাদিক হিসেবে হিন্দি ভাষাকে আধুনিক গদ্যের রূপ দান করেন।
  • জয়শঙ্কর প্রসাদ (১৮৮৯–১৯৩৭): হিন্দি কবিতার ‘ছায়াবাদ’ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। তাঁর মহাকাব্য ‘কামায়নী’ (Kamayani) দর্শন ও নান্দনিকতার এক অমর কীর্তি।
  • মহাদেবী বর্মা (১৯০৭–১৯৮৭): আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কবি ও প্রাবন্ধিক, যিনি তাঁর মরমী কবিতা ও গদ্যের জন্য ‘আধুনিক মীরা’ নামে পরিচিত এবং ১৯৮২ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।
  • সচ্চিদানন্দ বাৎস্যায়ন ‘অজ্ঞেয়’ (১৯১১–১৯৮৭): হিন্দি সাহিত্যে ‘প্রয়োগবাদ’ ও ‘নয়ী কবিতা’ আন্দোলনের প্রবক্তা। তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘শেখর: এক জীবনী’ হিন্দি কথাসাহিত্যের একটি অবিসংবাদিত মাইলফলক।
  • ফণিশ্বর নাথ ‘রেণু’ (১৯২১–১৯৭৭): হিন্দি সাহিত্যের প্রখ্যাত আঞ্চলিক ঔপন্যাসিক। বিহারের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে রচিত তাঁর ‘মৈলা আঁচল’ হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।
তিরুভাল্লুভার
তিরুভাল্লুভার

তামিল সাহিত্য

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য, পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল ছাড়াও সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল তামিল প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত তামিল ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম টিকে থাকা ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় (Classical) সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হওয়া প্রাচীন ‘সঙ্গম সাহিত্য’ (Sangam Literature) থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলন এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা তামিল সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে প্রাচীন নীতিশাস্ত্রীয় কাব্য, মহাকাব্যিক আখ্যান, ভক্তিমূলক গীতি এবং আধুনিক যুগে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাবাদী কথাসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের. তামিল সাহিত্যে প্রাচীন আত্মমর্যাদাবোধ (আকাম ও পুরাম চেতনা), বিংশ শতকের প্রগতিশীল ‘দ্রাবিড় আন্দোলন’, আত্মসম্মান আন্দোলন (Self-Respect Movement) এবং প্রান্তিক ও দলিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহাকবি তিরুভাল্লুভার, সুব্রামানিয়া ভারতী (আধুনিক তামিল সাহিত্যের জনক), পুদুমাইপিথান, আকিলান এবং জয়কান্তনের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাষার বিশুদ্ধতা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

জয়কান্তন
জয়কান্তন

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

তামিল সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই সুপ্রাচীন ও নান্দনিক যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. সঙ্গম ও নীতিসাহিত্য (Sangam & Didactic Poetry): তামিল সাহিত্যের আদি উৎস হলো ‘সঙ্গম সাহিত্য’, যা মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগ (আকাম) এবং বীরত্ব ও যুদ্ধকে (পুরাম) কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে রচিত মহাকবি তিরুভাল্লুভারের ‘তিরুক্কুড়ল’ (Thirukkural) বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নীতিগ্রন্থ, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবজীবনের নৈতিকতা ও দর্শনের এক শাশ্বত গাইডবুক।

খ. পঞ্চ-মহাকাব্য (The Five Great Epics): তামিল সাহিত্যের মধ্যযুগীয় স্বর্ণালী ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি মহাকাব্যের ওপর, যার মধ্যে প্রধানতম হলো ইলাঙ্গো আদিগালের ‘শিলপ্পাদিকারম’ (Silappatikaram) এবং ছাত্থানার-এর ‘มணிমেকলাই’ (Manimekalai)। এই মহাকাব্যগুলো কোনো পৌরাণিক দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে নয়, vacations বাস্তব জীবন, প্রেম, কোপ ও ত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্যিক রূপ।

গ. ভক্তিমূলক কাব্য (Bhakti Literature): ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে তামিলনাড়ু থেকেই সমগ্র ভারতে ‘ভক্তি আন্দোলন’-এর সূচনা হয়েছিল। আলভার (বিষ্ণুভক্ত) এবং নায়নমার (শিবভক্ত) সাধুদের রচিত হাজার হাজার আধ্যাত্মিক ও মরমী গান তামিল কবিতাকে সুর ও ভক্তির এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে।

ঘ. আধুনিক কথাসাহিত্য ও ছোটগল্প (Modern Fiction & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে পুদুমাইপিথানের হাত ধরে তামিল ছোটগল্পের আধুনিক ও বাস্তবতাবাদী যুগের সূচনা হয়। পরবর্তীতে আকিলান, জয়কান্তন এবং উত্তর-আধুনিক যুগে সুন্দর রামস্বামী ও পেরুমাল মুরুগানের মতো লেখকদের লেখনী তামিল কথাসাহিত্যকে বিশ্বমানের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও নান্দনিকতা দিয়েছে।

 

পুদুমাইপিথান
পুদুমাইপিথান

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

তামিল সাহিত্যে সামাজিক বৈষম্য, জাতপাত এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অত্যন্ত উগ্র ও আপসহীন প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • দ্রাবিড় ও আত্মসম্মান আন্দোলন: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পেরিয়ার ই. ভি. রামাসামির ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’ তামিল সাহিত্যকে আমূল বদলে দেয়। এর প্রভাবে সাহিত্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি, ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং জাতপাতের বিরুদ্ধে তীব্র কুঠারাঘাত করা হয় এবং ভারতেন্দু হরিশচন্দ্রের মতোই সুব্রামানিয়া ভারতীর কবিতায় জাতীয়তাবাদ ও নারীমুক্তির প্রগতিশীল বাণী উচ্চকিত হয়।
  • দলিত সাহিত্য আন্দোলন: আশির দশক থেকে তামিল সাহিত্যে এক শক্তিশালী দলিত ধারার জন্ম হয়। বামা (Bama)-র কালজয়ী আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘কারুক্কু’ (Karukku) এবং পেরুমাল মুরুগানের উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতা এবং প্রান্তিক অন্ত্যজ মানুষের অধিকারের লড়াই এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা লাভ করে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

তামিল সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • তিরুভাল্লুভার (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-১ম শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও কবি। তাঁর রচিত ‘তিরুক্কুড়ল’ তামিল সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি ও অমূল্য আকর গ্রন্থ।
  • ইলাঙ্গো আদিগাল (খ্রিষ্টীয় ৫মহ-৬ষ্ঠ শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘শিলপ্পাদিকারম’ (নূপুরের উপাখ্যান)-এর রচয়িতা, যিনি চেরা রাজবংশের যুগরাজ হওয়া সত্ত্বেও সন্ন্যাসী হয়ে সাধারণ মানুষের ট্র্যাজেডিকে কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন।
  • কাম্বান (১১শ-১২শ শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের ‘মহাকবি’। তিনি বাল্মীকির রামায়ণকে তামিল সংস্কৃতির ছাঁচে ঢেলে ‘কাম্ব রামায়নাম’ রচনা করেন, যা এর সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও শব্দচয়নের জন্য অনন্য।
  • সুব্রামানিয়া ভারতী (১৮৮২–১৯২১): আধুনিক তামিল সাহিত্যের জনক ও বীর কবি। তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতা, সামাজিক সংস্কারমূলক গান এবং সহজ সরল গদ্যশৈলী তামিল সমাজকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছিল।
  • পুদুমাইপিথান (১৯০৬–১৯৪৮): আধুনিক তামিল ছোটগল্পের জাদুকর। প্রথাবদ্ধ ও।)আদর্শবাদী লেখার বাইরে গিয়ে তিনি সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, ভণ্ডামি ও মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন।
  • জয়কান্তন (১৯৩৪–২০১৫): তামিল সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী প্রগতিশীল ঔপন্যাসিক ও গল্পকার, যিনি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চেন্নাইয়ের বস্তিবাসী, রিকশাচালক ও প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লিখেছেন এবং ২০০২ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।

 

সাহির লুধিয়ানভি | Sahir Ludhianvi

 

উর্দু, হিন্দভী, হিন্দুস্থানী বা রেখতা সাহিত্য

পাকিস্তান (জাতীয় ভাষা) এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, বিহার, হায়দরাবাদ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল দক্ষিণ এশীয় মুসলিম প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত উর্দু ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম সুমিষ্ট, সংবেদনশীল ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর সুফী কবি আমির খসরুর ‘রেখতা’ ও প্রাচীন ‘দখনি’ রূপ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের রাজকীয় দরবার এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা উর্দু সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে অনন্য গজল ও শায়েরি, সুগভীর দাস্তান (মহাকাব্যিক আখ্যান), সমাজবাস্তববাদী ছোটগল্প এবং প্রগতিশীল মননশীল প্রবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। উর্দু সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন (Progressive Writers’ Movement), দেশভাগ ও দাঙ্গার ট্র্যাজেডি এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, মীর তকী মীর, সাদাত হাসান মান্টো এবং ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও কালজয়ী উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। গীতিময়তা ও রোমান্টিকতার সাথে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সমসামयिक বৈশ্বিক কথাসাহিত্যে অনন্য অবদান রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

উর্দু সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই গতিশীল, সুরময় ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. গজল, শায়েরি ও নজম (Poetry & Ghazals): উর্দু সাহিত্যের মূল প্রাণই হলো কবিতা। এর প্রধান রূপ ‘গজল’ (যার মাধ্যমে প্রেম, বিরহ ও দর্শনের গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ পায়) এবং ‘নজম’ (নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ কবিতা) বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্ন। মীর ও গালিবের হাত ধরে গজলের যে রাজকীয় ও দার্শনিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা আজও উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।

খ. কথাসাহিত্য: ছোটগল্প ও উপন্যাস (Fiction: Short Stories & Novels): এক সময় বড় বড় অলৌকিক আখ্যান বা ‘দাস্তান’ উর্দু গদ্যের মূল রূপ হলেও, বিংশ শতাব্দীতে এসে ছোটগল্প বা ‘আফসানানিগারি’ (Afsana) উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জনরায় পরিণত হয়। মুন্সী প্রেমচন্দ এবং পরবর্তী সময়ে সাদাত হাসান মান্টোর হাত ধরে উর্দু ছোটগল্পে রূঢ় বাস্তবতা ও মানুষের আদিম মনস্তত্ত্ব এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। এছাড়া কুরাতুলাইন হায়দারের ‘আগ কা দরিয়া’ উর্দু উপন্যাসের এক মহাকাব্যিক মাইলফলক।

গ. মার্সিয়া ও কাসিদা (Marsiya & Qasida): কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে রচিত শোকগাঁথা বা ‘মার্সিয়া’ উর্দু কাব্যের এক অনন্য ও সমৃদ্ধ ধারা। মীর আনিস ও মির্জা দাবিরের হাত ধরে এই ধারাটি উপমা, অলঙ্কার এবং বিষাদময় শৈলীতে বিশ্বমানের মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করেছে।

ঘ. রম্যরচনা ও মননশীল গদ্য (Satire & Literary Prose): উর্দু সাহিত্যে মার্জিত ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুকের এক চমৎকার ধারা রয়েছে। পিত্রাস বুখারী ও মুশতাক আহমেদ ইউসুফীর মতো রম্যরচনাকারেরা সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের স্বভাবকে চমৎকার ব্যঙ্গাত্মক গদ্যের মাধ্যমে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

উর্দু সাহিত্যে শোষিত মেহনতি মানুষ, ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা এবং নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়ার সবচেয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন (Anjuman Taraqqi Pasand Musannifin): ১৯৩৬ সালে এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্দোলন। সাজ্জাদ জহির, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আলী সরদার জাফরি এবং ইসমত চুগতাইদের লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্য রাজদরবার ও কপোত-কপোতীর প্রেম থেকে বের হয়ে কারখানার শ্রমিক, ক্ষুধার্ত কৃষক এবং শোষিত মানুষের বিপ্লবের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়।
  • দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও বাস্তবতাবাদ: ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান দেশভাগের নারকীয় নৃশংসতা, দাঙ্গা ও মানবিক ট্রমাকে কোনো রাজনৈতিক মুখোশ ছাড়াই অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও নগ্ন বাস্তবতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন সাদাত হাসান মান্টো। তাঁর ‘টোবা টেক সিং’ গল্পটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা প্রগতিশীল প্রতিবাদী সৃষ্টি।
  • নারী মুক্তি ও প্রথাবিরোধিতা: ইসমত চুগতাই এবং রশিদ জাহানের মতো নারী লেখিকারা মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের অন্ধ সংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য এবং নারীদের অবদমিত মনস্তত্ত্ব ও কামনার কথা অত্যন্ত অকপটে ও সাহসিকতার সাথে তুলে সমাজে বৈপ্লবিক ঝড় তুলেছিলেন।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

উর্দু সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • মির্জা গালিব (১৭৯৭–১৮৬৯): উর্দু সাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয়তম কবি। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, গভীর দর্শন ও অনন্য গজলশৈলী উর্দু ভাষাকে বিশ্বদরবারে অমর করে রেখেছে।
  • আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭–১৯৩৮): উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক-কবি বা ‘শায়ের-ই-মাশরিক’ (প্রাচ্যের কবি)। তাঁর ‘শিকওয়া’, ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ এবং আধ্যাত্মিক কবিতা মুসলিম পুনর্জাগরণ ও আধুনিক চিন্তাধারার মূল ভিত্তি।
  • মীর তকী মীর (১৭২৩–১৮১০): উর্দু গজলের জনক বা ‘খুদা-এ-সুখান’ (কবিতার ঈশ্বর)। তাঁর অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও বিষাদময় গজল পরবর্তী প্রজন্মের সমস্ত কবিদের (এমনকি গালিবকেও) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
  • সাদাত হাসান মান্টো (১৯১২–১৯৫৫): বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে সাহসী, বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ছোটগল্পকার। সমাজবাস্তবতা ও দেশভাগের ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখা তাঁর গল্পগুলো বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
  • ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১৯১১–১৯৮৪): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কবি ও লেনিন শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। প্রথাগত রোমান্টিক গজলের অবয়বকে তিনি অত্যন্ত সার্থকভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন।
  • কুরাতুলাইন হায়দার (১৯২৭–২০০৮): উর্দু কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী লেখিকা। আড়াই হাজার বছরের উপমহাদেশীয় ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরের পটভূমিতে রচিত তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘আগ কা দরিয়া’ (River of Fire) বিশ্বমানের এক ক্লাসিক সৃষ্টি।
  • ইসমত চুগতাই (১৯১৫–১৯৯১): উর্দু সাহিত্যের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৈপ্লবিক নারী কথাসাহিত্যিক, যাঁর সাহসী ও অকপটে লেখনী পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
থুনছাথু ইজুথাচান
থুনছাথু ইজুথাচান

 

মালয়ালম সাহিত্য

ভারতের কেরালা রাজ্য এবং লাক্ষাদ্বীপ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত মালয়ালম ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং আধুনিক ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল ও উচ্চশিক্ষিত পাঠকদের সাহিত্যিক মাধ্যম। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্য এবং পরবর্তী সময়ে কন্নড় ও সংস্কৃতের মেলবন্ধনে তৈরি ‘মণিপ্রবালম’ শৈলী পেরিয়ে আধুনিক যুগে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক কবিতা, সমাজবাস্তববাদী ও অস্তিত্ববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল নাটক এবং রূপকধর্মী শিশুসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। মালয়ালম সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলন (Jeevat Sahitya Prasthanam), দলিত ও উপজাতীয় চেতনা এবং পরিবেশবাদী আন্দোলনের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে আধুনিক কবিত্রয় (কুমারন আসান, উল্লুর, ভাল্লাথোল), বৈকম মুহাম্মদ বশীর, থকাঝি শিবশঙ্কর পিল্লাই এবং এম. টি. বাসুদেবন নায়ারের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ অর্জনে (মোট ৬ বার বিজয়ী) অনন্য রেকর্ড গড়া এবং শতভাগ শিক্ষিত সমাজের মননকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

ভাইকম মুহম্মদ বশীর
ভাইকম মুহম্মদ বশীর

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

মালয়ালম সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মননশীল, আধুনিক ও বাস্তবমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. কবিতা ও রোমান্টিক নবজাগরণ (Poetry & Romantic Revival): মালয়ালম কবিতার আধুনিক ভিত্তি স্থাপিত হয় বিংশ শতকের শুরুতে ‘আধুনিক কবিত্রয়’-এর হাত ধরে। তাঁরা কবিতাকে রাজদরবার ও আধ্যাত্মিকতার বৃত্ত থেকে বের করে সামাজিক অন্যায় ও মানবিক আবেগের সাথে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে ‘নব্য-কবিতা’ আন্দোলনের মাধ্যমে মালয়ালম কবিতা তীব্র রাজনৈতিক সচেতনতা এবং উত্তর-আধুনিক নাগরিক জটিলতার এক অনন্য রূপ পরিগ্রহ করে।

খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): মালয়ালম কথাসাহিত্য ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী কথাসাহিত্যের একটি। বৈকম মুহাম্মদ বশীরের সরল-রম্য অথচ জীবনঘনিষ্ঠ গল্প এবং থকাঝি শিবশঙ্কর পিল্লাইয়ের মহাকাব্যিক বাস্তবতাবাদ এই ধারার ভিত্তি। মানুষের অস্তিত্ব সংকট, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং কেরালা সমাজের সামন্ততান্ত্রিক ভাঙনকে কেন্দ্র করে এম. টি. বাসুদেবন নায়ার ও ও. ভি. বিজয়ন যে ধারা তৈরি করেন, তা বিশ্বসাহিত্যের সমতুল্য।

গ. নাট্যসাহিত্য ও সমাজ সংস্কার (Drama & Social Reform Theatre): কেরালার কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সামাজিক নবজাগরণের পেছনে মালয়ালম নাটকের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫০-এর দশকে ‘কেরালা পিপলস আর্টস ক্লাব’ (KPAC)-এর ব্যানারে থোপ্পিল ভাসির লেখা ‘তুলাভাল্লাম’ বা ‘ইউ টুগ্যাদার মেইড মি এ কমিউনিস্ট’ (Ningalenne Communistakki) নাটকগুলো থিয়েটারকে সরাসরি গণমানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিল।

ঘ. প্রাবন্ধিক সাহিত্য ও সমালোচনা (Essays & Literary Criticism): মালয়ালম ভাষায় সাহিত্য সমালোচনা ও মননশীল প্রবন্ধের এক অত্যন্ত উঁচু মানের সংস্কৃতি রয়েছে। এম. পি. পল এবং কে. পি. আপ্পানের মতো সমালোচকেরা বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক তত্ত্বগুলোর (যেমন- উত্তর-আধুনিকতাবাদ, অস্তিত্ববাদ) নিরিখে মালয়ালম সাহিত্যকে ব্যবচ্ছেদ করে পাঠকদের মননকে অসম্ভব পরিপক্ক করে তুলেছেন।

 

তকাজি শিবশঙ্কর পিল্লাই
তকাজি শিবশঙ্কর পিল্লাই

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

মালয়ালম সাহিত্য জন্মলগ্ন থেকেই বামপন্থী দর্শন, সামাজিক সাম্য এবং জাতপাত বিরোধী প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত:

  • জীবাৎ সাহিত্য প্রস্থানম (Jeevat Sahitya Prasthanam): ১৯৩৭ সালে কেরালায় প্রগতিশীল লেখক সংঘ বা ‘জীবাৎ সাহিত্য আন্দোলন’ শুরু হয়। এর মূল স্লোগানই ছিল—সাহিত্যকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক ও অন্ত্যজ শ্রেণীর অধিকারের কথা বলতে হবে। এই আন্দোলনের ফলেই কেরালায় যুগান্তকারী ভূমি সংস্কার ও সামাজিক রূপান্তরের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।
  • বর্ণবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী দ্রোহ: কুমারন আসানের ‘দুরাবস্থা’ কাব্যে উচ্চবর্ণের নারী ও নিম্নবর্ণের পুরুষের প্রেমের মাধ্যমে জাতপ্রথার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দলিত ও আদিবাসী লেখকদের হাত ধরে মালয়ালম সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত উগ্র ও প্রগতিশীল রূপ লাভ করে।
  • পরিবেশবাদী ও নারীবাদী চেতনা: বিংশ শতকের শেষভাগে কেরালায় ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’ বাঁচানোর পরিবেশবাদী আন্দোলন এবং কমলা দাসের (মাধবীকুট্টি) সাহসী আত্মজীবনীমূলক লেখার মাধ্যমে সাহিত্যে এক নতুন ও আপসহীন প্রগতিশীল নারীবাদের জন্ম হয়।

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

মালয়ালম সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • থুনছাথু ইজুথাচান (১৬শ শতাব্দী): মালয়ালম ভাষার জনক। তিনি অধ্যাত্ম রামায়ণকে মালয়ালম ভাষায় অনুবাদ করে এই ভাষার নিজস্ব সাহিত্যিক ও ভাষাগত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।
  • ভাইকম মুহম্মদ বশীর (১৯০৮–১৯৯৪): মালয়ালম সাহিত্যের ‘সুলতান’। এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কথাসাহিত্যিক তাঁর অত্যন্ত সহজ, কৌতুকপূর্ণ অথচ জীবনঘনিষ্ঠ শৈলীতে ‘বাল্যকালসখী’ ও ‘শব্দাঙ্গল’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাস লিখেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্ন।
  • তকাজি শিবশঙ্কর পিল্লাই (১৯১২–১৯৯৯): জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী প্রখ্যাত বাস্তবতাবাদী ঔপন্যাসিক। কেরালার মৎস্যজীবী ও শ্রমিকদের জীবন নিয়ে লেখা তাঁর ‘চেম্মীন’ (Chemmeen) এবং ‘কায়ার’ (Coir) উপন্যাস দুটি ভারতীয় কথাসাহিত্যের মহাকাব্যিক মাইলফলক।
  • এম. টি. বাসুদেবন নায়ার (১৯৩৩—বর্তমান): আধুনিক মালয়ালম সাহিত্যের অবিসংবাদিত প্রধান পুরুষ এবং ১৯৯৫ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘নালাুকেত্তু’ (The Legacy) এবং মহাভারতের ভীম চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা ‘রান্দামুজাম’ (The Second Turn) উপন্যাস দুটি ক্ল্যাসিক মর্যাদা পেয়েছে।
  • কমলা দাস / মাধবীকুট্টি (১৯৩৪–২০০৯): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখিকা ও কবি। তাঁর অত্যন্ত সাহসী ও অকপট আত্মজীবনী ‘মাই স্টোরি’ (Ente Katha) পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মুখোশ খুলে দিয়ে ভারতীয় নারী স্বাধীনতায় এক বৈপ্লবিক ঝড় তুলেছিল।
  • ও. ভি. বিজয়ন (১৯৩০–২০০৫): মালয়ালম সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তর-আধুনিক ও অস্তিত্ববাদী লেখক। তাঁর রূপকধর্মী কালজয়ী উপন্যাস ‘খাসাক্কিন্তে ইতিহাসাম’ (The Legends of Khasak) মালয়ালম কথাসাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

 

গিরিশ রঘুনাথ কারনাড
গিরিশ রঘুনাথ কারনাড

 

কন্নড় সাহিত্য

ভারতের কর্ণাটক রাজ্য এবং মহারাষ্ট্র, গোয়া ও তামিলনাড়ুর সীমান্তবর্তী অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত কন্নড় ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় (Classical) সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর আদি নিদর্শন ‘কবিরাজমার্গ’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ভক্তিময় ও প্রথাবিরোধী ‘বচন সাহিত্য’ এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা কন্নড় সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে মহাকাব্যিক চম্পু-কাব্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), দর্শনভিত্তিক লিরিক এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক নাট্যসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। কন্নড় সাহিত্যে দ্বাদশ শতকের বীরশৈব আন্দোলন, বিংশ শতকের প্রগতিশীল নবোদয় (Navodaya) ও প্রথাবিরোধী নব্য (Navya) আন্দোলন এবং দলিত ও বান্ডায়া (Bandaya) বিদ্রোহের মতো প্রগতিশীল ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে আদিকবি পম্পা, সমাজ সংস্কারক বাসবেশ্বর, জ্ঞানপীঠ বিজয়ী শিবরাম কারান্ত, ইউ. আর. অনন্তমূর্তি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যকার গিরিশ কারনাডের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ অর্জনে (মোট ৮ বার বিজয়ী) ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়া এবং ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

কন্নড় সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই বৈচিত্র্যময়, শাস্ত্রীয় ও যুগোপযোগী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. চম্পু-কাব্য ও প্রাচীন মহাকাব্য (Champu-Kavya & Ancient Epics): কন্নড় সাহিত্যের আদি ও মধ্যযুগীয় স্বর্ণালী ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণ ‘চম্পু’ শৈলীর ওপর। খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে আদিকবি পম্পা মহাভারতের পটভূমিতে যে ‘পম্পা ভারত’ রচনা করেছিলেন, তা কন্নড় ভাষার এক অনন্য মহাকাব্যিক ভিত্তি।

খ. বচন ও কীর্তন সাহিত্য (Vachana & Kirtana Literature): দ্বাদশ শতাব্দীতে কন্নড় সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব সুরময় ও কাব্যিক বিপ্লব ঘটে। মহাত্মা বাসবেশ্বর ও আক্কা মহাদেবীর মতো সাধকেরা অত্যন্ত সহজ সরল কন্নড় গদ্য-পদ্যের মিশ্রণে ‘বচন’ (Vachana) রচনা করেন, যা ছিল একাধারে আধ্যাত্মিক সুধা ও সমাজ সংস্কারের বাণী। পরবর্তীতে পুরন্দর দাসের হাত ধরে ‘কীর্তন’ বা কর্ণাটকী সংগীতের সাহিত্যিক ধারা সমৃদ্ধ হয়।

গ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে কন্নড় কথাসাহিত্য সামাজিক বাস্তবতাবাদের এক নতুন চূড়া স্পর্শ করে। শিবরাম কারান্তের আঞ্চলিক জনজীবনভিত্তিক মহাকাব্যিক উপন্যাস এবং পরবর্তীতে ইউ. আর. অনন্তমূর্তির হাত ধরে কন্নড় কথাসাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক, অস্তিত্ববাদী ও উত্তর-আধুনিক ধারার সার্থক প্রকাশ ঘটে, যা বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও আধুনিক রঙ্গমঞ্চ (Drama & Modern Theatre): কন্নড় নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটার সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী। গিরিশ কারনাডের হাত ধরে কন্নড় নাটক লোকপুরাণ ও ইতিহাসকে সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতি ও মানব মনস্তত্ত্বের সাথে মিলিয়ে এক আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। তাঁর নাটকগুলো ইংরেজি, বাংলাসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষায় নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

কন্নড় সাহিত্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি, বর্ণপ্রথা এবং সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও আপসহীন প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • বচন আন্দোলন (দ্বাদশ শতাব্দী): এটিকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আদি প্রগতিশীল আন্দোলন বলা যায়। বাসবেশ্বরের নেতৃত্বে এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল সমাজ থেকে জাতপাত দূর করা, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং শ্রমের মর্যাদা (কায়াকাবে কৈলাসা) দেওয়া, যা বচন সাহিত্যের মূল উপজীব্য ছিল।
  • নব্য ও প্রগতিশীল আন্দোলন (Navya Movement): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কন্নড় সাহিত্যে ‘নব্য’ বা আধুনিকতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। ইউ. আর. অনন্তমূর্তির ‘সংস্কার’ (Sanskara) উপন্যাসের মাধ্যমে কন্নড় সমাজের রক্ষণশীলতা, ব্রাহ্মণ্যবাদের ভণ্ডামি এবং মানুষের নৈতিক স্খলনকে তীব্রভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয়।
  • বান্ডায়া ও দলিত আন্দোলন (Bandaya Movement): ১৯৭০-এর দশকে কন্নড় সাহিত্যে ‘বান্ডায়া’ (বিদ্রোহী) এবং দলিত সাহিত্য আন্দোলনের জন্ম হয়। “সাহিত্য যদি শোষিত মানুষের অস্ত্র না হতে পারে, তবে তা অর্থহীন”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রান্তিক, ভূমিহীন কৃষক এবং অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের অধিকারের প্রগতিশীল লড়াই কন্নড় সাহিত্যে এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

কন্নড় সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • পম্পা (১০ম শতাব্দী): কন্নড় সাহিত্যের ‘আদিকবি’। তাঁর ‘বিক্রমার্জুন বিজয়’ (পম্পা ভারত) কন্নড় ভাষার শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক মহাকাব্য।
  • বাসবেশ্বর / বাসভান্না (১১০৫–১১৬৭): মহান সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক ও বচন সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যাঁর সহজ সরল বাণী কন্নড় সমাজ ও সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
  • কে. শিবরাম কারান্ত (১৯০২–১৯৯৭): কন্নড় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, পরিবেশবাদী ও ১৯৭৭ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। কেরালা ও কর্ণাটকের উপকূলীয় জীবন নিয়ে লেখা তাঁর ‘চোমান দুদি’ (Choma’s Drum) উপন্যাসটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক দলিল।
  • কুভেম্পু / কে. ভি. পুত্তাপ্পা (১৯০৪–১৯৯৪): কন্নড় সাহিত্যের ‘রাষ্ট্রকবি’ এবং প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী (১৯৬৭)। রামায়ণের আধুনিক ও প্রগতিশীল রূপান্তর ‘শ্রী রামায়ণ দর্শনম’ তাঁর অমর কীর্তি।
  • ইউ. আর. অনন্তমূর্তি (১৯৩২–২০১৪): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কথাসাহিত্যিক, সমালোচক ও ১৯৯৪ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘সংস্কার’ ও ‘ভারতীপুরা’ উপন্যাস সমসাময়িক ভারতীয় সাহিত্যের অবিসংবাদিত মাইলফলক।
  • গিরিশ রঘুনাথ কারনাড (১৯৩৮–২০১৯): বিশ্বখ্যাত প্রগতিশীল নাট্যকার, অভিনেতা ও ১৯৯৮ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘তুঘলক’, ‘হায়বদন’ এবং ‘নাগামন্ডল’ নাটকগুলো ভারতীয় নাট্যসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়েছে।

 

শ্রীঅঙ্গম শ্রীনিবাস রাও
শ্রীঅঙ্গম শ্রীনিবাস রাও

 

তেলুগু সাহিত্য

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্য এবং পুদুচেরির ইয়ানাম অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত তেলুগু ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম সুমিষ্ট ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। প্রতিটি শব্দের শেষে স্বরবর্ণের (Vowel) সুমিষ্ট ব্যবহারের জন্য ইউরোপীয় পরিব্রাজকেরা একে ‘প্রাচ্যের ইতালীয়’ (The Italian of the East) নামে অভিহিত করেছিলেন। একাদশ শতাব্দীর ‘কবিত্রেয়ম’ (তিন কবি)-এর হাত ধরে মহাভারতের তেলুগু অনুবাদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজকীয় দরবার এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা তেলুগু সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে রাগপ্রধান গীতিময়তা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল ও গণমুখী নাটক এবং তীব্র সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। তেলুগু সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল লেখক সংঘ (Abhyudaya Rachayitala Sangham), তেলেঙ্গানার সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের রক্তক্ষয়ী আখ্যান এবং সত্তরের দশকের বিপ্লবী দিগম্বর (Digambara) আন্দোলনের মতো শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক অত্যন্ত উগ্র, গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে আদিকবি নন্নয়া, ভক্ত কবি ত্যাগরাজ, আধুনিক গদ্যের জনক কন্দুকুরি বীরেশলিঙ্গম, জ্ঞানপীঠ বিজয়ী বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ এবং বিপ্লবী কবি শ্রী শ্রী (শ্রীঅঙ্গম শ্রীনিবাস রাও)-এর মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ধ্রুপদী মর্যাদার (Classical Status) সাথে গণমানুষের বৈপ্লবিক সুরের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

তেলেগু সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই ছন্দোময়, ধ্রুপদী ও বৈপ্লবিক যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. মহাকাব্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্য (Epics & Prabandha Literature): তেলুগু সাহিত্যের আদি ও মধ্যযুগীয় স্বর্ণালী ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সংস্কৃত মহাকাব্যের সার্থক তেলুগু অনুবাদের ওপর। নন্নয়া, তিক্কনা ও যেররা প্রজ্ঞাদ—এই তিন কবি (কবিত্রেয়ম) মহাভারতকে তেলুগু সংস্কৃতির রসে জারিত করে অনুবাদ করেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে কৃষ্ণদেব রায়ের আমলে ‘প্রবন্ধ’ (Prabandha) নামক এক অনন্য ও অলঙ্কৃত কাব্যধারার জন্ম হয়, যা তেলুগু সাহিত্যের এক অনন্য নান্দনিক মাইলফলক।

খ. বাগময় কীর্তন ও পদাবলী (Kirtana & Devotional Lyrics): তেলুগু ভাষা কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান বাহন। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাধু ত্যাগরাজ, ক্ষেত্রয়‍্যা এবং অন্নমাচার্যের রচিত হাজার হাজার ভক্তিগীতি ও কীর্তন তেলুগু কবিতাকে সুর, লয় ও আধ্যাত্মিক সুধার এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে, যা আজ সমগ্র দক্ষিণ ভারতের সংগীতের প্রাণ।

গ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): উনিশ শতকের শেষে কন্দুকুরি বীরেশলিঙ্গমের হাত ধরে তেলুগু উপন্যাসের আধুনিক ও সমাজ সংস্কারমূলক যাত্রা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে তেলুগু কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেয়। গ্রামীণ অন্ধ্রপ্রদেশের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, জাতিভেদ প্রথা এবং তেলেঙ্গানার সাধারণ মানুষের তীব্র জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে রাভি শাস্ত্রী ও কালিপত্তনম রামারাওয়ের মতো লেখকেরা যে কথাসাহিত্য রচনা করেছেন, তা বিশ্বমানের সমকক্ষ।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও লোকরঙ্গমঞ্চ (Drama & Folk Theatre): তেলুগু নাট্যসাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। গুরুজাদা আপ্পারাওয়ের ‘কন্যাকুল্কম’ (Kanyasulkam) নাটকটি তৎকালীন সমাজের বাল্যবিবাহ ও পণপ্রথার মূলে তীব্র আঘাত হেনে তেলুগু নাটককে আধুনিক রূপ দেয়। পরবর্তীতে লোকজ আঙ্গিক ও ‘বুরাকথা’ (Burrakatha) শৈলী ব্যবহার করে নাটককে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচার ও গণজাগরণের হাতিয়ারে রূপান্তর করা হয়।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

তেলুগু সাহিত্যে পুঁজিবাদ, সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি প্রথা এবং রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ও উগ্র গণআন্দোলনের এক অনন্য প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • অভ্যুদয় রচয়িতল সংঘম (ARASAM / Progressive Writers’ Association): ১৯৪৩ সালে তেলুগু সাহিত্যে প্রগতিশীল লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়। এর ফলে সাহিত্যে রাজদরবারের রোমান্টিকতা ছুঁড়ে ফেলে কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর এবং শোষিত কৃষকদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও মার্ক্সীয় দর্শনের এক শক্তিশালী জোয়ার আসে। কবি শ্রী শ্রী-র ‘মহা প্রস্থানম’ (Maha Prasthanam) কাব্যগ্রন্থটি এই প্রগতিশীল আন্দোলনের বাইবেল হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহ ও গণসাহিত্য: ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের তেলেঙ্গানার সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ তেলুগু সাহিত্যকে সম্পূর্ণ গণমুখী করে তোলে। সুদ্দাল হনুমন্তু এবং যাদাগিরির মতো লোককবিদের লেখা গান ও কবিতা সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে শোষিত মানুষের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।
  • দিগম্বর ও বিপ্লবী কবি আন্দোলন (Digambara & Virasam): ১৯৬০-এর দশকের শেষে তেলুগু কবিতায় ‘দিগম্বর’ (নগ্ন বা আবরণহীন) আন্দোলনের জন্ম হয়, যা ছিল বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত। পরবর্তীতে নক্সালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবে ‘বিপ্লবী লেখক সংঘ’ (Virasam) গঠিত হয়, যা তেলুগু সাহিত্যকে সমাজ পরিবর্তনের এক জলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

তেলুগু সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • নন্নয়া (১১শ শতাব্দী): তেলুগু সাহিত্যের ‘আদিকবি’ বা ‘বাগানুশাসন’। তিনি মহাভারতের প্রথম তেলুগু অনুবাদ শুরু করে এই ভাষার সাহিত্যিক ও ব্যাকরণগত আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
  • শ্রীনাথ (১৩৬৫–১৪৪০): মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রথাবিরোধী ও স্বাধীনচেতা কবি, যিনি রাজদরবারের বিলাসিতা এবং সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য—উভয়কেই অত্যন্ত জীবন্ত ও অলঙ্কৃত কাব্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
  • কন্দুকুরি বীরেশলিঙ্গম (১৮৪৮–১৯১৯): আধুনিক তেলুগু গদ্যের জনক ও মহান সমাজ সংস্কারক। তিনি একাধারে প্রথম তেলুগু উপন্যাস ‘রাজশেখর চরিত্রম’-এর রচয়িতা, নাট্যকার ও সাংবাদিক, যিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে নারী শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
  • গুরুজাদা আপ্পারাও (১৮৬২–১৯১৫): আধুনিক তেলুগু সাহিত্যের প্রখ্যাত নাট্যকার ও কবি। তাঁর কালজয়ী সামাজিক নাটক ‘কন্যাকুল্কম’ তেলুগু সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
  • বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ (১৮৯৫–১৯৭৬): তেলুগু সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং তেলুগু ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী (১৯৭০)। তাঁর মহাকাব্য ‘রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু’ তেলুগু ধ্রুপদী কাব্যের এক অনন্য নিদর্শন।
  • শ্রী শ্রী / শ্রীঅঙ্গম শ্রীনিবাস রাও (১৯১০–১৯৮৩): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল ও বিপ্লবী কবি। তাঁর রচিত ‘মহা প্রস্থানম’ ভারতীয় সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত প্রগতিশীল ক্লাসিক, যা তাঁকে তেলুগু সাহিত্যের ‘মহাকবি’ হিসেবে অমর করে রেখেছে।

 

ভালচন্দ্র ভানাজি নেমাদে
ভালচন্দ্র ভানাজি নেমাদে

 

মারাঠি সাহিত্য

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য, গোয়া এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ জুড়ে বিস্তৃত মারাঠি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। ত্রয়োদশ শতাব্দীর সন্ত জ্ঞানেশ্বরের ‘জ্ঞানেশ্বরী’ এবং সন্ত তুকারামের প্রথাবিরোধী ‘অভঙ্গ’ ভক্তিগীতি থেকে শুরু করে শিবাজী মহারাজের আমলের বীরত্বগাথা (পোবাডা) এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা মারাঠি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কবিতা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল ও পরীক্ষামূলক নাটক এবং সমসাময়িক মননশীল প্রবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। মারাঠি সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল রূপান্তর এবং ষাট ও সত্তরের দশকে গড়ে ওঠা বৈপ্লবিক ‘দলিত সাহিত্য আন্দোলন’ (Dalit Literature Movement)-এর এক অত্যন্ত উগ্র, গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যা সমগ্র ভারতের সমাজ ও সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এখানে কুসুমাগ্রজ (বিষ্ণু বামন শিরওয়াদকর), জ্ঞানপীঠ বিজয়ী বি. এস. মার্ডেকর, বিজয় তেন্ডুলকর এবং নামদেও ধাসালের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের আপসহীন লড়াইয়ের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

মারাঠি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই গতিশীল, বৈচিত্র্যময় ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. অভঙ্গ, পোবাডা ও ঐতিহ্যবাহী কাব্য (Bhakti & Heroic Poetry): মারাঠি সাহিত্যের আদি ও মধ্যযুগীয় ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘ওয়ারকারী’ (Warkari) সন্তদের ওপর। সন্ত জ্ঞানেশ্বর, তুকারাম, একনাথ এবং জনা বাঈয়ের মতো সাধুদের রচিত ‘অভঙ্গ’ (Abhang) নামক ভক্তিগীতি মারাঠি সংস্কৃতির প্রাণ। পরবর্তীতে মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে ‘পোবাডা’ (Povada) নামক এক অনন্য বীরত্বগাথামূলক কাব্যধারার জন্ম হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের তীব্র উদ্দীপনা জোগাত।

খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): উনিশ শতকের শেষে হরি নারায়ণ আপতের হাত ধরে মারাঠি সামাজিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে মারাঠি কথাসাহিত্য মানুষের অস্তিত্ব সংকট ও গ্রামীণ জীবনকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে। বি. এস. মার্ডেকরের মনস্তাত্ত্বিক ধারা এবং পরবর্তীতে ভি. এস. খাণ্ডেকর ও রঞ্জিত দেশাইয়ের ঐতিহাসিক ও বাস্তবতাবাদী লেখনী মারাঠি উপন্যাসকে বিশ্বমানের উচ্চতায় নিয়ে যায়।

গ. নাট্যসাহিত্য ও আধুনিক থিয়েটার (Drama & Avant-Garde Theatre): মারাঠি নাট্যসাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ সমগ্র ভারতের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী, সাহসী ও প্রভাবশালী। মধ্যযুগের সংগীতনাট্যের ঐতিহ্য থেকে বের হয়ে বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ করে বিজয় তেন্ডুলকরের হাত ধরে মারাঠি নাটক চরম বাস্তবতাবাদ, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং মানুষের অবদমিত হিংস্র মনস্তত্ত্বকে যেভাবে মঞ্চে তুলে এনেছে, তা আন্তর্জাতিক থিয়েটারের সমকক্ষ।

ঘ. দলিত আত্মজীবনী ও অন্ত্যজ গদ্য (Dalit Autobiographies): মারাঠি সাহিত্যের একটি অনন্য এবং অত্যন্ত শক্তিশালী জনরা হলো দলিত আত্মজীবনী। হাজার বছর ধরে শোষিত মানুষেরা যখন নিজেদের জীবনের যন্ত্রণাকে গদ্যে রূপ দিতে শুরু করেন, তখন তা কোনো কাল্পনিক গল্প না হয়ে সমাজ পরিবর্তনের এক জলন্ত দলিলে পরিণত হয়, যা বিশ্বসাহিত্যে কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যের (Black Literature) সমতুল্য।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

মারাঠি সাহিত্যে ব্রাহ্মণ্যবাদ, জাতিভেদ প্রথা, লিঙ্গবৈষম্য এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ও প্রাতিষ্ঠানিক লড়াইয়ের এক গৌরবময় প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ও সত্যশোধক আন্দোলন: উনিশ শতকে মহাত্মা ফুলে এবং তাঁর স্ত্রী সাবিত্রীবাই ফুলের হাত ধরে মারাঠি সাহিত্যে প্রগতিশীল ও সমাজ সংস্কারমূলক ধারার বীজ রোপিত হয়। তাঁদের লেখনীতে প্রথম অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও নারী শিক্ষার দাবি জোরালোভাবে ওঠে।
  • দলিত সাহিত্য আন্দোলন ও প্যান্থার্স দ্রোহ (১৯৬০-৭০ এর দশক): ড. বি. আর. আম্বেদকরের দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে মারাঠি তরুণ সাহিত্যিকেরা ‘দলিত প্যান্থার্স’ (Dalit Panthers) গঠন করেন। নামদেও ধাসাল, বাবুরাও বাগূল এবং অর্জুন ডাংলের মতো লেখকেরা ঐতিহ্যবাহী মার্জিত ভাষার ছাঁচ ভেঙে বস্তির ভাষা, ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে সাহিত্যে তুলে আনেন। বাবুরাও বাগূলের ছোটগল্পের সংকলন ‘জেবহা মি জাত চোরলি হোতি’ (When I Had Concealed My Caste) ভারতীয় প্রগতিশীল সাহিত্যের ইতিহাসে একটি চরম বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ ঘটায়।
  • নারীবাদী প্রগতিশীল ধারা: খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকেই তারাবাঈ শিন্ডের লেখা ‘স্ত্রী পুরুষ তুলনা’ (Stri Purush Tulana) গ্রন্থটিকে ভারতের প্রথম আধুনিক নারীবাদী ইশতেহার হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মারাঠি সাহিত্যের চিরন্তন প্রগতিশীল চেতনার প্রমাণ।

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

মারাঠি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • সন্ত তুকারাম (১৬০৮–১৬৪৯): মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রথাবিরোধী মারাঠি সাধু-কবি। তাঁর অত্যন্ত সহজ অথচ ক্ষুরধার ‘অভঙ্গ’ কাব্য তৎকালীন ধর্মীয় গোঁড়ামি ও জাতপাতের বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত ছিল।
  • ভি. এস. খাণ্ডেকর (১৮৯৮–১৯৭৬): মারাঠি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ এবং মারাঠি ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী (১৯৭৪)। মহাভারতের খলচরিত্র যযাতির রূপকে আধুনিক মানুষের অন্তহীন লোভ ও কামনার মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা তাঁর ‘যযাতি’ (Yayati) উপন্যাসটি বিশ্বমানের ক্লাসিক।
  • কুসুমাগ্রজ / ভি. বা. শিরওয়াদকর (১৯১২–১৯৯৯): মারাঠি সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রগতিশীল কবি, নাট্যকার ও ১৯৮৭ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ ‘বিশাখা’ এবং কালজয়ী নাটক ‘নটসম্রাট’ মারাঠি সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
  • বিজয় তেন্ডুলকর (১৯২৮–২০০৮): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল নাট্যকার ও চলচ্চিত্র চিত্রনাট্যকার। তাঁর ‘শান্ততা! কোর্ট চালু আহে’ (Silence! The Court is in Session), ‘घाशीराम कोतवाल’ (Ghashiram Kotwal) এবং ‘সখারাম বাইন্ডার’ নাটকগুলো ক্ষমতার রাজনীতি ও সমাজের ভণ্ডামিকে অত্যন্ত নগ্ন ও আপসহীনভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছে।
  • নামদেও ধাসাল (১৯৪৯–২০১৪): ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী কবি এবং দলিত প্যান্থার্স আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘গোলপিঠা’ (Golpitha)—যা মুম্বাইয়ের রেড-লাইট এলাকার অন্ধকার জীবন নিয়ে লেখা—তা আধুনিক ভারতীয় কবিতার সমস্ত চেনা নান্দনিকতার ছক ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
  • ভালচন্দ্র ভানাজি নেমাদে (১৯৩৮—বর্তমান): বিখ্যাত উত্তর-আধুনিক মারাঠি ঔপন্যাসিক, কবি ও ২০১৪ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘কোসলা’ (Cocoon) এবং মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘হিন্দু’ সমসাময়িক ভারতীয় কথাসাহিত্যের গতিপথ বদলে দেওয়া অন্যতম সৃষ্টি।

 

ঝাভারচাঁদ মেঘানি
ঝাভারচাঁদ মেঘানি

 

গুজরাটি সাহিত্য

ভারতের গুজরাট রাজ্য, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ছাড়াও বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল ও প্রভাবশালী গুজরাটি ব্যবসায়ী প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত গুজরাটি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক মাধ্যম। দ্বাদশ শতাব্দীর জৈন সাহিত্য ও পঞ্চদশ শতাব্দীর আদি কবি নরসিংহ মেহতার মরমী কৃষ্ণভক্তি কাব্য থেকে শুরু করে মধ্যযুগের আখ্যান-কবিতা এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা গুজরাটি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে ভক্তি ও সুফী গীতিময়তা, সমাজসংস্কারমূলক গদ্য, মননশীল আত্মজীবনী এবং আধুনিক বাস্তবতাবাদী কথাসাহিত্যের (উপন্যাস ও ছোটগল্প) মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। গুজরাটি সাহিত্যে উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন, মহাত্মা গান্ধীর প্রবর্তিত সত্য ও অহিংসার ‘গান্ধী যুগ’ (Gandhi Yug) এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক ও দলিত চেতনার এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে নরসিংহ মেহতা, গোবর্ধনরাম ত্রিপাঠী, মহাত্মা গান্ধী, উমাশঙ্কর যোশী এবং কে. এম. মুন্সী-র মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভাষার প্রাঞ্জলতা, গভীর নৈতিক মূল্যবোধ এবং অহিংসার প্রগতিশীল দর্শনের নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

কে. এম. মুন্সী
কে. এম. মুন্সী

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

গুজরাটি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মননশীল, ঐতিহ্যবাহী ও জীবনমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. ভজন, পদাবলী ও মরমী কাব্য (Bhajan & Devotional Poetry): গুজরাটি সাহিত্যের আদি ও মূল প্রাণই হলো এর সুরময় ভজন ও পদাবলী। আদি কবি নরসিংহ মেহতার হাত ধরে ‘প্রভাতীয়া’ (সকালের ভক্তিগীতি) ধারার জন্ম হয়, যার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘বৈষ্ণব জন তো তেনে কহিয়ে’ মহাত্মা গান্ধীর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। এছাড়া মধ্যযুগের মীরা বাঈ এবং পরবর্তী সময়ে দয়ারামের ‘গর্বী’ (Garbi) কাব্যধারা গুজরাটি কবিতাকে প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নান্দনিক উচ্চতা দান করেছে।

খ. আখ্যান ও পদ্য-গল্প (Akhyana & Narrative Poetry): মধ্যযুগে কবি প্রেমানন্দ ভট্টের হাত ধরে ‘আখ্যান’ (Akhyana) নামক এক অনন্য জনরা গুজরাটি সাহিত্যে চরম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি মাটির পাত্রে আঙুল দিয়ে সুর তুলে (মানভট্ট শৈলী) রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের গল্পগুলোকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে অত্যন্ত রসাত্মক ও জীবন্ত কাব্যিক রূপ দিতেন, যা কন্নড়ের বচন বা বাংলার মঙ্গলকাব্যের মতোই এক অনন্য লোকঐতিহ্য।

গ. কথাসাহিত্য: মহাকাব্যিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Epic Novels & Short Stories): গোবর্ধনরাম ত্রিপাঠীর চার খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘সরস্বতীচন্দ্র’ (Saraswatichandra) গুজরাটি কথাসাহিত্যের এক অবিসংবাদিত ক্লাসিক মাইলফলক। বিংশ শতাব্দীতে কে. এম. মুন্সীর ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং ধূমকেতু (গৌরিশঙ্কর যোশী)-র হাত ধরে গুজরাটি ছোটগল্প মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও বাস্তবতার দিক থেকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ হয়ে ওঠে।

ঘ. আত্মজীবনী ও মননশীল গদ্য (Autobiographies & Ethical Prose): গুজরাটি সাহিত্যে আত্মজীবনী ও মননশীল প্রবন্ধের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্য রয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর সহজ, সরল ও অলঙ্কারহীন গদ্যশৈলী সমগ্র ভারতীয় গদ্যের ব্যাকরণকে বদলে দিয়েছিল। তাঁর লেখা আত্মজীবনী বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত এবং প্রভাবশালী গদ্য গ্রন্থ।

মহাত্মা গান্ধী
মহাত্মা গান্ধী

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

গুজরাটি সাহিত্যে ধর্মীয় কুসংস্কার, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, অস্পৃশ্যতা এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ার এক অত্যন্ত গভীর প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • গান্ধী যুগ ও সামাজিক মুক্তি (১৯১৫–১৯৪৮): মহাত্মা গান্ধীর গুজরাটে আগমন ও ‘গুজরাট বিদ্যাপীঠ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুজরাটি সাহিত্যে এক বিশাল প্রগতিশীল বিপ্লব ঘটে। সাহিত্য রাজদরবার ও উচ্চবিত্তের বিলাসিতা ছেড়ে হরিজন (দলিত), দরিদ্র কৃষক, মিল শ্রমিক এবং নারীদের অধিকারের কথা বলতে শুরু করে। উমাশঙ্কর যোশী ও ঝাভেরচাঁদ মেঘাণীর কবিতায় সামন্তবাদ বিরোধী দ্রোহ ও জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল বাণী উচ্চকিত হয়।
  • দলিত ও প্রান্তিক সাহিত্যের উত্থান: আশির দশক থেকে গুজরাটি সাহিত্যে জোসেফ ম্যাকওয়ান (তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আঙ্গালিয়াত’-এর মাধ্যমে) এবং দলিত কবিদের হাত ধরে এক শক্তিশালী প্রগতিশীল আন্দোলন শুরু হয়। গ্রামীণ গুজরাটের জাতপাত, অস্পৃশ্যতা এবং প্রান্তিক মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও অধিকারের লড়াই সাহিত্যে এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করে।

 

গোবর্ধনরাম ত্রিপাঠী
গোবর্ধনরাম ত্রিপাঠী

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

গুজরাটি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • নরসিংহ মেহতা (১৪১৪–১৪৮১): গুজরাটি সাহিত্যের ‘আদি কবি’। তাঁর মরমী ও অসাম্প্রদায়িক ভক্তিগীতি গুজরাটি ভাষা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
  • গোবর্ধনরাম ত্রিপাঠী (১৮৫৫–১৯০৭): আধুনিক গুজরাটি সাহিত্যের পুরোধা। তাঁর রচিত ‘সরস্বতীচন্দ্র’ উপন্যাসটি তৎকালীন ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও দর্শনের এক মহাকাব্যিক দলিল।
  • মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯–১৯৪৮): ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পুরোধা এবং গুজরাটি গদ্যের এক মহান রূপকার। তাঁর ‘সত্যের পরীক্ষা’ (An Autobiography: The Story of My Experiments with Truth) গ্রন্থটি বিশ্বমানের প্রগতিশীল ও মানবিক গদ্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
  • কে. এম. মুন্সী (১৮৮৭–১৯৭১): বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, ঐতিহাসিক ও ভারতীয় বিদ্যাভবনের প্রতিষ্ঠাতা। গুজরাটের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে লেখা তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস—যার মধ্যে ‘পাটন নী প্রভূতানি’ অন্যতম—তা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
  • উমাশঙ্কর জেঠালাল যোশী (১৯১১–১৯৮৮): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কবি, প্রাবন্ধিক এবং ১৯৬৭ সালে গুজরাটি ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘নিশীথ’ কাব্যগ্রন্থ এবং প্রগতিশীল সামাজিক নাটকগুলো গুজরাটি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
  • ঝাভারচাঁদ মেঘানি (১৮৯৬–১৯৪৭): লোকসংস্কৃতিবিদ, কবি ও ঔপন্যাসিক, যাঁকে মহাত্মা গান্ধী ‘রাষ্ট্রীয় শায়ের’ (জাতীয় কবি) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর বীরত্বগাথা ও লোকগীতি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুক্তিকামী মানুষকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
  • জোসেফ ম্যাকওয়ান (১৯৩৬–২০১০): প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও দলিত ঔপন্যাসিক। গুজরাটি সাহিত্যের প্রথম দলিত উপন্যাস ‘আঙ্গালিয়াত’ (The Stepchild)-এর জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের এক অনন্য দলিল।

 

ভবেন্দ্র নাথ শইকীয়া
ভবেন্দ্র নাথ শইকীয়া

 

অসমীয়া সাহিত্য

ভারতের আসাম রাজ্য এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত অসমীয়া ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক মাধ্যম। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীর আদি কবি মাধব কন্দলীর ‘সপ্তকাণ্ড রামায়ণ’ এবং পরবর্তী সময়ে মধ্যযুগের মহান সমাজ সংস্কারক ও মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেবের হাত ধরে অসমীয়া সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব নবজাগরণ ঘটে; বিশেষ করে অনন্য থিয়েটার-কাব্য (অঙ্কীয়া নাট), আহোম রাজদরবারের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণী গ্রন্থ ‘বুৰঞ্জী’ (Buranji) এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা অসমীয়া কথাসাহিত্যের (উপন্যাস ও ছোটগল্প) মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। অসমীয়া সাহিত্যে উনিশ শতকের অরুণোদই (Orunodoi) যুগ, বিংশ শতকের জোনাকী (Jonaki) আন্দোলন এবং উত্তর-আধুনিক প্রগতিশীল ও প্রান্তিক অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে রসাচার্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, জ্ঞানপীঠ বিজয়ী বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবাস্তববাদী লেখিকা ইন্দিরা গোস্বামী (মামণি রয়সম গোস্বামী)-র মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন রাজকীয় ঐতিহাসিক গদ্যের ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

শ্রীমন্ত শংকরদেব
শ্রীমন্ত শংকরদেব

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

অসমীয়া সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, ঐতিহাসিক ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বৈষ্ণব ভক্তিগীতি ও বরগীত (Bhakti & Borgeet Poetry): অসমীয়া সাহিত্যের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীর নব্য-বৈষ্ণব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব ও তাঁর প্রধান শিষ্য মাধবদেবের রচিত ‘বরগীত’ (Borgeet) বা ধ্রুপদী ভক্তিগীতি এবং ‘কীর্তন ঘোষা’ অসমীয়া সংস্কৃতির প্রাণ। এই আধ্যাত্মিক কবিতাগুলো সমাজকে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে।

খ. বুৰঞ্জী ও রাজকীয় ঐতিহাসিক গদ্য (Buranji & Historical Prose): অসমীয়া সাহিত্যের সবচেয়ে অনন্য এবং বিশ্বখ্যাত জনরা হলো ‘বুৰঞ্জী’। আহোম রাজাদের আমলে (ত্রয়োদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী) রাজদরবারের সমস্ত রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ ও কূটনৈতিক বিবরণ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গদ্যে লিপিবদ্ধ করা হতো। যখন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সাহিত্যে কেবল পদ্যের আধিপত্য ছিল, তখন আসামে বুৰঞ্জীর মাধ্যমে এক অত্যন্ত আধুনিক ও বাস্তবসম্মত ঐতিহাসিক গদ্য সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছিল।

গ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে এসে অসমীয়া কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী রূপ ধারণ করে। লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার হাত ধরে অসমীয়া ছোটগল্পের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক উপন্যাস এবং ইন্দিরা গোস্বামীর লেখনী আসামের গ্রামীণ জীবন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং প্রান্তিক মানুষের তীব্র জীবনসংগ্রামকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ করে তোলে।

ঘ. অঙ্কীয়া নাট ও ভাওনা (Ankiya Nat & Traditional Theatre): শ্রীমন্ত শংকরদেব কর্তৃক প্রবর্তিত ‘অঙ্কীয়া নাট’ (এক অঙ্কের নাটক) অসমীয়া নাট্যসাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক। ‘ব্রজাবলী’ নামক এক বিশেষ কৃত্রিম ভাষায় রচিত এই নাটকগুলো এবং এর মঞ্চায়ন বা ‘ভাওনা’ (Bhaona) উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকথিয়েটারের আদি ও সার্থক রূপ, যা আজও আসামের সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।

ইন্দিরা গোস্বামী - মামণি রয়সম গোস্বামী
ইন্দিরা গোস্বামী – মামণি রয়সম গোস্বামী

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

অসমীয়া সাহিত্যে সামন্তবাদ, জাতিভেদ প্রথা, আসামের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • শংকরদেবের সামাজিক সাম্য আন্দোলন: মধ্যযুগীয় আসামের চরম জাতিভেদ ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে শংকরদেবের বৈষ্ণব আন্দোলন ছিল এক অত্যন্ত প্রগতিশীল বিপ্লব। তাঁর সাহিত্যে উপজাতি, অন্ত্যজ এবং মুসলিমদেরও (যেমন সাধু জিকির রচয়িতা আজান ফকির) স্থান দেওয়া হয়েছিল, যা অসমীয়া সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ভিত্তি গড়ে তোলে।
  • জোনাকী যুগ ও প্রগতিশীল নবজাগরণ: ১৮৮৯ সালে ‘জোনাকী’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আধুনিক অসমীয়া সাহিত্যে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। সাহিত্য রাজদরবারের বৃত্ত থেকে বের হয়ে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব, দেশপ্রেম এবং কুসংস্কার বিরোধী প্রগতিশীল বাণী প্রচার করতে শুরু করে।
  • বামপন্থী চেতনা ও উগ্র বাস্তবতাবাদ: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (বিপ্লবী সাংস্কৃতিক পুরোধা) এবং বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার হাত ধরে অসমীয়া সাহিত্যে সরাসরি মার্ক্সীয় দর্শন ও মেহনতি মানুষের বিপ্লবের বাণী প্রতিফলিত হয়। পরবর্তীতে ভবেন্দ্র নাথ শইকীয়া এবং ইন্দিরা গোস্বামীর লেখনীতে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, লিঙ্গবৈষম্য, শ্রেণীসংগ্রাম এবং আসামের রাজনৈতিক অস্থিরতার ট্র্যাজেডি অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল রূপ লাভ করে।

 

বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য
বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

অসমীয়া সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • শ্রীমন্ত শংকরদেব (১৪৪৯–১৫৬৮): অসমীয়া জাতি, ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান স্থপতি। এই মহান সাধু, কবি, নাট্যকার ও সমাজ সংস্কারকের একক অবদান অসমীয়া সংস্কৃতিকে এক অনন্য ও চিরন্তন রূপ দিয়েছে।
  • মাধব কন্দলী (চতুর্দশ শতাব্দী): অসমীয়া সাহিত্যের অন্যতম আদি কবি। তাঁর অনূদিত ‘সপ্তকাণ্ড রামায়ণ’ হলো উত্তর ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে প্রথম রামায়ণের সার্থক অনুবাদ।
  • লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া (১৮৬৪–১৯৩৮): আধুনিক অসমীয়া সাহিত্যের ‘রসাচার্য’ এবং জাতীয় কবি। তাঁর কবিতা ‘ও মোর আপোনার দেশ’ বর্তমানে আসামের জাতীয় সঙ্গীত। তিনি একাধারে শ্রেষ্ঠ গল্পকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
  • বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য (১৯২৪–১৯৯৭): অসমীয়া সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল ঔপন্যাসিক এবং ১৯৭৯ সালে অসমীয়া ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। আসামের উপজাতিদের জীবন ও রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে লেখা তাঁর ‘ঈয়ারুইঙ্গম’ (Iyaruingam) এবং ‘মৃত্যুঞ্জয়’ উপন্যাস দুটি ভারতীয় কথাসাহিত্যের মহাকাব্যিক মাইলফলক।
  • ইন্দিরা গোস্বামী / মামণি রয়সম গোস্বামী (১৯৪২–২০১১): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখিকা, সমাজকর্মী ও ২০০০ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘দাঁতাল হাতীর উয়ে খোয়া হাওদা’ (The Moth-Eaten Howdah of the Tusker) উপন্যাস এবং উলফা (ULFA) উগ্রপন্থীদের সাথে ভারত সরকারের মধ্যস্থতায় তাঁর বৈপ্লবিক শান্তিপ্রক্রিয়ার ভূমিকা তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে।
  • ভবেন্দ্র নাথ শইকীয়া (১৯৩২–২০০৩): প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক, যাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসগুলো অসমীয়া মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও মানবীয় সম্পর্কের এক অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত দলিল।

 

প্রতিভা রায়
প্রতিভা রায়

 

ওড়িয়া সাহিত্য

ভারতের ওড়িশা রাজ্য এবং ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ওড়িয়া ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় (Classical) সাহিত্যিক মাধ্যম। দশম-একাদশ শতাব্দীর আদি নিদর্শন ‘বৌদ্ধ গান ও দোহা’ (চর্যাপদের সমসাময়িক) এবং পঞ্চদশ শতাব্দীতে শূদ্রমুনি সারলা দাসের ‘ওড়িয়া মহাভারত’ দিয়ে এর মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়; বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী গীতি-কাব্য, মধ্যযুগীয় অলঙ্কৃত রীতিকাব্য এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা ওড়িয়া কথাসাহিত্যের (উপন্যাস ও ছোটগল্প) মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। ওড়িয়া সাহিত্যে ঊনবিংশ শতকের আধুনিক নবজাগরণ, বিংশ শতকের প্রগতিশীল ‘সবুজ যুগ’ ও ‘সত্যবাদী যুগ’ এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক ও আদিবাসী অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে ব্যাসকবি ফকির মোহন সেনাপতি, স্বভাবকবি গঙ্গাধর মেহের, জ্ঞানপীঠ বিজয়ী গোপীনাথ মহান্তি, সচ্চিদানন্দ রাউতরায় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবাস্তববাদী লেখিকা প্রতিভা রায়ের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ভাষাতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতার সাথে সমসাময়িক প্রগতিশীল সমাজচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

ওড়িয়া সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, ধ্রুপদী ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. আদি ও পঞ্চসখা কাব্য (Early & Panchasakha Poetry): ওড়িয়া সাহিত্যের আদি উৎস সারলা দাসের লোকজ ধারার পর ষোড়শ শতাব্দীতে ‘পঞ্চসখা’ (বলরাম দাস, জগন্নাথ দাস, অচ্যুতানন্দ দাস, যশোভন্ত দাস ও অনন্ত দাস) যুগের সূচনা হয়। জগন্নাথ দাসের ‘ওড়িয়া ভাগবত’ ও বলরাম দাসের ‘জগমোহন রামায়ণ’ ওড়িশার ঘরে ঘরে এক প্রধান সাহিত্যিক ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে। এই ধারাটি ওড়িয়া কবিতাকে সরলতা ও গভীর মরমী দর্শনের এক অনন্য নান্দনিক উচ্চতা দান করেছে।

খ. রীতিকাব্য ও অলঙ্কৃত সাহিত্য (Riti-Kavya & Decorative Poetry): সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে কবিসম্রাট উপেন্দ্র ভঞ্জের হাত ধরে ওড়িয়া সাহিত্যে ‘রীতিকাব্য’ বা অত্যন্ত অলঙ্কৃত, ছন্দোময় ও ব্যাকরণনিষ্ঠ এক রাজকীয় কাব্যধারার জন্ম হয়। তাঁর ‘লাবণ্যবতী’ ও ‘বৈদেহীশ বিলাস’ কাব্য ওড়িয়া ভাষার শব্দভাণ্ডার, উপমা ও নান্দনিকতাকে এক অতুলনীয় শাস্ত্রীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): ওড়িয়া কথাসাহিত্য ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বাস্তবমুখী ও অগ্রগামী কথাসাহিত্যের অন্যতম। ফকির মোহন সেনাপতির হাত ধরে ওড়িয়া উপন্যাসে জমিদারী শোষণ ও গ্রামীণ বাস্তবতার সার্থক প্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে গোপীনাথ মহান্তির আদিবাসী জীবনভিত্তিক উপন্যাস এবং প্রতিভা রায়ের লেখনী ওড়িয়া কথাসাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ করে তোলে।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও যাত্রামঞ্চ (Drama & Folk Theatre): ওড়িয়া নাট্যসাহিত্য সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। জগন্মোহন লালার ‘বাবাজী’ (ওড়িয়ার প্রথম আধুনিক নাটক) থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীতে কালীচরণ পট্টনায়কের হাত ধরে ওড়িয়া নাটক লোকজ গণ্ডি পেরিয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক থিয়েটারে রূপ নেয়। ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী ‘যাত্রা’ ও লোকনাট্য আজও এই সাহিত্যের প্রধান বাহন।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

ওড়িয়া সাহিত্যে সামন্তবাদ, জাতপ্রথা, ঔপনিবেশিক শাসন এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • সত্যবাদী যুগ ও জাতীয়তাবাদী প্রগতি (বিংশ শতকের শুরু): উৎকলমণি গোপবন্ধু দাসের নেতৃত্বে ‘সত্যবাদী যুগ’-এর সূচনা হয়। এই আন্দোলনের কবিরা সাহিত্যকে রাজদরবার ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা থেকে বের করে সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের সেবা, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং অস্পৃশ্যতা বিরোধী প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত করেন।
  • সবুজ যুগ ও বামপন্থী চেতনা (Sabuja Yuga): ১৯২০-৩০ এর দশকে অন্নদাশঙ্কর রায় ও কালিন্দীচরণ পাণিগ্রাহীর হাত ধরে ওড়িয়া সাহিত্যে ‘সবুজ যুগ’ ও পরবর্তীতে প্রগতিশীল লেখক সংঘের জোয়ার আসে। কালিন্দীচরণ পাণিগ্রাহীর কালজয়ী উপন্যাস ‘মাটির মণিষ’ (Matira Manisha) গ্রামীণ সমাজের শ্রেণীসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রগতিশীল দলিল।
  • আদিবাসী ও দলিত চেতনা: উত্তর-আধুনিক ওড়িয়া সাহিত্যে গোপীনাথ মহান্তি ও প্রতিভা রায়ের হাত ধরে ওড়িশার শোষিত আদিবাসী (কন্ধ, পরজা উপজাতি) ও প্রান্তিক অন্ত্যজ মানুষের জীবন আখ্যান সাহিত্যে প্রধান স্থান পায়, যা পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রগতিশীল প্রতিবাদ।

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

ওড়িয়া সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • সারলা দাস (পঞ্চদশ শতাব্দী): ওড়িয়া সাহিত্যের ‘আদিকবি’ ও শূদ্রমুনি। সংস্কৃত না জেনেও তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব লোকজ ঢঙে ও ওড়িয়া সংস্কৃতির পটভূমিতে ‘ওড়িয়া মহাভারত’ ও ‘বিলঙ্কা রামায়ণ’ রচনা করে এই ভাষার সাহিত্যিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
  • কবিসম্রাট উপেন্দ্র ভঞ্জ (১৬৭০–১৭৪০): ওড়িয়া রীতিকাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার। শব্দচয়ন, অলঙ্কার এবং ছন্দের জাদুকরী ব্যবহারের জন্য তাঁকে ওড়িয়া সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মনে করা হয়।
  • ফকির মোহন সেনাপতি (১৮৪৩–১৯১৮): আধুনিক ওড়িয়া কথাসাহিত্যের জনক এবং ‘ব্যাসকবি’। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ছ মাণ আট গুণ্ঠ’ (Six Acres and a Third) তৎকালীন জমিদার ও ব্রিটিশদের দ্বারা সাধারণ কৃষকদের শোষণের এক নগ্ন ও তীব্র ব্যঙ্গাত্মক দলিল, যা তাঁকে বিশ্বমানের বাস্তবতাবাদী লেখকের মর্যাদা দিয়েছে।
  • গোপীনাথ মহান্তি (১৯১৪–১৯৯১): ওড়িয়া সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল ঔপন্যাসিক এবং ১৯৭৩ সালে ওড়িয়া ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। ওড়িশার পরজা উপজাতির জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা তাঁর ‘অমৃতর সন্তান’ ও ‘মাটিমটাল’ উপন্যাস দুটি ভারতীয় কথাসাহিত্যের মহাকাব্যিক মাইলফলক।
  • সচ্চিদানন্দ রাউতরায় / সচি রাউতরায় (১৯১৬–২০০৪): ওড়িয়া সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও বিপ্লবী কবি এবং ১৯৮৬ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘বাজিক রাউত’ (এক নৌকাচালকের ছোট ছেলের ব্রিটিশদের গুলিতে শহীদ হওয়ার বীরত্বগাথা) কবিতাটি ওড়িয়া প্রগতিশীল সাহিত্যের এক জলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
  • প্রতিভা রায় (১৯৪৩—বর্তমান): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখিকা ও ২০১১ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। মহাভারতের দ্রৌপদী চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ও নারীবাদী রূপান্তর নিয়ে লেখা তাঁর ‘যাজ্ঞসেনী’ (Yajnaseni) এবং আদিবাসী জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘আদিভূমি’ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

 

সুরজিৎ পাতর
সুরজিৎ পাতর

 

পাঞ্জাবি সাহিত্য

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ এবং ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য, হরিয়ানা ও দিল্লি ছাড়াও কানাডা, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিশাল ও প্রভাবশালী পাঞ্জাবি প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত পাঞ্জাবি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বাবা ফরিদের প্রথম সুফী শায়েরি এবং পঞ্চদশ শতাব্দীতে শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের আধ্যাত্মিক বাণী থেকে শুরু করে মধ্যযুগের অমর প্রেমগাথা (কিস্সা) এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা পাঞ্জাবি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে মরমী সুফী কালাম, মহাকাব্যিক রোমান্টিক আখ্যান, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং তীব্র দেশাত্মবোধক ও প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। পাঞ্জাবি সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার গভীর ক্ষত এবং সত্তরের দশকের বৈপ্লবিক ও বামপন্থী চেতনার এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে বাবা বুলেহ শাহ, ওয়ারিস শাহ, প্রথম নারী জ্ঞানপীঠ বিজয়ী অমৃতা প্রীতম, পশ (অবতার সিং সদ্ধু) এবং সুরজিৎ পাতরের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের ‘গুরুমুখী’ লিপি এবং পাকিস্তানের ‘শাহমুখী’ লিপি—এই দুই মাধ্যমে চর্চিত হয়েও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল চেতনা ধরে রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

পাঞ্জাবি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই আবেগপ্রবণ, সুরময় ও বৈপ্লবিক যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. সুফী কালাম ও আধ্যাত্মিক শায়েরি (Sufi Poetry & Devotional Verses): পাঞ্জাবি সাহিত্যের আদি এবং প্রধানতম প্রাণশক্তি হলো এর সুফী ঐতিহ্য। বাবা ফরিদ, সুলতান বাহু, শাহ হুসেন এবং বিশেষ করে বাবা বুলেহ শাহের রচিত ‘কাফি’ (Kafi) বা সুফী গান পাঞ্জাবি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। এছাড়া শিখ গুরুদের বাণী সংবলিত পবিত্র গ্রন্থ ‘শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব’ পাঞ্জাবি কবিতাকে এক অনন্য দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সুধা দান করেছে, যা সমাজকে জাতপাতহীন একতার শিক্ষা দেয়।

খ. কিস্সা বা মহাকাব্যিক প্রেমগাথা (Qissa & Romantic Epics): পাঞ্জাবি সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং স্বতন্ত্র একটি জনরা হলো ‘কিস্সা’ (পদ্যে রচিত দীর্ঘ গল্প)। মধ্যযুগে পিলু-র ‘মির্জা সাহিবান’, হাশেম শাহ-এর ‘সাসুই পুন্নু’ এবং বিশেষ করে ওয়ারিস শাহ-এর অমর সৃষ্টি ‘হীর রাঞ্জা’ (Heer Ranjha) পাঞ্জাবি সাহিত্যের এপিটোম বা সর্বশ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ। এই প্রেমগাথাগুলো কেবল রোমান্স নয়, বরং তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক তীব্র সামাজিক বিদ্রোহ।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে ভাই বীর সিংহের হাত ধরে পাঞ্জাবি আধুনিক গদ্য ও উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে নানক সিংহের সমাজসংস্কারমূলক লেখা এবং অমৃতা প্রীতমের মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবতাবাদী লেখনী পাঞ্জাবি কথাসাহিত্যকে বিশ্বমানের উচ্চতায় নিয়ে যায়। মানুষের অস্তিত্ব সংকট, গ্রামীণ পাঞ্জাবের জটিলতা এবং দেশভাগের ট্র্যাজেডি এই কথাসাহিত্যের মূল উপজীব্য।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও মঞ্চনাটক (Drama & Punjabi Theatre): পাঞ্জাবি নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটার সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঈশ্বর চন্দর নন্দা (আই. সি. নন্দা)-র হাত ধরে আধুনিক পাঞ্জাবি নাটকের সূচনা হয়। পরবর্তীতে বলবন্ত গার্গী এবং পাকিস্তানের মলিহা হাশমির ‘আজোকা থিয়েটার’ পাঞ্জাবি নাটককে রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক আধুনিকতার ছাঁচে ঢেলে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

পাঞ্জাবি সাহিত্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, ধর্মীয় কুসংস্কার, দেশভাগ এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ও আপসহীন লড়াইয়ের এক গৌরবময় প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • সুফী কবিদের প্রথাবিরোধী দ্রোহ: বুলেহ শাহ তাঁর কবিতার মাধ্যমে তৎকালীন মোল্লা-পুরোহিতদের ভণ্ডামি, ধর্মীয় আচারসর্বস্বতা এবং শাসক শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, যা পাঞ্জাবি সাহিত্যের আদি প্রগতিশীল ভিত্তি।
  • দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও প্রগতিশীল লেখক সংঘ: ১৯৩৬ সালে প্রগতিশীল লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার পর পাঞ্জাবি সাহিত্যে মার্ক্সীয় দর্শনের জোয়ার আসে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের নারকীয় দাঙ্গা, রক্তপাত এবং নারীদের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে অমৃতা প্রীতমের লেখা “আজ আখাঁ ওয়ারিস শাহ নু” (Today I Invoke Waris Shah) কবিতাটি বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল ও মানবিক আর্তনাদ।
  • নক্সালবাড়ি আন্দোলন ও পশ (Pash)-এর বৈপ্লবিক চেতনা: ১৯৬০-৭০ এর দশকে পাঞ্জাবি কবিতায় এক উগ্র ও বৈপ্লবিক ধারার জন্ম হয়। নক্সাল আন্দোলনের প্রভাবে কবি পশ (অবতার সিং সদ্ধু) তাঁর কবিতায় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে যে বজ্রকণ্ঠ তুলেছিলেন, তা আজও সমগ্র উপমহাদেশের প্রগতিশীল তরুণদের প্রধান অনুপ্রেরণা। তাঁর লাইন—“সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় আমাদের স্বপ্নের মরে যাওয়া”—এক চিরন্তন দ্রোহের প্রতীক।

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

পাঞ্জাবি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • বাবা ফরিদ (১১৭৩–১২৬৬) ও বুলেহ শাহ (১৬৮০–১৭৫৭): পাঞ্জাবি সাহিত্যের স্তম্ভ। বাবা ফরিদ যেখানে এই ভাষার সাহিত্যের সূচনা করেন, সেখানে বুলেহ শাহ তাঁর প্রথাবিরোধী ও বৈপ্লবিক সুফী কালামের মাধ্যমে একে সাধারণ মানুষের মুক্তির গানে পরিণত করেন।
  • ওয়ারিস শাহ (১৭২২–১৭৯৮): পাঞ্জাবি সাহিত্যের ‘মহাকবি’। তাঁর রচিত ‘হীর’ পাঞ্জাবি ভাষার শব্দভাণ্ডার, উপমা ও লোকজীবনের এক মহাকাব্যিক দলিল, যা তাঁকে পাঞ্জাবি সাহিত্যের শেকসপিয়রের মর্যাদা দিয়েছে।
  • নানক সিংহ (১৮৯৭–১৯৭১): আধুনিক পাঞ্জাবি উপন্যাসের জনক। তাঁর ‘পবিত্র পাপী’ (Chitta Lahu) উপন্যাসটি তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার ও মানবিক সম্পর্কের এক অনবদ্য সৃষ্টি।
  • অমৃতা প্রীতম (১৯১৯–২০০৫): বিংশ শতাব্দীর পাঞ্জাবি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী এবং প্রথম নারী জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৮১) বিজয়ী। তাঁর উপন্যাস ‘পিঞ্জর’ (The Skeleton) এবং কবিতাগুলো দেশভাগ ও নারীর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার এক অমর ঐতিহাসিক দলিল।
  • পশ / অবতার সিং সদ্ধু (১৯৫০–১৯৮৮): আধুনিক পাঞ্জাবি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল কবি। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে উগ্রপন্থীদের হাতে নিহত হওয়ার আগে তিনি পাঞ্জাবি কবিতাকে দ্রোহ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক জলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করে গেছেন।
  • সুরজিৎ পাতর (১৯৪৪–২০২৪): আধুনিক পাঞ্জাবি কবিতার জাদুকর এবং লিরিক্যাল মেলানকোলির রূপকার। তাঁর কবিতা ও গজলগুলো সমসাময়িক পাঞ্জাবের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়িষ্ণু রূপকে অত্যন্ত মার্জিত ও গভীর শৈলীতে তুলে ধরেছে।

 

খান আবদুল গাফফার খান

 

পশতু সাহিত্য

আফগানিস্তান (প্রধান সরকারি ও জাতীয় ভাষা) এবং পাকিস্তানের খাইবার পখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল পশতুন প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত পশতু ভাষা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলের অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। অষ্টম শতাব্দীর আদি নিদর্শন ‘পটা খাজানা’ (Pata Khazana) নামক সাহিত্যিক সংকলন থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতাব্দীর মহান যোদ্ধা, দার্শনিক ও জাতীয় কবি খুশহাল খান খাট্টাক-এর হাত ধরে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে বীরত্বগাথামূলক কবিতা, আধ্যাত্মিক সুফী কালাম, সমাজবাস্তববাদী ছোটগল্প এবং দেশাত্মবোধক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। পশতু সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল ‘খুদাই খিদমতগার’ (Khudai Khidmatgar) আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী দ্রোহ এবং সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে রচিত সাহিত্যের এক গৌরবময় ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে খুশহাল খান খাট্টাক (পশতু সাহিত্যের জনক), সুফী সাধক রহমান বাবা, আধুনিক পশতু গদ্যের পুরোধা আবদুল গফফর খান (সীমান্ত গান্ধী), এবং কবি ও দার্শনিক গণি খানের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পশতুনদের ঐতিহ্যবাহী জীবনসংহিতা ও নৈতিক নিয়মাবলী ‘পশতুনওয়ালি’ (Pashtunwali)-র সাথে আধুনিক প্রগতিশীল ও মানবিক চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

পশতু সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই আবেগময়, বীরত্বপূর্ণ ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বীরত্বগাথা ও জাতীয়তাবাদী কাব্য (Epics & Nationalist Poetry): পশতু সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং মৌলিক রূপ হলো বীরত্ব ও তরবারির মহিমা নিয়ে লেখা কবিতা। মোঘল সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পশতুনদের জাগিয়ে তুলতে খুশহাল খান খাট্টাক যে কাব্যধারা তৈরি করেছিলেন, তা পশতু সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি। এই ধারার কবিতাগুলোতে পশতুনদের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য অনবদ্য প্রকাশ ঘটেছে।

খ. সুফী কালাম ও মরমী শায়েরি (Sufi Poetry & Spiritual Verses): বীরত্বের সমান্তরালে পশতু সাহিত্যে সুফী দর্শনের এক সুগভীর ঐতিহ্য রয়েছে। খুশহাল খানের সমসাময়িক কবি রহমান বাবা (Abdur Rahman Baba) এবং আব্দুল হামিদ মোমান্দের হাত ধরে পশতু সুফী কাব্যের স্বর্ণযুগ আসে। রহমান বাবার অত্যন্ত সরল, অহিংস ও প্রেমময় সুফী কবিতা পশতুন সমাজের গোত্রীয় দ্বন্দ্ব ভুলে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

গ. ল্যান্ডে বা লোকগীতি (Landay – Folk Literature): পশতু সাহিত্যের একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং অনন্য জনরা হলো ‘ল্যান্ডে’ (Landay)। এটি মূলত দুই লাইনের এক ধরণের সংক্ষিপ্ত লোককবিতা বা গান, যা সাধারণত পশতুন নারীরা বেনামে রচনা করেন। এর মাধ্যমে পশতুন সমাজের পর্দার আড়ালে থাকা নারীদের প্রেম, বিরহ, যুদ্ধ, দেশভাগ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণার কথা অত্যন্ত নিখুঁত ও সংক্ষেপে প্রকাশ পায়।

ঘ. আধুনিক কথাসাহিত্য ও ছোটগল্প (Modern Fiction & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে এসে পশতু গদ্য ও কথাসাহিত্য শক্তিশালী রূপ নেয়। মাস্টার আবদুল করিমের হাত ধরে পশতু ছোটগল্পের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে সমসাময়িক যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানের ট্র্যাজেডি, শরণার্থী জীবনের কষ্ট এবং সমাজবাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আধুনিক লেখকেরা যে কথাসাহিত্য রচনা করছেন, তা বৈশ্বিক স্তরে সমাদৃত।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

পশতু সাহিত্যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ধর্মীয় চরমপন্থা এবং গোত্রীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়ার এক অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • খুদাই খিদমতগার ও অহিংস আন্দোলন (১৯২০-৩০ এর দশক): খান আবদুল গফফর খান (সীমান্ত গান্ধী) কর্তৃক প্রবর্তিত ‘খুদাই খিদমতগার’ (ঈশ্বরের সেবক) আন্দোলন পশতু সাহিত্যকে আমূল বদলে দেয়। তাঁদের মুখপত্র ‘পশতুন’ পত্রিকার মাধ্যমে পশতু সাহিত্য প্রথম গোত্রীয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও তরবারির মোহ ত্যাগ করে অহিংসা, নারী শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার এবং ব্রিটিশ বিরোধী প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত হয়।
  • গণি খানের মানবতাবাদী দর্শন ও রোমান্টিক বিদ্রোহ: আবদুল গফফর খানের পুত্র গণি খান পশতু কবিতায় এক বিশাল প্রগতিশীল বিপ্লব ঘটান। তিনি প্রথাবদ্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মোল্লাদের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ ও দার্শনিক কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতা পশতুনদের তরবারির বৃত্ত থেকে বের করে প্রেম, সৌন্দর্য ও বিশ্বজনীন মানবতার প্রগতিশীল শিক্ষা দেয়।
  • যুদ্ধবিরোধী ও আধুনিক প্রগতিশীল ধারা: গত কয়েক দশকের যুদ্ধ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে আধুনিক পশতু কবি ও কথাসাহিত্যিকেরা এক শক্তিশালী কলমী যুদ্ধ গড়ে তুলেছেন। উগ্রপন্থা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে পশতু প্রগতিশীল সাহিত্য আজ এক জলন্ত প্রতিবাদী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

পশতু সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • খুশহাল খান খাট্টাক (১৬১৩–১৬৮৯): পশতু সাহিত্যের ‘বাবা’ বা জনক। এই মহান যোদ্ধা, কবি ও উপজাতীয় প্রধান তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাটিয়েছেন। তিনি পশতু কবিতায় তরবারি ও প্রেমের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন এবং পশতু ভাষায় প্রথম দর্শনের বই লিখেছিলেন।
  •  রহমান বাবা (১৬৩২–১৭০৬): পশতু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয়তম সুফী কবি। তাঁর ‘দিওয়ান-ই-রহমান বাবা’ পশতুনদের কাছে পবিত্র গ্রন্থের মতো সমাদৃত। তাঁর অহিংস ও প্রেমময় দর্শন তাঁকে পশতু সাহিত্যের হাফিজ বা রুমির মর্যাদা দিয়েছে।
  • খান আবদুল গফফর খান (১৮৯০–১৯৮৮): ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত এই মহান নেতা পশতু গদ্যের আধুনিক রূপকার। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সমাজ সংস্কারমূলক লেখনী পশতু সমাজকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • গণি খান (১৯১৪–১৯৯৬): বিংশ শতাব্দীর পশতু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, দার্শনিক ও শিল্পী। তাঁর অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও বৈপ্লবিক কবিতা তাঁকে পশতু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবির আসনে বসিয়েছে।
  • মাস্টার আবদুল করিম (১৯০৮–১৯৬১): আধুনিক পশতু ছোটগল্পের জনক। তিনি অত্যন্ত সার্থকভাবে পশতু গদ্যে গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজের রূঢ় বাস্তবতা ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

 

 

নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামি
নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামি

 

দারি / ফারসি সাহিত্য

দারি মূলত ফারসি ভাষারই আফগান রূপ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে রয়েছে। ক্লাসিক্যাল ফারসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থভূমি হলো এই আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মধ্যযুগীয় খোরাসান ও পারস্য সংস্কৃতির মিলনস্থলে জন্ম নেওয়া এই ভাষা শুধু রাজদরবারের ভাষা ছিল না, বরং তা ছিল আধ্যাত্মিকতা, সুফীবাদ এবং উচ্চমার্গীয় দর্শনের প্রধান বাহন। আধুনিক আফগান কথাসাহিত্য ও কবিতায় প্রগতিশীল চিন্তা এবং রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার ইতিহাস ফুটিয়ে তুলতেও এই ভাষার প্রভাব অসীম ও অনবদ্য।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

দারি/ফারসি সাহিত্যের ক্যানভাস সুগভীর দর্শন, মরমী প্রেম ও ধ্রুপদী ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ:

ক. সুফী কালাম ও মরমী শায়েরি (Mystical & Sufi Poetry): দারি সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর সুফী দর্শন। খোরাসান অঞ্চলের মরুময় ও পাহাড়ি পটভূমিতে জন্ম নেওয়া আধ্যাত্মিক সাধকেরা খোদার প্রতি মানুষের ঐশ্বরিক প্রেমকে কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এই ধারার কবিতাগুলো শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানবাত্মার মুক্তির এক বিশ্বজনীন দলিল।

খ. মহাকাব্য ও বীরত্বগাথা (Epic Literature): ফারসি সাহিত্যের আদি ভিত্তি গড়ে উঠেছিল বীরত্ব ও রাজকীয় ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল পারস্যের প্রাচীন ঐতিহ্য, বীরদের বীরত্বগাথা এবং নৈতিকতার পাঠকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা।

গ. আধুনিক গদ্য ও কথাসাহিত্য (Modern Prose & Fiction): বিংশ শতাব্দীতে এসে দারি সাহিত্য রাজদরবার ও সুফী খানকাহর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প বলতে শুরু করে। সমসাময়িক যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানের ট্র্যাজেডি, সমাজবাস্তবতা, নারীদের বন্দিদশা এবং শরণার্থী জীবনের রূঢ় বাস্তবতা নিয়ে আধুনিক আফগান লেখকেরা এই ধারায় বিশ্বমানের সাহিত্য রচনা করছেন।

 

খালেদ হোসেইনি
খালেদ হোসেইনি

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন

আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে সমান্তরালভাবে দারি সাহিত্যেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন:

  • সাংবিধানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন (বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ): মাহমুদ তরজির মতো প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের হাত ধরে আফগানিস্তানে আধুনিক সাংবাদিকতা ও দারি গদ্যের এক নতুন যুগ শুরু হয়। সাহিত্যিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করা, নারী শিক্ষার বিস্তার এবং পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ভাবধারার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল।
  • প্রতিরোধ ও যুদ্ধকালীন সাহিত্য (Resistance Literature): গত কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধ, বিদেশি আগ্রাসন এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে দারি কবি ও সাহিত্যিকেরা এক শক্তিশালী কলমী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। নির্বাসিত ও যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা লেখকদের হাত ধরে এই ধারার প্রগতিশীল সাহিত্য আজ বিশ্বজুড়ে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

 

মাহমুদ তরজি
মাহমুদ তরজি

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

  • জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (১২০৭–১২৭৩): দারি/ফারসি সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ও বিশ্বখ্যাত সুফী কবি, যাঁর জন্ম হয়েছিল বর্তমান আফগানিস্তানের বালখ (Balkh) শহরে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মসনবী’ বিশ্বজুড়ে আধ্যাত্মিকতার প্রধান পাঠ্য হিসেবে গণ্য হয় এবং তাঁকে বিশ্বজনীন প্রেমের কবি বলা হয়।
  • খাজা আবদুল্লাহ আনসারি (১০০৬–১০৮৮): ‘হেরাতের পীর’ নামে পরিচিত এই মহান সুফী সাধক ও কবি দারি ভাষার আদি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। তাঁর মননশীল গদ্য ও আধ্যাত্মিক প্রার্থনা (মোনাজাতনামা) দারি সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
  • নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামি (১৪১৪–১৪৯২): ধ্রুপদী ফারসি কাব্যযুগের সর্বশেষ মহান কবি বা ‘খাতামুশ শুয়ারা’। হেরাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাঁর সাহিত্যিক ও সুফী দর্শন মধ্য এশিয়ার সাহিত্যকে আমূল প্রভাবিত করেছিল।
  • মাহমুদ তরজি (১৮৬৫–১৯৩৩): আধুনিক আফগান বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও প্রগতিশীল দারি গদ্যের জনক। তাঁর দূরদর্শী লেখনী আফগানিস্তানের সমাজকে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
  • খালেদ হোসেইনি (জন্ম ১৯৬৫): যদিও তিনি বর্তমানে ইংরেজিতে লেখেন, তবে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য কাইট রানার’ এবং ‘এ থাউজেন্ড স্প্লেন্ডিড সানস’-এর মূল পটভূমি, মনস্তত্ত্ব ও আত্মিক ভাষা সম্পূর্ণভাবে দারি সাহিত্যের আধুনিক সমাজবাস্তবতা ও ট্র্যাজেডি দ্বারা অনুপ্রাণিত।

 

অমর জলিল
অমর জলিল

 

সিন্ধি সাহিত্য

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ এবং ভারতের গুজরাট, Maharashtra, রাজস্থান ও দিল্লি ছাড়াও বিশ্বজুড়ে থাকা সুপ্রতিষ্ঠিত সিন্ধি ব্যবসায়ী প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত সিন্ধি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক মাধ্যম। অষ্টম শতাব্দীর কুরআন শরীফের প্রথম সিন্ধি অনুবাদ এবং মধ্যযুগের চারণকবিদের বীরত্বগাথা পেরিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর শাহ আব্দুল লতিফ ভিট্টাই-এর হাত ধরে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে সুগভীীর মরমী সুফী কালাম, মহাকাব্যিক রোমান্টিক আখ্যান (কিস্সা), সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং আধুনিক প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। সিন্ধি সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে নিজের ভূমি ছেড়ে ভারতে চলে আসা সিন্ধি Hindus-দের উদ্বাস্তু জীবনের গভীর বেদনা এবং সিন্ধুর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে শাহ আব্দুল লতিফ ভিট্টাই (সিন্ধি সাহিত্যের জনক), সচল সরমস্ত, সামী, আধুনিক গদ্যের রূপকার মির্জা কলীচ বেগ এবং প্রগতিশীল কবি শেখ আয়াজের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের ‘দেবনাগরী’ এবং পাকিস্তানের ‘আরবি-সিন্ধি’ লিপি—এই দুই মাধ্যমে চর্চিত হয়েও অভিন্ন সুফী ও প্রগতিশীল মানবিক চেতনা ধরে রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

পোপটি হিরানন্দানি
পোপটি হিরানন্দানি

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

সিন্ধি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই আত্মিক, সুরময় ও জীবনমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. সুফী কালাম ও শাহ জো রিসালো (Sufi Poetry & Shah Jo Risalo): সিন্ধি সাহিত্যের মূল ভিত্তি ও সর্বোচ্চ চূড়া হলো এর সুফী ঐতিহ্য। শাহ আব্দুল লতিফ ভিট্টাই-এর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘শাহ জো রিসালো’ (Shah Jo Risalo) সিন্ধি সাহিত্যের বাইবেল হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর কবিতা ও মরমী সুফী গান সিন্ধি সংস্কৃতিকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য পরিচিতি দিয়েছে। এছাড়া সচল সরমস্ত ও সামীর হাত ধরে সুফী শায়েরি এক অনন্য নান্দনিক ও অসাম্প্রদায়িক উচ্চতা লাভ করে।

খ. লোকগাথা ও রোমান্টিক কিস্সা (Folk Tales & Romantic Epics): সিন্ধি সাহিত্যে সাতটি বিখ্যাত লোকপ্রেমের উপাখ্যান রয়েছে, যা ‘লতিফের সাত রানি’ (Seven Queens of Sindh) নামে পরিচিত। মারুই, সাসুই, সোনি এবং নূরির মতো চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কিস্সাগুলো কেবল প্রেমের গল্প নয়, বরং এগুলো ঈশ্বরের প্রতি মানবাত্মার ব্যাকুলতা এবং तत्कालीन সামন্ততান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক অবাধ্য বিদ্রোহের प्रतीक।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): উনিশ শতকের শেষে মির্জা কলীচ বেগের হাত ধরে সিন্ধি উপন্যাসের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে, বিশেষ করে দেশভাগের পর সিন্ধি কথাসাহিত্য এক অভূতপূর্ব মোড় নেয়। নিজের শিকড় হারানোর যন্ত্রণা, সিন্ধুর গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে কেন্দ্র করে অমর জলিল এবং ভারতের পোপটি হিরানন্দানির মতো লেখকেরা যে কথাসাহিত্য রচনা করেছেন, তা বিশ্বমানের সমকক্ষ।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও রেডিও নাটক (Drama & Broadcast Literature): সিন্ধি নাট্যসাহিত্য সমাজ সংস্কার ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশভাগের পর পাকিস্তান ও ভারত—উভয় দেশেই সিন্ধি ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রেডিও নাটক ও মঞ্চনাটক গণমানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।

শেখ আয়াজ, মোবারক আলী শেখ
শেখ আয়াজ (মোবারক আলী শেখ)

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

সিন্ধি সাহিত্যে ধর্মীয় কট্টরপন্থা, সামন্তবাদী জমিদারি প্রথা (ওডেরাশাহী), দেশভাগের ট্র্যাজেডি এবং রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ের এক অনন্য প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • সুফী ত্রয়ীর অসাম্প্রদায়িক দ্রোহ: শাহ লতিফ, সচল সরমস্ত ও সামী—এই তিন মহান কবি তৎকালীন কট্টরপন্থী মোল্লা ও কাজীদের ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন। মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই—এই প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদই সিন্ধি সাহিত্যের মূল ভিত্তি।
  • প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন ও শেখ আয়াজ (বিংশ শতাব্দী): ১৯৩৬ সালের প্রগতিশীল লেখক সংঘের জোয়ার সিন্ধি সাহিত্যকে আধুনিক বৈপ্লবিক রূপ দেয়। আধুনিক সিন্ধি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল কবি শেখ আয়াজ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সিন্ধুর মেহনতি মানুষ ও কৃষকদের জাগিয়ে তোলেন। সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখার কারণে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছিল, যা সিন্ধি সাহিত্যে এক চিরন্তন দ্রোহের প্রতীক।
  • দেশভাগের ক্ষত ও উদ্বাস্তু প্রগতিশীল ধারা: ১৯৪৭ সালের দেশভাগে সিন্ধুপ্রদেশ সম্পূর্ণ পাকিস্তানের অংশে পড়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ সিন্ধি হিন্দুকে নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে চলে আসতে হয়। পোপটি হিরানন্দানি, নারায়ণ শ্যামের মতো লেখকদের সাহিত্যে এই দেশভাগের যন্ত্রণা, পরিচয় সংকট এবং নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই এক অত্যন্ত শক্তিশালী মানবিক ও প্রগতিশীল ধারার জন্ম দেয়।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

সিন্ধি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • শাহ আব্দুল লতিফ ভিট্টাই (১৬৮৯–১৭৫২): সিন্ধি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট ও জাতীয় কবি। তাঁর গভীর মানবিক, আধ্যাত্মিক ও সুরময় সুফী কাব্য ‘শাহ জো রিসালো’ সিন্ধি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।
  • সচল সরমস্ত (১৭ัจ–১৮২৯): সিন্ধুর আরেক মহান প্রথাবিরোধী সুফী কবি। সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন বলে তাঁকে ‘সরমস্ত’ (মাতাল বা আত্মহারা) বলা হতো। তিনি সিন্ধি ছাড়াও সাতটি ভাষায় কবিতা লিখেছেন।
  • মির্জা কলীচ বেগ (১৮৫৩–১৯২৯): আধুনিক সিন্ধি গদ্যের জনক। তিনি প্রথম সিন্ধি উপন্যাস ‘জিনাত’ (Zeenat) সহ প্রায় সাড়ে চারশো বই লিখেছেন এবং অনুবাদ করেছেন, যা সিন্ধি সাহিত্যকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
  • শেখ আয়াজ (মোবারক আলী শেখ) (১৯২১–১৯ ৭): বিংশ শতাব্দীর আধুনিক সিন্ধি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক কবি ও ঔপন্যাসিক। তাঁর কবিতা শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
  • পোপটি হিরানন্দানি (১৯২৪–২০০৫): ভারত তথা উপমহাদেশের সিন্ধি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও প্রখ্যাত প্রগতিশীল নারীবাদী লেখিকা। তাঁর অত্যন্ত সাহসী আত্মজীবনী এবং গল্পগুলো সিন্ধি সমাজে নারীর অধিকার ও দেশভাগের ট্র্যাজেডির এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।
  • অমর জলিল (১৯৩৬—বর্তমান): পাকিস্তানের অত্যন্ত জনপ্রিয়, সাহসী ও প্রথাবিরোধী প্রগতিশীল সিন্ধি গল্পকার ও কলামিস্ট। সমাজের ভণ্ডামি, ধর্মীয় চরমপন্থা ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার ব্যঙ্গাত্মক লেখনী বিশ্বমানের।

 

 

কুমারাতুঙ্গা মুনীদাসা
কুমারাতুঙ্গা মুনীদাসা

 

সিংহলি সাহিত্য

শ্রীলঙ্কা (প্রধান সরকারি ও জাতীয় ভাষা) জুড়ে বিস্তৃত সিংহলি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-২য় শতাব্দীর প্রাচীন শিলালিপি, রাজকীয় খোদাই এবং মহাকাব্যিক বিবরণী ‘মহাবংশ’ (Mahavamsa) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা সিংহলি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে বৌদ্ধ দর্শন ও পালি সাহিত্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত থেরবাদী গীতিময়তা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল নাটক এবং আধুনিক মননশীল প্রবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। সিংহলি সাহিত্যে উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী নবজাগরণ, বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠা কলম্বো যুগ (Colombo Period) এবং উত্তর-আধুনিক সমাজবাস্তববাদী ও রাজনৈতিক সংকটের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহাকবি কুমারাতুঙ্গা মুনীদাসা, আধুনিক সিংহলি কথাসাহিত্যের জনক মার্টিন বিক্রমাসিংহে, প্রখ্যাত নাট্যকার ইদিরিবীরা সারাচ্ছন্দ্র এবং গুনদাসা আমারাসেকারার মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ধ্রুপদী বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

মার্টিন বিক্রমাসিংহে
মার্টিন বিক্রমাসিংহে

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

সিংহলি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মননশীল, ঐতিহ্যবাহী ও জীবনমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. ধ্রুপদী বৌদ্ধ সাহিত্য ও পদ্য আখ্যান (Classical Buddhist & Jataka Literature): সিংহলি সাহিত্যের আদি ও মধ্যযুগীয় ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে বুদ্ধের জীবন ও বাণী বা ‘জাতকের গল্প’ (Jataka Tales) অনুবাদের ওপর। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রচিত ‘পিলিয়াদোরা জাতা পোথা’ এবং ‘আমাবাতুরা’ সিংহলি গদ্যের আদি ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক। এই ধারাটি সিংহলি সাহিত্যকে গভীর নৈতিকতা, মরমী দর্শন এবং সমাজতাত্ত্বিক এক অনন্য নান্দনিক উচ্চতা দান করেছে।

খ. সন্দেশ কাব্য বা দূত-কবিতা (Sandesha Kavya – Messenger Poetry): চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে (কোট্টে যুগে) সিংহলি সাহিত্যে ‘সন্দেশ কাব্য’ নামক এক অনন্য কাব্যধারার জন্ম হয়। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তোতাপাখি, কোকিল বা ময়ূরকে দূত বানিয়ে রাজা বা দেবতার কাছে বার্তা পাঠানোর এই কাব্যরীতিতে শ্রীলঙ্কার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তৎকালীন রাজনীতি ও সমাজকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো, যার মধ্যে ‘সেলালিহিনি সন্দেশয়’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে মার্টিন বিক্রমাসিংহের হাত ধরে সিংহলি কথাসাহিত্য সামন্তবাদ থেকে আধুনিকতার দিকে পা বাড়ায়। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী উপন্যাস—যার প্রথম খণ্ড ‘গামপেরালাইয়া’ (The Changing Village)—সিংহলি কথাসাহিত্যকে এক ধাক্কায় বিশ্বমানের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও বাস্তবতায় নিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজের ভাঙন ও নাগরিক জটিলতা এই কথাসাহিত্যের মূল উপজীব্য।

ঘ. শৈল্পিক নাট্যসাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ (Stylized Drama & Theatre): সিংহলি নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটারকে আধুনিক রূপ দেন অধ্যাপক ইদিরিবীরা সারাচ্ছন্দ্র। তিনি শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য ‘নাদাগাম’ (Nadagam) শৈলীকে আধুনিক পাশ্চাত্য থিয়েটারের সাথে মিলিয়ে ‘মনামে’ (Maname) এবং ‘সিনহাবাহু’ (Sinhabahu)-র মতো কালজয়ী কাল্ট নাটক রচনা ও নির্দেশনা করেন, যা সিংহলি নাট্যসাহিত্যের মোড় চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

ইদিরিবীরা সারাচ্ছন্দ্র
ইদিরিবীরা সারাচ্ছন্দ্র

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

সিংহলি সাহিত্যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, শ্রেণীসংগ্রাম, জাতিগত সংকট এবং সাধারণ মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • হেলা হাভুলা ও ভাষা আন্দোলন (Hela Havula): ১৯৪১ সালে কুমারাতুঙ্গা মুনীদানার নেতৃত্বে ‘হেলা হাভুলা’ (সিংহলি বিশুদ্ধতা আন্দোলন) শুরু হয়। এই আন্দোলনের লেখকেরা সাহিত্যে সংস্কৃতের অতিরিক্ত প্রভাব বর্জন করে খাঁটি সিংহলি ভাষার শক্তিকে পুনরুদ্ধার করেন এবং সাধারণ মানুষের উপযোগী প্রগতিশীল গদ্যের বিকাশ ঘটান।
  • কলম্বো যুগ ও সমাজতান্ত্রিক চেতনা (Colombo Period): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কলম্বো যুগের কবিরা (যেমন আনন্দ রাজাকরুণা ও শ্রী চন্দ্রমণি) কবিতাকে রাজকীয় ও ধর্মীয় বৃত্ত থেকে বের করে রোমান্টিকতা, গ্রামীণ মানুষের কষ্ট, পুঁজিবাদী শোষণ এবং প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সাথে যুক্ত করেন।
  • গৃহযুদ্ধ ও উত্তর-আধুনিক বাস্তবতাবাদ: গত শতকের আশির দশক থেকে শ্রীলঙ্কার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সিংহলি সাহিত্যে এক নতুন বৈপ্লবিক জোয়ার আনে। গুনদাসা আমারাসেকারা এবং কে. জয়তিলকের মতো লেখকদের লেখনীতে যুদ্ধের নৃশংসতা, মানবিক ট্রমা, শ্রেণী বৈষম্য এবং শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও আপসহীন প্রগতিশীল ধারা তৈরি হয়।

 

গুনদাসা আমারাসেকারা
গুনদাসা আমারাসেকারা

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

সিংহলি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • কুমারাতুঙ্গা মুনীদাসা (১৮৮৭–১৯৪৪): আধুনিক সিংহলি ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি, কবি ও ভাষাবিদ। তিনি সিংহলি ভাষার স্বকীয়তা রক্ষায় এবং শিশুদের জন্য প্রগতিশীল ও মননশীল সাহিত্য রচনায় অনন্য অবদান রেখে গেছেন।
  • মার্টিন বিক্রমাসিংহে (১৮৯০–১৯৭৬): আধুনিক সিংহলি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট ও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তাঁর ‘গামপেরালাইয়া’ (Gamperaliya) উপন্যাসটি সিংহলি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা কেরালা বা বাংলার শরৎচন্দ্র-বিভূতির মতোই গ্রামীণ জনজীবনের মহাকাব্যিক রূপ।
  • ইদিরিবীরা সারাচ্ছন্দ্র (১৯১৪–১৯৯৬): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সিংহলি নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও কবি, যাঁকে সিংহলি থিয়েটারের জনক বলা হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেন এবং তাঁর নাটকগুলো সিংহলি সংস্কৃতির অমূল্য আকর।
  • গুনদাসা আমারাসেকারা (১৯২৯—বর্তমান): আধুনিক সিংহলি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল কবি, ঔপন্যাসিক ও সমালোচক। শ্রীলঙ্কার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলো সমসাময়িক কথাসাহিত্যের মাইলফলক।
  • মহাগামা সেকেরা (১৯২৯–১৯৭৬): বিংশ শতাব্দীর সিংহলি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রভাববিস্তারকারী আধুনিক কবি, চিত্রশিল্পী ও গীতিকার। তাঁর অত্যন্ত সহজ ও লিরিক্যাল কবিতাগুলো মানুষের জীবনের গভীর দর্শন, সমাজ সচেতনতা ও মানবিকতার এক অনন্য নিদর্শন।

 

 

ইন্দ্র বাহাদুর রাঈ (১৯২৭–২০১৮): ভারতের দার্জিলিং-এ জন্ম নেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক নেপালি ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও তাত্ত্বিক। তাঁর 'আজ রমিতা ছা' (Today is a Carnival) উপন্যাসটি ভারতীয় নেপালি সমাজের মনস্তত্ত্ব ও জীবনসংগ্রামের এক অনন্য মহাকাব্যিক মাইলফলক।
ইন্দ্র বাহাদুর রাঈ

 

নেপালি সাহিত্য

নেপাল (প্রধান সরকারি ও জাতীয় ভাষা) এবং ভারতের সিকিম রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং ও ডুয়ার্স অঞ্চল ছাড়াও ভুটান ও বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল গোর্খা প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত নেপালি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর সিনজা উপত্যকার শিলালিপি ও রাজকীয় তাম্রপত্র থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর ভানুভক্ত আচার্যের হাত ধরে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে লোকজ ছন্দোময়তা, রোমান্টিক ও বাস্তবতাবাদী কবিতা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল নাটক এবং রূপকধর্মী শিশুসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। নেপালি সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের রানা রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গোর্খাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক ও প্রগতিশীল অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য, মহাকবি লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটা, আধুনিক গদ্যের রূপকার পারিজাত (বিষ্ণুকুমারী ওয়াইবা) এবং লৈন সিংহ বাঙ্গদেলের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পাহাড়ি লোকসংস্কৃতির সরলতার সাথে আধুনিক বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

লক্ষ্মী প্ৰসাদ দেৱকোটা (১৯০৯–১৯৫৯): নেপালি সাহিত্যের 'মহাকবি'। তাঁর রচিত 'মুনা মদন' নেপালি সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কালজয়ী সৃষ্টি, যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও খাঁটি মানুষের মানবিকতার এক অনন্য দলিল।
লক্ষ্মী প্ৰসাদ দেৱকোটা

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

নেপালি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মননশীল, ঐতিহ্যবাহী ও জীবনমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. আদি কাব্য ও ভানুভক্তীয় ঐতিহ্য (Early Poetry & Bhanubhakta Tradition): নেপালি সাহিত্যের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য সংস্কৃত রামায়ণকে অত্যন্ত সহজ, সুমিষ্ট ও লোকজ নেপালি ভাষায় অনুবাদ করে এক যুগান্তকারী কীর্তি স্থাপন করেন। তাঁর এই অনুবাদ হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নেপালিভাষী উপজাতি ও গোষ্ঠীগুলোকে একটি একক ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সূত্রে বেঁধেছিল, যা নেপালি কবিতার মূল ভিত্তি।

খ. আধুনিক কবিতা ও দেবকোটা যুগ (Modern Poetry & Devkota Era): বিংশ শতাব্দীতে মহাকবি লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটার হাত ধরে নেপালি কবিতায় এক বিশাল স্বর্ণযুগ আসে। তিনি নেপালি লোকজ ছন্দ ‘ঝ্যামুরে’ (Jhamre)-র ওপর ভিত্তি করে ‘মুনা মদন’ (Muna Madan)-এর মতো কালজয়ী আখ্যান-কাব্য রচনা করেন। দেবকোটার কবিতা নেপালি সাহিত্যকে রোমান্টিকতার চূড়া স্পর্শ করানোর পাশাপাশি তীব্র সামাজিক ও মানবিক বোধে জারিত করেছিল।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): নেপালি কথাসাহিত্য মানুষের অস্তিত্ব সংকট, পাহাড়ি জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে। লৈন সিংহ বাঙ্গদেলের সামাজিক উপন্যাস এবং পরবর্তীতে লেখিকা পারিজাতের হাত ধরে নেপালি কথাসাহিত্যে অস্তিত্ববাদ, অবক্ষয়বাদ ও উত্তর-আধুনিক ধারার সার্থক প্রকাশ ঘটে, যা বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ।

ঘ. নাট্য সাহিত্য ও প্রগতিশীল রঙ্গমঞ্চ (Drama & Modern Theatre): নেপালি নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটারকে আধুনিক রূপ দেন বালকৃষ্ণ সম। তিনি নাটককে কেবল বিনোদনের মাধ্যম থেকে বের করে মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক গভীরতা দান করেন, যার কারণে তাঁকে নেপালি সাহিত্যের শেকসপিয়র বলা হয়। পরবর্তীতে গোপালপ্রসাদ রিমালের হাত ধরে নাটক সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ভানুভক্ত আচার্য - ভানুভক্ত আচার্য (১৮১৪–১৮৬৮): নেপালি সাহিত্যের 'আদিকবি'। রামায়ণের সার্থক নেপালি অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আধুনিক নেপালি ভাষার সাহিত্যিক ও ব্যাকরণগত আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
ভানুভক্ত আচার্য

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

নেপালি সাহিত্যে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, সামন্তবাদ, জাতিভেদ প্রথা এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ার এক অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও আপসহীন প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • রানা রাজতন্ত্র বিরোধী দ্রোহ ও গোপালপ্রসাদ রিমাল: ১৯৪০-এর দশকে নেপালে রানা বংশের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল কবি ও নাট্যকারেরা কলম ধরেন। গোপালপ্রসাদ রিমাল তাঁর বৈপ্লবিক কবিতা ও ‘মশানো’ (Masan) নাটকের মাধ্যমে প্রথম নেপালি সাহিত্যে গদ্য কবিতার বিপ্লব আনেন এবং স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দেন।
  • রালেফ আন্দোলন ও পারিজাতের প্রগতিশীল চেতনা (Ralefa Movement): ১৯৬০-এর দশকে নেপালি সাহিত্যে ‘রালেফ’ (রাঙা লেখনী ফৌজ) নামক এক উগ্র প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য আন্দোলনের জন্ম হয়। এই আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন প্রখ্যাত লেখিকা পারিজাত। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘শিরীষকো ফুল’ (Shirishko Phool / The Blue Mimosa) সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভণ্ডামির মূলে তীব্র আঘাত হেনে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।
  • দার্জিলিং-এর ছায়াবাদ ও ভারতীয় নেপালি প্রগতিশীল ধারা: ভারতের দার্জিলিং ও সিকিম অঞ্চলেও নেপালি সাহিত্যের এক অত্যন্ত শক্তিশালী সমান্তরাল ধারা রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে রূপনারায়ণ সিংহ এবং পরবর্তীতে ইন্দ্র বাহাদুর রাঈ-এর হাত ধরে ‘লেলাখন’ (Tesro Aayam / Third Dimension) ও প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে প্রান্তিক গোর্খা জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের লড়াই সাহিত্যে এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা লাভ করে।

 

বিষ্ণু কুমারী ওয়াইবা (পরিজাত, ১৯৩৭–১৯৯৩): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখিকা ও কবি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখা তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'শিরীষকো ফুল' নেপালি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে একটি চরম বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ, যার জন্য তিনি নেপালের সর্বোচ্চ 'মদন পুরস্কার' লাভ করেন।
বিষ্ণু কুমারী ওয়াইবা (পরিজাত)

 

বালকৃষ্ণ শামশের জং বাহাদুর রানা বা বালা কৃষ্ণ সামা (১৯০২–১৯৮১): আধুনিক নেপালি নাটকের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও 'নাট্যশিরোমণি'। তাঁর ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকগুলো নেপালি সমাজ ও মননকে অসম্ভব পরিপক্ক করে তুলেছে।
বালকৃষ্ণ শামশের জং বাহাদুর রানা বা বালা কৃষ্ণ সামা

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

নেপালি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • ভানুভক্ত আচার্য (১৮১৪–১৮৬৮): নেপালি সাহিত্যের ‘আদিকবি’। রামায়ণের সার্থক নেপালি অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আধুনিক নেপালি ভাষার সাহিত্যিক ও ব্যাকরণগত আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
  • লক্ষ্মী প্ৰসাদ দেৱকোটা (১৯০৯–১৯৫৯): নেপালি সাহিত্যের ‘মহাকবি’। তাঁর রচিত ‘মুনা মদন’ নেপালি সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কালজয়ী সৃষ্টি, যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও খাঁটি মানুষের মানবিকতার এক অনন্য দলিল।
  • বালকৃষ্ণ শামশের জং বাহাদুর রানা বা বালা কৃষ্ণ সামা (১৯০২–১৯৮১): আধুনিক নেপালি নাটকের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও ‘নাট্যশিরোমণি’। তাঁর ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকগুলো নেপালি সমাজ ও মননকে অসম্ভব পরিপক্ক করে তুলেছে।
  • বিষ্ণু কুমারী ওয়াইবা (পরিজাত, ১৯৩৭–১৯৯৩): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখিকা ও কবি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখা তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘শিরীষকো ফুল’ নেপালি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে একটি চরম বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ, যার জন্য তিনি নেপালের সর্বোচ্চ ‘মদন পুরস্কার’ লাভ করেন।
  • ইন্দ্র বাহাদুর রাঈ (১৯২৭–২০১৮): ভারতের দার্জিলিং-এ জন্ম নেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক নেপালি ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও তাত্ত্বিক। তাঁর ‘আজ রমিতা ছা’ (Today is a Carnival) উপন্যাসটি ভারতীয় নেপালি সমাজের মনস্তত্ত্ব ও জীবনসংগ্রামের এক অনন্য মহাকাব্যিক মাইলফলক।

 

 

তাশি গায়েলশেন (সমসাময়িক): জোংখা ভাষার তরুণ প্রগতিশীল কবি ও গল্পকার, যাঁর ছোটগল্পগুলোতে আধুনিক ভুটানি যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে।
তাশি গায়েলশেন

 

 

জোংখা সাহিত্য

ভুটান (একমাত্র জাতীয় ও সরকারি ভাষা) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত জোংখা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন তিব্বতি-বর্মী ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক ও ধর্মীয় মাধ্যম। ‘জোং’ (Dzong) শব্দের অর্থ দুর্গ এবং ‘খা’ (Kha) শব্দের অর্থ ভাষা; অর্থাৎ দুর্গের রাজকীয় ও প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এর আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ঐতিহ্যগতভাবে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ‘চোকি’ (Choke/Classical Tibetan) লিপির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই ভাষার সাহিত্য মূলত আধ্যাত্মিকতা, লোকগাথা এবং হিমালয় অঞ্চলের রাজা ও সাধুদের জীবনী বা ‘নামথার’ (Namthar) কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জোংখা সাহিত্যে মধ্যযুগের ধর্মীয় একীকরণ, হিমালয়ের মনাস্ট্রি বা গুম্বাগুলোর প্রাচীন পুঁথিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং আধুনিক যুগে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের এক গৌরবময় ও শান্তিবাদী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহাপুরুষ শাবদ্রুং নকাওয়াং নামগিয়াল, আধুনিক জোংখা ব্যাকরণের স্থপতি পলোপ শেরাব গায়েলশেন এবং আধুনিক কবি ও গবেষক লোন্টেন গায়াত্সো-র মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন বজ্রযান বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতার সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল ও পরিবেশবাদী জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

শাবদ্রুং নকাওয়াং নামগিয়াল (১৫৯৪–১৬৫১): ভুটানের মহান প্রতিষ্ঠাতা এবং জোংখা সংস্কৃতির প্রধান স্থপতি। তাঁর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং রাজকীয় ফরমানগুলো জোংখা সাহিত্যের আদি ও প্রধান ভিত্তি।
শাবদ্রুং নকাওয়াং নামগিয়াল

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

জোংখা সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই আত্মিক, শান্ত ও হিমালয়ী লোকসংস্কৃতিতে ঋদ্ধ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. নামথার বা সাধুদের জীবনী (Namthar – Hagiography): জোংখা সাহিত্যের আদি এবং সবচেয়ে সম্মানিত জনরা হলো ‘নামথার’। এটি মূলত হিমালয় অঞ্চলের মহান বৌদ্ধ সাধু, লামা এবং রাজাদের আধ্যাত্মিক জীবনী ও অলৌকিক আখ্যান। খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে ভুটানের প্রতিষ্ঠাতা শাবদ্রুং নকাওয়াং নামগিয়ালের জীবনী নিয়ে রচিত নামথারগুলো জোংখা সাহিত্যের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিকতার মূল আকর গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়।

খ. লোজে ও ঐতিহ্যবাহী লিরিক (Lozey – Ballads & Folk Poetry): জোংখা সাহিত্যের একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় লোক-জনরা হলো ‘লোজে’ (Lozey)। এটি মূলত পদ্য বা ছড়ার আকারে রচিত এক ধরণের ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা বা ব্যালাড, যা মুখে মুখে আবৃত্তি করা হতো। লোজে-র মাধ্যমে ভুটানের সাধারণ মানুষের প্রেম, দেশপ্রেম, পাহাড়ের কঠিন জীবনসংগ্রাম এবং বৌদ্ধ দর্শনের নৈতিক মূল্যবোধকে অত্যন্ত মার্জিত ও শৈল্পিক উপায়ে প্রকাশ করা হয়।

গ. ধর্মীয় পুঁথি ও চোকি ঐতিহ্য (Choekey – Classical Text Tradition): শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জোংখা সাহিত্যের মূল চর্চা আবর্তিত হয়েছে ভুটানের দুর্গ ও গুম্বাগুলোতে সংরক্ষিত ধর্মীয় পুঁথিকে কেন্দ্র করে। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের গভীর দর্শন, ধ্যান এবং কর্মফল সংক্রান্ত এই জটিল তত্ত্বগুলো প্রাচীন ‘উচেন’ (Uchen) লিপিতে হরিতাল ও সোনা-রুপার কালিতে লেখা পুঁথিতে সংরক্ষিত, যা এই ভাষার বুদ্ধিবৃত্তিক আভিজাত্যের প্রতীক।

ঘ. আধুনিক কথাসাহিত্য ও ছোটগল্প (Modern Fiction & Short Stories): বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে জোংখা সাহিত্য আধুনিক গদ্যের দিকে পা বাড়ায়। ১৯৭১ সালে জোংখাকে ভুটানের একমাত্র জাতীয় ভাষা ঘোষণার পর স্কুল-কলেজে এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়। সমসাময়িক লেখকদের হাত ধরে বর্তমানে জোংখা ভাষায় নাগরিক জীবনের জটিলতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং হিমালয়ের ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ নিয়ে আধুনিক ছোটগল্প ও কবিতা লেখা শুরু হয়েছে।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

জোংখা সাহিত্যে সহিংসতা বর্জন, প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থান এবং ভুটানের অনন্য দর্শন ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (Gross National Happiness) বা স্থূল জাতীয় সুখের পক্ষে লড়ার এক অনন্য শান্তিবাদী ও প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • শাবদ্রুং-এর আইনি ও সামাজিক সংস্কার: সপ্তদশ শতাব্দীতে শাবদ্রুং নামগিয়ালের হাত ধরে জোংখা গদ্যে ‘কাচাম’ (Katham) বা রাজকীয় ফরমান ও আইন রচনার ধারা শুরু হয়। এটি ধর্মীয় গোত্রীয় যুদ্ধ বন্ধ করে একটি প্রগতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভুটান গড়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা জোংখা সাহিত্যের আদি প্রগতিশীল রূপ।
  • সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও আধুনিকায়ন আন্দোলন: ১৯৬০-এর দশকে ভুটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুকের উদ্যোগে জোংখা সাহিত্যকে আধুনিক করার আন্দোলন শুরু হয়। ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বের করে ভাষাকে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে ‘জোংখা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (Dzongkha Development Commission) গঠন করা হয়, যা সাহিত্যে প্রগতির এক নতুন যুগের সূচনা করে।
  • পরিবেশবাদী ও মানবিক চেতনা: উত্তর-আধুনিক জোংখা সাহিত্যে ভুটানের চিরন্তন অরণ্য, পাহাড় এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষার পরিবেশবাদী দর্শন প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছে। আধুনিক জোংখা কবিদের লেখনীতে অন্ধ আধুনিকায়নের কুফল, বস্তুবাদের বিরোধিতা এবং মানসিক শান্তি ও সুখের প্রগতিশীল বাণী বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

জোংখা সাহিত্যের আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • শাবদ্রুং নকাওয়াং নামগিয়াল (১৫৯৪–১৬৫১): ভুটানের মহান প্রতিষ্ঠাতা এবং জোংখা সংস্কৃতির প্রধান স্থপতি। তাঁর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং রাজকীয় ফরমানগুলো জোংখা সাহিত্যের আদি ও প্রধান ভিত্তি।
  • পলোপ শেরাব গায়েলশেন (ঊনবিংশ শতাব্দী): জোংখা ভাষার অন্যতম আদি পণ্ডিত ও ব্যাকরণবিদ। তিনি চোকি বা ক্লাসিক্যাল তিব্বতি ভাষা থেকে জোংখাকে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে রূপ দিতে প্রথম ব্যাকরণ ও ভাষাতাত্ত্বিক নিয়মাবলী তৈরি করেছিলেন।
  • লোন্টেন গায়াত্সো (বিংশ শতাব্দী): আধুনিক জোংখা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গবেষক, কবি ও অনুবাদক। জোংখা ভাষার আধুনিক অভিধান তৈরি এবং প্রাচীন লোকগীতি ‘লোজে’ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে তাঁর অবদান অনন্য।
  • দর্জি ওয়াংচুক (সমসাময়িক): ভুটানের অন্যতম প্রখ্যাত আধুনিক প্রাবন্ধিক ও তাত্ত্বিক, যিনি জোংখা ভাষায় ভুটানের ঐতিহ্যবাহী দর্শন ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মেলবন্ধন নিয়ে অসংখ্য মননশীল প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
  • তাশি গায়েলশেন (সমসাময়িক): জোংখা ভাষার তরুণ প্রগতিশীল কবি ও গল্পকার, যাঁর ছোটগল্পগুলোতে আধুনিক ভুটানি যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে।

 

আমিনাথ ফাইজা (১৯২৪–২০১১): দিভেহী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কবি, যাঁকে মালদ্বীপের সাহিত্যের 'ডেইজি ফুল' (Daisy Maa) বলা হতো। তিনি তাঁর অত্যন্ত সুমিষ্ট ও ধারালো কবিতার মাধ্যমে নারী স্বাধীনতা, প্রকৃতি এবং সমাজের প্রগতিশীল পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছেন।
আমিনাথ ফাইজা

 

দিভেহী সাহিত্য

মালদ্বীপ (একমাত্র জাতীয় ও সরকারি ভাষা) এবং ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাক্ষাদ্বীপের মিনিকয় দ্বীপ (যেখানে এটি ‘মহল’ বা Mahl নামে পরিচিত) জুড়ে বিস্তৃত দিভেহী ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য (Sanskrit-Prakrit) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত অনন্য সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন তাম্রশাসন ‘লোমাফানু’ (Loamaafanu) এবং প্রবাল পাথরে খোদাই করা আদি নিদর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা দিভেহী সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে দ্বীপময় ভূগোলের সামুদ্রিক জীবন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত লোকগাথা, ঐতিহ্যবাহী লিরিক্যাল কবিতা বা ‘রাঈভ’ (Raaivaru), প্রগতিশীল সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং মননশীল ঐতিহাসিক প্রবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। দিভেহী সাহিত্যে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকে বৌদ্ধধর্ম থেকে ইসলামে রূপান্তরের ঐতিহাসিক আখ্যান, পর্তুগিজ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সমুদ্রের বুকে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং বিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা আধুনিক প্রগতিশীল সাহিত্যিক আন্দোলনের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে সুলতান মুহম্মদ থাকুরুফানু, আধুনিক দিভেহী সাহিত্যের জনক হুসেন সালাহুদ্দিন, প্রখ্যাত কবি মুহাম্মদ আমীন দিদি এবং বোডুফেনভাহগে সিদি-র মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ডান থেকে বাঁয়ে লেখা দিভেহীর নিজস্ব বৈজ্ঞানিক লিপি ‘তানা’ (Thaana)-র রাজকীয় ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল ও পরিবেশবাদী জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

হুসেন সালাহুদ্দিন (১৮৮১–১৯৪৮): আধুনিক দিভেহী সাহিত্যের জনক এবং 'আল-গাজী'। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক এবং প্রখ্যাত পণ্ডিত। তাঁর রচিত 'দ্য স্টোরি অফ থুহুফা' এবং ধর্মীয় ও সামাজিক গদ্যগুলো দিভেহী সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
হুসেন সালাহুদ্দিন

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

দিভেহী সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, সামুদ্রিক ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. রাঈভ ও ঐতিহ্যবাহী লিরিক্যাল কাব্য (Raaivaru & Traditional Poetry): দিভেহী সাহিত্যের আদি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মৌলিক জনরা হলো ‘রাঈভ’ (Raaivaru)। এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সুরে গাওয়া অত্যন্ত জটিল ও অলঙ্কৃত তিন বা চার লাইনের কবিতা। রাঈভের মাধ্যমে মালদ্বীপের অন্তহীন সমুদ্রের রূপ, মৎস্যজীবীদের জীবনসংগ্রাম, প্রেম এবং বীরত্বগাথাকে প্রকাশ করা হয়। এর শব্দবিন্যাস এতটাই শৈল্পিক যে সাধারণ গদ্যের চেয়ে এর ভাব সম্পূর্ণ আলাদা ও নান্দনিক।

খ. লোমাফানু ও ঐতিহাসিক গদ্য (Loamaafanu & Historical Chronicles): দিভেহী সাহিত্যের লিখিত ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘লোমাফানু’ (Loamaafanu) বা তাম্রশাসনের ওপর। দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মালদ্বীপের সুলতানদের আদেশ, রাজকীয় বংশলতিকা এবং বৌদ্ধধর্ম থেকে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার বিবরণ তামার পাতে প্রাচীন ‘ইভেইলা’ (Eveyla) লিপিতে খোদাই করা হতো। এটি দিভেহী সাহিত্যের আদি ঐতিহাসিক গদ্যের প্রধান আকর দলিল।

গ. লোকগাথা ও সামুদ্রিক কিস্সা (Folk Tales & Maritime Legends): চারদিকের মহাসাগর দিভেহী লোকসাহিত্যকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। ‘ডন মোফন অ্যান্ড আইশা’ (Dhon Hiyala and Ali Fulhu)-র মতো বিখ্যাত রোমান্টিক মহাকাব্যিক লোকগাথা, সমুদ্রের জলদানব ‘রান্নামারি’ (Rannamaari)-র কিংবদন্তি এবং নাবিকদের অ্যাডভেঞ্চার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুখে মুখে প্রচলিত থেকে দিভেহী সাহিত্যের মূল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

ঘ. কথাসাহিত্য: আধুনিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হুসেন সালাহুদ্দিনের হাত ধরে দিভেহী কথাসাহিত্যের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। সমসাময়িক লেখকদের হাত ধরে বর্তমানে দিভেহী উপন্যাসে মালদ্বীপের ভঙ্গুর দ্বীপ ইকোসিস্টেম, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ট্র্যাজেডি, পর্যটনের আড়ালে থাকা গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং আধুনিক যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক সংকট অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠছে।

মুহাম্মদ জামিল দিদি (১৯১৫–১৯৮৯): দিভেহী সাহিত্যের 'উস্তাদ' বা গুরু। তিনি মালদ্বীপের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা এবং আধুনিক দিভেহী কবিতা ও গজলের অন্যতম প্রধান রূপকার, যাঁর লেখনীতে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
মুহাম্মদ জামিল দিদি

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

দিভেহী সাহিত্যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ধর্মীয় অন্ধত্ব ও কুসংস্কার বর্জন এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • সালাহুদ্দিনের সাহিত্যিক নবজাগরণ (বিংশ শতকের প্রথমার্ধ): মালদ্বীপের তৎকালীন কট্টর ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে বদলে দিতে হুসেন সালাহুদ্দিন ও তাঁর সমসাময়িক লেখকেরা প্রগতিশীল আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ইসলামের মূল ও উদার শিক্ষা এবং আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতাকে এক করে দিভেহী গদ্যে এক বিশাল যুক্তিবাদী জোয়ার এনেছিলেন।
  • মুহাম্মদ আমীন দিদি ও রাজনৈতিক প্রগতি: মালদ্বীপের প্রথম রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ আমীন দিদি দিভেহী সাহিত্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তাঁর প্রগতিশীল লেখনী ও কবিতার মূল বিষয়ই ছিল নারীদের ভোটাধিকার ও শিক্ষা, সামন্তবাদী রাজতন্ত্রের অবসান এবং আধুনিক সমাজতান্ত্রিক মালদ্বীপ গঠন। তাঁর হাত ধরেই দিভেহী সাহিত্যে প্রথম আধুনিক ছোটগল্প ও রাজনৈতিক প্রবন্ধের আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে।
  • পরিবেশবাদী ও উত্তর-আধুনিক প্রতিরোধ ধারা: উত্তর-আধুনিক দিভেহী সাহিত্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মালদ্বীপের অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি এক প্রধান বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল ইশতেহার হয়ে উঠেছে। আধুনিক দিভেহী কবিদের লেখনীতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ, পুঁজিবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদ এবং সমুদ্র ও দ্বীপের প্রকৃতি রক্ষার আহ্বান এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।

 

মুহাম্মদ আমীন দিদি, আল আমীর মোহাম্মদ আমিন ধোশাঈমেয়ানা কিলাইফানু - মালদ্বীপের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং প্রখ্যাত প্রগতিশীল সাহিত্যিক। দিভেহী গদ্যের আধুনিকায়ন, প্রথম দিভেহী ব্যাকরণ রচনা এবং সাহিত্যে নারী জাগরণের বাণী উচ্চকিত করার পেছনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
মুহাম্মদ আমীন দিদি, আল আমীর মোহাম্মদ আমিন ধোশাঈমেয়ানা কিলাইফানু

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

দিভেহী সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • হুসেন সালাহুদ্দিন (১৮৮১–১৯৪৮): আধুনিক দিভেহী সাহিত্যের জনক এবং ‘আল-গাজী’। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক এবং প্রখ্যাত পণ্ডিত। তাঁর রচিত ‘দ্য স্টোরি অফ থুহুফা’ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক গদ্যগুলো দিভেহী সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
  • মুহাম্মদ আমীন দিদি, আল আমীর মোহাম্মদ আমিন ধোশাঈমেয়ানা কিলাইফানু (১৯১০–১৯৫৪): মালদ্বীপের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং প্রখ্যাত প্রগতিশীল সাহিত্যিক। দিভেহী গদ্যের আধুনিকায়ন, প্রথম দিভেহী ব্যাকরণ রচনা এবং সাহিত্যে নারী জাগরণের বাণী উচ্চকিত করার পেছনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
  • বোডুফেনভাহগে সিদি (১৮৮৮–১৯৭০): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিভেহী কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘রাঈভ’ কাব্যধারাকে আধুনিক রূপ দেন এবং ১৯৫৩ সালে মালদ্বীপের প্রাচীন লিপি নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ প্রকাশ করে দিভেহী সংস্কৃতির শেকড়কে পুনরুজ্জীবিত করেন।
  • মুহাম্মদ জামিল দিদি (১৯১৫–১৯৮৯): দিভেহী সাহিত্যের ‘উস্তাদ’ বা গুরু। তিনি মালদ্বীপের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা এবং আধুনিক দিভেহী কবিতা ও গজলের অন্যতম প্রধান রূপকার, যাঁর লেখনীতে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
  • আমিনাথ ফাইজা (১৯২৪–২০১১): দিভেহী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কবি, যাঁকে মালদ্বীপের সাহিত্যের ‘ডেইজি ফুল’ (Daisy Maa) বলা হতো। তিনি তাঁর অত্যন্ত সুমিষ্ট ও ধারালো কবিতার মাধ্যমে নারী স্বাধীনতা, প্রকৃতি এবং সমাজের প্রগতিশীল পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছেন।

 

আতা শাদ (১৯৩৯–১৯৯৭): আধুনিক বেলুচি কবিতার পুরোধা পুরুষ। তিনি রোমান্টিকতা ও আধুনিক বাস্তবতাবাদের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন এবং উর্দু ও বেলুচি—উভয় ভাষাতেই তাঁর কাব্যিক প্রতিভা বিশ্বমানের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
আতা শাদ

 

বেলুচি সাহিত্য

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব ইরান (সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশ) এবং দক্ষিণ-আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছাড়াও ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা বিশাল বেলুচি প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত বেলুচি ভাষা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলের অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইরানীয় ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লিখিত রূপের চেয়ে মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে টিকে থাকা এই ভাষার সাহিত্য মূলত মধ্যযুগের চারণকবিদের বীরত্বগাথা, গোত্রীয় যুদ্ধকাব্য এবং রোমান্টিক লোককাহিনীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক লিখিত সাহিত্যের অভূতপূর্ব প্রসার ঘটে এবং তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়; বিশেষ করে তীব্র রাজনৈতিক ও দেশাত্মবোধক কবিতা, সমাজবাস্তববাদী ছোটগল্প, মননশীল ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধ এবং আধুনিক গদ্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। বেলুচি সাহিত্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী দ্রোহ, নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবং সত্তরের দশকের বৈপ্লবিক বামপন্থী চেতনার এক গৌরবময়, ট্রাজিক ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে চারণকবি মীর চাকর খান রিন্দ, আধুনিক বেলুচি গদ্যের জনক সায়েদ জহুর শাহ হাশমি, কালজয়ী কবি আতা শাদ এবং প্রগতিশীল সাহিত্যিক গুল খান নাসিরের মতো ব্যক্তিত্বেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যাযাবর ও পার্বত্য জীবনসংগ্রামের রুক্ষ সৌন্দর্যের সাথে আধুনিক প্রগতিশীল ও শোষিত মানুষের অধিকারের চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সায়েদ জহুর শাহ হাশমি (১৯২৬–১৯৭৮): আধুনিক বেলুচি সাহিত্যের অবিসংবাদিত স্থপতি এবং 'সায়েদ'। তিনি প্রথম বেলুচি উপন্যাস 'নাজুক' (Nazuk) রচনা করেন এবং প্রথম সর্ববৃহৎ বেলুচি অভিধান 'সায়েদ গঞ্জ' সংকলন করে এই ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন।
সায়েদ জহুর শাহ হাশমি

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

বেলুচি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মহাকাব্যিক, আবেগপ্রবণ ও বাস্তবমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. চারণকাব্য ও বীরত্বগাথা (Epic Poetry & Tribal Ballads): বেলুচি সাহিত্যের মূল ভিত্তি এবং সবচেয়ে গৌরবময় অংশ হলো এর প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ‘রিন্দ-লাশার’ (Rind-Lashari) যুগের বীরত্বগাথামূলক কবিতা। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে বেলুচ উপজাতিগুলোর বীরত্ব, যুদ্ধ এবং গোত্রপ্রধান মীর চাকর খানের শৌর্য নিয়ে শত শত দীর্ঘ ব্যালাড বা চারণকাব্য মুখে মুখে রচিত হয়েছিল। এই কবিতাগুলোতে বেলুচদের চরম আত্মমর্যাদা, অতিথিপরায়ণতা এবং প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ততার এক অনন্য ও জীবন্ত দলিল পাওয়া যায়।

খ. লোকগাথা ও রোমান্টিক কিস্সা (Folk Tales & Romantic Epics): বীরত্বের সমান্তরালে বেলুচি সাহিত্যে রোমান্টিক ট্র্যাজেডির এক সুগভীর ঐতিহ্য রয়েছে। ‘হানি ও মুরিদ’ (Hani and Sheh Mured)-এর অমর ও আধ্যাত্মিক প্রেমগাথা বেলুচি সাহিত্যের এপিটোম বা সর্বশ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বাংলার লাইলী-মজনু বা পাঞ্জাবের হীর-রাঞ্জার মতোই কালজয়ী। এছাড়া ‘শায় মুরিদ ও দোদো-চাগল’-এর মতো কিস্সাগুলো বেলুচ সংস্কৃতির মূল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি।

গ. আধুনিক কবিতা ও মুক্তছন্দ (Modern Poetry & Avant-Garde Verses): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আতা শাদের হাত ধরে বেলুচি কবিতায় এক বিশাল আধুনিক ও নান্দনিক বিপ্লব ঘটে। তিনি ঐতিহ্যবাহী ছন্দের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আধুনিক প্রতীকীবাদ, অবচেতন মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্বজনীন জীবনবোধকে বেলুচি কবিতায় স্থান দেন, যা এই ভাষার কাব্যসাহিত্যকে এক ধাক্কায় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে।

ঘ. কথাসাহিত্য ও আধুনিক গদ্য (Modern Prose & Short Stories): সায়েদ জহুর শাহ হাশমির হাত ধরে বেলুচি ভাষায় প্রথম আধুনিক উপন্যাস ও ব্যাকরণনিষ্ঠ গদ্যের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য, সামন্ততান্ত্রিক মীর ও সর্দারদের অত্যাচার এবং রাজনৈতিক অবদমনকে কেন্দ্র করে আধুনিক লেখকেরা অত্যন্ত শক্তিশালী ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করছেন।

 

মীর চাকর খান রিন্দ (১৪৬৬–১৫৫৫): বেলুচ ইতিহাসের মহান বীর ও গোত্রপ্রধান, যাঁর যুগকে বেলুচি সাহিত্যের 'স্বর্ণযুগ' বা ক্লাসিক্যাল যুগ বলা হয়। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং তাঁর আমলের চারণকাব্যগুলো বেলুচি সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি।
মীর চাকর খান রিন্দ

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

বেলুচি সাহিত্যে সামন্তবাদ (সর্দারী প্রথা), ঔপনিবেশিক শোষণ, জাতীয় নিপীড়ন এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • সায়েদ হাশমির ভাষা ও প্রগতি আন্দোলন: ১৯৫০-এর দশকে সায়েদ জহুর শাহ হাশমি বেলুচি সাহিত্যকে কট্টর ধর্মীয় ও সামন্তবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত করার আন্দোলন শুরু করেন। তিনি বিশুদ্ধ বেলুচি শব্দভাণ্ডার উদ্ধার করেন এবং ভাষার মাধ্যমে বেলুচ জনগণের মধ্যে এক প্রগতিশীল ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবোধের বীজ বপন করেন।
  • মীর গুল খান নাসির ও বামপন্থী রাজনৈতিক দ্রোহ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেলুচি কবি মীর গুল খান নাসির সরাসরি মার্ক্সীয় দর্শনে দীক্ষিত ছিলেন। তাঁর বৈপ্লবিক কবিতাগুলো ছিল শোষক শ্রেণী, স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক একটি জলন্ত বুলেট। বেলুচ যুবসমাজ ও মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলার জন্য তাঁকে জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, যা বেলুচি সাহিত্যে এক চিরন্তন প্রগতিশীল দ্রোহের প্রতীক।
  • প্রতিরোধ ও মানবাধিকারের উত্তর-আধুনিক ধারা: গত কয়েক দশক ধরে বেলুচিস্তানের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক নিপীড়ন এবং ‘নিখোঁজ’ (Missing Persons) ব্যক্তিদের ট্র্যাজেডি বেলুচি সাহিত্যে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও ট্রাজিক ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম দিয়েছে। আধুনিক তরুণ কবি ও গল্পকারদের লেখনীতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, মানবাধিকার রক্ষা এবং নিজ ভূমির ওপর অধিকার আদায়ের প্রগতিশীল ইশতেহার বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

 

মীর গুল খান নাসির (১৯১৪–১৯৮৩): বেলুচিস্তানের 'জাতীয় কবি' এবং প্রখ্যাত প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। তাঁর বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ 'গুলবংগ' (Gulbang) বেলুচ জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের প্রধান সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা।
মীর গুল খান নাসির

 

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকবৃন্দ

বেলুচি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • মীর চাকর খান রিন্দ (১৪৬৬–১৫৫৫): বেলুচ ইতিহাসের মহান বীর ও গোত্রপ্রধান, যাঁর যুগকে বেলুচি সাহিত্যের ‘স্বর্ণযুগ’ বা ক্লাসিক্যাল যুগ বলা হয়। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং তাঁর আমলের চারণকাব্যগুলো বেলুচি সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি।
  • সায়েদ জহুর শাহ হাশমি (১৯২৬–১৯৭৮): আধুনিক বেলুচি সাহিত্যের অবিসংবাদিত স্থপতি এবং ‘সায়েদ’। তিনি প্রথম বেলুচি উপন্যাস ‘নাজুক’ (Nazuk) রচনা করেন এবং প্রথম সর্ববৃহৎ বেলুচি অভিধান ‘সায়েদ গঞ্জ’ সংকলন করে এই ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন।
  • মীর গুল খান নাসির (১৯১৪–১৯৮৩): বেলুচিস্তানের ‘জাতীয় কবি’ এবং প্রখ্যাত প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। তাঁর বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ ‘গুলবংগ’ (Gulbang) বেলুচ জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের প্রধান সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা।
  • আতা শাদ (১৯৩৯–১৯৯৭): আধুনিক বেলুচি কবিতার পুরোধা পুরুষ। তিনি রোমান্টিকতা ও আধুনিক বাস্তবতাবাদের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন এবং উর্দু ও বেলুচি—উভয় ভাষাতেই তাঁর কাব্যিক প্রতিভা বিশ্বমানের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
  • ড. নেয়ামাতুল্লাহ গিশকোরি (সমসাময়িক): আধুনিক বেলুচি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক, যিনি বেলুচি মৌখিক লোকসাহিত্য ও চারণকাব্য সংগ্রহ, লিপিdocument এবং তা বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিতে অনন্য ভূমিকা পালন করছেন।

 

গোলাম আহমদ মাহজুর (১৮৮৭–১৯৫২): কাশ্মীরি সাহিত্যের 'জাতীয় কবি' বা 'শায়ের-ই-কাশ্মীর'। তিনি কাশ্মীরি কবিতাকে আধুনিক যুগের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার সাথে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর কবিতা শুনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'কাশ্মীরের কবিগুরু' হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।
গোলাম আহমদ মাহজুর

 

কাশ্মীরি সাহিত্য

ভারত ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে থাকা কাশ্মীরি প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত কাশ্মীরি ভাষা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলের অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য ও দার্দিক (Dardic) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। দশম-একাদশ শতাব্দীর আদি নিদর্শন ও শৈব দর্শনের ঐতিহ্য পেরিয়ে চতুর্দশ শতাব্দীর মহান নারী সুফী সাধিকা ও কবি লালদেদ (লল্লেশ্বরী) এবং মুসলিম সুফী সাধক নুন্দ রেশির হাত ধরে কাশ্মীরি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়; বিশেষ করে আধ্যাত্মিক সুফী পঙক্তি, অনন্য রেশি গীতিময়তা, মহাকাব্যিক রোমান্টিক আখ্যান, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং তীব্র রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। কাশ্মীরি সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন, ১৯৩০-৪০ এর দশকের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং গত কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, রক্তপাত ও দেশত্যাগের এক গৌরবময়, ট্রাজিক ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে লালদেদ, হাব্বা খাতুন, জাতীয় কবি গোলাম আহমদ মাহজুর, আকতার মহিউদ্দিন এবং কাশ্মীরি ভাষার প্রথম ও একমাত্র জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী রহমান রাহীর মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কাশ্মীরের নিজস্ব সুফী-শৈব মিশ্র সংস্কৃতির (‘কাশ্মীরিয়াত’) চিরায়ত দর্শনের সাথে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

হাব্বা খাতুন (১৫৫৪–১৬০৯): কাশ্মীরের লোকপ্রিয় রানি ও মহান প্রথাবিরোধী কবি। কাশ্মীরি কবিতায় প্রেম, বিরহ ও লিরিক্যাল গীতিময়তার প্রবর্তক হিসেবে তিনি যুগ যুগ ধরে কাশ্মীরিদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
হাব্বা খাতুন

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

কাশ্মীরি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মননশীল, আধ্যাত্মিক ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বাখ ও শ্রুক — আদি সুফী কাব্য (Vakh & Shruk — Early Mystical Poetry): কাশ্মীরি সাহিত্যের মূল প্রাণ এবং ভিত্তি গড়ে উঠেছে চতুর্দশ শতকের আধ্যাত্মিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। হিন্দু শৈব সাধিকা লালদেদের চার লাইনের আধ্যাত্মিক পঙক্তি, যা ‘বাখ’ (Vakh) নামে পরিচিত এবং মুসলিম সুফী সাধক নুন্দ রেশি (শেখ নূর-উদ-দিন ওয়ালী)-র আধ্যাত্মিক পঙক্তি, যা ‘শ্রুক’ (Shruk) নামে পরিচিত—তা কাশ্মীরি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই আধ্যাত্মিক কবিতাগুলো তৎকালীন সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও জাতপাতহীন একতার শিক্ষা দিয়ে এক কালজয়ী অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন (কাশ্মীরিয়াত) তৈরি করেছিল।

খ. লোল কাব্য ও রোমান্টিক গীতি (Lol Lyrics & Romantic Epics): ষোড়শ শতাব্দীতে কাশ্মীরি সাহিত্যে ‘লোল’ (Lol) বা অত্যন্ত সুমিষ্ট, সংক্ষিপ্ত ও আবেগপূর্ণ রোমান্টিক গীতিময়তার জন্ম দেন কাশ্মীরের সম্রাজ্ঞী ও মহান কবি হাব্বা খাতুন (যাঁকে ‘নাইটিঙ্গেল অফ কাশ্মীর’ বলা হয়) এবং পরবর্তীতে আরনিমাল। এই ধারাটি রাজকীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের প্রেম, বিরহ এবং প্রকৃতির রূপকে অত্যন্ত লিরিক্যাল উপায়ে প্রকাশ করে। পরবর্তীতে মাহমুদ গামীর হাত ধরে ‘ইউসুফ-জুলাইখা’-র মতো অমর রোমান্টিক কিস্সা বা আখ্যান-কাব্যের বিকাশ ঘটে।

গ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে কাশ্মীরি কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী রূপ ধারণ করে। আকতার মহিউদ্দিনের হাত ধরে কাশ্মীরি ছোটগল্পের আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভূ-রাজনৈতিক সংকট, উপত্যকার প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা, সামরিক অস্থিরতা এবং মানুষের অস্তিত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে আধুনিক লেখকেরা বিশ্বমানের কথাসাহিত্য রচনা করেছেন।

ঘ. ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য ও ভাণ্ড পাথের (Bhand Pather – Folk Theatre): কাশ্মীরি নাট্যসাহিত্যের এক অনন্য লোকঐতিহ্য হলো ‘ভাণ্ড পাথের’। এটি মূলত এক ধরণের ব্যঙ্গাত্মক ও সঙ্গীতধর্মী পথনাটক, যা গ্রামীণ কাশ্মীরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক কুসংস্কার, দুর্নীতি এবং শাসক শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হাসির ছলে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর এক প্রগতিশীল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 

রহমান রাহী (১৯২৫–২০২৩): আধুনিক কাশ্মীরি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, তাত্ত্বিক এবং ২০০৭ সালে কাশ্মীরি ভাষায় প্রথম ও একমাত্র জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর গভীর মনস্তাত্ত্বিক, রূপকধর্মী ও প্রগতিশীল কাব্যগ্রন্থ 'সিয়াহ রুদ জিয়ারেন মানজ' (In Black Drizzle) কাশ্মীরি সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্যিক মাইলফলক।
রহমান রাহী

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন

কাশ্মীরি সাহিত্যে সামন্তবাদী ডোগরা রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিক শাসন, পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং উপত্যকার মানুষের রাজনৈতিক স্বাধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ও প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন (১৯৪৭): দেশভাগের সময় কাশ্মীরে গড়ে ওঠা ‘কাশ্মীর কালচারাল ফ্রন্ট’ এই ভাষার সাহিত্যে এক বিশাল প্রগতিশীল বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। দিনা নাথ নাদিম, গোলাম আহমদ মাহজুর এবং আব্দুল আহাদ আজাদের মতো লেখকেরা প্রগতিশীল লেখক সংঘের জোয়ারে শামিল হন। সাহিত্য প্রথম আধ্যাত্মিকতা ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ছেড়ে সরাসরি ডোগরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কৃষকদের জমি ও শ্রমিকের অধিকারের পক্ষে এবং প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠনের পক্ষে কথা বলতে শুরু করে।
  • দিনা নাথ নাদিম ও গদ্য-কবিতার বিপ্লব: আধুনিক কাশ্মীরি কবিতার পুরোধা দিনা নাথ নাদিম তাঁর বিখ্যাত প্রগতিশীল ও যুদ্ধবিরোধী কবিতা ‘বুম্বুর তে ইয়েম্বেরজল’ (The Bumblebee and the Narcissus) এবং শ্রমিকদের জাগরণের গানের মাধ্যমে কাশ্মীরি সাহিত্যের আধুনিক রূপান্তর ঘটান, যা উপত্যকার তরুণদের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
  • সংঘাত, ট্র্যাজেডি ও উত্তর-আধুনিক প্রতিরোধ ধারা: গত কয়েক দশক ধরে কাশ্মীরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, রাজনৈতিক অবদমন এবং কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গণ-দেশত্যাগের (Exodus) ক্ষত কাশ্মীরি সাহিত্যে এক তীব্র ও ট্রাজিক ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম দিয়েছে। রহমান রাহী এবং সমসাময়িক কবিদের লেখনীতে মানুষের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা, হারানো শান্তি এবং সংঘাতের মাঝে পিষ্ট হওয়া সাধারণ মানুষের আর্তনাদ অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল রূপ লাভ করেছে।

 

দিনা নাথ নাদিম (১৯১৬–১৯৮৮): বিংশ শতাব্দীর কাশ্মীরি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক ও বৈপ্লবিক প্রগতিশীল কবি। তিনি কাশ্মীরি কবিতায় প্রথম মুক্তছন্দ ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদের সফল প্রয়োগ করেন।
দিনা নাথ নাদিম

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

কাশ্মীরি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • লালদেদ / লল্লেশ্বরী (১৩২০–১৩৯২): কাশ্মীরি সাহিত্যের আদি ও অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী। তাঁর মরমী ও অসাম্প্রদায়িক ‘বাখ’ কবিতাগুলো কাশ্মীরি ভাষা ও সংস্কৃতির চিরন্তন ভিত্তিপ্রস্তর।
  • হাব্বা খাতুন (১৫৫৪–১৬০৯): কাশ্মীরের লোকপ্রিয় রানি ও মহান প্রথাবিরোধী কবি। কাশ্মীরি কবিতায় প্রেম, বিরহ ও লিরিক্যাল গীতিময়তার প্রবর্তক হিসেবে তিনি যুগ যুগ ধরে কাশ্মীরিদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
  • গোলাম আহমদ মাহজুর (১৮৮৭–১৯৫২): কাশ্মীরি সাহিত্যের ‘জাতীয় কবি’ বা ‘শায়ের-ই-কাশ্মীর’। তিনি কাশ্মীরি কবিতাকে আধুনিক যুগের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার সাথে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর কবিতা শুনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘কাশ্মীরের কবিগুরু’ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।
  • দিনা নাথ নাদিম (১৯১৬–১৯৮৮): বিংশ শতাব্দীর কাশ্মীরি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক ও বৈপ্লবিক প্রগতিশীল কবি। তিনি কাশ্মীরি কবিতায় প্রথম মুক্তছন্দ ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদের সফল প্রয়োগ করেন।
  • রহমান রাহী (১৯২৫–২০২৩): আধুনিক কাশ্মীরি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, তাত্ত্বিক এবং ২০০৭ সালে কাশ্মীরি ভাষায় প্রথম ও একমাত্র জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর গভীর মনস্তাত্ত্বিক, রূপকধর্মী ও প্রগতিশীল কাব্যগ্রন্থ ‘সিয়াহ রুদ জিয়ারেন মানজ’ (In Black Drizzle) কাশ্মীরি সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্যিক মাইলফলক।
  • আকতার মহিউদ্দিন (১৯২৮–২০০১): আধুনিক কাশ্মীরি কথাসাহিত্যের জনক। তাঁর বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘সাথ সাঙ্গার’ (Sath Sangar) তৎকালীন কাশ্মীরি সমাজের রূঢ় বাস্তবতা ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এক অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত দলিল।

 

হরি মোহন ঝা (১৯০৮–১৯৮৪): আধুনিক মৈথিলি কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও প্রাবন্ধিক। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক এবং কৌতুক ও ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসগুলো মৈথিলি সমাজকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
হরি মোহন ঝা

 

মৈথিলি সাহিত্য

ভারতের বিহার রাজ্যের পূর্বাঞ্চল (প্রাচীন মিথিলা অঞ্চল) এবং নেপালের তরাই অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত মৈথিলি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক ও ধ্রুপদী মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের ‘বর্ণরত্নাকর’ (যা এশিয়ার অন্যতম আদি গদ্য সংকলন) এবং চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি বিদ্যাপতির হাত ধরে মৈথিলি সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ ও নবজাগরণ ঘটে; বিশেষ করে রাধাকৃষ্ণের প্রেমগাথা সংবলিত বৈষ্ণব পদাবলী, অনন্য থিয়েটার-কাব্য (কীর্তনীয়া নাটক), সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং আধুনিক যুগের প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। মৈথিলি সাহিত্যের রাধাকৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রচিত পদাবলী সমগ্র পূর্ব ভারতে এক নতুন কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা ‘ব্রজবুলি’-র জন্ম দিয়েছিল, যা বাংলা, ওড়িয়া এবং অসমীয়া সাহিত্যকেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই ভাষার নিজস্ব ঐতিহাসিক লিপি রয়েছে যা ‘তিরহুতা’ বা ‘মিথিলাক্ষর’ নামে পরিচিত। বিংশ শতকের প্রথমার্ধের আধুনিকতাবাদী আন্দোলন, ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের গৌরবময় সংগ্রাম এবং উত্তর-আধুনিক প্রগতিশীল ও প্রান্তিক অধিকার আদায়ের এক দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে এই ভাষার, যেখানে মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতি, আধুনিক মৈথিলি কবিতার পুরোধা বৈদ্যনাথ মিশ্র (নাগার্জুন) এবং ললিত নারায়ণ মিশ্রের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ধ্রুপদী গীতি-কাব্যের ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল সমাজচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

রাজকমল চৌধুরী ও আধুনিকতাবাদী বিদ্রোহ: ১৯৬০-এর দশকে রাজকমল চৌধুরীর হাত ধরে মৈথিলি সাহিত্যে এক উগ্র আধুনিক ও প্রগতিশীল ধারার জন্ম হয়। তিনি সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, যৌন মনস্তত্ত্ব, অবদমিত মানুষের ক্ষোভ এবং পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপসহীন ও বৈপ্লবিক রূপ লাভ করা সাহিত্য উপহার দেন, যা মৈথিলি সাহিত্যের চেনা পরিধিকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
রাজকমল চৌধুরী

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

মৈথিলি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, ধ্রুপদী ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বিদ্যাপতি ও বৈষ্ণব পদাবলী (Vidyapati & Vaishnav Padavali): মৈথিলি সাহিত্যের মূল প্রাণশক্তি এবং বিশ্বখ্যাত ভিত্তি গড়ে উঠেছে চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বিদ্যাপতির হাত ধরে। তাঁকে ‘মৈথিল কোকিল’ বলা হয়। রাধাকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক ও লৌকিক প্রেম নিয়ে তিনি যে হাজার হাজার পদাবলী রচনা করেছিলেন, তা মৈথিলি সংস্কৃতির প্রাণ। এই কাব্যধারা পূর্ব ভারতের বৈষ্ণব আন্দোলনকে তীব্রভাবে বেগবান করেছিল এবং এর সহজ, সুরময় রূপ সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিল।

খ. কীর্তনীয়া নাটক ও ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার (Kirtaniya Natak & Traditional Theatre): মধ্যযুগীয় মিথিলায় এক সম্পূর্ণ নিজস্ব নাট্যধারার জন্ম হয়, যা ‘কীর্তনীয়া নাটক’ নামে পরিচিত। উমাপতি উপাধ্যায়ের ‘পারিজাত হরণ’ এই ধারার এক অনন্য ক্লাসিক। এই নাটকগুলোতে মূলত মৈথিলি ভাষায় গান এবং সংস্কৃত বা প্রাকৃত ভাষায় সংলাপ ব্যবহার করে মাঙ্গলিক পরিবেশ তৈরি করা হতো, যা মিথিলার লোকসংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আজও টিকে রয়েছে।

গ. বর্ণরত্নাকর ও প্রাচীন গদ্য (Varna Ratnakara & Early Prose): মৈথিলি সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গৌরবময় দিক হলো এর প্রাচীন গদ্যের ঐতিহ্য। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুর রচিত ‘বর্ণরত্নাকর’ (Varna Ratnakara) হলো উত্তর ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম গদ্য বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া। মধ্যযুগীয় সমাজ, রাজনীতি, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির এক অনন্য বাস্তবসম্মত দলিল এই গ্রন্থটি।

ঘ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে এসে মৈথিলি কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী রূপ ধারণ করে। হরি মোহন ঝা-র হাত ধরে মৈথিলি উপন্যাসে তীব্র সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক ধারার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ললিত এবং রাজকমল চৌধুরীর লেখনী মিথিলার গ্রামীণ জীবনের জটিলতা, নারী অবদমন এবং প্রান্তিক মানুষের তীব্র জীবনসংগ্রামকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ করে তোলে।

বৈ্দ্যনাথ মিশ্র, যাত্ৰী, নাগার্জুন (১৯১১–১৯৯৮): মৈথিলি সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও বিপ্লবী কবি এবং ১৯৬৮ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর 'চিত্রা' ও 'পত্রহীন নগ্ন গাছ' কাব্যগ্রন্থ মৈথিলি প্রগতিশীল কবিতার ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক মাইলফলক।
বৈ্দ্যনাথ মিশ্র, যাত্ৰী, নাগার্জুন

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

মৈথিলি সাহিত্যে সামন্তবাদ, জাতপ্রথা, রক্ষণশীল ব্রাহ্মণতন্ত্র এবং গ্রামীণ মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • হরি মোহন ঝা এবং কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলন: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হরি মোহন ঝা তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘কন্যাদান’ এবং ‘দ্বিরাগমন’-এর মাধ্যমে মিথিলার রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা, বাল্যবিকাশ, বেমানান বিয়ে এবং নারীদের ওপর হওয়া অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও প্রগতিশীল জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন।
  • নাগার্জুন ও প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন: আধুনিক মৈথিলি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈপ্লবিক পুরোধা হলেন বৈদ্যনাথ মিশ্র, যিনি ‘যাত্ৰী’ ও ‘নাগার্জুন’ ছদ্মনামে লিখতেন। তিনি মৈথিলি কবিতায় সরাসরি মার্ক্সীয় দর্শন, মেহনতি কৃষক-শ্রমিকের শ্রেণীসংগ্রাম এবং মেহনতি মানুষের বিপ্লবের বাণী ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর কবিতা ছিল শোষক শ্রেণীর ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক একটি প্রগতিশীল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
  • রাজকমল চৌধুরী ও আধুনিকতাবাদী বিদ্রোহ: ১৯৬০-এর দশকে রাজকমল চৌধুরীর হাত ধরে মৈথিলি সাহিত্যে এক উগ্র আধুনিক ও প্রগতিশীল ধারার জন্ম হয়। তিনি সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, যৌন মনস্তত্ত্ব, অবদমিত মানুষের ক্ষোভ এবং পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপসহীন ও বৈপ্লবিক রূপ লাভ করা সাহিত্য উপহার দেন, যা মৈথিলি সাহিত্যের চেনা পরিধিকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

 

বিদ্যাপতি (১৩৫২–১৪৪৮): মৈথিলি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট, মহাকবি ও মৈথিল কোকিল। তাঁর পদাবলী এবং 'কীর্তিলতা' ও 'কীর্তিপতাকা' কাব্য এই ভাষাকে ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর ও ধ্রুপদী আসন এনে দিয়েছে।
বিদ্যাপতি

 

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

মৈথিলি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুর (১২৮০–১৩৪০): মৈথিলি সাহিত্যের আদি পুরুষ এবং প্রখ্যাত নাট্যকার। তাঁর রচিত ‘বর্ণরত্নাকর’ ও ‘ধূর্তসমাগম’ নাটক এই ভাষার প্রাচীনতম গদ্য ও ব্যঙ্গসাহিত্যের এক অনন্য আকর গ্রন্থ।
  • বিদ্যাপতি (১৩৫২–১৪৪৮): মৈথিলি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট, মহাকবি ও মৈথিল কোকিল। তাঁর পদাবলী এবং ‘কীর্তিলতা’ ও ‘কীর্তিপতাকা’ কাব্য এই ভাষাকে ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর ও ধ্রুপদী আসন এনে দিয়েছে।
  • হরি মোহন ঝা (১৯০৮–১৯৮৪): আধুনিক মৈথিলি কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও প্রাবন্ধিক। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক এবং কৌতুক ও ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসগুলো মৈথিলি সমাজকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • বৈ্দ্যনাথ মিশ্র / যাত্ৰী / নাগার্জুন (১৯১১–১৯৯৮): মৈথিলি সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও বিপ্লবী কবি এবং ১৯৬৮ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর ‘চিত্রা’ ও ‘পত্রহীন নগ্ন গাছ’ কাব্যগ্রন্থ মৈথিলি প্রগতিশীল কবিতার ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক মাইলফলক।
  • রাজকমল চৌধুরী (১৯২৯–১৯৬৭): বিংশ শতাব্দীর মৈথিলি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী বৈপ্লবিক ও উত্তর-আধুনিক কবি ও ঔপন্যাসিক। মাত্র ৩৮ বছর বয়সের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি মৈথিলি কথাসাহিত্যে অবক্ষয়বাদ, অস্তিত্ববাদ ও প্রথাবিরোধী চিন্তার এক জলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন।
  • ললিত (১৯৩২–১৯৮৩): মৈথিলি কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবতাবাদী লেখক। মিথিলার গ্রামীণ সমাজের ক্ষয়িষ্ণু রূপ ও মানুষের জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পগুলো এই সাহিত্যের এক অনবদ্য সম্পদ।

 

দামোদর মৌজো (১৯৪৪—বর্তমান): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কথাসাহিত্যিক, সমাজকর্মী এবং ২০২১ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর উপন্যাস 'কার্মেলিন' এবং ছোটগল্পগুলো কোঙ্কানি মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও মানবীয় সম্পর্কের এক অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত দলিল।
দামোদর মৌজো

 

কোঙ্কানি সাহিত্য

ভারতের গোয়া রাজ্য, মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ উপকূল (কোঙ্কণ অঞ্চল), কর্ণাটকের উপকূলীয় জেলা এবং কেরালার কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত কোঙ্কানি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত অনন্য ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্যিক মাধ্যম। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শিলালিপি, সন্ত নামদেবের সমসাময়িক কবিদের আধ্যাত্মিক রচনা এবং ষোড়শ শতাব্দীতে কৃষ্ণদাস শামার ‘অশ্বমেধ’ ও ‘রঘুনাথবংশীয় কথা’র হাত ধরে কোঙ্কানি সাহিত্যের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়; বিশেষ করে উপকূলীয় লোকসংস্কৃতি, সমুদ্রের সামুদ্রিক জীবন, রোমান ক্যাথলিক ঐতিহ্য এবং পর্তুগিজ উপনিবেশের গভীর প্রভাব কোঙ্কানি সাহিত্যের প্রতিটি ধারায় বা জনরায় স্পষ্ট। কোঙ্কানি একটি অত্যন্ত বিরল ও অনন্য ভাষা যা ভৌগোলিক ও ধর্মীয় কারণে প্রধানত পাঁচটি লিপিতে—দেবনাগরী, রোমান (ক্যাথলিকদের মধ্যে), কন্নড়, মালায়ালম এবং আরবি—চর্চিত হয়ে আসছে। কোঙ্কানি সাহিত্যে পর্তুগিজদের দ্বারা চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে হওয়া ভাষাতাত্ত্বিক দমন ও নিষেধাজ্ঞা, ১৯২০-এর দশকে শুরু হওয়া কোঙ্কানি পুনর্জাগরণ আন্দোলন (Konkani Language Movement) এবং ১৯৬১ সালে গোয়ার স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের গৌরবময় সংগ্রাম ও প্রগতিশীল অধিকার আদায়ের এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে, যেখানে আধুনিক কোঙ্কানি গদ্যের জনক শেনই গোয়বাব, জ্ঞানপীঠ বিজয়ী রবীন্দ্র কেলকর এবং দামোদর মৌজোর মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গভীর ক্ষত ও প্রতিরোধের সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

রবীন্দ্র কেলকর ও গান্ধীবাদী প্রগতিশীল চেতনা: গোয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জ্ঞানপীঠ জয়ী রবীন্দ্র কেলকর কোঙ্কানি সাহিত্যে এক সুগভীর চিন্তাশীল ও প্রগতিশীল গদ্যের জোয়ার আনেন। তিনি গান্ধীবাদী দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং অসাম্প্রদায়িক কোঙ্কানি সমাজের পক্ষে অসংখ্য কালজয়ী প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনা করে কোঙ্কানি সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করেন।
রবীন্দ্র কেলকর

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

কোঙ্কানি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, বহু-সাংস্কৃতিক ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. আদি গদ্য ও ধর্মীয় রূপান্তর সাহিত্য (Early Prose & Religious Literature): কোঙ্কানি সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আদি গদ্যের ঐতিহ্য রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে গোয়ায় পর্তুগিজ আগমনের পর জেসুইট মিশনারিরা (যেমন ফাদার থমাস স্টিফেনস) কোঙ্কানি ভাষা শিখে এই ভাষায় খ্রিষ্টধর্মের প্রচার শুরু করেন। তাঁদের রচিত ‘ক্রিস্ট পুরাণ’ কোঙ্কানি ও মারাঠি মিশ্রিত এক অনন্য ধ্রুপদী মহাকাব্য। এই ধর্মীয় সাহিত্যিক আদান-প্রদান কোঙ্কানি গদ্যের ব্যাকরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড় করাতে সাহায্য করেছিল।

খ. ফোব ও ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি (Phov & Traditional Folk Songs): চারদিকের মহাসাগর ও উপকূলের প্রকৃতি কোঙ্কানি লোকসাহিত্যকে এক অনন্য লিরিক্যাল রূপ দিয়েছে। ‘ফোব’ (Phov), ‘ম্যান্ডো’ (Mando — যা গোয়ান ক্যাথলিকদের ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গান) এবং ‘ডুলপড’ (Dulpod)-এর মতো অনন্য লোক-জনরার মাধ্যমে কোঙ্কানি সমাজের প্রেম, বিরহ, পর্তুগিজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদ এবং সমুদ্রের বুকে জেলেদের জীবনসংগ্রামকে অত্যন্ত সুমিষ্ট সুরে ফুটিয়ে তোলা হতো, যা আজ কোঙ্কানি সংস্কৃতির প্রাণশক্তি।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে এসে কোঙ্কানি কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী, প্রগতিশীল ও বাস্তবমুখী রূপ ধারণ করে। রবীন্দ্র কেলকরের মনস্তাত্ত্বিক সামাজিক গদ্য এবং পরবর্তীতে দামোদর মৌজোর লেখনী কোঙ্কানি কথাসাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ করে তোলে। গোয়ার গ্রামীণ জীবন, সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের শোষণ, খ্রিষ্টান ও হিন্দু সমাজের সামাজিক মেলবন্ধন এবং আধুনিক পর্যটনের আড়ালে থাকা মানুষের তীব্র জীবনসংগ্রাম এই কথাসাহিত্যের মূল উপজীব্য।

ঘ. তিয়াত্র ও আধুনিক নাট্যসাহিত্য (Tiatr & Modern Theatre): কোঙ্কানি সাহিত্যের সবচেয়ে অনন্য এবং তুমুল জনপ্রিয় একটি থিয়েটার-জনরা হলো ‘তিয়াত্র’ (Tiatr)। ঊনবিংশ শতকের শেষে রোমান লিপিতে গোয়ান খ্রিষ্টানদের হাত ধরে এই নাট্যরীতির জন্ম হয়। তিয়াত্র হলো গান, নাচ এবং নাটকের এক নিখুঁত মেলবন্ধন, যা গোয়ার গ্রামে ও শহরে আজও প্রধান সামাজিক চালিকাশক্তি এবং এর মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষুরধার ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ জানানো হয়।

 

বাকিবাব বরকার, বালকৃষ্ণ ভগবান্ত বরকার (১৯১০–১৯৮৪): কোঙ্কানি ও মারাঠি—উভয় ভাষারই অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী কবি। গোয়ার পর্তুগিজ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতাগুলো বিপ্লবীদের প্রধান হাতিয়ার ছিল।
বাকিবাব বরকার, বালকৃষ্ণ ভগবান্ত বরকার

 

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

কোঙ্কানি সাহিত্যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, মারাঠি ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা, জাতপ্রথা এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • শেনই গোয়বাব ও কোঙ্কানি পুনর্জাগরণ: পর্তুগিজ ও মারাঠি ভাষার চাপে কোঙ্কানি যখন প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছিল, তখন বিংশ শতকের শুরুতে ওয়ামন রঘুনাথ শেনই বর্দো (শেনই গোয়বাব) এক বিশাল প্রগতিশীল ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটান। তিনি কোঙ্কানি ভাষায় অসংখ্য গল্প, নাটক ও শিশুদের বই লিখে প্রমাণ করেন যে কোঙ্কানি কোনো উপভাষা নয়, বরং একটি স্বাধীন ও উচ্চমানের সাহিত্যিক ভাষা। তাঁর এই আন্দোলন কোঙ্কানিদের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছিল।
  • রবীন্দ্র কেলকর ও গান্ধীবাদী প্রগতিশীল চেতনা: গোয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জ্ঞানপীঠ জয়ী রবীন্দ্র কেলকর কোঙ্কানি সাহিত্যে এক সুগভীর চিন্তাশীল ও প্রগতিশীল গদ্যের জোয়ার আনেন। তিনি গান্ধীবাদী দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং অসাম্প্রদায়িক কোঙ্কানি সমাজের পক্ষে অসংখ্য কালজয়ী প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনা করে কোঙ্কানি সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করেন।
  • উত্তর-আধুনিক বাস্তবতাবাদ ও দামোদর মৌজো: উত্তর-আধুনিক কোঙ্কানি কথাসাহিত্যে দামোদর মৌজোর লেখনী এক শক্তিশালী সমাজবাস্তববাদী ধারার জন্ম দেয়। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘কার্মেলিন’ (Karmelin) গোয়ার দরিদ্র নারীদের মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে যে অমানবিক শোষণ ও অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তার এক আপসহীন ও চরম প্রগতিশীল নারীবাদী দলিল, যা বিশ্বজুড়ে উচ্চ প্রশংসিত।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

কোঙ্কানি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • কৃষ্ণদাস শামা (ষোড়শ শতাব্দী): কোঙ্কানি গদ্যের আদি পুরুষ। তিনি রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন পর্ব অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল কোঙ্কানি গদ্যে অনুবাদ করে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন।
  • শেনই গোয়বাব / ওয়ামন রঘুনাথ শেনই বর্দো (১৮৭৭–১৯৪৬): আধুনিক কোঙ্কানি ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান স্থপতি। কোঙ্কানি ভাষার অধিকার রক্ষা ও এর নবজাগরণে তাঁর একক এবং অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে কোঙ্কানি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ চারণপুরুষ মনে করা হয়।
  • বাকিবাব বরকার / বালকৃষ্ণ ভগবান্ত বরকার (১৯১০–১৯৮৪): কোঙ্কানি ও মারাঠি—উভয় ভাষারই অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী কবি। গোয়ার পর্তুগিজ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতাগুলো বিপ্লবীদের প্রধান হাতিয়ার ছিল।
  • রবীন্দ্র কেলকর (১৯২৫–২০১০): প্রখ্যাত প্রগতিশীল প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক ও ২০০৬ সালে কোঙ্কানি ভাষায় প্রথম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর মননশীল ও দার্শনিক লেখনী কোঙ্কানি সাহিত্যকে এক অনন্য বৈচারিক আভিজাত্য দান করেছে।
  • দামোদর মৌজো (১৯৪৪—বর্তমান): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কথাসাহিত্যিক, সমাজকর্মী এবং ২০২১ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর উপন্যাস ‘কার্মেলিন’ এবং ছোটগল্পগুলো কোঙ্কানি মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও মানবীয় সম্পর্কের এক অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত দলিল।

 

 

সারদা প্রসাদ কিসকু (১৯২৯–১৯৯৬): আধুনিক সাঁওতালি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল কবি ও সাহিত্যিক। সমাজ সংস্কার এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে তাঁর ধারালো ও বৈপ্লবিক কবিতাগুলো সাঁওতালি প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রধান অনুপ্রেরণা।
সারদা প্রসাদ কিসকু

 

 

সাঁওতালি সাহিত্য

ভারতের ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) জুড়ে বিস্তৃত সাঁওতালি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং উপমহাদেশের সুপ্রাচীন প্রাক-আর্য (Pre-Aryan) বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ আদিবাসী সাহিত্যিক মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে হাজার বছর ধরে সম্পূর্ণ মৌখিক ঐতিহ্যের (Oral Tradition) ওপর ভর করে টিকে থাকা এই ভাষার সাহিত্য মূলত লোকগাথা, গান, সৃষ্টিতত্ত্বের আখ্যান এবং রূপকথার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু কর্তৃক সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব বৈজ্ঞানিক লিপি ‘অল চিকি’ (Ol Chiki) আবিষ্কারের পর সাঁওতালি লিখিত সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব জোয়ার ও আধুনিক নবজাগরণ আসে; বিশেষ করে গভীর প্রকৃতি প্রেম, ১৮৫৫ সালের ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের (সান্তাল হুল) বীরত্বগাথা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। ২০০৩ সালে ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে একটি স্বাধীন ও অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা আরও সুদৃঢ় হয়। আদিবাসী সংস্কৃতির চিরন্তন সরলতা ও যৌথতার দর্শনের সাথে আধুনিক যুগের পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সাধু রামচাঁদ মুর্মু (১৮৯৭–১৯৪৮): সাঁওতালি সাহিত্যের অন্যতম আদি মহান কবি, সুরকার ও দার্শনিক, যাঁর লেখনীতে সাঁওতালি কবিতা প্রথম আধুনিক গীতি-কাব্যের রূপ লাভ করে। তাঁর 'লিতা গড এত ক্রনিকল' সাঁওতালি সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
সাধু রামচাঁদ মুর্মু

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

সাঁওতালি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই প্রাকৃতিক, ছন্দোময় ও দ্রোহী চেতনায় ঋদ্ধ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. মৌখিক ঐতিহ্য ও সৃষ্টিতত্ত্বের আখ্যান (Oral Tradition & Binti): সাঁওতালি সাহিত্যের আদি ভিত্তি হলো এর বিপুল মৌখিক সাহিত্য। বিশেষ করে ‘বিনতি’ (Binti) হলো সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী সৃষ্টিতত্ত্বের গান বা আখ্যান, যা মূলত বিবাহ বা সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রবীণদের দ্বারা গাওয়া হয়। এর মাধ্যমে পৃথিবী সৃষ্টি, মানবজাতির আগমন এবং সাঁওতাল জাতির সুদীর্ঘ পরিযায়নের (Migration) ইতিহাস অত্যন্ত শৈল্পিক ও কাব্যিক গদ্যে মুখে মুখে ধরে রাখা হয়েছে।

খ. হুল-গাথা ও বীরত্বকাব্য (Hul Ballads & Resistance Poetry): সাঁওতালি সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রগতিশীল অংশ গড়ে উঠেছে ১৮৫৫ সালের ব্রিটিশ ও জমিদার বিরোধী ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ বা ‘সান্তাল হুল’ (Santhal Hul)-কে কেন্দ্র করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব—এই চার বীর ভাইয়ের বীরত্ব এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীর-ধনুক নিয়ে লড়ার অবিনাশী ইতিহাস নিয়ে শত শত লোকগাথা ও কবিতা রচিত হয়েছে, যা সাঁওতালি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।

গ. ঋতুভিত্তিক লোকগীতি ও কারাম (Folk Songs & Karam): সাঁওতালি কবিতা ও গান মূলত প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘সোহরাই’ (Sohrai – ফসল কাটার উৎসব), ‘বাহা’ (Baha – বসন্ত উৎসব), ‘দাশাই’ (Dashai) এবং ‘কারাম’ (Karam) উৎসবের গানগুলো সাঁওতালি সাহিত্যের অমূল্য গীতি-সম্পদ। এই গানগুলোতে জঙ্গল, পাহাড়, নদী এবং মানুষের মধ্যকার গভীর আত্মিক সম্পর্ককে অত্যন্ত চমৎকার উপমায় ফুটিয়ে তোলা হয়।

ঘ. আধুনিক কথাসাহিত্য ও লিখিত উপন্যাস (Modern Written Fiction): অল চিকি লিপি চালুর পর সাঁওতালি গদ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। সাধু রামচাঁদ মুর্মু এবং পরবর্তীতে অন্য লেখকদের হাত ধরে সাঁওতালি ছোটগল্প ও উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। সমসাময়িক সাঁওতালি কথাসাহিত্যে কয়লা খনি বা কলকারখানার গ্রাসে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমিন হারানোর ট্র্যাজেডি, উচ্ছেদ সমস্যা, গ্রামীণ সমাজের ভাঙন এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের দোটানা অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠছে।

ভোগলা সরেন - প্রখ্যাত আধুনিক সাঁওতালি নাট্যকার ও সাহিত্যিক, যিনি ২০১০ সালে সাঁওতালি নাটকে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর নাটকগুলো সমসাময়িক আদিবাসী সমাজের রূপান্তর ও রাজনৈতিক সংকটের এক নিখুঁত দর্পণ।
ভোগলা সরেন

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন

সাঁওতালি সাহিত্যে সামন্তবাদী মহাজনদের শোষণ, ঔপনিবেশিক শাসন, করপোরেট আগ্রাসন এবং আদিবাসী আত্মপরিচয় রক্ষার পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও আপসহীন প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু ও অল চিকি আন্দোলন: সাঁওতালি ভাষা আগে রোমান, বাংলা, ওড়িয়া বা দেবনাগরী লিপিতে লেখার চেষ্টা করা হতো, যা এই ভাষার মৌলিক ধ্বনিগুলোকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারত না। পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু সাঁওতালি সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে ভিত্তি করে ‘অল চিকি’ লিপি আবিষ্কার করেন। তাঁর এই লিপি আন্দোলন কেবল একটি বর্ণমালা তৈরি ছিল না, বরং তা ছিল আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক বিশাল প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন।
  • সারদা প্রসাদ কিসকু ও সমাজতান্ত্রিক চেতনা: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাঁওতালি কবি ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ সারদা প্রসাদ কিসকু (যাঁকে ‘কবি রত্ন’ বলা হয়) তাঁর কবিতার মাধ্যমে সাঁওতাল সমাজের অন্ধ কুসংস্কার, ডাইনি প্রথার মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করার ডাক দেন। একই সাথে তিনি মেহনতি সাঁওতাল কৃষকদের শ্রেণীসংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো কলম ধরেছিলেন।
  • জল-জঙ্গল-জমিনের উত্তর-আধুনিক লড়াই: উত্তর-আধুনিক সাঁওতালি সাহিত্যে কর্পোরেট পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম হয়েছে। আধুনিক সাঁওতালি কবি ও গল্পকারদের লেখনীতে অরণ্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদী চেতনা, আদিবাসী নারীদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় অবদমনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ এক কালজয়ী প্রগতিশীল ইশতেহার হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

সাঁওতালি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু (১৯০৫–১৯৮২): সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট, রূপকার ও ‘গুরু গোমকে’ (Great Teacher)। তিনি অল চিকি লিপির আবিষ্কারক এবং তাঁর লেখা ‘বিদু চন্দন’ (Bidu Chandan) ও ‘খেরওয়ার বীর’ (Kherwar Bir) নাটক সাঁওতালি সাহিত্যের লিখিত ইতিহাসের কালজয়ী মাইলফলক।
  • সাধু রামচাঁদ মুর্মু (১৮৯৭–১৯৪৮): সাঁওতালি সাহিত্যের অন্যতম আদি মহান কবি, সুরকার ও দার্শনিক, যাঁর লেখনীতে সাঁওতালি কবিতা প্রথম আধুনিক গীতি-কাব্যের রূপ লাভ করে। তাঁর ‘লিতা গড এত ক্রনিকল’ সাঁওতালি সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
  • সারদা প্রসাদ কিসকু (১৯২৯–১৯৯৬): আধুনিক সাঁওতালি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল কবি ও সাহিত্যিক। সমাজ সংস্কার এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে তাঁর ধারালো ও বৈপ্লবিক কবিতাগুলো সাঁওতালি প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রধান অনুপ্রেরণা।
  • ডমন সাহু ‘সমীর’ (১৯২৪–২০১৮): সাঁওতালি গদ্য ও সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান রূপকার। তিনি সাঁওতালি সাহিত্যের ইতিহাস লিখন, ব্যাকরণ চর্চা এবং প্রথম সাঁওতালি পত্রিকা ‘হোর সেম্বাদ’ (Hor Sombad) সম্পাদনার মাধ্যমে এই ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করেছিলেন।
  • ভোগলা সরেন (সমসাময়িক): প্রখ্যাত আধুনিক সাঁওতালি নাট্যকার ও সাহিত্যিক, যিনি ২০১০ সালে সাঁওতালি নাটকে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর নাটকগুলো সমসাময়িক আদিবাসী সমাজের রূপান্তর ও রাজনৈতিক সংকটের এক নিখুঁত দর্পণ।
  • যদুমনী বেশরা (সমসাময়িক): আধুনিক সাঁওতালি কথাসাহিত্য ও কবিতার অন্যতম শক্তিশালী প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর। সাঁওতালি ভাষার অধিকার আন্দোলন এবং সমসাময়িক আদিবাসী নারীদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর নিয়ে তাঁর গল্প ও কবিতাগুলো বিশ্বমানের।

 

 

চিত্তধর হৃদয় (১৯০৬–১৯৮২): নেওয়ারি সাহিত্যের 'কবিবর' এবং আধুনিক গদ্যের স্থপতি। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর রচিত মহাকাব্য 'সুগত সৌরভ' নেওয়ারি সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য আভিজাত্যের আসনে বসিয়েছে।
চিত্তধর হৃদয়

 

 

 

নেওয়ারি ভাষা বা নেপাল ভাষা:

নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকা (কাঠমান্ডু, ললিতপুর ও ভক্তপুর) এবং ভারতের সিকিম ও পাহাড়ী অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত নেওয়ারি ভাষা (যা নেপালের বর্তমান সরকারি ভাষা ‘নেপালি’ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তিব্বতি-বর্মী ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত) দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান ধ্রুপদী সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের আদি পাণ্ডুলিপি ‘হরমেখলা’ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর মল্ল রাজাদের (Malla Dynasty) রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার হাত ধরে এই ভাষার লিখিত সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ ও নবজাগরণ ঘটেছিল; বিশেষ করে হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনের অনন্য মেলবন্ধন, প্রাচীন রাজকীয় নাটক, ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা ও গল্প বলার বিশেষ রীতি বা ‘খায়াহ’ (Khayah), সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং আধুনিক প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। নেওয়ারি ভাষা ও সাহিত্যকে বিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রে টিকে থাকার জন্য এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াই করতে হয়েছিল, যা ‘নেপাল ভাষা আন্দোলন’ (Nepal Bhasa Movement) নামে পরিচিত। স্বৈরাচারী রানা রাজতন্ত্রের ভাষা-দমন নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক ও প্রগতিশীল অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে এই ভাষার, যেখানে মহাকবি সিদ্ধিদাস মহাজুর, ‘কবিবর’ চিত্তধর হৃদয় এবং প্রগতিশীল গদ্যের রূপকার ধুঁসঁ ওয়ানিয়া (বৈকুণ্ঠ প্রসাদ লাকোউল)-র মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন ধ্রুপদী নেওয়ার স্থাপত্য, চিত্রকলা ও উৎসবের লিরিক্যাল ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল সমাজচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সিদ্ধিদাস মহাজুর ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন: নেওয়ারি সাহিত্যের 'মহাকবি' সিদ্ধিদাস মহাজুর তৎকালীন নেওয়ার সমাজের অন্ধ কুসংস্কার, জাতপ্রথা, বাল্যবিয়ে এবং অপচয়সর্বস্ব উৎসবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর 'সিদ্ধি রামায়ণ' এবং নীতিধর্মীয় কবিতাগুলো সমাজকে প্রগতির আলো দেখাতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
সিদ্ধিদাস মহাজু, সিদ্ধিদাস অমাত্য

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

নেওয়ারি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মৌলিক, বহুমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. মল্ল আমলের রাজকীয় নাটক ও গীতি-কাব্য (Malla Era Drama & Lyric Poetry): নেওয়ারি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীকে। রাজা জগৎ প্রকাশ মল্ল এবং মহিন্দ্র মল্লের মতো শাসকেরা নিজেরা কবি ও নাট্যকার ছিলেন। এই যুগে ‘নেপাল লিপি’ বা ‘প্রচলিত লিপি’ (Prachalit Script)-তে শত শত নাটক ও গীতি-কাব্য রচিত হয়, যা কাঠমান্ডুর রাজদরবারে মঞ্চস্থ হতো। এই নাটকগুলো ছিল মূলত হিন্দু পুরাণ ও বৌদ্ধ জাতকের গল্পের এক চমৎকার সুরময় মেলবন্ধন।

খ. খায়াহ ও লোকগাথার ঐতিহ্য (Khayah & Folk Literature): নেওয়ারি সাহিত্যের একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং অনন্য জনরা হলো ‘খায়াহ’ (Khayah)। এটি মূলত এক ধরণের ঐতিহ্যবাহী ব্যঙ্গাত্মক, শিক্ষণীয় ও দার্শনিক গল্প বলার মৌখিক রীতি, যা পরবর্তীতে লিখিত রূপ নেয়। এর মাধ্যমে নেওয়ার সমাজের রীতিনীতি, মানব চরিত্রের ভণ্ডামি এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ শৈলীতে ফুটিয়ে তোলা হয়।

গ. বৌদ্ধ অবদান সাহিত্য ও পুথি ঐতিহ্য (Buddhist Avadana Literature): তিব্বতি-বর্মী গোষ্ঠীর ভাষা হলেও নেওয়ারি সাহিত্য বৌদ্ধ মহাযান ও বজ্রযান দর্শনের এক অমূল্য ভাণ্ডার। বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনী নিয়ে রচিত ‘অবদান’ (Avadana) সাহিত্য নেওয়ারি গদ্যের আদি ভিত্তি। প্রাচীন নেওয়ারি পুথিগুলো গুম্বা ও বিহারে অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে, যা এই ভাষার গভীর মননশীলতার পরিচয় দেয়।

ঘ. কথাসাহিত্য: আধুনিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে নেওয়ারি কথাসাহিত্য আধুনিক ও বাস্তবমুখী রূপ ধারণ করে। চিত্তধর হৃদয়ের হাত ধরে নেওয়ারি গদ্য এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। পরবর্তীতে ধুঁসঁ ওয়ানিয়ার ‘মিশা’ (Misha — যার অর্থ নারী) উপন্যাসটি নেওয়ারি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম আধুনিক উপন্যাস, যা সমাজবাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক কালজয়ী নিদর্শন।

রাজা জগৎ প্রকাশ মল্ল (১৬৩৮–১৬৭৩): ভক্তপুরের এই মল্ল রাজা একাধারে মহান শাসক এবং নেওয়ারি ধ্রুপদী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও কবি। তাঁর রচিত গীতি-কাব্যগুলো নেওয়ারি সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তম্ভ।
রাজা জগৎ প্রকাশ মল্ল

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

নেওয়ারি সাহিত্যে স্বৈরাচারী রানা রাজতন্ত্রের ভাষাতাত্ত্বিক নিপীড়ন, জাতিগত বৈষম্য, সামন্তবাদ এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত আপসহীন ও বৈপ্লবিক প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • রানা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘কারাবাস সাহিত্য’ (Prison Literature): বিংশ শতকের প্রথমার্ধে নেপালের রানা শাসকেরা নেওয়ারি ভাষায় সাহিত্য চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়। এই দমনপীড়নের বিরুদ্ধে কবি চিত্তধর হৃদয় এবং ফটে বাহাদুর প্রধানের মতো লেখকেরা গোপনে কলম ধরেন। চিত্তধর হৃদয়কে কারাগারে বন্দী করা হলে তিনি টুথপিক বা কাঠি দিয়ে লুকিয়ে তাঁর অমর মহাকাব্য ‘সুগত সৌরভ’ (Sugata Saurabha — বুদ্ধের জীবনী) রচনা করেন। এই মহাকাব্যটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নেওয়ারি সাহিত্যের এক চিরন্তন বৈপ্লবিক ইশতেহার।
  • সিদ্ধিদাস মহাজুর ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন: নেওয়ারি সাহিত্যের ‘মহাকবি’ সিদ্ধিদাস মহাজুর তৎকালীন নেওয়ার সমাজের অন্ধ কুসংস্কার, জাতপ্রথা, বাল্যবিয়ে এবং অপচয়সর্বস্ব উৎসবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর ‘সিদ্ধি রামায়ণ’ এবং নীতিধর্মীয় কবিতাগুলো সমাজকে প্রগতির আলো দেখাতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • প্রগতিশীল লেখক সংঘ ও আধুনিক দ্রোহ: ১৯৫০-এর দশকে নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর নেওয়ারি সাহিত্যে মার্ক্সীয় ও প্রগতিশীল ভাবধারার জোয়ার আসে। ‘নেপাল ভাষা পরিষদ’ গঠনের মাধ্যমে তরুণ কবিরা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদ, মেহনতি মানুষের শ্রেণীসংগ্রাম এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার কবিতা ও নাটক লিখতে শুরু করেন, যা নেওয়ারি সাহিত্যকে আধুনিক রূপ দেয়।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

নেওয়ারি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • রাজা জগৎ প্রকাশ মল্ল (১৬৩৮–১৬৭৩): ভক্তপুরের এই মল্ল রাজা একাধারে মহান শাসক এবং নেওয়ারি ধ্রুপদী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও কবি। তাঁর রচিত গীতি-কাব্যগুলো নেওয়ারি সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তম্ভ।
  • সিদ্ধিদাস মহাজু, সিদ্ধিদাস অমাত্য (১৮৬৭–১৯৩১): নেওয়ারি সাহিত্যের ‘মহাকবি’ এবং আধুনিক নেওয়ারি নবজাগরণের চার প্রধান স্তম্ভের (Four Pillars of Nepal Bhasa) অন্যতম। তিনি ভাষাকে রানা রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অনন্য আধুনিক ও সমাজ সংস্কারমূলক উচ্চতা দান করেছিলেন।
  • চিত্তধর হৃদয় (১৯০৬–১৯৮২): নেওয়ারি সাহিত্যের ‘কবিবর’ এবং আধুনিক গদ্যের স্থপতি। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর রচিত মহাকাব্য ‘সুগত সৌরভ’ নেওয়ারি সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য আভিজাত্যের আসনে বসিয়েছে।
  • ধুঁসঁ ওয়ানিয়া / বৈকুণ্ঠ প্রসাদ লাকোউল (১৯২০–২০০০): আধুনিক নেওয়ারি কথাসাহিত্যের জনক। তাঁর ‘মিশা’ উপন্যাস এবং মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্পগুলো নেওয়ারি গ্রামীণ ও নাগরিক সমাজের ভাঙন এবং নারীর অধিকারের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত দলিল।
  • ফটে বাহাদুর প্রধান (১৯১৫–১৯৯৫): নেওয়ারি সাহিত্যের এক মহান বৈপ্লবিক কণ্ঠস্বর। ১৯৪০ সালে নেওয়ারি কবিতার প্রথম আধুনিক সংকলন ‘নেপাল বিহার’ প্রকাশের অপরাধে রানা সরকার তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল, যা তাঁকে নেপাল ভাষা আন্দোলনের এক অমর প্রতীকে পরিণত করে।

 

রাজস্থানি সাহিত্য

ভারতের রাজস্থান রাজ্য, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত রাজস্থানি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য (Sanskrit-Prakrit) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন মারু-গুর্জরী (Maru-Gurjari) ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগের চারণ কবিদের হাত ধরে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে বীরত্বগাথামূলক যুদ্ধকাব্য, অলঙ্কৃত প্রেমগাথা, ভক্তিগীতি, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং প্রগতিশীল নাটকের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। রাজস্থানি সাহিত্য মূলত দুটি প্রধান সাহিত্যিক রূপ বা শৈলীতে বিভক্ত—‘ডিঙ্গল’ (Dingal — মারোয়াড়ি ভিত্তিক বীরত্বগাথার ভাষা) এবং ‘পিঙ্গল’ (Pingal — ব্রজভাষা প্রভাবিত পদ্যের ভাষা)। ভারতের সংবিধানে এখনো স্বাধীন সরকারি বা তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ভাষার মর্যাদা না পেলেও, ভারতের জাতীয় ‘সাহিত্য অকাদেমি’ (Sahitya Akademi) ১৯ সূচক থেকে এই ভাষার সাহিত্যিক সমৃদ্ধির পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্রের যুগ থেকে শুরু করে বিংশ শতকের প্রথমার্ধের আধুনিকতাবাদী আন্দোলন এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক ও প্রগতিশীল অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে এই ভাষার, যেখানে মহাকবি চন্দ বরদায়ী, মীরা বাঈ, সূর্যমল মিশ্র এবং আধুনিক যুগের বিজয়দান দেথার মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রাজপুতানার প্রাচীন ঐতিহাসিক বীরত্বের সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

রাজস্থানি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মহাকাব্যিক, সুরময় ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. ডিঙ্গল ও পিঙ্গল — চারণ কবিদের বীরত্বকাব্য (Bardic & Epic Poetry): রাজস্থানি সাহিত্যের আদি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগের চারণ (Charan & Bhat) কবিদের বীরত্বগাথার ওপর। মহাকবি চন্দ বরদায়ী রচিত ‘पृथ्वीराज रासो’ / ‘পৃথিবীরাজ রাসো’ (Prithviraj Raso) হলো এই ধারার এক অনন্য ক্লাসিক, যা ভারতের অন্যতম আদি মহাকাব্য। ডিঙ্গল শৈলীতে রচিত এই কবিতাগুলো রাজস্থানের দুর্গ ও যুদ্ধক্ষেত্রের শৌর্য, রাজপুতদের আত্মত্যাগ এবং বীরত্বকে চিরন্তন রূপ দিয়েছে।

খ. ঢোলা মারু এবং রোমান্টিক লোকগাথা (Romantic Folk Epics): বীরত্বের সমান্তরালে রাজস্থানি সাহিত্যে গভীর প্রেমের এক সুপ্রাচীন লোকঐতিহ্য রয়েছে। একাদশ শতাব্দীতে কবি কল্লোল রচিত বিখ্যাত প্রেমগাথা ‘ঢোলা মারু রা দুহা’ (Dhola Maru ra Duha) রাজস্থানি সংস্কৃতির প্রাণ। ঢোলা এবং মারুর এই অমর ও ট্রাজিক প্রেমকাহিনী দোহার আকারে মুখে মুখে গ্রামীণ রাজস্থানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে রয়েছে, যা রাজস্থানি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নান্দনিক নিদর্শন।

গ. মীরা বাঈ ও ভক্তি আন্দোলন (Meera Bai & Bhakti Movement): পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রাজস্থানি সাহিত্যকে এক অপার্থিব উচ্চতায় নিয়ে যান কৃষ্ণভক্ত সাধিকা মীরা বাঈ। রাজস্থানি (বিশেষ করে মারোয়াড়ি উপভাষা) ও ব্রজভাষার মিশ্রণে রচিত তাঁর ভক্তিগীতি বা ভজনগুলো কেবল আধ্যাত্মিক সম্পদ নয়, বরং তা ছিল তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক রাজপরিবারের কঠোর নিয়ম ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব ও শৈল্পিক নারী-বিদ্রোহের প্রতীক।

ঘ. কথাসাহিত্য: আধুনিক ছোটগল্প ও উপন্যাস (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে এসে রাজস্থানি কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক রূপ ধারণ করে। শিবচন্দ্র ভারতীয়ার হাত ধরে প্রথম রাজস্থানি উপন্যাস ও নাটকের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে শ্রীলাল জোশী এবং বিজয়দান দেথার লেখনীতে রাজস্থানি ছোটগল্প ও লোকগাথা পুনর্নির্মাণের এক বিশ্বমানের ধারা তৈরি হয়, যা এই সাহিত্যের পরিধিকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

রাজস্থানি সাহিত্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ, দেশীয় রাজাদের সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচার, জাতপ্রথা এবং নারীদের অবদমিত অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • সূর্যমল মিশ্র ও ১৮৫৭-র স্বাধীনতা চেতনা: উনবিংশ শতাব্দীর মহাকবি সূর্যমল মিশ্র (রাজস্থানের রাষ্ট্র কবি) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বংশ ভাস্কর’ এবং ‘বীর সৎসই’-এর মাধ্যমে রাজস্থানি সাহিত্যে প্রথম প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী বিপ্লব ঘটান। তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় রাজপুত রাজাদের ব্রিটিশ দাসত্ব ত্যাগ করে দেশের জন্য লড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা চারণকাব্যকে রাজদরবার থেকে বের করে গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ারে পরিণত করেছিল।
  • বিজয়দান দেথা এবং লোকসাহিত্যের প্রগতিশীল রূপান্তর: আধুনিক রাজস্থানি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল পুরোধা হলেন বিজয়দান দেথা (যাঁকে ‘বিজ্জি’ বলা হয়)। তিনি রাজস্থানের সুপ্রাচীন লোককথা ও রূপকথাগুলোকে সংগ্রহ করে সেগুলোকে সামন্তবাদ বিরোধী, পুঁজিবাদ বিরোধী এবং কট্টর নারীবাদী প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্লিখন করেন। তাঁর ১৪ খণ্ডের মহাকাব্যিক সংকলন ‘বাতান রি ফুলওয়ারী’ (Batan ri Phulwari — গল্পের বাগান) বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ এবং তাঁর গল্প অবলম্বনে ‘দুধ কা কর্জ’ ও অমল পালেকারের ‘পহেলি’-র মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
  • উত্তর-আধুনিক বাস্তবতাবাদ ও প্রান্তিক চেতনা: উত্তর-আধুনিক রাজস্থানি সাহিত্যে যাদবেন্দ্র শর্মা ‘চন্দ্র’ এবং কুনওয়ার নারায়ণ সিং-এর মতো লেখকদের হাত ধরে এক শক্তিশালী সমাজবাস্তববাদী ধারার জন্ম হয়। রাজস্থানের তীব্র গ্রামীণ দারিদ্র্য, খরা ও জলের সংকট, পর্দার আড়ালে থাকা নারীদের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং অনগ্রসর উপজাতিদের অধিকারের লড়াই আধুনিক রাজস্থানি সাহিত্যে এক জোরালো প্রগতিশীল ইশতেহার হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

রাজস্থানি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • চন্দ বরদায়ী (১১৪৮–১১৯২): রাজস্থানি সাহিত্যের আদি মহাকবি। দিল্লির শেষ হিন্দু শাসক পৃথিবীরাজ চৌহানের রাজকবি ও বন্ধু চন্দ বরদায়ী রচিত ‘পৃথিবীরাজ রাসো’ এই ভাষার বীরত্বগাথার আদি ও প্রধান মাইলফলক।
  • মীরা বাঈ (১৪৯৮–১৫৪৭): মেওয়ারের রাজবধূ এবং উপমহাদেশের ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। তাঁর সহজ, প্রেমময় ও বিদ্রোহী ভক্তিগীতিগুলো শতাব্দী ধরে রাজস্থানি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
  • সূর্যমল মিশ্র (১৮১৫–১৮৬৮): রাজস্থানি সাহিত্যের আধুনিক যুগের পুরোধা ও চারণ ধারার শেষ মহান কবি। তাঁর দেশাত্মবোধক ও ব্রিটিশ বিরোধী কবিতাগুলো রাজস্থানি সমাজকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনায় দীক্ষিত করেছিল।
  • শিবচন্দ্র ভারতীয়া (১৮৫৩–১৯১৯): আধুনিক রাজস্থানি গদ্যের জনক। তিনি প্রথম রাজস্থানি উপন্যাস ‘কনক সুন্দর’ (Kanak Sundar), প্রথম নাটক ‘কেসর বিলাস’ এবং প্রথম ছোটগল্প রচনা করে রাজস্থানি সাহিত্যকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
  • বিজয়দান দেথা (১৯২৬–২০১৩): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কথাসাহিত্যিক, পদ্মশ্রী বিজয়ী এবং নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত প্রথম রাজস্থানি লেখক। লোকগাথার মাধ্যমে প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারের বার্তা দেওয়ার জন্য তাঁকে ‘রাজস্থানের শেকসপিয়র’ বলা হয়।
  • লক্ষ্মী কুমারী চুণ্ডাওয়াত (১৯১৬–২০১২): প্রখ্যাত প্রগতিশীল লেখিকা, গবেষক ও রাজনীতিবিদ। রাজস্থানি লোকসাহিত্য সংগ্রহ, নারীবাদী চেতনা ও প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলো এই সাহিত্যের এক অনবদ্য ঐতিহাসিক দলিল।

 

 

টুলু সাহিত্য

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের দক্ষিণ উপকূলীয় অংশ (দক্ষিণ কন্নড় ও উড়ুপি জেলা) এবং কেরালার উত্তর-পশ্চিমের কাসারগোড অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত টুলু ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন দ্রাবিড় (Dravidian) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত অনন্য সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মাধ্যম। এই ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে যৌথভাবে ‘টুলুনাডু’ (Tulunadu) বলা হয়। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, পঞ্চ-দ্রাবিড় ভাষার অন্যতম প্রাচীন এই মাধ্যমটির ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে অরুণাব্জ কর্তৃক লিখিত ‘টুলু মহাভারত’ এবং ‘শ্রী ভাগবতো’ এই ভাষার ধ্রুপদী লিখিত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাচীন নিদর্শন। তবে টুলু ভাষার মূল প্রাণশক্তি এবং অনন্যতা লুকিয়ে আছে এর বিপুল ও সমৃদ্ধ মৌখিক সাহিত্যে (Oral Literature), বিশেষ করে ‘পদ্দন’ (Paddanas) নামক বীরত্বগাথা, লোকগীতি এবং সৃষ্টিতত্ত্বের আখ্যানে, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার ও নৃত্য উৎসব ‘ভূতা কোলা’ (Bhuta Kola)-র সময় অত্যন্ত ভক্তি সহকারে গাওয়া হয়। ঐতিহ্যের দিক থেকে টুলু ভাষার নিজস্ব একটি ঐতিহাসিক লিপি ছিল, যা ‘তিগলরি লিপি’ (Tigalari Script) নামে পরিচিত (যা মূলত মালয়ালম লিপির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ)। তবে সমসাময়িক যুগে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য প্রধানত কন্নড় লিপি ব্যবহার করে এই ভাষায় আধুনিক কবিতা, কথাসাহিত্য এবং নাটক রচিত হচ্ছে। ভারতের সংবিধানে এখনো স্বাধীন সরকারি বা তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ভাষার মর্যাদা না পেলেও, কর্ণাটক ও কেরালার উপকূলীয় জনজীবনে এর সাংস্কৃতিক প্রভাব অসীম এবং বর্তমানে এই ভাষাটি বৈশ্বিক স্তরে এক অনন্য নৃতাত্ত্বিক পরিচয় লাভ করেছে।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

টুলু সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই আধ্যাত্মিক, আদিম ও জীবনমুখী যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. পদ্দন ও মৌখিক বীরত্বগাথা (Paddanas & Oral Epics): টুলু সাহিত্যের মূল ভিত্তি ও সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো ‘পদ্দন’। এগুলো মূলত দীর্ঘ আখ্যান-কবিতা বা লোকগাথা, যা শত শত বছর ধরে মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে রয়েছে। এর মধ্যে ‘কোটী এবং চেন্নাইয়া’ (Koti and Chennayya — দুই যমজ বীর ভাইয়ের সামাজিক ন্যায়বিচারের লড়াই) এবং ‘সিরি’ (Siri — এক মহীয়সী নারীর আত্মত্যাগ ও অধিকারের আখ্যান) অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যিক পদ্দন, যা এই সংস্কৃতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি।

খ. ভূতা কোলা ও ধর্মীয় নাট্য-আচার (Bhuta Kola & Ritualistic Theatre): টুলু সাহিত্যের বিকাশ ও টিকে থাকার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ‘ভূতা কোলা’ (Bhuta Kola) বা ‘দৈব আরাধনা’। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় নৃত্য-আচার, যেখানে স্থানীয় দেবতা ও প্রকৃতির আত্মাদের আহ্বান করা হয়। এই উৎসবের সময় পরিবেশিত দীর্ঘ লিরিক্যাল গান ও সংলাপগুলো টুলু সাহিত্যের ধ্রুপদী রূপ, যা মানুষের সাথে প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ এবং অতিপ্রাকৃতিক শক্তির আত্মিক সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলে।

গ. ধ্রুপদী লিখিত কাব্য (Classical Written Poetry): পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে টুলুনাডুতে লিখিত সাহিত্যের এক অনন্য ধারা তৈরি হয়। অরুণাব্জ-এর ‘টুলু মহাভারত’ ছাড়াও বিষ্ণুতুঙ্গা কর্তৃক লিখিত ‘শ্রী ভাগবতো’ (Sri Bhagavato) এই ভাষার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ধ্রুপদী মহাকাব্য। তিগলরি লিপিতে তালপাতার পুথিতে লেখা এই সাহিত্যগুলো প্রমাণ করে যে টুলু কেবল মৌখিক ভাষা নয়, বরং এর একটি অত্যন্ত মার্জিত ও পণ্ডিতি লিখিত ঐতিহ্যও ছিল।

ঘ. আধুনিক নাট্যসাহিত্য ও মঞ্চ (Modern Drama & Tulu Theatre): আধুনিক যুগে টুলু সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং অর্থনৈতিকভাবে সফল জনরা হলো এর নাটক বা রঙ্গমঞ্চ। কে. এন. টেইলর এবং রাম শেট্টির মতো নাট্যকারদের হাত ধরে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক টুলু থিয়েটারের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। পারিবারিক মেলবন্ধন, হাস্যরস এবং তীব্র সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক এই নাটকগুলো আজও টুলুনাডুর গ্রামে ও শহরে বিপুল জনপ্রিয়।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

টুলু সাহিত্যে সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের (বান্ট ও শেট্টিদের) অত্যাচার, জাতপ্রথা, লিঙ্গবৈষম্য এবং ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • পদ্দনে শ্রেণীসংগ্রাম ও প্রান্তিক চেতনা: প্রাচীন পদ্দনগুলোর অন্তর্নিহিত মূল সুর কিন্তু তীব্র প্রগতিশীল। যেমন ‘কোটী-চেন্নাইয়া’র গল্পটি মূলত নিম্নবর্ণের দুই বীরের সামন্ততান্ত্রিক বিল বা সর্দারদের শোষণের বিরুদ্ধে এক অবাধ্য বিদ্রোহের আখ্যান। আবার ‘সিরি পদ্দন’-এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভণ্ডামি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নারীর গর্জে ওঠার কথা বলা হয়েছে, যা আদিম দ্রাবিড় সমাজের এক শক্তিশালী নারীবাদী রূপ।
  • কোঙ্কণ উপকূলের আধুনিকতাবাদী পুনর্জাগরণ: বিংশ শতকের শেষভাগে এসে ‘টুলু সাহিত্য একাডেমি’ (Tulu Sahitya Academy) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এক বিশাল আধুনিকতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। অমৃতা সোমেশ্বর এবং ড. মণ্ডারা কেশব ভাটের মতো প্রগতিশীল লেখকেরা টুলু সাহিত্যকে কেবল ধর্মীয় আচার বা সস্তা কৌতুকের বৃত্ত থেকে বের করে আধুনিক বৈচারিক আভিজাত্য দান করেন।
  • উত্তর-আধুনিক স্বাধিকার ও পরিবেশবাদী লড়াই: সমসাময়িক টুলু সাহিত্যে (বিশেষ করে আধুনিক কবিতা ও ছোটগল্পে) কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের দ্রুত শিল্পায়ন, পরিবেশ ধ্বংস, ঐতিহ্যবাহী কৃষিজমির বিলুপ্তি এবং কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম হয়েছে। তরুণ কবিদের লেখনীতে ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে টুলু ভাষার অন্তর্ভুক্তির দাবি আজ এক বৈপ্লবিক প্রগতিশীল ইশতেহার হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

টুলু সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • অরুণাব্জ (পঞ্চদশ শতাব্দী): টুলুনাডুর কাসারগোড অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই মহান ধ্রুপদী কবি টুলু ভাষার আদিকবি হিসেবে গণ্য। তাঁর রচিত ‘টুলু মহাভারত’ (Tulu Mahabharato) এই ভাষার ধ্রুপদী লিখিত ইতিহাসের এক অমর ও প্রধান মাইলফলক।
  • ড. মণ্ডারা কেশব ভাট (১৯১৯–২০১০): আধুনিক টুলু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকবি ও পণ্ডিত। তাঁর রচিত মহাকাব্য ‘মণ্ডারা রামায়ণ’ (Mandara Ramayana) টুলু সংস্কৃতির পটভূমিতে রামায়ণের এক অসাধারণ লোকজ ও আধুনিক রূপান্তর, যার জন্য তিনি বহু জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।
  • কে. এন. টেইলর (১৯৩৯–২০১৫): আধুনিক টুলু নাট্যসাহিত্য ও সিনেমার অবিসংবাদিত সম্রাট। তিনি একাধারে নাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক। তিনি প্রায় একশোটিরও বেশি জনপ্রিয় নাটক লিখে টুলু ভাষাকে সাধারণ গণমানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
  • অমৃতা সোমেশ্বর (১৯৩৭–২০২৪): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত প্রগতিশীল গবেষক, কবি ও ঔপন্যাসিক। তিনি প্রাচীন টুলু পদ্দন ও লোকসাহিত্য সংগ্রহ, সেগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং টুলু ভাষায় নারীবাদী ও সমাজবাস্তববাদী আধুনিক ছোটগল্প রচনায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন।
  • পলীকা রমাচারী (সমসাময়িক): আধুনিক টুলু কবিতার এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বৈপ্লবিক প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর। উপকূলীয় অঞ্চলের মেহনতি মানুষের শ্রেণীসংগ্রাম, পুঁজিবাদ বিরোধী অবস্থান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলো বিশ্বমানের।

 

খাসি সাহিত্য:

ভারতের মেঘালয় রাজ্য (প্রধান সরকারি ভাষা) এবং বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত খাসি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং উপমহাদেশের সুপ্রাচীন প্রাক-আর্য বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক (Austroasiatic) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত অনন্য সাহিত্যিক ও নৃতাত্ত্বিক মাধ্যম। মেঘালয়ের খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই ভাষাটির সাহিত্য একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনো নিজস্ব লিপি না থাকায় সম্পূর্ণ মৌখিক (Oral Tradition) ছিল। খাসি উপজাতিদের অনন্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, পাহাড়ের চোখ জুড়ানো প্রকৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের বীরত্বের গল্প যুগ যুগ ধরে লোকগাথা, লোকগীতি এবং ছড়ার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ আমলে খ্রিষ্টান মিশনারিদের হাত ধরে প্রথম রোমান (Roman) লিপি ব্যবহারের মাধ্যমে খাসি সাহিত্যের লিখিত রূপের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরবর্তীতে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে উ জেবন্ রায় (U Jeebon Roy)-এর একক প্রচেষ্টায় এই সাহিত্য মিশনারি গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে স্বকীয় সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করে, যার কারণে তাঁকে খাসি লিখিত সাহিত্যের জনক বলা হয়। খাসি সাহিত্যে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে চেরাপুঞ্জির পাহাড়ী উপজাতিদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ, নিজস্ব আদিবাসী সত্তা ও প্রাচীন প্রকৃতিপূজা (Ka Niam Khasi) টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে গড়ে ওঠা প্রগতিশীল আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, যেখানে উ জেবন্ রায়, মহাকবি উ সোসথাম মহাজন এবং আধুনিক গদ্যের রূপকার রাডন সিংহ বেরির মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পাহাড়ি প্রকৃতির মরমী রহস্যের সাথে আধুনিক প্রগতিশীল ও মানবিক জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

খাসি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই প্রাকৃতিক, সুরময় ও জীবনঘনিষ্ঠ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. মৌখিক লোকগাথা ও কানিয়াক্সখুর (Oral Folklore & Kañiatskhur): খাসি সাহিত্যের মূল প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে এর বিপুল মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কানিয়াক্সখুর’ (Kañiatskhur) বা পূর্বপুরুষদের মিথলজি বলা হয়। এর মধ্যে ‘কা মে খা’ (মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আদি রূপরেখা), ‘উ লুম শিলাং’ (শিলং পাহাড়ের সৃষ্টির রহস্য) এবং ‘কা পহ লাং’ (প্রকৃতির সাথে মানুষের আদিম চুক্তি)-এর মতো গল্পগুলো কেবল রূপকথা নয়, বরং খাসি জাতির জীবনদর্শন, নৈতিকতা ও বিচার ব্যবস্থার মূল আকর ভিত্তি।

খ. আধুনিক কবিতা ও সোসথাম যুগ (Modern Poetry & Sostham Era): বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মহাকবি উ সোসথাম মহাজন (U Soso Tham)-এর হাত ধরে খাসি কবিতায় এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ আসে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘কি রসলিং কি কিয়ার্ড লুম’ (Ki Sngi Barim U Hynniewtrep — খাসি আদি পুরুষদের প্রাচীন দিনগুলো) খাসি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্লাসিক মহাকাব্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর কবিতা খাসি পাহাড়ের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি, লোককথা এবং গভীর মানবীয় দর্শনকে এক অনন্য বৈশ্বিক নান্দনিক উচ্চতা দান করেছে।

গ. আদিবাসী গদ্য ও অনুবাদ সাহিত্য (Indigenous Prose & Translations): খাসি লিখিত গদ্যের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অনুবাদ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে। উ জেবন্ রায় খাসি গদ্যকে সমৃদ্ধ করতে রামায়ণ, মহাভারত, বুদ্ধচরিত এবং হিতোপদেশ অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল খাসি ভাষায় অনুবাদ করেন। একই সাথে তিনি খাসি ধর্মের মূল দর্শন নিয়ে মৌলিক বই লেখেন, যা খাসি ভাষায় মননশীল গদ্য ও প্রবন্ধের এক মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলে।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও প্রগতিশীল থিয়েটার (Modern Tulu / Khasi Drama): খাসি সমাজে নাটক ও অভিনয়ের এক নিজস্ব লোক-ঐতিহ্য রয়েছে, যা সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাডন সিংহ বেরি এবং পরবর্তীতে অন্য আধুনিক লেখকদের হাত ধরে খাসি নাট্যসাহিত্য সমাজ সংস্কারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যার মাধ্যমে মদ্যপান, পারিবারিক ভাঙন ও জুয়াখেলার মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ জানানো হতো।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

খাসি সাহিত্যে ঔপনিবেশিক খ্রিষ্টান মিশনারিদের একচেটিয়া সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজের আদিবাসী শিকড় রক্ষা, নারীদের সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং পাহাড়ি পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • উ জেবন্ রায় ও খাসি নবজাগরণ (Seng Khasi Movement): ঊনবিংশ শতকের শেষে ব্রিটিশ ও মিশনারিদের প্রভাবে খাসি তরুণরা যখন নিজেদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ভাষা ভুলে যাচ্ছিল, তখন উ জেবন্ রায় ১৮৯৯ সালে ‘সেং খাসি’ (Seng Khasi) নামক এক বিশাল প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি নিজের টাকায় প্রথম খাসি ছাপাখানা (Ri Khasi Press) প্রতিষ্ঠা করেন এবং খাসি ভাষায় পাঠ্যবই রচনা করে শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রগতিশীল বিপ্লব ঘটান।
  • উ সোসথাম মহাজনের জাতীয়তাবাদী দ্রোহ: খাসি সাহিত্যের শেকসপিয়র বলা হয় উ সোসথাম মহাজনকে। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে খাসি জনগণের মধ্যে তীব্র দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করেন। তাঁর কবিতা ছিল অবক্ষয় উন্মুখ খাসি সমাজের পুনর্জাগরণ এবং পাহাড়ের মেহনতি মানুষের কঠিন জীবনসংগ্রামের এক প্রগতিশীল ইশতেহার।
  • উত্তর-আধুনিক বাস্তবতাবাদ ও পরিবেশবাদী লড়াই: উত্তর-আধুনিক খাসি সাহিত্যে (বিশেষ করে সমসাময়িক ছোটগল্প ও কবিতায়) মেঘালয়ের খনি অঞ্চলের (Rat-hole mining) অনিয়ন্ত্রিত কয়লা উত্তোলনের ফলে পাহাড়, জঙ্গল ও নদীর ধ্বংসলীলা, প্রকৃতির বুক চিরে গড়ে ওঠা কর্পোরেট পুঁজিবাদ এবং আদিবাসীদের উচ্ছেদ সংকটের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম হয়েছে। তরুণ লেখকদের লেখনীতে পরিবেশ রক্ষা এবং প্রান্তিক খাসি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বাধিকারের দাবি আজ এক জোরালো কণ্ঠস্বর।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

খাসি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • উ জেবন্ রায় (১৮৩৮–১৯০৩): খাসি লিখিত সাহিত্যের জনক ও আধুনিক মেঘালয়ের স্থপতি। খাসি গদ্যের সূচনা, প্রথম খাসি প্রিন্টিং প্রেস স্থাপন এবং প্রাচীন লোকগাথা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান একক ও অবিস্মরণীয়।
  • উ সোসথাম মহাজন, উ সোসো থাম (১৮৭৩–১৯৪০): খাসি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় কবি। তিনি খাসি ভাষাকে রোমান লিপির মাধ্যমে এক অনন্য গীতিময়তা ও বিশ্বমানের কাব্যিক উচ্চতা দান করেছেন, যাঁর স্মৃতিতে শিলং-এ তাঁর বিশাল আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।
  • রাডন সিংহ বেরি (১৮৬১–১৯০৩): আধুনিক খাসি নাট্যসাহিত্য ও প্রবন্ধের অন্যতম প্রধান রূপকার। তাঁর রচিত ‘কা কিয়েন কি খাসি’ (Ka Ktien Khasi) খাসি ভাষার ব্যাকরণ ও সাহিত্যের গতিপথ নির্ধারণে এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • পন্ডিত রয় (বিংশ শতাব্দী): খাসি গদ্য ও সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি খাসি ভাষায় প্রথম নিয়মিত পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশ করে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা পৌঁছে দিয়েছিলেন।
  • হোপউয়েল ইলাইয়াহ ব্লড (১৯০৯–১৯৭৫): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক খাসি ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। খাসি পাহাড়ের গ্রামীণ সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, আধুনিকতার অভিঘাতে প্রাচীন মূল্যবোধের ক্ষয় এবং মানুষের জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলো এই সাহিত্যের অনবদ্য সম্পদ।

 

বোড়ো / বড়ো সাহিত্য

ভারতের আসাম রাজ্যের বোড়োল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (বিটিআর), ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত বোড়ো ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সুপ্রাচীন প্রাক-আর্য তিব্বতি-বর্মী (Tibeto-Burman) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর আদিম লোকগাথা ও ধর্মীয় মন্ত্র পেরিয়ে বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে গভীর প্রকৃতি প্রেম, বোড়ো উপজাতিদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং তীব্র রাজনৈতিক স্বাধিকার ও প্রগতিশীল কবিতার মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। অতীতে এই ভাষাটি রোমান, অসমীয়া ও লাতিন লিপিতে লেখা হলেও দীর্ঘ লিপি-আন্দোলনের পর বর্তমানে এটি অফিশিয়ালি দেবনাগরী লিপিতে চর্চিত হয়। ২০০৩ সালে ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে একটি স্বাধীন ও অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা এক নতুন উচ্চতা লাভ করে। ১৯৫২ সালে ‘বোড়ো সাহিত্য সভা’ (Bodo Sahitya Sabha) প্রতিষ্ঠার পর এই ভাষার আধুনিক সাহিত্যে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক মোড় আসে। আসামের পার্বত্য ও সমতল অঞ্চলের নিজস্ব লোকসংস্কৃতির সরলতার সাথে আধুনিক রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই এবং মেহনতি মানুষের চেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

বোড়ো সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই প্রাকৃতিক, সুরময় ও সংগ্রামমুখর যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. খেরাই ও আদিম ধর্মীয় গীতি (Kherai & Ritualistic Folk Poetry): বোড়ো সাহিত্যের আদি প্রাণ লুকিয়ে আছে তাদের ঐতিহ্যবাহী বাথৌ (Bathou) ধর্ম এবং ‘খেরাই’ (Kherai) পূজার লোকগাথার মধ্যে। খেরাই উৎসবের সময় ওঝা বা পুরোহিত এবং দওদিনী (নর্তকী)-দের মুখ নিঃসৃত যে আদিম মন্ত্র, সৃষ্টিতত্ত্বের আখ্যান এবং প্রার্থনা গীতি—তা বোড়ো মৌখিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় আকর সম্পদ। এই গানগুলো মানুষের সাথে প্রকৃতি এবং পরমেশ্বরের এক অনন্য আদিম সম্পর্কের কথা বলে।

খ. লোকগাথা ও ঐতিহাসিক ব্যালাড (Folk Tales & Historical Ballads): বোড়ো লোকসাহিত্যে বীরত্ব ও প্রেমের এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ‘জাওলা দওগা’ (Jiagoulikha — বীর যুবকের আখ্যান) এবং ‘মাইনদাও রিমিমলি’র মতো লোকগাথাগুলো শতাব্দী ধরে বোড়ো সমাজে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। এই কিস্সাগুলোর মাধ্যমে বোড়ো জাতির প্রাচীন রাজকীয় গৌরব, উপজাতীয় যুদ্ধ এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের ইতিহাসকে ধরে রাখা হয়েছে।

গ. কথাসাহিত্য: সামাজিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বোড়ো সাহিত্য সভার হাত ধরে বিংশ শতকের ষাটের দশকে বোড়ো কথাসাহিত্যের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। চিত্তরঞ্জন মুসাহারি-র হাত ধরে প্রথম বোড়ো উপন্যাসের জন্ম হয়। বোড়ো কথাসাহিত্যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, বড় জমিদার ও মহাজনদের দ্বারা বোড়ো কৃষকদের শোষণ এবং ঐতিহ্যবাহী বনায়ন ধ্বংসের ট্র্যাজেডি অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

ঘ. নাট্যসাহিত্য ও প্রগতিশীল থিয়েটার (Modern Tulu / Bodo Drama): বোড়ো সমাজে সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো নাটক। বোড়ো নাট্যসাহিত্য অত্যন্ত প্রগতিশীল ও সমাজ সংস্কারমূলক। সতিশ চন্দ্র বসুমাতারির মতো আদি নাট্যকারদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই ধারায় গ্রামীণ সমাজের অন্ধ কুসংস্কার, মদ্যপান ও অশিক্ষার বিরুদ্ধে যেমন তীব্র আঘাত হানা হয়েছে, তেমনই সমসাময়িক নাটকগুলোতে বোড়োদের রাজনৈতিক ও অস্তিত্বের লড়াই চমৎকারভাবে মঞ্চস্থ হচ্ছে।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

বোড়ো সাহিত্যে অসমীয়া জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের ভাষাতাত্ত্বিক অস্তিত্ব রক্ষা, জমি ও সংস্কৃতির স্বাধিকার এবং প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত আপসহীন ও প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • বোড়ো ভাষা আন্দোলন ও লিপি সংগ্রাম: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বোড়ো ভাষা ও সংস্কৃতিকে আসামে প্রায় প্রান্তিক করে ফেলার চেষ্টা করা হলে ‘বোড়ো সাহিত্য সভা’ এক ঐতিহাসিক ও প্রগতিশীল গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা পাওয়ার অধিকার এবং একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক লিপি (দেবনাগরী) গ্রহণের জন্য বোড়ো কবি, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা সরাসরি রাজপথে নেমে আসেন। এই আন্দোলন বোড়ো সাহিত্যে তীব্র দ্রোহ ও আত্মপরিচয়ের এক নতুন যুগের সূচনা করে।
  • ইশান মুসাহারি ও আধুনিক কবিতার নবজাগরণ: বোড়ো সাহিত্যের শেকসপিয়র বা আদি আধুনিক কবি বলা হয় ইশান মুসাহারি-কে। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে তিনি বোড়ো কবিতাকে কেবল ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বের করে আধুনিক রোমান্টিকতা, মানবতাবাদ এবং প্রগতিশীল সমাজ সচেতনতার সাথে যুক্ত করেন, যা তরুণ প্রজন্মের লেখকদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা ছিল।
  • বোড়ো স্বাধিকার আন্দোলন ও ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’: আশির দশক থেকে শুরু হওয়া পৃথক ‘বোড়োলেণ্ড’ (Bodoland) রাজ্যের সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন বোড়ো সাহিত্যে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম দেয়। ব্রজেন্দ্র কুমার ব্রহ্ম এবং সমসাময়িক কবিদের লেখনীতে নিজের মাটির অধিকার, জাতিগত দাঙ্গা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে শান্তি স্থাপন, রাষ্ট্রীয় অবদমন এবং বোড়ো যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কথা এক অবিনাশী প্রগতিশীল ইশতেহার হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

বোড়ো সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • সতিশ চন্দ্র বসুমাতারি (১৯০১–১৯৭৪): আধুনিক বোড়ো সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি, সমাজ সংস্কারক ও নাট্যকার। তিনি বোড়ো সাহিত্য সভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর সামাজিক নাটকগুলো বোড়ো সমাজকে আধুনিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • ইশান মুসাহারি (১৯৪০-এর দশক): আধুনিক বোড়ো কবিতার জনক। তাঁর লিরিক্যাল গীতি-কাব্য এবং অত্যন্ত সুমিষ্ট অথচ ধারালো কবিতাগুলো বোড়ো কাব্যসাহিত্যকে প্রথম আধুনিক আভিজাত্য দান করেছিল।
  • চিত্তরঞ্জন মুসাহারি (১৯৪৭—বর্তমান): আধুনিক বোড়ো কথাসাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত ‘বোরোনি ফাইমালি’ (Boroni Phimali) বোড়ো ভাষার প্রথম সামাজিক উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়, যা এই সাহিত্যের ইতিহাসকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
  • ব্রজেন্দ্র কুমার ব্রহ্ম (১৯৪৩–২০১৮): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত প্রগতিশীল বোড়ো কবি, সমালোচক ও সাহিত্যিক। ২০০২ সালে ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার বিজয়ী এই মহৎ লেখকের কবিতা বোড়ো সমাজের মেহনতি মানুষের শ্রেণীসংগ্রাম ও স্বাধিকার আন্দোলনের এক অনন্য মহাকাব্যিক দলিল।
  • ড. মঙ্গল সিং হাজোয়ারী (সমসাময়িক): বোড়ো সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ, যিনি বোড়ো নাটক ও গদ্যে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেছেন।
  • অঞ্জলি লাহারী (সমসাময়িক): বোড়ো সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল নারী কথাসাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। বোড়ো স্বাধিকার আন্দোলনের ট্র্যাজেডি, উচ্ছেদ হওয়া নারীদের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং আদিবাসী নারীদের অধিকার নিয়ে লেখা তাঁর গল্প ও উপন্যাসগুলো বিশ্বমানের।

 

ডোগরি সাহিত্য:

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জম্মু বিভাগ, হিমাচল প্রদেশের কাংড়া ও হামিরপুর জেলা এবং পাঞ্জাবের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ডোগরি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য (Sanskrit-Prakrit) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। এই ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে ঐতিহাসিকভাবে ‘ডুগ্গার’ (Duggar) বলা হয় এবং এর অধিবাসীরা ‘ডোগরা’ নামে পরিচিত। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের আদি আমির খসরুর বর্ণনায় এই ভাষার উল্লেখ পাওয়া যায়। অতীতে ডোগরি ভাষা নিজস্ব ঐতিহাসিক ‘টাকরি’ (Takri) লিপিতে লেখা হলেও, আধুনিক যুগে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাহিত্যিক সুবিধার্থে এটি দেবনাগরী লিপিতে চর্চা করা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডিনো ভাই পান্ত-এর বিপ্লবী কবিতার মাধ্যমে আধুনিক ডোগরি সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়; বিশেষ করে সুরময় পাহাড়ী লোকগীতি, বীরত্বগাথামূলক যুদ্ধকাব্য, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প) এবং প্রগতিশীল নাটকের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। ২০০৩ সালে ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে একটি স্বাধীন ও অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা এক নতুন উচ্চতা লাভ করে। ডোগরা রাজবংশের রাজকীয় ইতিহাসের সাথে সমসাময়িক আধুনিক প্রগতিশীল জীবনচেতনার নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

ডোগরি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই প্রাকৃতিক, সুরময় ও পাহাড়ী লোকসংস্কৃতিতে ঋদ্ধ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. কারাক ও বারান — বীরত্বকাব্য (Karak & Baran — Bardic Poetry): ডোগরি সাহিত্যের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর সুপ্রাচীন মৌখিক লোকগাথার মধ্যে। এর মধ্যে ‘কারাক’ (Karak) হলো দেবদেবী এবং স্থানীয় লোকবীরদের মহিমা কীর্তন করে গাওয়া এক ধরণের বিশেষ লোকগীতি। অন্যদিকে ‘বারান’ (Baran) হলো ডোগরা যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রের শৌর্য, দেশপ্রেম এবং বীরত্বগাথা নিয়ে রচিত দীর্ঘ আখ্যান-কবিতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চারণ কবিরা এগুলো মুখে মুখে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

খ. ডোগরি লোকগীতি ও পাহাড়ী সুর (Dogri Folk Songs & Lyrics): ডোগরি কবিতা প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত লিরিক্যাল ও সুমিষ্ট। পাহাড়ের কঠিন জীবন, বর্ষা ঋতুর আগমন, প্রেম এবং বিরহ নিয়ে ডোগরি ভাষায় অজস্র লোকগীতি রয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের গান এবং ফসলের গানগুলো ডোগরি সাহিত্যের অমূল্য গীতি-সম্পদ, যা ডোগরা সংস্কৃতির উৎসবমুখর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

গ. কথাসাহিত্য: আধুনিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতকের ষাটের দশকে ডোগরি কথাসাহিত্যের আধুনিক ও বাস্তবমুখী যাত্রা শুরু হয়। নরেন্দ্র খাজুরিয়ার হাত ধরে প্রথম মনস্তাত্ত্বিক ডোগরি ছোটগল্প এবং পরবর্তীতে বেদ রাহীর লেখনীতে ডোগরি উপন্যাস এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। জম্মুর পাহাড়ী অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, নারীদের ওপর হওয়া সামাজিক অবিচার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম এই কথাসাহিত্যের মূল উপজীব্য।

ঘ. আধুনিক নাট্য সাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ (Modern Dogri Theatre): ডোগরি নাট্যসাহিত্য সমাজ সংস্কার ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। রামনাথ শাস্ত্রীর মতো আদি নাট্যকারদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই ধারায় ডোগরা সমাজের জাতপ্রথা, বাল্যবিয়ে এবং রাজতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে সরাসরি মঞ্চের মাধ্যমে তীব্র প্রগতিশীল ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ জানানো হতো।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

ডোগরি সাহিত্যে সামন্তবাদী রাজতন্ত্রের অবদমন, জমিদারী প্রথার অত্যাচার, কুসংস্কার বর্জন এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:

  • ডিনো ভাই পান্ত ও ১৯৪৪-এর বিপ্লবী কবিতা: আধুনিক ডোগরি সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ধরা হয় ১৯৪৪ সালকে, যখন প্রখ্যাত কবি ডিনো ভাই পান্ত তাঁর বিখ্যাত বৈপ্লবিক কবিতা ‘বীর গুলাব’ (Veer Gulab) এবং ‘মঙ্গু দি চাবিল’ (Mangu di Chabil) প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতা ছিল সামন্ততান্ত্রিক শোষক শ্রেণী ও রাজতন্ত্রের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রগতিশীল কশাঘাত, যা ডোগরি সাহিত্যকে প্রথম আধুনিক দ্রোহের সাথে যুক্ত করে।
  • ডোগরি সংস্থা ও সাহিত্যিক নবজাগরণ (Dogri Sanstha): ১৯৪৪ সালে জম্মুতে ‘ডোগরি সংস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। রামনাথ শাস্ত্রী, দিনো ভাই পান্ত এবং ভগবান্ত প্রসাদ সাতের হাত ধরে এই আন্দোলনটি গড়ে ওঠে। এই সংস্থার লেখকেরা ডোগরি ভাষাকে কেবল রাজদরবারের স্তুতি বা সস্তা বিনোদনের মাধ্যম থেকে বের করে সাধারণ মেহনতি মানুষ, কৃষক এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক শক্তিশালী প্রগতিশীল হাতিয়ারে পরিণত করেন।
  • উত্তর-আধুনিক বাস্তবতাবাদ ও প্রান্তিক চেতনা: উত্তর-আধুনিক ডোগরি সাহিত্যে পদ্মা সচদেব এবং সমসাময়িক লেখকদের হাত ধরে এক শক্তিশালী সমাজবাস্তববাদী ধারার জন্ম হয়। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের কারণে জম্মুর সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের অবর্ণনীয় কষ্ট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পাহাড়ি প্রকৃতির বুক চিরে গড়ে ওঠা কর্পোরেট পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ডোগরি সাহিত্যে আজ এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও আপসহীন প্রগতিশীল ধারা তৈরি হয়েছে।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

ডোগরি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • ডিনো ভাই পান্ত (১৯১১–২০০৮): আধুনিক ডোগরি সাহিত্যের জনক ও প্রখ্যাত বৈপ্লবিক কবি। তাঁর কবিতা ডোগরি সাহিত্যকে প্রথম প্রগতিশীল ও আধুনিক সমাজ সচেতনতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
  • অধ্যাপক রামনাথ শাস্ত্রী (১৯১৪–২০০৬): ডোগরি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও ‘ডোগরি ভাষার ভারতেন্দু’। তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার ও অনুবাদক। ডোগরি সংস্থাকে নেতৃত্ব দিয়ে ডোগরি ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান একক ও অবিস্মরণীয়।
  • পদ্মা সচদেব (১৯৪০–২০২১): আধুনিক ডোগরি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী এবং প্রথম আধুনিক নারী কবি। ২০০১ সালে তিনি ডোগরি সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ এবং পরবর্তীতে কবীর সম্মান লাভ করেন। তাঁর কবিতা ও গদ্য ডোগরি সাহিত্যে এক অনন্য নারীবাদী ও প্রগতিশীল আভিজাত্য দান করেছে।
  • বেদ রাহী (১৯৩৩—বর্তমান): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত ডোগরি ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর রচিত ‘লল্লেদ’ (Lal Ded) উপন্যাসটি কাশ্মীরি ও ডোগরি সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল এবং তাঁর ছোটগল্পগুলো ডোগরি মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক নিখুঁত বাস্তবসম্মত রূপ।
  • নরেন্দ্র খাজুরিয়া (১৯৩৩–১৯৭০): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক ও বাস্তবতাবাদী ডোগরি গল্পকার। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকালেই তিনি তাঁর অসাধারণ ছোটগল্পগুলোর মাধ্যমে ডোগরি কথাসাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ করে তুলেছিলেন।

 

ভোজপুরি সাহিত্য

ভারতের বিহারের পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল (পূর্বাঞ্চল অঞ্চল), ঝাড়খণ্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং নেপালের তরাই অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ভোজপুরি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং সুপ্রাচীন ইন্দো-আর্য (Magadhi Prakrit) ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মাধ্যম। কেবল ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, বরং ঔপনিবেশিক আমলে ‘গিরমিটিয়া’ (Indentured Labourers) চুক্তির মাধ্যমে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া মরিশাস, সুরিনাম, গায়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং ফিজির বিশাল প্রবাসী ভারতীয় সমাজ জুড়ে এই ভাষা ও সাহিত্যের এক অনন্য বৈশ্বিক রূপ তৈরি হয়েছে। খ্রিষ্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকের সিদ্ধাচার্যদের ‘চর্যাপদ’ এবং সন্ত কবিরের মরমী বাণীর মধ্য দিয়ে এই ভাষার আদি সাহিত্যিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভিখারী ঠাকুরের হাত ধরে এই সাহিত্যের আধুনিক ও লিখিত রূপের এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ আসে; বিশেষ করে অভিবাসী জীবনের করুণ ট্র্যাজেডি সংবলিত লোকনাট্য, বীরত্বগাথামূলক লোকগীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রগতিশীল কবিতা এবং আধুনিক কথাসাহিত্যের (উপন্যাস ও ছোটগল্প) মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। ভারতের সংবিধানে এখনো স্বাধীন রাষ্ট্রীয় বা তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ভাষার মর্যাদা না পেলেও (বর্তমানে এটি হিন্দির একটি উপভাষা হিসেবে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত), ভারতের জাতীয় ‘সাহিত্য অকাদেমি’ (Sahitya Akademi) এবং আন্তর্জাতিক স্তরে এই ভাষার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির পূর্ণ স্বীকৃতি রয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক মহাজনী শোষণ থেকে শুরু করে মরিশাসের চিনিকলে ভোজপুরি মেহনতি মানুষের রক্ত জল করা লড়াই এবং উত্তর-আধুনিক প্রান্তিক অধিকার আদায়ের এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে এই ভাষার, যেখানে সন্ত কবির, ভোজপুরির শেকসপিয়র ভিখারী ঠাকুর, রাহুল সাংকৃত্যায়ন এবং মহাকবি মহেন্দ্র মিসিরের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা

ভোজপুরি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই মাটিঘনিষ্ঠ, আবেগপ্রবণ ও লৌকিক ঐতিহ্যে ঋদ্ধ যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:

ক. বিদেশিয়া ও লোকনাট্যের ঐতিহ্য (Bideshiya & Folk Theatre): ভোজপুরি সাহিত্যের আধুনিক যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কালজয়ী মৌলিক জনরা হলো ‘বিদেশিয়া’ (Bideshiya)। বিশ শতকের শুরুতে ভিখারী ঠাকুর এই নাট্যরীতি ও গীতি-আলেখ্যের প্রবর্তন করেন। এটি মূলত জীবিকার তাগিদে কলকাতা বা বিদেশে পাড়ি জমানো ভোজপুরি পুরুষদের কারণে গ্রামে একা রয়ে যাওয়া নারীদের তীব্র বিরহবেদনা, গ্রামীণ সমাজের ভাঙন এবং কুসংস্কারের এক অমর ও বাস্তবসম্মত দলিল, যা আজও ভোজপুরি সংস্কৃতির প্রধান মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি।

খ. চারণকাব্য ও লোরিকায়ন (Lorikayan — Oral Epics): ভোজপুরি লোকসাহিত্যের এক সুপ্রাচীন ও মহাকাব্যিক ঐতিহ্য হলো ‘লোরিকায়ন’। এটি মূলত ভোজপুরি চারণ কবিদের দ্বারা মুখে মুখে গাওয়া এক দীর্ঘ লোক-মহাকাব্য, যেখানে বীর নায়ক লোরিকের শৌর্য, যুদ্ধ এবং প্রেমের বীরত্বগাথা ফুটিয়ে তোলা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ ভোজপুরি সমাজে এটি মেহনতি মানুষের আত্মমর্যাদা ও সাহসের প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে।

গ. ঋতুভিত্তিক ও মরমী লোকগীতি (Seasonal & Mystical Songs): ভোজপুরি কবিতা প্রাকৃতিকভাবেই গান ও সুরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মধ্যে ‘কাজরী’ (Kajri — বর্ষার গান), ‘চৈতা’ (Chaita — বসন্ত-বিদায়ের গান) এবং ‘হোরী’ (Hori — ফাগুনের গান) অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া সন্ত কবির এবং ধরনী দাসের মরমী বাউল বা সুফী ঘরানার ভজনগুলো ভোজপুরি সাহিত্যকে এক সুগভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক আভিজাত্য দান করেছে।

ঘ. কথাসাহিত্য: আধুনিক উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন এবং রামনাথ পাণ্ডের হাত ধরে ভোজপুরি কথাসাহিত্যের আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত রামনাথ পাণ্ডের ‘বিন্দিয়া’ (Bindiya) ভোজপুরি ভাষার প্রথম সামাজিক উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়। ভোজপুরি কথাসাহিত্যে সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের অত্যাচার, জাতপ্রথা এবং গ্রামীণ মেহনতি কৃষকদের তীব্র জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)

ভোজপুরি সাহিত্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দ্রোহ, গিরমিটিয়া শ্রমিকদের অধিকার, সামন্তবাদ ও জাতিভেদ প্রথার অবসান এবং নারী জাগরণের পক্ষে লড়ার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:

  • ভিখারী ঠাকুর ও প্রগতিশীল সমাজ সংস্কার: ভিখারী ঠাকুরের নাটকগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল প্রগতির ইশতেহার। তাঁর ‘বেটি বেচোয়া’ (Beti Bechwa) নাটকের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন ভোজপুরি সমাজে বুড়ো বরদের কাছে কন্যাসন্তান বিক্রি করার মতো জঘন্য কুপ্রথার মূলে তীব্র কুঠারাঘাত করেছিলেন। তাঁর প্রগতিশীল লেখনী ভোজপুরি সমাজকে আধুনিক করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল।
  • রাহুল সাংকৃত্যায়ন ও কৃষক আন্দোলন: প্রখ্যাত সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ ও বহুভাষাবিদ পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভোজপুরি ভাষাকে সরাসরি কৃষক আন্দোলন ও ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি ভোজপুরি ভাষায় বেশ কিছু বৈপ্লবিক নাটক (যেমন ‘মেহেরারুন কে দুমদশা’) এবং প্রগতিশীল প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা মেহনতি কৃষকদের নিজেদের অধিকারের প্রতি সচেতন করে তুলেছিল।
  • গিরমিটিয়া আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ ধারা: মরিশাস ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে যাওয়া ভোজপুরি গিরমিটিয়া শ্রমিকদের লেখনীতে এক অনন্য ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ (Resistance Literature)-এর জন্ম হয়। শোষণের বিরুদ্ধে, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাঁদের রচিত গান ও কবিতাগুলো আজ বিশ্বমানের প্রগতিশীল সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে, যা মরিশাসের মতো দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ

ভোজপুরি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:

  • সন্ত কবির (১৩৯৮–১৪৪৮): ভোজপুরি ও অবহট্ট মিশ্রিত ভাষার আদি ও সর্বশ্রেষ্ঠ মরমী কবি। তাঁর দোহা ও ভজনগুলো ভোজপুরি সাহিত্যের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তার আদি আকর ভিত্তি।
  • ভিখারী ঠাকুর (১৮৮৭–১৯৭১): আধুনিক ভোজপুরি সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট, লোকনাট্যকার ও ‘ভোজপুরির শেকসপিয়র’। তাঁর রচিত ‘বিদেশিয়া’, ‘গাবর ঘিচোর’ এবং ‘বেটি বেচোয়া’ নাটক ভোজপুরি সাহিত্যের ইতিহাসের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী মাইলফলক।
  • মহেন্দ্র মিসির (১৮৮৬–১৯৪৬): ভোজপুরি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং ‘পুর্বী’ (Poorbi) গীতিধারার জনক। তিনি একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সুরকার ছিলেন, যাঁর রোমান্টিক ও দেশাত্মবোধক গানগুলো ভোজপুরি সংস্কৃতির প্রাণ।
  • পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন (১৮৯৩–১৯৬৩): প্রখ্যাত প্রগতিশীল সাহিত্যিক, সমাজতান্ত্রিক পুরোধা এবং গবেষক। ভোজপুরি ভাষায় বৈপ্লবিক নাটক ও প্রগতিশীল গদ্য রচনার মাধ্যমে তিনি এই ভাষার সাহিত্যিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন।
  • রঘুভীর নারায়ণ (১৮৮৪–১৯৫৫): বিখ্যাত ভোজপুরি কবি। তাঁর রচিত কালজয়ী দেশাত্মবোধক কবিতা ‘বটোহিয়া’ (Batohiya) মরিশাস ও ভারতের ভোজপুরি জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এক অনন্য মহাকাব্যিক সঙ্গীত হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক মানচিত্রের কাঁটাতার দিয়ে যে সীমান্তগুলো আমরা টেনে দিয়েছি, দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বারবার সেই সীমানাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। আমরা যখন বাংলা সাহিত্যের মহানায়কদের কীর্তিগাথার পাশাপাশি সংস্কৃতের ধ্রুপদী গভীরতা, হিন্দির সমাজবাস্তবতা, তামিলের দুই হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য কিংবা উর্দুর মরমী ও প্রগতিশীল শায়েরির দিকে তাকাই, তখন এক পরম সত্য উন্মোচিত হয়—আমাদের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের যূথবদ্ধ অভিযাত্রার গল্পটা এক। বঙ্কিম-মানিক-জীবনানন্দের যে দ্রোহ ও নান্দনিকতা, তারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই প্রেমচন্দ, কালিদাস, তিরুভাল্লুভার কিংবা মির্জা গালিবের অবিনশ্বর সৃষ্টিতে।

বাংলা ও ইংরেজির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশীদের এই সুবিশাল সাহিত্য-সমুদ্রে ডুব দেওয়া কেবল নতুন কিছু জানা নয়, বরং আয়নায় নিজের অবদমিত ও বিস্তৃত সত্ত্বাকেই নতুন করে আবিষ্কার করা। এই প্রতিবেশীরা তো অন্য কেউ নন, এরা আমাদেরই মাটির কাছের মানুষ, আমাদেরই আত্মার আত্মীয়।

আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস “আমার সংস্কৃতি সিরিজ” কোনো একাডেমিক গবেষণা নয়; বরং নিজের শেকড় এবং চারপাশের প্রতিবেশীদের নতুন করে চেনার এক আন্তরিক আকুতি। এই সুদীর্ঘ ইনডেক্স বা পরিচিতি পর্ব যদি আমাদের পাঠকদের মনে ঘরের পাশের এই সমৃদ্ধ সাহিত্যজগৎ নিয়ে সামান্যতম কৌতূহল বা ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে, তবেই এই অসম্পূর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা চেষ্টাটুকু সার্থকতা পাবে। আসুন, অনুবাদের সেতু বেয়ে, সংস্কৃতির লেনদেনে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার এই মহান সাহিত্যিকদের হাত ধরি এবং নিজেদের আরও উদার, আরও সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি।

আরও দেখুন: