শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা নীতিশিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর বাহন হলো গল্প। আবার এই গল্পই তো যুগ যুগ ধরে মানুষের বিনোদনেরও মস্ত বড় একটা মাধ্যম। সত্যি বলতে, গল্প বানানো আর তা একে অন্যকে শোনানোর মধ্য দিয়েই মানুষের সভ্যতা আজ এতদূর এগিয়েছে।
কিন্তু আজ নাটক বা সিনেমায় যেভাবে গল্প বলা হয়, আজ থেকে দুশো বছর আগেও কিন্তু তেমনটা ছিল না। একটা সময় ছিল যখন থিয়েটারের এত প্রপস, মঞ্চের এত কারুকাজ কিংবা আলোর এত চোখধাঁধানো আয়োজন ছিল না। তখন পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতার মানুষ নিজেদের মতো করে গল্প বলেছে। স্রেফ একজন মানুষ তাঁর মুখের কথা আর শরীরের অঙ্গভঙ্গি দিয়ে দর্শক-শ্রোতার মনে গড়ে তুলেছেন এক বিরাট প্রাসাদ, কোনো এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্র, কিংবা এমন সব অদ্ভুত ভাবনা—যা হয়তো বাস্তবে বহু শত বছরে একবার ঘটে, অথবা যার অস্তিত্ব কেবল মানুষের কল্পনাতেই সম্ভব।
গল্প বলার এই অবিশ্বাস্য ঐতিহ্যেরই একটি ধ্রুপদী রূপ হলো ‘দাস্তানগোই’। মাত্র এক-দেড়শো বছর আগে হারিয়ে যেতে বসা এক অনন্য ট্রাডিশন। একসময় যা আমাদের এই উপমহাদেশ থেকে প্রায় পুরোপুরিই মুছে গিয়েছিল—অবশ্যই সাম্প্রতিককালের সেই জাদুকরী পুনরুত্থানের আগে।
সাফ জানিয়ে রাখছি—আমি কোনো গবেষক নই, সাহিত্য বিষয়ে পণ্ডিত্য আমার নেই। আমি কেবল এক মুগ্ধ গল্পভক্ত শ্রোতা। সোজা সিঁড়ি বেয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে দাস্তানগোদের সেই জাদুকরী আসরে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটাই আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার একটা চেষ্টা করছি মাত্র।
তবে এই কিসসার ভেতরে ঢোকার আগে একটা কথা একটু পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আমি আমার প্রায় সব লেখাতেই একটা কথা বারবার বলি—চল্লিশের সেই অভিশপ্ত দেশভাগের পর, কাটা তারের ওপারে-এপারে জমির ভাগাভাগিটা হয়তো ধুলোবালি মেপে হয়েছে, কিন্তু আমার পূর্বপুরুষেরা তাদের বুকের ভেতরের শিল্পের ভাগটা যথাযথভাবে বুঝে নিয়ে আসতে পারেননি। সেই অধিকারটা এবার আমাদের আদায় করে নিতে হবে। সাতচল্লিশের সেই কৃত্রিম রেখা টানার আগে এই বিশাল ভারতখণ্ডে যত শিল্প, যত সাহিত্য কিংবা যত সাংস্কৃতিক যজ্ঞ হয়েছে, তার প্রতিটা ইটের ওপর আমার সমান এবং ন্যায্য অধিকার আছে। সেই হিসেবে দাস্তানগোই কেবল লখনউ, দিল্লি কিংবা আধুনিক ভারতের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; এটি আমারও শিল্প, আমাদেরও পরম ঐতিহ্য।
চলুন, আগানো যাক।
দাস্তানগোই (Dastangoi): হাজার রাতের জাদুকরী কথকতার ইতিহাস

দাস্তানগোই কী?
সহজ কথায়, ফারসি শব্দ ‘দাস্তান’ মানে হলো গল্প বা মহাকাব্য, আর ‘গোই’ মানে হলো বলা। এই দুইয়ে মিলেই তৈরি হয়েছে গল্প বলার এক ধ্রুপদী পারফর্মিং আর্ট—দাস্তানগোই।
লণ্ঠনের টিমটিমে আলোয় মোড়ানো একটা ঘরে ধবধবে সাদা পিরহান আর মাথায় টুপি পরা একজন মানুষ যখন মঞ্চের মাঝখানে একা বসেন, তখন তার সামনে কোনো দোতারা-সেতার থাকে না, গায়ে কোনো ঝকঝকে কস্টিউম থাকে না। তিনি কেবল হাত দুটি বাতাসে নাড়েন, চোখের মণি জোড়া ঘোরান আর তার গল্পের ভাঁজ ভাঙতে থাকেন।
মুহূর্তের মধ্যে শ্রোতারা আর সেই সাধারণ ঘরে বসে থাকেন না; তারা পৌঁছে যান তপ্ত মরুভূমির কোনো এক মায়াবী দুর্গে, যেখানে ডানাওয়ালা জিন, জাদুকর আফরিয়াব আর বীর হামজার তরবারির ঝনঝনানি চলছে। এটি হলো শব্দ দিয়ে মানুষের মগজে থিয়েটার তৈরি করার এক আদিম ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক শিল্প।
দাস্তানগোই কোন সরলভাবে গল্পে বলে যাবার শিল্প নয়। আবার স্ক্রিপ্ট পড়ে অভিনয় করার মতোও বিষয় নয়। বরং দর্শক-শ্রেতাদের যুক্ত করে নিয়ে করা একটি জটিল কম্পোজিট পার্ফমেন্স। চলুন এর কারিগরি দিক গুলো কিছুটা বোঝার চেষ্টা করি:
দাস্তান দর দাস্তান’ (Dastan-dar-Dastan):
দাস্তানগোরা কখনো একই সরলরেখায় গল্পের বিস্তার করেন না। দাস্তানগোই-এর এই বিশেষ গায়েরীতিকে ওস্তাদরা বলেন ‘দাস্তান দর দাস্তান’ (Dastan-dar-Dastan), অর্থাৎ গল্পের ভেতর থেকে গল্পের জন্ম দেওয়া। এখানে কাহিনী কখনো হরিণের শিং-এর মতো এসে দুই দিকে ভাগ হয়ে যায়। দাস্তানগো তখন চালাকি করে একটি শিং ধরে গল্প নিয়ে এগিয়ে চলেন। অন্য শিং-এ কী হলো—এই তীব্র কৌতুহল আর চাপ শ্রোতাদের মনের মধ্যে রেখে দিয়ে, তিনি যে শিংটি ধরে এগিয়ে চলছেন, সেখান থেকে আবার নতুন আরেকটি শাখা বের করে ফেলেন!
‘তাওয়ালুত’ (Tawalat):
এই গল্পশিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হচ্ছে মূল কাহিনীটাকে খুব দ্রুত এগোতে না দেওয়া। দাস্তানের ব্যাকরণে একে বলা হয় ‘তাওয়ালুত’ (Tawalat), যার সোজা বাংলা হলো—গল্পকে দীর্ঘায়িত করার শিল্প। কোনো একটি মূল ঘটনার ক্লাইম্যাক্স বা যবনিকার জন্য যখন শ্রোতাদের মনে চূড়ান্ত তৃষ্ণা তৈরি হয়, ঠিক তখনই হঠাৎ করে নতুন কোনো চরিত্র বা অলৌকিক ঘটনা এসে সেই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে অন্য রাস্তায় নিয়ে যায়। ওস্তাদ দাস্তানগোরা এই মনস্তাত্ত্বিক খেলাটা দারুণ খেলেন। তারা শ্রোতাকে তৃষ্ণার্ত রাখেন, কিন্তু কখনো তৃষ্ণা মেটান না; বরং আরও বড় এক তৃষ্ণার সাগরে ফেলে দেন।
ফেহেরেস্ত-নিগারি (Fehrest-Nigari – অন্তহীন তালিকার মায়াজাল):
এটি দাস্তানগোদের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক খেলা। গল্প বলতে বলতে হঠাৎ কোনো রাজকীয় ভোজ, কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি, কিংবা কোনো জাদুকরের ডেরার বর্ণনা দিতে গিয়ে দাস্তানগোরা এক বিশাল তালিকা বা ইনভেন্টরি দেওয়া শুরু করতেন। যেমন ধরুন, রাজকীয় ভোজে কী কী খাবার আছে—তার একশোটা পদের নাম তারা একটানা ছন্দের মতো সুর করে বলে যেতেন (পোলাও, কোপ্তা, কাবাব, কোরমো থেকে শুরু করে সুদূর পারস্যের বিলুপ্ত সব খাবারের নাম)। এই অনর্গল শব্দের ঝড় শ্রোতাদের মগজকে এক ধরনের ‘ট্রান্স’ বা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিত। শ্রোতারা অবলীলায় সেই এলাহী কাণ্ড নিজের চোখের সামনে দেখতে পেতেন।
গুলেস্তানি এবং খারিজি (Gulestani & Khariji – মূল বনাম বাইরের জগৎ):
দাস্তানের মূল কাঠামোর প্রধান দুটি ভাগ থাকে। একটি হলো ‘গুলেস্তানি’—এটি হলো দাস্তানের সেই চেনা ফ্যান্টাসি জগত, যেখানে জিন আছে, জাদুকর আফরিয়াব আছে, আসমানি তলোয়ার আছে। আর অন্যটি হলো ‘খারিজি’—এটি হলো সম্পূর্ণ বাস্তব জগৎ। গল্প বলতে বলতে হঠাৎ করেই দাস্তানগো সেই রূপকথা থেকে বের হয়ে লখনউ বা দিল্লির সমসাময়িক কোনো বাস্তব ঘটনা, কোনো মেলা, বাজারের দরদাম বা রাজনৈতিক রসিকতা ছুড়ে দিতেন। একটানা রূপকথা শুনতে শুনতে শ্রোতারা যাতে ক্লান্ত না হয়ে পড়েন, সেজন্য এই ‘খারিজি’ এলিমেন্ট দিয়ে তাদের একটু বাস্তবে ফিরিয়ে এনে হাসানো হতো, এবং পরক্ষণেই আবার জাদুনগরে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।
মানযিল-বা-মানযিল (Manzil-ba-Manzil – মনস্তাত্ত্বিক ট্রাভেলগ):
দাস্তানের নায়কেরা যখন কোনো অভিযানে বের হতেন, তখন তারা এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতেন। দাস্তানগোরা এই পথ চলার নিখুঁত বর্ণনা দিতেন। প্রতি মাইলে কী গাছ আছে, বাতাসের গন্ধ কেমন, আকাশের রঙ কেমন—এগুলো এত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলা হতো যে, শ্রোতারা নিজেদের ঘরের মেঝেতে বসেও ফিল করতেন যে তারা নিজেরাও ঘোড়ায় চড়ে নায়কের সাথে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন। একে বলা হতো ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার শিল্প।
মোশায়েরি ভঙ্গি (Moshairi Style – কবিতার বুনন):
আমরা খেয়াল গানে যেমন দেখি—মূল গান গাইতে গাইতে হঠাৎ ঠুমরির মিষ্টি অঙ্গ ঢুকে পড়ছে, ঠিক তেমনি দাস্তানগোরা গদ্যে গল্প বলতে বলতে হঠাৎ কোনো একটা নাটকীয় মুহূর্তে নিজের বা সমসাময়িক বড় কোনো কবির (যেমন গালিব বা মীর) এক বা দুই লাইনের চমৎকার শায়েরি বা কবিতা টেনে আনতেন। একে বলা হতো ‘মোশায়েরি অঙ্গ’। এটি গল্পের সাহিত্যিক মানকে এক ধাক্কায় রাজদরবারের স্তরে তুলে দিত।
বরণ-নিগারি (Baran-Nigari – প্রকৃতির সাথে মুডের খেলা):
চরিত্রদের মনের আবেগের সাথে মিলিয়ে প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া। যেমন—নায়ক যখন বিরহে কাঁদছেন, তখন দাস্তানগো এমনভাবে ঝুম বৃষ্টির আর মেঘের গর্জনের বর্ণনা দিতেন যেন প্রকৃতিও নায়কের সাথে সুর মিলিয়ে কাঁদছে। আবার যুদ্ধের সময় তপ্ত বালুঝড়ের এমন বর্ণনা দেওয়া হতো যাতে শ্রোতারা নিজেদের গাল দিয়েও যেন সেই তপ্ত বালুর আঁচ আর ওড়না ওড়ার শব্দ টের পান।
সরাপা-নিগারি (Sarapa-Nigari – পায়ের নখ থেকে মাথার চুল):
ফারসি ‘সরাপা’ শব্দের অর্থ হলো আপাদমস্তক। এটি হলো দাস্তানের কোনো রূপবতী রাজকুমারী, মায়াবী ডাইনি কিংবা খোদ নায়কের রূপের নিখুঁত ও অবিশ্বাস্য বর্ণনা। দাস্তানগো যখন সরাপা-নিগারি শুরু করতেন, তখন রাজকুমারীর পায়ের নখের উজ্জ্বলতা থেকে শুরু করে তার চোখের পলক, চুলের প্রতিটি ভাঁজ আর গায়ের ওড়নার সুক্ষ্ম সুতোর কাজ পর্যন্ত এমনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বর্ণনা করতেন যে, শ্রোতাদের বুকের ভেতর একটা হাহাকার তৈরি হতো। রূপের এই বর্ণনা শ্রোতাকে তীব্র রোমান্টিক এক ঘোরের মধ্যে আটকে রাখত।
আইয়ারি চাতুরী (Aiyari Chaturi – ধোঁকাবাজি ও বুদ্ধির খেলা):
দাস্তানে শুধু তলোয়ারের লড়াই হতো না, চলত চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ‘আইয়ার’ মানে হলো গোয়েন্দা বা জাদুকরী গুপ্তচর (যেমন আমির হামজার বন্ধু আমর উমাইয়া)। দাস্তানগো যখন আইয়ারি অঙ্গের বর্ণনা দিতেন, তখন গলার আওয়াজ পুরো বদলে ফেলতেন। একজন আইয়ার কীভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করছে, কীভাবে শত্রুর শিবিরে আফিম খাইয়ে সবাইকে অজ্ঞান করছে, কিংবা নিখুঁত নকল আওয়াজ বের করে বোকা বানাচ্ছে—তার এমন নাটকীয় ও রসাত্মক বর্ণনা দেওয়া হতো যে, আসরের থমথমে ভাব কেটে গিয়ে শ্রোতারা হাসিতে ফেটে পড়তেন।
সওয়াল-জওয়াব (Sawal-Jawab – কথার পিঠে কথার খই):
আমরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যেমন দেখি—সেতারের একটা তান ছুড়ে দেওয়ার পর তবলা বাদক ঠিক সেটার পিঠে একটা জবাব দেন, দাস্তানগোইতেও ঠিক এই জিনিসটা হতো। বিশেষ করে যখন দুজন জাদুকর কিংবা নায়ক ও খলনায়কের মধ্যে কথার লড়াই হতো, তখন দাস্তানগো একা মুখে দুই চরিত্রের সংলাপ এমন দ্রুত আর ছন্দের তালের সাথে ছুড়ে দিতেন যে শ্রোতারা শ্বাস নিতে ভুলে যেতেন। তর্কের এই দ্রুত লয় শ্রোতাদের নার্ভ টানটান করে রাখত।
তাক্রার (Takrar – চেনা শব্দের রিদম):
এটি হলো কোনো বিশেষ বাক্য বা শব্দকে বারবার ঘুরেফিরে ব্যবহার করে আসরে একটা হিপনোটিক রিদম বা ছন্দ তৈরি করা। যেমন, কোনো এক জাদুনগরীর বর্ণনায় হয়তো বারবার বলা হচ্ছে, “না সেখানে বাতাস আছে, না সেখানে আলো আছে…”। এই একই বাক্যাংশ যখন দাস্তানগো তার চমৎকার কণ্ঠস্বরে বারবার বিভিন্ন টোনে বলতেন, তখন শ্রোতাদের মনে এক ধরণের রহস্যময় ভয়ের আবহ তৈরি হতো।
খাব-নামা (Khab-Nama – স্বপ্নের মায়াজাল):
দাস্তানের চরিত্ররা প্রায়শই স্বপ্নে অদ্ভুত সব ইঙ্গিত পেতেন। দাস্তানগোরা এই স্বপ্নের দৃশ্যগুলোকে এত অবাস্তব, পরাবাস্তব (Surreal) এবং রূপক দিয়ে বর্ণনা করতেন যে শ্রোতারা বাস্তবের যুক্তি-বুদ্ধি ভুলে পুরোপুরি অবচেতনের এক অতল জগতে হারিয়ে যেতেন।
আওচার বা তমহীদ (Tamheed – আসর বাঁধার আলাপ):
আমরা যেমন খেয়াল গানে মূল বন্দিশ শুরু করার আগে সুর লাগিয়ে সংক্ষিপ্ত একটা ‘আওচার’ বা আলাপ শুনি, দাস্তানগোরাও মূল গল্পে ঢোকার আগে আসরের পরিবেশ তৈরি করতে একটা ভূমিকা নিতেন। একে বলা হতো ‘তমহীদ’। এখানে তারা ঈশ্বর, নবী বা আউলিয়াদের প্রশংসা করতেন, লখনউ বা দিল্লির গুণী শ্রোতাদের বন্দনা করতেন এবং একটা মিষ্টি কাব্যিক আবহ তৈরি করে শ্রোতাদের মনকে দুনিয়ার কোলাহল থেকে মুক্ত করে গল্পের জন্য তৈরি করতেন।
রযমিয়া এবং বযমিয়া অঙ্গ (Razmiya & Bazmiya – বীরত্ব বনাম শৃঙ্গার রস):
দাস্তানের পুরো শরীর এই দুটি প্রধান মেজাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন তলোয়ারের লড়াই, ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ আর বীরত্বের বর্ণনা হয়, তাকে বলে ‘রযমিয়া’ অঙ্গ। আর যখন ফুলশয্যা, সুরা, সঙ্গীত, প্রেম আর বিরহের মতো নরম অনুভূতিগুলো আসে, তাকে বলা হয় ‘বযমিয়া’ অঙ্গ। ওস্তাদ গায়কেরা যেমন রাগের মেজাজ বুঝে ধ্রুপদ থেকে ঠুমরিতে যান, দাস্তানগোরাও তেমনি শ্রোতাদের নাড়ি বুঝে রযমিয়া থেকে বযমিয়া অঙ্গে যাতায়াত করতেন।
আশুব-ই-শহর (Ashob-e-Shahar – ধ্বংসের হাহাকার):
যখন কোনো জাদুকর তার মায়াশক্তি দিয়ে একটা আস্ত শহর ধ্বংস করে দেয়, কিংবা কোনো যুদ্ধে একটা সুন্দর নগরী পুড়ে ছারখার হয়ে যায়, তখন দাস্তানগোরা এই ‘আশুব-ই-শহর’ অঙ্গটি ব্যবহার করতেন। এখানে বিলাপে আর কান্নায় এমন এক বুক কাঁপানো বিবরণ দেওয়া হতো যা শ্রোতাদের মনে এক ধরণের করুণ রসের (Pathos) সৃষ্টি করত।
গুরেয (Gurez – মোড় ঘোরানোর চাতুরী):
এটি হলো সম্পূর্ণ অলক্ষিত উপায়ে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে লাফ দেওয়ার কৌশল। গল্প বলতে বলতে দাস্তানগো হয়তো এক রাজপ্রাসাদের বর্ণনা দিচ্ছেন, শ্রোতারাও সেখানে মগ্ন; ঠিক তখনই কোনো একটি শব্দের সুতো ধরে দাস্তানগো হঠাৎ করে শ্রোতাকে নিয়ে চলে গেলেন গভীর এক জঙ্গল বা সমুদ্রের তলে। এই যে এক সুতো থেকে অন্য সুতোয় মসৃণভাবে পিছলে যাওয়া, একেই বলে ‘গুরেয’।
জবান-দানী (Zaban-Dani – ভাষার খেলা):
এটি কোনো আলাদা গল্প নয়, এটি হলো দাস্তানগোর নিজের ভাষার ওপর দখলের পরীক্ষা। বিভিন্ন চরিত্রের মুখে বিভিন্ন রকম ভাষা বসানো। যেমন, একজন রাজা যখন কথা বলবেন তখন ভাষা হবে অত্যন্ত গম্ভীর ও ফারসিঘেঁষা; কিন্তু একজন আইয়ার বা সাধারণ চোর যখন কথা বলবে, তখন ভাষা হয়ে যাবে লখনউয়ের চুনোপুঁটি গলির একদম চলতি ও জ্যান্ত উপভাষা। এই ভাষার ভিন্নতা চরিত্রগুলোকে মানুষের চোখের সামনে জীবন্ত মাংসের মানুষ বানিয়ে তুলত।
নক্ল-ই-মজলিস (Naql-e-Majlis – উপস্থিত ব্যঙ্গ-কৌতুক):
গল্প বলতে বলতে হঠাৎ করেই দাস্তানগো সামনের সারিতে বসা কোনো বিশিষ্ট শ্রোতা, নবাবের কোনো খামখেয়ালি স্বভাব, কিংবা সেই মফস্বলের কোনো চেনা জলজ্যান্ত চরিত্রকে কাহিনীর ভেতরে একটা ছদ্মবেশী চরিত্র বানিয়ে ঢুকিয়ে দিতেন। এতে আসরের গাম্ভীর্য ভেঙে এক চিলতে হাসির হাওয়া বয়ে যেত। শ্রোতারাও নড়েচড়ে বসে অবলীলায় রূপকথার সাথে নিজেদের বাস্তব জীবনকে মেলাতে পারতেন।
মাক্বুলাত (Maqulat – জ্ঞানগর্ভ প্রবচন):
আমরা যেমন দেখি গম্ভীর কোনো গানের মাঝে হঠাৎ জীবনের একটা বড় সত্য লুকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি দাস্তানগোরা বীরত্ব বা প্রেমের গল্পের ফাঁকে ফাঁকে সুফি দর্শন, নীতিশিক্ষা বা চিরন্তন কিছু সত্য বাণী এমন কাব্যিক ঢঙে ছুড়ে দিতেন যা শ্রোতাদের মগজে গেঁথে যেত। এটি কেবল সস্তা বিনোদন ছিল না, ছিল এক ধরণের লার্নিং প্রসেসও।
সালাত-ই-আমির (Salat-e-Amir – নায়কের জয়ধ্বনি):
যখনই দাস্তানে মূল নায়ক আমির হামজা বা তার কোনো বীর সেনাপতি কোনো অসম্ভব যুদ্ধ জিতে শত্রুর দুর্গ গুঁড়িয়ে দিতেন, তখন দাস্তানগো মূল বর্ণনা থামিয়ে হঠাৎ এক ধরণের উচ্চস্বরের ছন্দোবদ্ধ স্লোগান বা স্তুতি গেয়ে উঠতেন। একে বলা হতো ‘সালাত’। এর উদ্দেশ্য ছিল পুরো আসরের ঝিমিয়ে পড়া এনার্জিকে এক ধাক্কায় চাঙ্গা করে তোলা এবং শ্রোতাদের অবচেতন মনকেও সেই বিজয়ের ভাগীদার করা।
গযল-খওয়ানি (Ghazal-Khwani – সুরের অলঙ্কার):
দাস্তানগোরা শুধু যে গদ্যে কথা বলতেন তা কিন্তু নয়। যখন বযমিয়া অঙ্গে কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার তীব্র বিরহ বা মিলনের দৃশ্য আসত, তখন দাস্তানগোরা কথার পিঠে কথা না বলে, লখনউই ঘরানার গজল বা ঠুমরির মতো করে সেই লাইনগুলো সুর করে গেয়ে উঠতেন। এই ক্ষণস্থায়ী সুরের ছোঁয়া গল্পটিকে এক অনন্য নান্দনিক উচ্চতায় নিয়ে যেত।
খেলাত-নিগারি (Khelat-Nigari – রাজকীয় রাজবেশের বর্ণনা):
এটি ‘সরাপা-নিগারি’র মতোই পোশাকের এক এলাহী ইনভেন্টরি। কোনো রাজা যখন দরবারে বসতেন বা কোনো যোদ্ধা যখন যুদ্ধে যেতেন, তার মাথায় জড়ি ছিটানো পাগড়ি থেকে শুরু করে, কোমরবন্ধের হীরের কাজ, বর্মের সূক্ষ্ম কারুকাজ আর তরবারির খাপের মখমল পর্যন্ত এত মিহি করে বর্ণনা করা হতো যে, পোশাকের সেই জাঁকজমক শ্রোতাদের চোখের সামনে ঝলমল করে উঠত।
দাওয়াত-ই-তিলিসম (Dawat-e-Tilism – মায়াজালের নিমন্ত্রণ):
জাদুর দুনিয়া বা তিলিসমের ভেতরে যখন কোনো নতুন চরিত্র প্রবেশ করত, তখন জাদুনগরী নিজেই যেন তাকে এক মায়াবী ইশারায় স্বাগত জানাত। গাছপালা কথা বলে উঠত, পাথর থেকে ঝরনা ছুটত, কিংবা আকাশে অদ্ভুত রঙের মেঘ জমত। দাস্তানগোরা প্রকৃতির এই অতিপ্রাকৃতিক রূপান্তরের এমন এক পরাবাস্তব বা সুরিয়াল বিবরণ দিতেন যা শ্রোতার চেনা যুক্তি-বুদ্ধিকে এক নিমেষে অসাড় করে দিত।
আওয়াজ-খওয়ানি (Awaz-Khwani – কণ্ঠের মড্যুলেশন):
এটি দাস্তানগোর গলার স্বরের এক অবিশ্বাস্য ব্যায়াম। একজন দাস্তানগো কোনো বাদ্যযন্ত্র বা সাউন্ড এফেক্ট ছাড়াই, স্রেফ নিজের কণ্ঠনালী দিয়ে একই সাথে কোনো রাক্ষসের বজ্রগম্ভীর গর্জন, বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ, তলোয়ারের ঠোকাঠুকির ধাতব শব্দ, কিংবা কোনো মুমূর্ষু শিশুর ক্ষীণ কান্না ফুটিয়ে তুলতেন। এই কণ্ঠের কারিগরিই ছিল তাদের থিয়েটার খাড়া করার প্রধান খুঁটি।

আদি উৎস ও সৃষ্টি: আরবের ধুলোবালি থেকে পারস্যের রাজদরবার
দাস্তানগোই-এর ইতিহাস বলতে গিয়ে ভারতের অনেকে এই শিল্প সৃষ্টির পুরো কৃতিত্ব আরবদের দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, যেহেতু এই শিল্পের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটির নাম ‘দাস্তান-ই-আমির হামজা’, তাই এর জন্মও বুঝি আরবের মরুভূমিতে। কিন্তু আমি এর সাথে এক মত না। ইসলামিক বিজয়ের (Islamic Conquest) কারণে আমির হামজার চরিত্রটি হয়তো পরবর্তী সময়ে পারস্যে প্রবেশ করেছে, কিন্তু গল্প বলার যে ধ্রুপদী পারফর্মিং আর্ট—তার আসল জাদুকরী শেকড় প্রোথিত ছিল প্রাক-ইসলামিক পারস্যের (আধুনিক ইরান) মাটি ও সেন্ট্রাল এশিয়ার যাযাবর সংস্কৃতির গভীরে। আরবরা এসে সেই সুপ্রাচীন বহমান নদীতে কেবল নিজেদের একটা নতুন চরিত্র ভাসিয়ে দিয়েছিল মাত্র।
ইসলামের আবির্ভাবের শত শত বছর আগে, প্রাচীন পারস্যের পার্থিয়ান (Parthian) এবং সাসানীয় (Sasanian) রাজবংশের আমলে এক বিশেষ শ্রেণির চারণকবি বা গল্পকার ছিলেন, যাঁদের বলা হতো ‘গোসান’ (Gosan)।
এঁরাই ছিলেন মূলত পৃথিবীর আদি দাস্তানগো। এঁদের সামনে কোনো কস্টিউম বা বাদ্যযন্ত্র থাকত না। এঁরা রাজদরবারে এবং সাধারণ মানুষের আড্ডায় ঘুরে ঘুরে পারস্যের প্রাচীন রাজাদের বীরত্ব, দেব-দেবী, জিন-পরী এবং ভয়ংকর দানবদের সাথে মানুষের লড়াইয়ের গল্প শোনাতেন। প্রাচীন ফারসি ভাষায় গল্প বলার এই পুরো কাঠামোটাকেই বলা হতো ‘দাস্তান’। অর্থাৎ, ‘দাস্তান’ শব্দ, এর ভেতরের ফ্যান্টাসি এবং পরিবেশনার এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক রূপটি আরবের ইসলামের চেয়েও বহু পুরোনো এবং সম্পূর্ণ পারসিক ঐতিহ্য।
এমনকি ১০ম শতাব্দীতে কবি ফেরদৌসী যখন পারস্যের জাতীয় মহাকাব্য (শাহনামা) রচনা করেন, তিনিও আসলে প্রাচীন পারস্যের সেইসব ‘গোসান’দের মুখে প্রচলিত, হারিয়ে যাওয়া অজস্র আদি দাস্তানকে একত্রিত করে পদ্যের রূপ দিয়েছিলেন। শাহনামার মূল নায়ক ‘রোস্তম’-এর যে বীরত্বগাথা, তার ছদ্মবেশী লড়াই, কিংবা ড্রাগন ও জাদুকরদের ডেরায় হানা দেওয়ার গল্প—এগুলোই ছিল পৃথিবীর প্রথম ক্লাসিক দাস্তান চক্র।

আরবের কিসসা এবং ইতিহাসের মহা-ফিউশন
তাহলে আরবের ভূমিকাটা ঠিক কোথায়? প্রাক-ইসলামিক আরবের বেদুইন সংস্কৃতির মধ্যেও গল্প বলার একটা চল ছিল, যাকে তারা বলত ‘কিসসা-খওয়ানি’। মরুভূমির দীর্ঘ, একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর রাতগুলোকে একটু রাঙিয়ে তুলতে আরবরা খোলা আকাশের নিচে আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে পূর্বপুরুষদের তলোয়ারের লড়াইয়ের গল্প শুনত।
৭ম ও ৮ম শতাব্দীতে যখন আরবের ইসলামিক খিলাফতের বিস্তৃতির ফলে পারস্য বিজিত হয়, তখন আরবের সেই চড়া, সরল এবং যুদ্ধপ্রধান সংস্কৃতির সাথে পারস্যের হাজার বছরের পুরনো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, রাজকীয় এবং দার্শনিক ‘গোসান’ ট্রাডিশনের এক যুগান্তকারী মেলবন্ধন ঘটে। একে বলা যায় ইতিহাসের এক মহা-ফিউশন!
আরবের যুদ্ধজয়ের সুবাদে তাদের লোকনায়ক ‘আমির হামজা’র বীরত্বগাথাটি পারস্যে এসে পৌঁছায়। পারস্যের পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও দাস্তানগোরা আরবের এই নতুন চরিত্রটিকে লুফে নিলেন ঠিকই, কিন্তু তাকে তারা নিজেদের সেই প্রাচীন ‘রোস্তমের দাস্তানে’র ছাঁচে ঢেলে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজালেন। আরবের সেই সোজা-সাপ্টা তলোয়ারধারী আমির হামজা পারস্যের সংস্কৃতির ছোঁয়া লেগে কেমন যেন একটু সুফি ঘরানার, একটু দার্শনিক আর ভীষণ রকমের রোমান্টিক হয়ে উঠলেন।
পারসিক সংস্কৃতির এই জাদুকরী ছোঁয়াতেই দাস্তানের শরীরে যুক্ত হয় দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিপরীতধর্মী ধারণাগত স্তম্ভ:
‘রজম’ (Razm): যুদ্ধবিগ্রহ, তরবারির ঝনঝনানি, ঢালের মারপ্যাঁচ আর ঘোড়ার ক্ষুরের নিখুঁত ওজস্বী বর্ণনা। রক্ত গরম করা বীরত্বের অধ্যায়।
‘বজম’ (Bazm): রাজকীয় ভোজ, প্রেম, সুরা, সঙ্গীত, সুগন্ধি আতর ও উৎসবের মায়াবী আবহ। একদম ঠুমরি বা গজলের মতো নরম এক শৃঙ্গার রস।
এর সাথে পারস্যের উর্বর কল্পনা থেকে যুক্ত হলো ‘তিলিসম’ (Tilism – জাদুনগরী বা মায়াজাল) এবং ‘আইয়ারি’ (Aiyari – ছদ্মবেশ ধারণ ও গোয়েন্দাগিরি)। কাহিনীর ছকে আমির হামজার প্রধান সেনাপতি এবং বাল্যবন্ধু ‘আমর উমাইয়া’ (Amr Umayya) হয়ে উঠলেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম আইয়ার বা সুপার-স্পাই, যিনি নিমেষে যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারতেন। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী আমর উমাইয়ার আসল নাম আমর ইবনে উমাইয়া আল-দামরি। তিনি একজন সাহসী ট্র্যাকার বা গুপ্তচর থেকে পারস্যের দাস্তানগুলোতে হয়ে উঠলেন পৃথিবীর প্রথম ‘আইয়ার’ (Aiyar)। দাস্তানের গল্প অনুযায়ী, তিনি নিমেষে বুড়ো জাদুকর, সুন্দরী রমণী কিংবা শত্রুপক্ষের সৈন্যের রূপ ধারণ করতে পারতেন। তাঁর কাছে থাকত এক জাদুকরী ঝুলি বা ‘জাম্বিল’ (Zambil), যার ভেতর থেকে তিনি আস্ত একটা তাবু, দড়ি, কিংবা অজ্ঞান করার ওষুধ ‘বেহোশ-দারু’ বের করে ফেলতেন।
সুগন্ধি আতরে মোড়া পারস্যের রাজদরবারে ‘দাস্তানগো’রা এক বিশেষ এবং অত্যন্ত সম্মানিত আসন পেতে শুরু করলেন। সুতরাং, দাস্তানগোই-এর মূল ক্রেডিট এককভাবে আরবকে দেওয়া যায় না। আরব যদি এই শিল্পের শরীরে ‘রক্তমাংস’ জুগিয়ে থাকে, তবে পারস্য তাকে দিয়েছে ‘আত্মা’ আর ‘মস্তিষ্ক’। পারসিকরা দাস্তানের এই রাজকীয় কাঠামো তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু তার আসল রূপ-রং আর জৌলুস ফুটে উঠেছে আমাদের এই ভারতবর্ষে এসে। এই মাটিতে পা রেখেই দাস্তানগোই নামের আর্ট ফর্মটি তার পরম পূর্ণতা পেয়েছে।

দাস্তান যেমন হয়:
ধারণার জন্য নওয়াল কিশোরের উর্দু সংস্করণের দাস্তানের একটা অংশ তুলে দিলাম। এটা ‘তিলিসম-ই-হোশরুবা’র প্রথম খণ্ড থেকে আমর উমাইয়ার (আমর আইয়ার) একটি দাস্তানের অংশ। প্রথমে মূল উর্দু টেক্সটটি বাংলা হরফে (উর্দু উচ্চারণ ঠিক রেখে) দিলাম, তার নিচে দিয়ে দিলাম বাংলা অনুবাদ।
পর্ব – ১: আসরের সূচনা ও লাকাল জাদুকরের দম্ভ
উর্দু:
“রাভিয়ান-ই-কালাম অউরে নাজিলান-ই-সুখান ইয়ে কিসসা ইউঁ বয়ান করতে হ্যায়ঁ—
জব আমির-ই-নামদার, সাহিব-কিরান হযরত আমির হামজা আপনে লশকর-ই-ইসলাম কো লেকর তিলিসম-ই-হোশরুবা কে হুুদুদ মেঁ দাখিল হুয়ে, তো সারে জাদুগরোঁ কে দিল কাঁপ উঠে। শাহেনশাহ্-ই-তিলিসম, স্বঘোষিত খুদা আফরিয়াব কে হুকুম সে, আমির কা রাস্তা রোকনে কে লিয়ে এক জবরদস্ত অউরে খঁখখার জাদুগার আগে বাড়হা—জিসকা নাম থা লাকাল বিন হ্যারিস।
লাকাল কো আপনি কুওয়াত-ই-তিলিসম পর বড়া নায থা। ওহ্ আসমান কি তরফ হাত উঠাতা তো শ্যালোঁ কি বারিশ হোতি, অউরে যমিন পর প্যায়র মারতা তো যমিন ফট জাতি। উসনে আমির কে খ্যায়মে কে করীব এক অ্যায়সা তিলিসমি কোহ্রা (কুয়াশা) খাড়া কিয়া জিসমেঁ লশকর কা জো সিপাহী ভি জাতা, ওহ্ আপনা হোশ খো বৈঠতা।”
বাংলা অনুবাদ:
“ইতিহাসের লিপিকরেরা এবং শব্দের জাদুকরেরা এই কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেছেন—
যখন মহান কীর্তিমান আমির, সাহিব-কিরান হযরত আমির হামজা তাঁর ইসলামি সৈন্যদল নিয়ে জাদুনগরী হোশরুবার সীমানায় প্রবেশ করলেন, তখন সমস্ত জাদুকরদের বুক কেঁপে উঠল। জাদুনগরীর সম্রাট, নিজেকে ঈশ্বর দাবি করা আফরিয়াবের আদেশে আমিরের পথ রোধ করতে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়ংকর জাদুকর এগিয়ে এল—যার নাম ছিল লাকাল বিন হ্যারিস।
লাকালের নিজের জাদুকরী ক্ষমতার ওপর ছিল অগাধ অহংকার। সে আকাশের দিকে হাত তুললে আগুনের গোলার বৃষ্টি হতো, আর মাটিতে পা ঠুকলে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত। সে আমিরের শিবিরের কাছাকাছি এমন এক জাদুকরী কুয়াশার দেয়াল খাড়া করল, যার ভেতরে সৈন্যদলের যে সিপাহীই পা দিচ্ছিল, সে-ই নিজের চেতনা হারিয়ে ফেলছিল।”
পর্ব – ২: খাজা আমর উমাইয়ার প্রবেশ
উর্দু:
“ইয়ে দেখকর হযরত আমির নিহায়েত তশবীশ মেঁ মুবতিলা হুয়ে। উসী ওয়াক্ত, আসফ-উদ-দৌরান, সুলতান-উল-আইয়ারীন, খাজা আমর উমাইয়া হাজির-ই-খিদমত হুয়ে। উনহোনে আমির কো তসলিমাত আরয কি অউরে কহা, ‘অ্যায় আমির-ই-মোহতারাম! জহাঁ তলোয়ার কা জোর কাম নেহীঁ করতা, ওয়াহাঁ ইস নাচীয আমর কা দমাগ কাম করতা হ্যায়। আপ ইতমিডান রখখেঁ, আজ ইস জাদুগার কা তিলিসম খাক মেঁ মিলা দুঙ্গা।’
আমর নে এক লহমে মেঁ আপনা ‘জাম্বিল’ সমহালা। ওহ্ জাম্বিল কোই আম থ্যায়লা না থা, উসমেঁ এক পুরী দুনিয়া সমা সকতী থী। আমর নে লাকাল কে এক খাস শাগির্দ, ‘হিজাম’ কা রূপ ইখতিয়ার কিয়া। উসী কি তর্হ পোশাক পহনী, উসী কি তর্হ বোলনে কা আন্দায আপনায়া, অউরে লাকাল জাদুগার কে ডেরে পর যা পহুঁচো।”
বাংলা অনুবাদ:
“এই অবস্থা দেখে হযরত আমির অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, সময়ের সেরা চতুর, আইয়ারদের সুলতান খাজা আমর উমাইয়া তাঁর সামনে এসে হাজির হলেন। তিনি আমিরকে কুর্নিশ জানিয়ে আরজ করলেন, ‘হে সম্মানিত আমির! যেখানে তলোয়ারের জোর কাজ করে না, সেখানে এই অধম আমরের মগজ কাজ করে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আজ এই জাদুকরের দম্ভ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব।’
আমর এক পলকে তাঁর ‘জাম্বিল’ (জাদুর ঝুলি) হাতড়ে নিলেন। সেই ঝুলি কোনো সাধারণ থলে ছিল না, তার ভেতরে আস্ত এক দুনিয়া লুকিয়ে রাখা যেত। আমর নিমেষের মধ্যে লাকালের এক বিশ্বস্ত শিষ্য ‘হিজাম’-এর রূপ ধারণ করলেন। অবিকল তার মতো পোশাক পরলেন, তার মতো করে কথা বলার ঢং নিলেন এবং লাকাল জাদুকরের আস্তানায় গিয়ে হাজির হলেন।”
পর্ব – ৩: লাকালের দরবারে ছদ্মবেশী আমর
উর্দু:
“আমর নে লাকাল কে সামনে জাকর যমিন পর সর রখা অউরে নিহায়েত খওফজাদা আওয়ায মেঁ কহা, ‘অ্যায় ওস্তাদ-ই-মোহতারাম! অ্যায় শাহেনশাহ্-ই-আফলাক! গজব হো গয়া! আমির হামজা কে লশকর নে এক অ্যায়সা পাল্টা মন্ত্র পড়া হ্যায় কি হামারী হী তিলিসমি দিওয়ার আব হামারে খিলাফ ঘূম গয়ী হ্যায়! দেখিয়ে, মেরা জিসম ক্যায়সে নীলা পড় রাহা হ্যায়!’
লাকাল জাদুগার আপনে তখত-ই-তিলিসম পর বৈঠা থা। উসনে গুসসে সে আঁখেঁ বড়ী কীঁ অউরে গর্জা, ‘ক্যা কহা হিজাম? কিস কী ইতনী মজাল জো লাকাল কে তিলিসম কো তূড়ে? আমির হামজা কা লশকর ক্যা অব তক জিন্দা হ্যায়?'”
বাংলা অনুবাদ:
“আমর লাকালের সামনে গিয়ে মাটিতে মাথা ঠেকালেন এবং অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বললেন, ‘হে সম্মানিত ওস্তাদ! হে আকাশের সম্রাট! এক মস্ত বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে! আমির হামজার সৈন্যরা এমন এক পাল্টা মন্ত্র পড়েছে যে, আমাদের নিজেদের জাদুকরী দেয়াল এখন উল্টো আমাদের দিকেই ঘুরে গেছে! দেখুন ওস্তাদ, আমার শরীর কেমন নীল হয়ে যাচ্ছে!’
লাকাল জাদুকর তখন তার জাদুর সিংহাসনে বসে ছিল। সে রাগে চোখ বড় বড় করল এবং গর্জে উঠল, ‘কী বললি হিজাম? কার এত বড় দুঃসাহস যে লাকালের জাদুর দেয়াল ভাঙে? আমির হামজার সৈন্যরা কি তবে এখনো বেঁচে আছে?'”
পর্ব – ৪: ‘বেহোশ-দারু’ বা বিষাক্ত পানীয়র ফাঁদ
উর্দু:
“আমর নে হাত জোড়কর কহা, ‘জী ওস্তাদ! উনহোনে এক অ্যায়সী হাওয়া ছৌড়ী হ্যায় জো সারে তিলিসম কো নিগল রহী হ্যায়। অ্যায় ওস্তাদ, অগর আপনে অভী ইস সুরহী কে পানি পর আপনে খাস ইসম-ই-আজম কা দম না কিয়া, তো কুছ না বচেগা।’
আমর নে এক তিলিসমি সুরহী লাকাল কি তরফ বাড়হা দী। উস সুরহী মেঁ কোই জাদু কা পানি না থা, বলকি আমর কা তৈয়ার কিয়া হুয়া ত্যীয ‘বেহোশ-দারু’ থা। লাকাল নে গুসসে মেঁ আপনে হোশ খো দিয়ে থো। উসনে কহা, ‘লা হামেঁ ওহ্ সুরহী! ম্যাঁ অভী আপনে মন্ত্র সে হামজা কে লশকর কো খাক করতা হুঁ!’
লাকাল নে সুরহী ছীন লী অউরে এক হী সাঁস মেঁ সানি পীন গয়া।”
বাংলা অনুবাদ:
“আমর হাত জোড় করে বললেন, ‘হ্যাঁ ওস্তাদ! তারা এমন এক বাতাস ছেড়েছে যা আমাদের পুরো জাদুনগরীকে গিলে খাচ্ছে। হে ওস্তাদ, আপনি যদি এখনই এই পাত্রের পানির ওপর আপনার বিশেষ ‘ইসম-ই-আজম’ (সবচেয়ে শক্তিশালী মূল মন্ত্র) পড়ে ফুঁ না দেন, তবে আমাদের আর কিছুই বাকি থাকবে না।’
আমর একটি জাদুকরী পাত্র লাকালের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সেই পাত্রে কোনো জাদুর পানি ছিল না, বরং ছিল আমরের নিজের তৈরি করা তীব্র ‘বেহোশ-দারু’ বা অজ্ঞান করার ওষুধ। লাকাল রাগের মাথায় তার নিজের বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল। সে বলল, ‘দে ওটা আমার কাছে! আমি এখনই আমার মন্ত্র দিয়ে হামজার পুরো লশকরকে ছাই করে দিচ্ছি!’
লাকাল পাত্রটি একরকম কেড়ে নিল এবং এক নিশ্বাসেই ভেতরের সমস্ত পানি গিলে ফেলল।”
পর্ব – ৫: লাকালের পতন এবং আমরের আসল রূপ
উর্দু:
“এক লহমা… দো লহমে… তিন লহমে!
পাস পেটে যাতে হী লাকাল জাদুগর কা সর চক্কর খানে লাগা। উসকী আঁখোঁ কে সামনে সারে তিলিসম কে চেরাগ বুঝনে লেগে। উসকে হাথ সে যমির পর জাদুই লাঠি ছুট গয়ী। ওহ্ লড়খড়াতে হুয়ে বোলা, ‘হিজাম… ইয়ে তুনে ক্যা দিয়া… মেরা সরা জিসম পাত্তর হো রাহা হ্যায়…’
অউরে ধড়াম সে লাকাল যমিন পর গিড় পড়া!
আমর নে এক ঝটকে মেঁ আপনা ভেঁস উতার ফেঁকা। ওহ্ খিলখিলা কর হাসা অউরে বোলা, ‘অ্যায় নাদান জাদুগর! তেরা জাদু আসমান পর চালতা হোগা, পর আরবের আমর কা দমাগ যমিন পর চালতা হ্যায়!'”
বাংলা অনুবাদ:
“এক পলক… দুই পলক… তিন পলক!
পানীয়টি পেটে যেতেই জাদুকর লাকালের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তার চোখের সামনে জাদুনগরীর সমস্ত চেরাগ যেন একে একে নিভে যেতে লাগল। তার হাত থেকে জাদুর লাঠিটি মাটিতে খসে পড়ল। সে টলতে টলতে বলল, ‘হিজাম… এ তুই কী দিলি… আমার সারা শরীর যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে…’
এবং ধড়াম করে লাকাল মাটির ওপর আছড়ে পড়ল!
আমর এক ঝটকায় নিজের ছদ্মবেশ ছুঁড়ে ফেললেন। তিনি খিলখিল করে হেসে উঠলেন এবং বললেন, ‘ওরে অবোধ জাদুকর! তোর জাদু হয়তো আকাশে চলে, কিন্তু আরবের আমরের মগজ চলে এই মাটির বুকে!'”
পর্ব – ৬: জাদুর মালামাল লুট ও কিসসার সমাপ্তি
উর্দু:
“আমর নে ওয়াক্ত জায়া না কিয়া। উসনে লাকাল কি কমর সে জাদুই কোঁড়া (চাবুক), উসকে গালে সে তিলিসমি মানি অউরে উসকে সারে জওয়াহেরাত খীঁচ লিয়ে। ইন সভি চিজোঁ কো আমর নে আপনে উস ‘জাম্বিল’ মেঁ ডাল দিয়া জিসকা কোই কিনারা না থা। ফির লাকাল কি দাড়ি কো এক হী ঝটকে মেঁ খঞ্জর সে কাট দিয়া অউরে ওয়াহাঁ সে হাওয়া হো গয়ে।
লাকাল কা তিলিসম টূঁট গয়া, অউরে লশকর-ই-ইসলাম মেঁ ফাতাহ্ কা নালকা বোলা।
কিসসা খতম, রাভি চুপ!”
বাংলা অনুবাদ:
“আমর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না। তিনি লাকালের কোমর থেকে জাদুর চাবুক, তার গলা থেকে জাদুকরী মণি এবং তার সমস্ত জহরত টেনে খুলে নিলেন। এই সব জিনিস আমর তাঁর সেই ‘জাম্বিল’ বা ঝুলির ভেতর পুরে দিলেন, যার কোনো শেষ ছিল না। তারপর লাকালের দাড়িগুলো খঞ্জর দিয়ে এক ঝটকায় কেটে নিয়ে তিনি সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেলেন।
লাকালের জাদুর মায়াজাল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং ইসলামি লশকরে বিজয়ের জয়ধ্বনি ধ্বনিত হলো।
গল্প শেষ, গল্পকার এবার নীরব!”

খাইবার পাস পেরিয়ে হিন্দুস্তানে: মুঘল আমল
১১শ ও ১২শ শতাব্দীর দিকে মাহমুদ গজনভি আর দিল্লি সালতানাতের হাত ধরে এই গল্প বলার চলটা খাইবার পাস পার হয়ে প্রথম আমাদের এই উপমহাদেশে এসে পৌঁছায়। হিন্দুস্তানে পা রেখেই এই শিল্পটা যেন তার আসল চারণভূমি খুঁজে পেয়েছিল। কারণ, এ মাটির নিজেরই তো গল্প আর মহাকাব্যের অভাব ছিল না—রামায়ণ, মহাভারত থেকে শুরু করে পঞ্চতন্ত্রের মতো কিসসার এক বিশাল খনি আগে থেকেই এখানে তৈরি ছিল। ফলে পারস্যের এই গল্পবলার ঢংটি এদেশের উর্বর মাটিতে খুব সহজেই শিকড় গেঁড়ে বসে।
আকবরের দরবার এবং ‘হামজানামা’
দাস্তানগোই-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড়টা আসে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। আকবর নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন, কিন্তু গল্প শোনার প্রতি তাঁর একটা তীব্র নেশা ছিল। প্রতি রাতে তিনি নিয়ম করে ওস্তাদ দাস্তানগোদের মুখ থেকে আমির হামজার কিসসা শুনতেন।
গল্পের এই ফ্যান্টাসি আকবরকে এতটাই টেনেছিল যে, তিনি তাঁর রাজকীয় চিত্রশালাকে নির্দেশ দেন পুরো কাহিনীটাকে ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় ইতিহাসের বিখ্যাত সচিত্র গ্রন্থ ‘হামজানামা’।
মীর সাইয়্যিদ আলী আর আবদুস সামাদ—এই দুজন পারসিক মাস্টারের তত্ত্বাবধানে প্রায় পঞ্চাশ জনেরও বেশি ভারতীয় চিত্রশিল্পী টানা ১৫ বছর ধরে কাজ করেছিলেন। ক্যানভাসের মতো বড় বড় কাপড়ের পাতায় তাঁরা প্রায় চৌদ্দশোটি ছবি আঁকেন। পাতার একদিকে থাকত যুদ্ধ, জাদুনগরী বা দানবদের রঙিন ছবি, আর উল্টোদিকে ফারসি হরফে লেখা থাকত মূল গল্পটা।
আকবরের দরবারে মীর মুহাম্মদ রেযা কিংবা মির্জা কাসিমের মতো দাস্তানগোরা আসরে বসে এই ছবিগুলো দরবারের সবাইকে দেখাতেন আর মুখে কিসসা শোনাতেন। স্রেফ কান দিয়ে গল্প শোনার বাইরেও, ছবি আর শব্দের মেলবন্ধনে এভাবেই ভারতবর্ষে দাস্তানগোই এক অন্য মাত্রা পেতে শুরু করে।

রাজদরবারে দাস্তানগোদের স্থায়ী আসন: রাজা-মহারাজাদের মনস্তত্ত্ব
মুঘল সাম্রাজ্য যখন আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে আসছিল, তখন ভারতের আঞ্চলিক স্বাধীন রাজ্যগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। হায়দ্রাবাদের নিজাম, বাংলার নবাব কিংবা আওধের (লখনউ) শাসকেরা তখন নিজেদের মতো করে দরবার সাজাতে শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো, প্রায় প্রতিটি দরবারেই দাস্তানগোদের জন্য একটা স্থায়ী আসন বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রাজা-বাদশাহরা কেন এত বিপুল অর্থ খরচ করে স্রেফ গল্প বলার জন্য মানুষ পুষতেন? এর পেছনে পরিষ্কার কিছু মনস্তাত্ত্বিক আর রাজনৈতিক কারণ ছিল।
প্রথমত, এটি ছিল পুরোপুরি ক্ষমতার দেখনদারি আর রুচির প্রকাশ। সেই আমলে দরবারে একজন নামী দাস্তানগো থাকা মানেই ছিল সেই শাসকের সাহিত্যিক আভিজাত্যের প্রমাণ। জাঁকজমকপূর্ণ হাতি, দামি হীরা-জহরত যেমন রাজার ক্ষমতা দেখাত, ঠিক তেমনি একজন প্রতিভাবান দাস্তানগো আসরে থাকা মানেই ছিল প্রতিবেশীদের কাছে নিজের ওজন বাড়িয়ে নেওয়া।
দ্বিতীয় কারণটি ছিল মনস্তাত্ত্বিক উদ্দীপনা। দাস্তানের ‘রজম’ বা যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণগুলো এত চড়া আর ওজস্বী হতো যে, তা শুনলে রক্ত গরম হয়ে যেত। রাজারা প্রায়ই যুদ্ধের আগে কিংবা সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা করতে দাস্তানগোদের ডেকে আমির হামজার তরবারি চালানোর গল্প শুনতেন। এটি তাঁদের এক ধরণের অবচেতন সাহস জোগাত।
আর শেষ কারণটি হলো স্রেফ একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচা, যাকে আমরা এখন ‘এস্কেপিজম’ বলি। সারাদিনের রাজনীতি, প্রাসাদের ভেতরের ষড়যন্ত্র আর যুদ্ধের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে রাজারা রাতের বেলা দাস্তানের ‘তিলিসম’ বা জাদুনগরীর রূপকথায় ডুব দিতেন। বাস্তব দুনিয়ার চাপ থেকে সাময়িকভাবে পালিয়ে বাঁচার জন্য এটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে রঙিন এক জানালা।

লখনউয়ের স্বর্ণযুগ: আমির হামজা থেকে নতুন দাস্তানের জন্ম
১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীর দিকে দিল্লির মুঘল ক্ষমতা যখন একে একে ভেঙে পড়ছিল, তখন দাস্তানগোই-এর আসল কেন্দ্র হয়ে ওঠে লখনউ। নবাব আসফ-উদ-দৌলা আর পরবর্তী সময়ে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের আমলে এই গল্প বলার চলটা লখনউতে এসে একদম অন্য একটা রূপ নেয়।
লখনউয়ের দাস্তানগোরা খুব দ্রুতই একটা জিনিস বুঝতে পেরেছিলেন—শুধু আরবের সেই পুরোনো আমির হামজার গল্প শুনিয়ে লখনউয়ের এই বিলাসী আর খুঁতখুঁতে শ্রোতাদের খুব বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। তাই তাঁরা আমির হামজার মূল কাঠামোটা ঠিক রাখলেন, কিন্তু নিজেদের উর্বর কল্পনা খাটানো শুরু করলেন। এর ফলে আমির হামজার মূল কাহিনীর ভেতর থেকেই জন্ম নিতে লাগল একদম নতুন নতুন উপশাখা বা যেগুলোকে বলা হতো ‘দফতর’।
তিলিসম-ই-হোশরুবা
এই সময়েই তৈরি হয় দাস্তান সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর জনপ্রিয় মহাকাব্য—‘তিলিসম-ই-হোশরুবা’। সহজ বাংলায় এই নামের অর্থ দাঁড়ায়, ‘যে জাদুজগৎ মানুষের চেতনা হরণ করে’। লখনউয়ের দুই নামজাদা দাস্তানগো—মুহাম্মদ হুসাইন জাহ আর আহমেদ হুসাইন কামার মিলে এই বিশাল গল্পচক্র খাড়া করেছিলেন।
হোশরুবায় এসে গল্পটা আর আমির হামজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। এর মূল নায়ক হয়ে উঠলেন আমির হামজার নাতি রাজপুত্র আসাদ এবং তাঁর সেই চতুর সঙ্গী আমর উমাইয়া। তাঁদের লড়াইটা ছিল হোশরুবা নামের এক জাদুনগরীর সম্রাট আর নিজেকে ঈশ্বর দাবি করা খলনায়ক ‘আফরিয়াব’-এর বিরুদ্ধে। এই দাস্তানে জাদুর যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, তা কল্পনার দিক থেকে সমসাময়িক যেকোনো পশ্চিমা ফ্যান্টাসি বা রূপকথাকে টেক্কা দেওয়ার মতো। লখনউয়ের অলিগলি, চকবাজার কিংবা কফি হাউসগুলোতে তখন দিন-রাত মানুষ শুধু এই হোশরুবার জাদুর গল্প শোনার জন্যই ভিড় করত।

মৌখিক রূপ থেকে কাগজের বুকে: মুদ্রণ সংস্কৃতির প্রভাব
উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দাস্তান ছিল পুরোপুরি একটি মৌখিক শিল্প। দাস্তানগোরা ওস্তাদ-শাগির্দ পরম্পরায় এই লাখ লাখ লাইনের গল্প স্রেফ নিজেদের স্মৃতিতে ধরে রাখতেন। কিন্তু প্রিন্টিং প্রেসের আগমন এই চেনা ধারাটিকে চিরতরে বদলে দিল।
ঠিক এই সময়েই ইতিহাসে প্রবেশ করেন এক দূরদর্শী মানুষ—মুন্সি নওয়াল কিশোর। ১৮৫৮ সালে তিনি লখনউতে প্রতিষ্ঠা করেন এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ‘নওয়াল কিশোর প্রেস’। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দাস্তানের এই বিশাল মৌখিক সম্পদ যদি কাগজের বুকে লিখে রাখা না হয়, তবে ওস্তাদদের মৃত্যুর সাথে সাথে এই অমূল্য ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যাবে।
৪৬ খণ্ডের বিশাল সংকলন
নওয়াল কিশোর এই কাজের জন্য লখনউয়ের তিন বিখ্যাত দাস্তানগো—সৈয়দ মুহাম্মদ আমীর আলী, মুহাম্মদ হুসাইন জাহ আর আহমেদ হুসাইন কামারকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করেন। তাঁদের কাজ ছিল মুখে মুখে দাস্তানগুলো বলে যাওয়া, আর প্রেসের লিপিকাররা তা লিখে রাখতেন।
১৮৮১ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে নওয়াল কিশোর প্রেস থেকে ‘দাস্তান-ই-আমির হামজা’-র যে সংস্করণটি বের হয়েছিল, তা ছিল আয়তনের দিক থেকে এক কথায় বিশাল। মোট ৪৬টি বড় বড় খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয়, যার প্রতি খণ্ডে ছিল প্রায় এক হাজার করে পাতা! পৃথিবীর ইতিহাসে একক কোনো ফ্যান্টাসি বা মহাকাব্যের এত বড় লিখিত সংস্করণ আর দ্বিতীয়টি নেই।
এই ছাপানো বইগুলো খুব দ্রুতই সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। এর ফলে গল্প শোনার ঢংটাতেও একটু বদল এল। যারা নিজেরা পড়তে পারতেন না, তাঁরা বৈঠকখানায় কোনো একজনকে বসিয়ে উচ্চস্বরে এই বই পড়াতেন আর বাকিরা চারপাশ থেকে গোল হয়ে বসে আগের মতোই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই কিসসা শুনতেন।

প্রদীপের শেষ আলো এবং আকস্মিক পতন
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বিশেষ করে ১৯২০-এর দশকের পর থেকে দাস্তানগোই-এর আকাশে এক ধরণের কালবৈশাখীর মেঘ জমতে শুরু করে। যে শিল্পটি শত শত বছর ধরে মানুষের মগজ আর মন শাসন করেছিল, তা প্রায় এক-দেড় দশকের মধ্যে কেমন যেন নিঃশব্দে ফুরিয়ে গেল। এই আকস্মিক আর মন খারাপ করা পতনের পেছনে পরিষ্কার কিছু কারণ ছিল।
প্রথম ধাক্কাটা আসে আধুনিক উপন্যাসের হাত ধরে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে এদেশের নতুন প্রজন্ম আস্তে আস্তে আধুনিক ‘নভেল’ বা উপন্যাস পড়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। দাস্তানের সেই অন্তহীন, অবাস্তব জাদুজগতের চেয়ে মানুষ তখন উপন্যাসের ভেতরের চেনা সামাজিক বাস্তবতার গল্পগুলোকে বেশি আপন মনে করতে শুরু করে। মৌখিক গল্পের জায়গাটা দখল করে নেয় ছাপানো বইয়ের পাতা।
তবে এই শিল্পের বুকে আসল মরণকামড়টা বসিয়েছিল সিনেমা। ১৯৩১ সালে যখন ভারতে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’ মুক্তি পেল, তা দাস্তানগোই-এর দুনিয়াটাকে ওলটপালট করে দিল। যে যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা কিংবা জাদুনগরীর দৃশ্য মানুষ এতকাল শুধু দাস্তানগোর মুখে শুনে মনে মনে কল্পনা করত, তা এখন রূপালী পর্দায় সরাসরি চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। সস্তা টিকিটের এই নতুন চাক্ষুষ বিনোদনের কাছে দাস্তানের আসরগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই মার খেয়ে গেল।
এর সাথে যুক্ত হয়েছিল পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ আর তার আগে-পরে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ফলে রাজা-নবাবদের পুরোনো দরবারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দাস্তানগোদের রুটি-রুজির যে প্রধান জায়গা, তা রাতারাতি হারিয়ে যায়। পেটের দায়ে এই রাজকীয় শিল্পীরা তখন অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন।
লখনউ ঘরানার শেষ মহান দাস্তানগো ছিলেন ওস্তাদ মীর বাকের আলী। ১৯২৮ সালে দিল্লির জামে মসজিদের সিঁড়ির কাছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন মনে করা হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে গল্প বলার এই অনন্য ট্রাডিশনটি বুঝি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল।

পুনরুত্থান: ২১ শতকের রিভাইভাল
প্রায় আশি বছর ধরে দাস্তানগোই শিল্পটি কেবল লাইব্রেরির ধুলোবালি মাখা নওয়াল কিশোর প্রেসের সেই ৪৬ খণ্ডের বইয়ের ভেতরেই একরকম বন্দি হয়ে ছিল। মানুষ ভুলেই গিয়েছিল এই শিল্পটির কথা। ২০০৫ সালে এসে এই মৃতপ্রায় শিল্পটি আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

ফারুকী দ্বয়ের হাত ধরে নতুন করে ফেরা
এই পুনরুত্থানের প্রধান তাত্ত্বিক নায়ক ছিলেন ভারতের প্রখ্যাত উর্দু কবি, সমালোচক ও গবেষক শামসুর রহমান ফারুকী। তিনি বছরের পর বছর ধরে সেই ৪৬ খণ্ডের দাস্তান নিয়ে গবেষণা করেন এবং এর ভেতরের ধ্রুপদী সাহিত্যিক টেক্সটগুলোকে উদ্ধার করে চার খণ্ডের এক বিশাল গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক কাজকে থিয়েটারের মঞ্চে জীবন্ত রূপ দেওয়ার সাহস করেন তাঁরই ভাতিজা – তরুণ পরিচালক ও লেখক মাহমুদ ফারুকী।
২০০৫ সালে দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারে মাহমুদ ফারুকী এবং তাঁর সেসময়ের মূল পারফর্মিং পার্টনার দানিশ হুসাইন দীর্ঘ আশি বছর পর ভারতে প্রথম পেশাদার দাস্তানগোই-এর একটি লাইভ পারফরম্যান্স করেন। সাদা কুর্তা-পায়জামা পরে, সুগন্ধি আতর মেখে মেঝের গদিতে হাঁটু গেড়ে বসে দুই তরুণ যখন সেই পুরোনো কিসসা শুরু করলেন, দিল্লির আধুনিক থিয়েটার-দর্শকেরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।

বদলে যাওয়া আঙ্গিক এবং নতুন শিল্পীবৃন্দ
তবে মাহমুদ ফারুকী এই শিল্পকে কেবল পুনর্জন্মই দেননি, তিনি একে আধুনিক মঞ্চের উপযোগী করতে বেশ কিছু নতুন রূপান্তরও এনেছেন। প্রাচীনকালে দাস্তানগোই ছিল একজন মানুষের একক পারফরম্যান্স। কিন্তু ফারুকী এটিকে আরও গতিশীল আর ড্রামাটিক করতে দু’জন দাস্তানগোর মুখোমুখি বসার একটি চমৎকার ‘দ্বৈত’ (Duet) ফরম্যাট তৈরি করেন।
এর পাশাপাশি তাঁর গড়া ‘দাস্তানগোই কালেক্টিভ’-এর মাধ্যমে একঝাঁক নতুন প্রতিভাবান শিল্পী এই মঞ্চে এসে দাঁড়ান। প্রাচীনকালে দাস্তানগোই শুধু পুরুষদের একচেটিয়া শিল্প থাকলেও, এই আধুনিক পুনরুত্থানে নারীরাও সমান তালে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক আনুশকা রিজভী নিজে দাস্তানগো হিসেবে পারফর্ম করার পাশাপাশি এই আর্টের স্ক্রিপ্ট রাইটিং আর ডিরেকশন করেন। তার পাশাপাশি পুনম গিরধানীর মতো শক্তিশালী নারী দাস্তানগোরা শিশুদের জন্য তৈরি দাস্তান (যেমন দাস্তান অ্যালিস কি) কিংবা বুদ্ধের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি আধুনিক দাস্তান নিয়ে দেশ-বিদেশে নিয়মিত পারফর্ম করতে শুরু করেন।
এই দলেরই আরেকজন অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী দাস্তানগো হলেন নাদিম শাহ, যিনি তাঁর দুর্দান্ত কণ্ঠ আর অভিব্যক্তির জন্য দারুণ পরিচিত। আর নিখুঁত উর্দু ও হিন্দি উচ্চারণে দাস্তান পরিবেশনের জন্য এই সমসাময়িক মঞ্চে রানা প্রতাপ সেঙ্গারের নামটিও বেশ উজ্জ্বল। পরবর্তীতে দানিশ হুসাইন যখন নিজের আলাদা থিয়েটার গ্রুপ ‘The Hoshruba Repertory’ তৈরি করেন, তখন তিনিও এই ধারাকে ভারতজুড়ে আরও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন।

সমসাময়িক বিষয়বস্তু এবং সীমানা পেরিয়ে
আধুনিক দাস্তানগোরা শুধু আমির হামজা বা হোশরুবার সেই পুরোনো জাদুজগতেই আটকে থাকেননি। সমসাময়িক কবি ও লেখক রাজেশ কুমারের মতো মানুষেরা এই আঙ্গিক ব্যবহার করে নতুন নতুন দাস্তান লিখতে শুরু করলেন। ফলে মঞ্চে উঠে এল মহাত্মা গান্ধী, সত্যজিৎ রায়, বি আর আম্বেদকর কিংবা সাদাত হাসান মন্টোর জীবন ও গল্প। এমনকি সমসাময়িক কর্পোরেট জীবনের ট্র্যাজেডি কিংবা কারগিল যুদ্ধের মতো বাস্তব ঘটনাও এখন দাস্তানের ঢঙে বলা হচ্ছে।
এই আন্দোলনের হাওয়া খুব দ্রুতই ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানে এই পুনরুত্থানের হাল ধরেন ফাওয়াদ খান এবং নাজিয়া কানওয়াল। করাচি আর লাহোরের আধুনিক তরুণদের কাছে তাঁরা ‘কিসসা খওয়ানি’র সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন করে চেনাচ্ছেন।
বাংলাদেশে অবশ্য যথারীতি তেমন বড় কোনো আয়োজন এখনো চোখে পড়েনি। যদিও মুস্তফা জামান আব্বাসী কিংবা আমাদের দেশের জ্যেষ্ঠ আবৃত্তিশিল্পীরা পুঁথিপাঠ আর কিসসা-গাথার এই সমান্তরাল ঐতিহ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় তাত্ত্বিক আলোচনা করে গেছেন। তবে বর্তমানের কিছু তরুণ আবৃত্তিশিল্পী ও নাট্যকর্মী (যেমন তিলোত্তমা শিকদার কিংবা মোরশেদ মিশুর মতো তরুণেরা) মুখোমুখি বসে স্রেফ কথা দিয়ে থিয়েটার করার এই ফর্মটি নিয়ে নতুন করে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করছেন; যদিও সেগুলো সরাসরি দাস্তানগোই-অনুপ্রাণিত নয়। আমাদের এখানে মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ কিংবা বাংলার নিজস্ব লোকগাথাগুলোকে কিন্তু এই চেনা ঢঙে দারুণভাবে পরিবেশন করা যেতেই পারে।

কথার মৃত্যু নেই
দাস্তানগোই আমাদের আসলে একটা খুব জরুরি সত্য মনে করিয়ে দেয়—মানুষের তৈরি আধুনিক প্রযুক্তি, সিনেমা বা গ্যাজেট যতই উন্নত হোক না কেন, সামনাসামনি বসে মানুষের মুখে গল্প শোনার যে আদিম আনন্দ, তার কোনো বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। স্রেফ মুখের কথা আর গলার আওয়াজ দিয়ে এক অন্য দুনিয়ার মায়াজাল তৈরি করার এই ধ্রুপদী শিল্পটি আরব থেকে পারস্য, পারস্য থেকে লখনউ হয়ে আজ আমাদের আধুনিক অডিটোরিয়াম কিংবা ড্রয়িংরুমে এসে পৌঁছেছে।
সময়ের সাথে সাথে দাস্তানগোরা বদলে গেছেন, রাজদরবারের সেই চেনা জৌলুস হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের কল্পনার আকাশে আমির হামজা আর আমর উমাইয়ারা আজও তাঁদের জাদুর ঝুলি আর তরবারি নিয়ে ঠিকই বেঁচে আছেন। কারণ, দুনিয়া যতই যান্ত্রিক হোক না কেন, গল্প শোনার তৃষ্ণা মানুষের কোনোদিন ফুরাবে না।
সবার জীবন গল্পে আর সুরেলা হোক।
আরও দেখুন:
