দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এর জন্মদিনে শ্রদ্ধা । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে ক’জন ক্ষণজন্মা পুরুষ উনিশ শতকের শেষার্ধ এবং বিশ শতকের প্রারম্ভে বাঙালির মনন ও জাতীয়তাবোধকে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩) তাঁদের অন্যতম। ১৯ জুলাই ১৮৬৩ সালে কৃষ্ণনগরে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব কেবল একজন কবি বা নাট্যকারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির এক অগ্রগামী সংস্কারক। তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি ও গভীরতা বাঙালির প্রগতিশীল যাত্রাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

নাট্য সাহিত্যে নবজাগরণ: ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রধান কৃতিত্ব নিহিত রয়েছে তাঁর ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকগুলোতে। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন বাঙালি জাতি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে নিজস্ব পরিচয় খুঁজছিল, তখন তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে চরিত্রদের তুলে এনে মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিলেন।

  • ঐতিহাসিক নাটক: ‘মেবার পতন’, ‘শাহজাহান’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ কিংবা ‘নূরজাহান’—নাটকগুলোতে তিনি শুধু ইতিহাসকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেননি, বরং সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের আলোকে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর নাটকের সংলাপের তীক্ষ্ণতা এবং নাটকীয় দ্বন্দ্ব বাংলা নাট্যমঞ্চে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করে।
  • সামাজিক ও ব্যঙ্গাত্মক নাটক: প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তিনি সামাজিক কুসংস্কার, ভণ্ডামি ও জাতপাত প্রথার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। ‘পরপারে’ বা ‘সামাজিক প্রহসন’ গুলোর মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতাকে তীব্রভাবে আঘাত করেন।

সুরের ভুবনে ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন

রবীন্দ্র সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সুরের জগতে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা আজ ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে সুপরিচিত।

  • বিলেতে কৃষিবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুবাদে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুর ও চলন সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। বাংলা গানে প্রথম সফলভাবে পাশ্চাত্য সুরের (বিশেষ করে স্কটিশ ও ইংরেজি লোকগীতি এবং মার্চের সুর) চলন ও তালের সার্থক প্রয়োগ ঘটান তিনি।
  • তাঁর রচিত ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ বা ‘বঙ্গ আমার! জননী আমার! ধাত্রী আমার! আমার দেশ!’—গানগুলো কেবল সঙ্গীত নয়, বাঙালির চিরন্তন দেশপ্রেমের মন্ত্র। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান বাঙালিকে অসীম সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

 

বাঙালির প্রগতিশীল মনন ও ধর্মনিরপেক্ষতায় অবদান

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চিন্তা ছিল সংস্কারমুক্ত ও প্রগতিশীল। তৎকালীন বাংলার সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে যখন নানামুখী গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন মাথাচাড়া দিচ্ছিল, তখন তিনি তাঁর লেখনীতে এক উদার ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির কথা বলেছেন।

১. উদার জাতীয়তাবাদ: তাঁর নাটকে হিন্দু বা মুসলিম কোনো একক সম্প্রদায়কে মহিমান্বিত করা হয়নি, বরং মানুষের দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মেবার পতন নাটকে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

২. আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি: সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিলেত প্রবাসের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ থেকে আলাদা করেছিল। তিনি অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

১৭ মে ১৯১৩ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই মহীরুহের প্রয়াণ ঘটে। স্বল্পায়ু জীবনেও তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে যা দিয়ে গেছেন, তা শতবর্ষ পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট যখনই ঘনীভূত হয়েছে, দ্বিজেন্দ্রলালের গান ও নাটক তাকে পথের দিশা দেখিয়েছে।

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মজয়ন্তীতে আমাদের নিবেদন—তিনি কেবল অতীতের এক স্মর্তব্য নাম নন, বরং আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি সমাজ বিনির্মাণের এক শাশ্বত প্রেরণা। যুক্তিবাদ, দেশপ্রেম এবং প্রগতির যে মশাল তিনি জ্বেলে গিয়েছিলেন, আজকের দিনে তার চর্চা আরও বেশি প্রয়োজন।

বিনম্র শ্রদ্ধা, হে সুর ও নাট্যের বরপুত্র!

Leave a Comment