দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আধুনিক বিশ্ব ইতিহাস এবং সমকালীন পপ-কালচারের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা কেবল বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে ভূ-রাজনীতি, বিশ্বজনমত এবং মানবতার গতিপথকে নতুন রূপ দেয়। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ (The Concert for Bangladesh) ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি কেবল দুটি আন্তর্জাতিক সংগীত পরিবেশনা ছিল না; এটি ছিল একটি অবরুদ্ধ, নিপীড়িত এবং স্বাধীনতাকামী জাতির অস্তিত্বের আকুতিকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার প্রথম ও সবচেয়ে সফল সাংস্কৃতিক কূটনীতি (Cultural Diplomacy)।

পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ‘দ্য বিটলস’ (The Beatles) খ্যাত ব্রিটিশ রকস্টার জর্জ হ্যারিসনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি সংগীতের ইতিহাসে প্রথম বৃহৎ পরিসরের ‘মেগা চ্যারিটি বেনিফিট কনসার্ট’ হিসেবে স্বীকৃত। এটি তৎকালীন বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে, পরাশক্তিগুলোর সরকারি নীতি বা ভূ-রাজনৈতিক কূটচালের বাইরে গিয়েও শিল্পের শক্তি দিয়ে কীভাবে কোটি মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা যায় এবং চরম মানবিক সংকটে প্রত্যক্ষ সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।

 

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ - মুক্তিযুদ্ধের কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন ও তার বন্ধুরা সঙ্গে ছিলেন নোবেলজয়ী সুপারস্টার বব ডিলান
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ – মুক্তিযুদ্ধের কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন ও তার বন্ধুরা সঙ্গে ছিলেন নোবেলজয়ী সুপারস্টার বব ডিলান

 

Table of Contents

একনজরে: দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর সার্বিক রূপরেখা

মূল বিষয়বিস্তারিত তথ্য
প্রধান উদ্যোক্তা ও পরিকল্পনাকারীপণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসন
তারিখ ও স্থান১ আগস্ট ১৯৭১; ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন, নিউইয়র্ক সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
অনুষ্ঠানের বিন্যাসএকই দিনে দুটি পৃথক শো (দুপুর ২:৩০ এবং রাত ৮:০০)
মোট উপস্থিত দর্শকপ্রায় ৪০,০০০ (দুই শো মিলিয়ে)
সংগীত ধারাভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং ওয়েস্টার্ন রক অ্যান্ড রোল
সংগৃহীত প্রাথমিক তহবিলপ্রায় ২,৪৩,০০ ডলার (তাৎক্ষণিক টিকিট বিক্রি থেকে)
দীর্ঘমেয়াদি তহবিল নিবন্ধকইউনিসেফ (UNICEF – United Nations Children’s Fund)
পরবর্তী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি১৯৭৩ সালে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন
ঐতিহাসিক গুরুত্বপপ মিউজিকের ইতিহাসে প্রথম বৈশ্বিক মানবিক বেনিফিট কনসার্ট
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

১. ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: রক্তঝরা বাংলাদেশ ও সীমান্তপারে মানবিক বিপর্যয়

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর ভিত্তি কেবল কোনো বৈশ্বিক সুরের মূর্ছনায় গড়ে ওঠেনি; এর পেছনে ছিল একটি জাতির ভয়াবহ রক্তক্ষয় এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

১.১. ১৯৭১-এর গণহত্যা, শরণার্থী সংকট ও কলেরার প্রাদুর্ভাব

১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে প্রলয়ংকরী ‘ভোলা সাইক্লোন’-এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। তৎকালীন পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের চরম অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণে বাঙালি জাতির মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অচলবস্থার চরম পর্যায়ে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর পদ্ধতিগত গণহত্যা শুরু করে।

প্রাণভয়ে এবং সম্ভ্রম বাঁচাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই নজিরবিহীন শরণার্থীর ঢেউ ভারতের সীমান্ত অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করে। সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা অপরিসর শরণার্থী শিবিরগুলোতে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে দেখা দেয় কলেরা, ডায়রিয়া ও তীব্র পুষ্টিহীনতা। প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু ও বৃদ্ধ অনাহারে ও মহামারীতে মারা যেতে থাকেন। মানবিক এই সংকট আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল।

১.২. স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণ, নিক্সন-কিসিঞ্জার অক্ষ ও বৈশ্বিক নীরবতা

তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) চরম উত্তেজনায় আচ্ছন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার কৌশলগতভাবে পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

এর কারণ ছিল চীন-মার্কিন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনে মাধ্যম হিসেবে কাজ করছিলেন ইয়াহিয়া খান। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক গোপন বেইজিং সফরও সম্পন্ন হয়েছিল ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায়। ফলে, পূর্ব পাকিস্তানে চলা গণহত্যা সম্পর্কে ঢাকাস্থ মার্কিন কনস্যুলেটের তৎকালীন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড বারবার সতর্কবার্তা (‘ব্লাড টেলিগ্রাম’) পাঠানো সত্ত্বেও, হোয়াইট হাউস পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পূর্ণ অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল। বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গন এবং মূলধারার অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও যখন নীরব বা দ্বিধান্বিত, ঠিক তখনই সংস্কৃতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার রাজনৈতিক ও মানবিক প্রয়োজন দেখা দেয়।

 

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

 

২. প্রস্তাবনা থেকে পরিকল্পনা: পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের যুগলবন্দি

সংগীতের ইতিহাসে এই যুগান্তকারী উদ্যোগটির সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আবেগঘন একটি স্থান থেকে।
সংকট থেকে প্রতিক্রিয়া:
[বাংলাদেশে গণহত্যা ও শরণার্থী সংকট] 
        │
        ▼
[পণ্ডিত রবিশঙ্করের ব্যক্তিগত বেদনা ও ২৫ হাজার ডলারের প্রাথমিক পরিকল্পনা]
        │
        ▼
[জ জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরিসর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত]
        │
        ▼
['Bangla Desh' গান প্রকাশ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ]
        │
        ▼
[ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে মেগা কনসার্ট আয়োজন]

২.১. রবিশঙ্করের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও ২৫ হাজার ডলারের প্রাথমিক স্বপ্ন

বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের নড়াইল জেলায়। বাংলাদেশে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি বিজড়িত ছিল। ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি জন্মভূমির মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা এবং সীমান্ত শিবিরের ট্র্যাজেডির খবর শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

রবিশঙ্কর প্রথমে চিন্তা করেছিলেন, নিউইয়র্কের কোনো ছোট মিলনায়তনে একটি একাডেমি ট্র্যাডিশনাল শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুদান অনুষ্ঠান করবেন, যেখান থেকে অন্তত ২৫,০০০ ডলার সংগ্রহ করে শরণার্থীদের জন্য পাঠানো সম্ভব হবে। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল সাধারণ এক শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠানে সাধারণ আমেরিকানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কিংবা বিপুল পরিমাণ অর্থ তোলা সম্ভব নয়। এই চিন্তাভাবনা থেকেই তিনি তাঁর শিষ্য ও অনুরাগী, বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’-এর প্রধান গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসনের শরণাপন্ন হন।

২.২. জর্জ হ্যারিসনের প্রবেশ: এক বৈশ্বিক সংহতির সূচনা

১৯৭১ সালের মে-জুন মাসের দিকে রবিশঙ্কর লস অ্যাঞ্জেলেসে হ্যারিসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেন। হ্যারিসন কেবল রবিশঙ্করের সংগীতের ছাত্র ছিলেন না, ভারতীয় দর্শন ও সুরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।

রবিশঙ্করের কাছ থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা শুনে হ্যারিসন অনুধাবন করেন যে ২৫,০০০ ডলার এই বিপর্যয়ের তুলনায় অতি নগণ্য। তিনি বলেন, “যদি কিছু করতেই হয়, তবে তা এত বড় পরিসরে করতে হবে যেন পুরো বিশ্ব এ সম্পর্কে জানতে পারে।” হ্যারিসন তাঁর নিজস্ব তারকাখ্যাতি, বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এক অভূতপূর্ব আয়োজনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন।

২.৩. ‘Bangla Desh’ গান: পপ সংগীতের প্রথম ভূ-রাজনৈতিক চ্যুতির সুর

কনসার্ট আয়োজনের ঘোষণার পূর্বেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে জর্জ হ্যারিসন দ্রুত একটি গান রচনা করেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসের রেকর্ড প্ল্যান্ট স্টুডিওতে প্রখ্যাত প্রযোজক ফিল স্পেক্টরের সহযোগিতায় মাত্র কয়েক দিনে রেকর্ড করা হয় ‘Bangla Desh’ শিরোনামের ঐতিহাসিক সিঙ্গেলটি।

২৩ জুলাই ১৯৭১ তারিখে অ্যাপল রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত এই গানটি ছিল মূলধারার পপ মিউজিকের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিয়ে রচিত প্রথম দাতব্য গান। গানটির কথা ছিল অত্যন্ত সরল কিন্তু শক্তিশালী:

“My friend came to me with tears in his eyes / He said I need some help, before his country dies…”

গানটি রাতারাতি ইউকে সিঙ্গেলস চার্টের শীর্ষ ১০-এ এবং ইউএস বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষ ২৩-এ জায়গা করে নেয়। পশ্চিমা বিশ্বের লাখ লাখ তরুণ ও বেতার শ্রোতা এই একটি গানের মাধ্যমেই প্রথম ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি শোনেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাতের মাত্রা অনুধাবন করতে পারেন।

 

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

 

৩. শিল্পীদের সমাবেশ, বিটলস সংযোগ ও পর্দার অন্তরালের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ

স্বল্প সময়ে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের মতো বিশালাকার ভেন্যুতে বিশ্বের শীর্ষ তারকাদের একত্র করা এক মহাযজ্ঞ ছিল।

৩.১. দ্য বিটলস পুনঃএকত্রীকরণের প্রচেষ্টা ও জটিলতা

১৯৭০ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় আধুনিক পপ সংগীতের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’। হ্যারিসন চেষ্টা করেছিলেন বিটলসের সাবেক চার সদস্যকেই (জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, রিঙ্গো স্টার এবং তিনি নিজে) এই মঞ্চে পুনরায় একত্রিত করতে।

  • পল ম্যাকার্টনি: আইনি টানাপোড়েন এবং বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যকার দূরত্বের কারণে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
  • জন লেনন: শুরুতে রাজি হলেও হ্যারিসন শর্ত দেন যে লেননের স্ত্রী ইয়োকো ওনো মঞ্চে পারফর্ম করতে পারবেন না। এই নিয়ে মতভেদের কারণে লেনন কনসার্টের ঠিক আগে নিউইয়র্ক ছেড়ে প্যারিসে চলে যান।
  • রিঙ্গো স্টার: একমাত্র বিটলস সদস্য হিসেবে হ্যারিসনের ডাকে সাড়া দেন এবং স্পেন থেকে তাঁর চলচ্চিত্রের শুটিং স্থগিত রেখে নিউইয়র্কে ছুটে আসেন।

৩.২. আন্তর্জাতিক মেগাস্টারদের একত্রীকরণ: ডিলান, ক্ল্যাপটন ও অন্যান্য

হ্যারিসন তাঁর সমসাময়িক শীর্ষ সংগীতশিল্পীদের দ্রুত আমন্ত্রণ জানান:

  • বব ডিলান (Bob Dylan): ১৯৬৬ সালের মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর ডিলান বড় ধরনের কোনো পাবলিক কনসার্ট বা ট্যুর থেকে দূরে ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি ছিল পুরোপুরি অনিশ্চিত। কিন্তু কনসার্টের দিন তিনি নাটকীয়ভাবে মঞ্চে উঠে আসেন।
  • এরিক ক্ল্যাপটন (Eric Clapton): গিটার জাদুকর এরিক ক্ল্যাপটন সে সময় মারাত্মক ড্রাগ আসক্তিতে (হেরোইন) ভুগছিলেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও বন্ধু হ্যারিসনের অনুরোধে তিনি মঞ্চে ওঠেন এবং গিটার সোলো পরিবেশন করেন।
  • লিয়ন রাসেল ও বিলি প্রেস্টন: রকিং কিবোর্ড পারফরম্যান্স ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভোকালের দায়িত্ব নেন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক লিয়ন রাসেল এবং ‘ফিফথ বিটল’ নামে খ্যাত অর্গানিস্ট বিলি প্রেস্টন।

৩.৩. মাত্র কয়েক সপ্তাহে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন ও প্রযোজনার কারিগরি প্রস্তুতি

কনসার্টটির সার্বিক প্রস্তুতি সারতে হ্যারিসন সময় পেয়েছিলেন মাত্র চার সপ্তাহ। এত অল্প সময়ে নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন বুক করা, শব্দের নিখুঁত ভারসাম্য (Acoustics) বজায় রাখা, ১৬-ট্র্যাক টেপ রেকর্ডার স্থাপন এবং চিত্রগ্রহণের জন্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাউন্ড ও ফিল্ম টিম গঠন করা ছিল বিস্ময়কর সাফল্য। ২:৩০ মিনিট ও রাত ৮:০০ টার দুটি শো-এর প্রায় ৪০,০০০ টিকিট মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়।

 

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

 

৪. ১ আগস্ট ১৯৭১: ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ঐতিহাসিক মহাসঙ্গীত

১ আগস্টের দুপুর ছিল সাধারণ কোনো সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন নয়, বরং তা পরিণত হয় মানবিক বিশ্বজনমত গঠনে এক অবিস্মরণীয় উদযাপনে।
অনুষ্ঠানের কাঠামোগত প্রবাহ:
[প্রথম পর্ব: প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সংগীত (রবিশঙ্কর, আলী আকবর, আল্লারাখা)]
        │
        ▼
['বাংলা ধুন' পরিবেশনা ও পাশ্চাত্য শ্রোতাদের সুর-সচেতনতা]
        │
        ▼
[দ্বিতীয় পর্ব: ওয়েস্টার্ন রক (হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, ক্ল্যাপটন, রাসেল, প্রেস্টন)]
        │
        ▼
[আকস্মিক সারপ্রাইজ: বব ডিলানের আইকনিক প্রটেস্ট সং পরিবেশনা]
        │
        ▼
[সমাপ্তি: 'Bangla Desh' অ্যান্থেমের মাধ্যমে মানবিক বার্তা প্রদান]

৪.১. প্রথম পর্ব: প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সংগীত ও ‘সুর বাঁধার’ ঐতিহাসিক মুহূর্ত

অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধ নির্ধারিত ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জন্য। মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর (সেতার), ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (সরোদ), ওস্তাদ আল্লারাখা (তবলা) এবং কমলা চক্রবর্তীর (তানপুরা)।

পাশ্চাত্যের যুবসমাজ, যারা সাধারণত লাউড রক অ্যান্ড রোলে অভ্যস্ত, তাদের সামনে রাগ সংগীতের ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। অনুষ্ঠানের শুরুতে রবিশঙ্কর মাইক্রোফোনে বাংলাদেশের চরম মানবিক বিপর্যয় তুলে ধরে অত্যন্ত সংযত ও বিনয়ী কণ্ঠে বলেন:

“The first part of the program will be Indian music… We are not trying to make political statements, we are musicians. But the suffering in Bangladesh is so great, we just want to help.”

সংগীত পরিবেশনের পূর্বে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম তারের সামঞ্জস্য (Tuning) মিলিয়ে নিতে শাস্ত্রীয় শিল্পীদের প্রায় এক থেকে দেড় মিনিট সময় লাগে। সুর মেলানোর সময় যে ধ্বনি তৈরি হয়, সেটিকে পশ্চিমা শ্রোতারা পরিবেশনার মূল অংশ ভেবে উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং তুমুল করতালি দেন।

তখনি পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর বিখ্যাত হাস্যরসাত্মক ও দূরদর্শী উক্তিটি করেন:
“If you appreciate the tuning so much, I hope you will enjoy the playing more.”
(আপনারা যদি সুর বাঁধাতেই এত আনন্দ পান, তবে মূল বাজানো শুরু হলে আশা করি আরও বেশি উপভোগ করবেন।)

৪.২. ‘বাংলা ধুন’: রাগ সংগীতে লোকজ সুর ও মুক্তিযুদ্ধের আবেগ

সুর বাঁধার পর্ব শেষে শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘বাংলা ধুন’ (Bangla Dhun) নামক একটি বিশেষ রাগাশ্রিত সুর। এটি কোনো প্রচলিত ধ্রুপদী রাগ ছিল না; বরং বাংলাদেশের লোকজ সুর, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালি ধুন এবং লোকগাথার করুণ রসের ওপর ভিত্তি করে রবিশঙ্কর ও আলী আকবর খাঁ এই যুগলবন্দি সুরটি রচনা করেছিলেন। ওস্তাদ আল্লারাখার তবলার দ্রুত লয় এবং সেতার-সরোদের সংঘাতময় জুগলবন্দিতে তাসের ঘরের মতো ভেসে ওঠা দুঃখ, সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক মহাকাব্যিক রূপ ফুটে ওঠে।

৪.৩. দ্বিতীয় পর্ব: ওয়েস্টার্ন রক অ্যান্থেম ও বব ডিলানের প্রত্যাবর্তন

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চে ঘটে রক অ্যান্ড রোলের তাণ্ডব। জর্জ হ্যারিসন তাঁর সুসজ্জিত ব্যান্ড নিয়ে মঞ্চে আসেন। তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিলেন বিখ্যাত ব্যান্ড ‘ব্যাডফিঙ্গার’ (Badfinger)-এর সদস্যরা, ড্রামসে রিঙ্গো স্টার ও জিম কেল্টনার, বেস গিটারে ক্লাউস ভুর্মান এবং পারকাশনে ডন প্রেস্টন।

হ্যারিসন একের পর এক তাঁর কালজয়ী গান পরিবেশন করেন—’Wah-Wah’, ‘My Sweet Lord’, ‘Awaiting on You All’, এবং ‘Beware of Darkness’। ‘While My Guitar Gently Weeps’ গানে এরিক ক্ল্যাপটন ও জর্জ হ্যারিসনের গিটারের দ্বৈত লড়াই দর্শকদের মাঝে উত্তেজনার পারদ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

তবে রাতের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বব ডিলানের আগমন। দীর্ঘদিন ধরে নিভৃতবাসে থাকা ডিলান একস্টিক গিটার ও হারমোনিকা হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাইতে শুরু করেন তাঁর বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী গানগুলো:

  • ‘A Hard Rain’s A-Gonna Fall’
  • ‘Blowin’ in the Wind’
  • ‘It’s Alright, Ma (I’m Only Bleeding)’
  • ‘Just Like a Woman’
ডিলানের প্রতিবাদী সুর ও কাব্যময় বাণী তৎকালীন সময়ে ভিয়েতনামী যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের গণহত্যা উভয় প্রেক্ষাপটেই মার্কিন তরুণের বিবেককে দারুণভাবে নাড়া দেয়।

৪.৪. কনসার্টের সম্পূর্ণ সেটলিস্ট

১ আগস্টের সংগীতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের যে মেলবন্ধন ঘটেছিল, তার সম্পূর্ণ সেটলিস্ট ছিল নিম্নরূপ:

  1. Introduction by George Harrison & Ravi Shankar
  2. ‘Bangla Dhun’ – Pandit Ravi Shankar, Ustad Ali Akbar Khan, Ustad Alla Rakha, Kamala Chakravarty
  3. ‘Wah-Wah’ – George Harrison
  4. ‘My Sweet Lord’ – George Harrison
  5. ‘Awaiting on You All’ – George Harrison
  6. ‘That’s the Way God Planned It’ – Billy Preston
  7. ‘It Don’t Come Easy’ – Ringo Starr
  8. ‘Beware of Darkness’ – George Harrison & Leon Russell
  9. ‘Band Introduction’ – George Harrison
  10. ‘While My Guitar Gently Weeps’ – George Harrison & Eric Clapton
  11. ‘Medley: Jumpin’ Jack Flash / Young Blood’ – Leon Russell
  12. ‘Here Comes the Sun’ – George Harrison
  13. ‘A Hard Rain’s A-Gonna Fall’ – Bob Dylan
  14. ‘Blowin’ in the Wind’ – Bob Dylan
  15. ‘It’s Alright, Ma (I’m Only Bleeding)’ – Bob Dylan
  16. ‘Just Like a Woman’ – Bob Dylan
  17. ‘Something’ – George Harrison
  18. ‘Bangla Desh’ – George Harrison & Full Ensemble

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

৫. দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর শীর্ষ শিল্পী ও তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক অবদান

প্রতিটি শিল্পীর স্বতন্ত্র শৈলী এবং তাঁদের ভূমিকা এই কনসার্টটিকে সংগীতে এক অমর মাত্রা প্রদান করেছিল।

শিল্পীর নামবাদ্যযন্ত্র / ভূমিকাসংগীত জগতের পরিচয়কনসার্টে অবদান ও বিশেষ মুহূর্ত
জর্জ হ্যারিসনলিড ভোকাল, গিটার, প্রধান আয়োজকসাবেক ‘দ্য বিটলস’ সদস্যসমগ্র অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী; ‘Bangla Desh’ গান রচনা ও পুরো মিউজিশিয়ান দলকে নেতৃত্ব প্রদান।
পণ্ডিত রবিশঙ্করসেতার, সহ-উদ্যোক্তাআন্তর্জাতিক সেতার বিশেষজ্ঞ ও রাগ সংগীতের প্রাণপুরুষকনসার্টের মূল ভাবনাকারী; বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিতে হ্যারিসনকে উদ্বুদ্ধকরণ ও ‘বাংলা ধুন’ পরিবেশন।
ওস্তাদ আলী আকবর খাঁসরোদমাইহার ঘরানার প্রখ্যাত সরোদ সুরসাধকশাস্ত্রীয় পর্বের প্রধান সুরসংযোজক; রবিশঙ্করের সঙ্গে সরোদের মেলবন্ধনে এক অপার্থিব সুর সৃষ্টি করেন।
ওস্তাদ আল্লারাখাতবলাতবলার প্রখ্যাত ওস্তাদতবলার জটিল তালের ছন্দে প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় অংশকে আন্তর্জাতিক মানে উপস্থাপন।
বব ডিলানভোকাল, একস্টিক গিটার, হারমোনিকাপ্রখ্যাত নোবেলজয়ী সংগীতশ্রষ্টা ও প্রতিবাদী কণ্ঠদীর্ঘদিনের বিরতি ভেঙে সারপ্রাইজ এন্ট্রি; ‘A Hard Rain’s A-Gonna Fall’ গানে যুদ্ধবিরোধী আবেগ সঞ্চার।
এরিক ক্ল্যাপটনলিড গিটারবিশ্বের শ্রেষ্ঠ গিটারিস্টদের একজনতীব্র শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ‘While My Guitar Gently Weeps’ গানে ঐতিহাসিক গিটার সোলো প্রদান।
রিঙ্গো স্টারড্রামস, ভোকালসাবেক ‘দ্য বিটলস’ ড্রামার‘It Don’t Come Easy’ পরিবেশন এবং বিটলস পরবর্তী হ্যারিসনের সঙ্গে অনন্য বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন।
বিলি প্রেস্টনঅর্গান, পিয়ানো, ভোকালবিখ্যাত সোল ও আর-অ্যান্ড-বি শিল্পী‘That’s the Way God Planned It’ গানে হাই-এনার্জি পারফরম্যান্স ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভোকাল পরিচালনা।
লিয়ন রাসেলপিয়ানো, বেস, ভোকালরিয়েল সেশন মিউজিশিয়ান ও রকস্টার‘Jumpin’ Jack Flash / Young Blood’ মেডলি গানে অসাধারণ ওয়েস্টার্ন রক মেজাজ তৈরি।
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

৬. আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জনমতে কনসার্টের প্রভাব: সফট পাওয়ারের শক্তি

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে ‘সফট পাওয়ার’ (Soft Power) বা সাংস্কৃতিক কূটনীতির সফল প্রয়োগের এক প্রামাণ্য দলিল।
কূটনৈতিক প্রভাবের অনুক্রম:
[হোয়াইট হাউসের (নিক্সন-কিসিঞ্জার) পাকিস্তানঘেঁষা নীতি]
        │
        ▼
[কনসার্ট, মিডিয়া কাভারেজ ও লাইভ অ্যালবামের বিশ্বব্যাপী প্রচার]
        │
        ▼
[আমেরিকান জনমতে পাকিস্তানবিরোধী ও বাংলাদেশবান্ধব পরিবর্তন]
        │
        ▼
[মার্কিন কংগ্রেসে নীতিগত চাপ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক 'Legitimacy' প্রতিষ্ঠা]

৬.১. ওয়াশিংটনের সরকারি নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতের বিস্ফোরণ

১৯৭১ সালে নিক্সন প্রশাসন যখন আড়ালে থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে সামরিক অস্ত্র পাঠাচ্ছিল, তখন সাধারণ মার্কিন জনগণ পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ ছিল। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ৪০,০০০ দর্শক এবং পরবর্তীতে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও রোলিং স্টোন (Rolling Stone) ম্যাগাজিনের কাভারেজের মাধ্যমে মার্কিন তরুণ প্রজন্ম তাদের নিজস্ব সরকারের জনবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।

কনসার্টের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শহরগুলোতে নিক্সন-কিসিঞ্জার অক্ষের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। মার্কিন সাধারণ জনগণ ও সিনেটরদের একটি বড় অংশ (যেমন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি) পাকিস্তানের গণহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ শুরু করেন।

৬.২. মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা (Legitimacy) ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক কূটনীতি

একটি স্বাধীনতাহীন বা অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রয়োজন থাকে বিশ্বমঞ্চে নিজের ‘আন্তর্জাতিক বৈধতা’ (International Legitimacy) অর্জন করা। ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ কোনো সরকারি কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে নয়, বরং সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অস্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি বার্তা দিয়েছিল যে, বাংলাদেশের এই লড়াই কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নয়, এটি মানবতার জন্য এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম।

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

৭. আর্থিক সফলতা, আইআরএস (IRS) জটিলতা এবং ইউনিসেফ জর্জ হ্যারিসন ফান্ড

যদিও এটি একটি দাতব্য উদ্যোগ ছিল, তবুও বিশাল এই ফান্ডের অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণে আয়োজকদের বহু বছর ধরে চরম প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

৭.১. টিকিট, গ্র্যামিজয়ী অ্যালবাম এবং চলচ্চিত্রের আয়

  • তাৎক্ষণিক টিকিট বিক্রয়: কনসার্টের দুটি শো-এর টিকিট বিক্রি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ২,৪৩,০০ ডলার সংগৃহীত হয়, যা কনসার্ট শেষ হওয়ার পরপরই ইউনিসেফের হাতে ত্রাণ হিসেবে তুলে দেওয়া হয়।
  • লাইভ ট্রিপল ভিনাইল অ্যালবাম (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর অ্যাপল রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত হয় কনসার্টের ৩-ডিস্ক লাইভ ভিনাইল বক্স সেট। এটি ইউএস চার্টের ২ নম্বরে এবং ইউকে চার্টের ১ নম্বরে উঠে আসে। এই অ্যালবামটি ১৯৭৩ সালে ১৫তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে মর্যাদাপূর্ণ ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ অর্জন করে।
  • ডকুমেন্টারি ফিল্ম (১৯৭২): সল সুইমার (Saul Swimmer) নির্দেশিত কনসার্টের ফিচার ফিল্মটি ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে মুক্তি পায় এবং বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে প্রচুর রাজস্ব আয় করে।

৭.২. মার্কিন কর বিভাগের (IRS) সঙ্গে আইনি সংঘাত ও আটকা পড়া ফান্ড

কনসার্টটি অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে আয়োজন করার ফলে, আইনগতভাবে এটিকে শুরুতেই মার্কিন কর বিভাগের (IRS – Internal Revenue Service) অধীনে ‘ট্যাক্স-মুক্ত দাতব্য সংস্থা’ বা 501(c)(3) স্ট্যাটাসে নিবন্ধিত করা হয়নি।

ফলে, মার্কিন কর বিভাগ অ্যালবাম বিক্রি এবং সিনেমার আয়কে সাধারণ বাণিজ্যিক উপার্জন হিসেবে গণ্য করে এবং বিশাল অংকের ট্যাক্স দাবি করে ফান্ডের ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার আটকে দেয়। এর ওপর যোগ হয় রেকর্ড ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানিগুলোর আইনি দাবি-দাওয়া।

আইআরএস-এর সাথে এই ট্যাক্স জটিলতা নিরসনে জর্জ হ্যারিসনকে এক দশকেরও বেশি সময় আইনি লড়াই চালাতে হয়েছে। তৎকালীন সময়ে হ্যারিসন নিজস্ব পকেট থেকে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যক্তিগত আমানত বন্ড হিসেবে জমা দিয়েছিলেন যেন আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালবাম বিক্রি বন্ধ না হয়। অবশেষে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে মার্কিন আইনসভা এবং কংগ্রেসের বিশেষ হস্তক্ষেপে মামলাটি সুরাহা হয় এবং সমস্ত আটকে থাকা অর্থ ইউনিসেফের মূল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়।

৭.৩. ‘জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ’: পাঁচ দশকের ধারাবাহিক অবদান

আটকা পড়া অর্থ মুক্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় ‘George Harrison Fund for UNICEF’। পরবর্তীতে অ্যালবাম, সিডি, ডিভিডি এবং ডিজিটাল ডাউনলোডের রয়্যালটি থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে প্রায় ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) ডলারেরও বেশি অর্থ ইউনিসেফ লাভ করে।

আজও এই ফান্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেবল বাংলাদেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে এই উদ্যোগের তিন দশক পূর্তি উদযাপিত করে।

 

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

 

৮. বৈশ্বিক পপ-কালচার ও চ্যালিটি কনসার্টের পথপ্রদর্শক মডেল

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ পপ কালচার ও চ্যারিটি ইভেন্টের সংজ্ঞাই চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

৮.১. মেগা চ্যারিটি কনসার্টের ব্লু-প্রিন্ট: ‘লাইভ এইড’ থেকে আধুনিক ধারা

১৯৭১ সালের পূর্বে পপ কিংবা রক মিউজিককে কেবল তরুণদের বিনোদন বা বিদ্রোহের খোরাক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এই কনসার্ট প্রমাণ করে যে তারকাদের জনপ্রিয়তাকে কোনো বৈশ্বিক মানবিক সংকটের সমাধানে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়।

পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বখ্যাত মেগা বেনিফিট কনসার্টগুলোর প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’:

  • লাইভ এইড (Live Aid – 1985): ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষ তহবিলের জন্য বব গেলডফ (Bob Geldof) এবং মিজ ইউরে (Midge Ure) আয়োজিত বিখ্যাত লাইভ এইড কনসার্টের সরাসরি অনুপ্রেরণা ছিল এই অনুষ্ঠান। বব গেলডফ স্বীকার করেছিলেন যে, একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যান্ডকে কীভাবে সামলাতে হয় এবং আইআরএস-এর মতো আইনি ফাঁদ কীভাবে এড়াতে হয়, সে বিষয়ে তিনি জর্জ হ্যারিসনের কাছ থেকে ব্যক্তিগত পরামর্শ নিয়েছিলেন।
  • অন্যান্য ইভেন্ট: ১৯৮৮ সালের ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস নাউ! ট্যুর’, ২০০১ সালের ৯/১১ পরবর্তী ‘দ্য কনসার্ট ফর নিউইয়র্ক সিটি’, কিংবা ২০০৫ সালের ‘লাইভ ৮’ (Live 8)—প্রতিটি ইভেন্টেই ১৯৭১ সালের সেই উদ্ভাবিত অবকাঠামোগত মডেল অনুসৃত হয়েছে।

৮.২. ওয়েস্টার্ন রকে ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’-এর নতুন দিগন্ত

পশ্চিমা পপ ও রক সুরের মূলধারায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে এক অভূতপূর্ব মর্যাদা এনে দিয়েছিল এই উদ্যোগ। সেতার, সরোদ ও তবলার মতো বাদ্যযন্ত্রগুলোকে এতদিন পশ্চিমা শ্রোতারা কেবল ভিনদেশি বা অদ্ভুত বাদ্য হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ঐতিহাসিক পরিবেশনা ভারতীয় ধ্রুপদী সুরকে বিশ্বমঞ্চে ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ (World Music) নামক এক নতুন ধারায় প্রতিষ্ঠিত করে।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

১. Harrison, George. I, Me, Mine. Simon and Schuster, 1980. (জর্জ হ্যারিসনের আত্মজীবনী, যেখানে কনসার্টের পটভূমি, পরিকল্পনা ও আইআরএস মামলার বিবরণ রয়েছে)।
২. Shankar, Ravi. Raga Mala: The Autobiography of Ravi Shankar. Genesis Publications, 1999. (পণ্ডিত রবিশঙ্করের আত্মজীবনী, যেখানে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অনুভূতি ও প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপট বর্ণিত)।
৩. Lavezzoli, Peter. The Dawn of Indian Music in the West. Continuum International Publishing Group, 2006. (পশ্চিমা পপ ও রক মিউজিকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রসার এবং ১ আগস্টের প্রভাবের বিস্তারিত একাডেমিক বিশ্লেষণ)।
৪. Leng, Simon. While My Guitar Gently Weeps: The Music of George Harrison. Hal Leonard Corporation, 2006. (জর্জ হ্যারিসনের একক গান, বিশেষ করে ‘Bangla Desh’ এবং কনসার্ট অ্যালবামের মিউজিক্যাল অ্যানালাইসিস)।
৫. Clayson, Alan. George Harrison. Sanctuary Publishing, 2003. (হ্যারিসনের জীবনী এবং আইআরএস ও অ্যাপল রেকর্ডসের আইনি নথিপত্রের বিশ্লেষণ)।
৬. UNICEF Historical Archives. The George Harrison Fund for UNICEF: Legacy & Continuous Impact (1971–2020). UNICEF Official Documentation.
৭. Swimmer, Saul (Director). The Concert for Bangladesh [Documentary Film]. Apple Films, 1972.
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ