হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ধ্রুপদে তলোয়ান্ডি ঘরানা (Talwandi Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

১৯২০-এর দশকের শুরুর দিকে লাহোরে তালওয়ান্ডি ঘরানা

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম, গম্ভীরতম ও প্রথাসিদ্ধ কণ্ঠসঙ্গীত ধারা হলো ধ্রুপদ। ধ্রুপদ সঙ্গীতের বিকাশ কেবল রাজস্থানের রাজদরবার কিংবা গঙ্গা নদীর অববাহিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং অবিভক্ত পাঞ্জাবের সমতল ভূমিতেও ধ্রুপদের এক অত্যন্ত বীররসাত্মক, ওজস্বী ও স্বকীয় ধারা গড়ে উঠেছিল। এই বিশেষ পাঞ্জাবী ধ্রুপদী ঐতিহ্যই সঙ্গীতজগতে তলোয়ান্ডি ঘরানা (Talwandi Gharana) নামে সুপরিচিত।

ধ্রুপদের ঐতিহ্যবাহী চার বাণীর মধ্যে তলোয়ান্ডি ঘরানাকে মূলত খণ্ডার বাণী (Khandar Bani)-র সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালা জেলার (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত) প্রাচীন তলোয়ান্ডি শহরকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ ঘরানার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ঘটে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রবাদপ্রতীম প্রতিষ্ঠাতা

তলোয়ান্ডি ঘরানার সাঙ্গীতিক গোড়াপত্তন ঘটে মধ্যযুগীয় উত্তর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতগুরু নায়ক চাঁদ খাঁ এবং নায়ক সুরজ খাঁ-এর হাত ধরে। রাজকীয় দরবারী আভিজাত্য এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরার কঠোর শৃঙ্খলায় তাঁরা ধ্রুপদ গায়কীতে এক অভূতপূর্ব তেজ, ক্ষিপ্রতা ও গতিময়তার সঞ্চার করেন।

পরবর্তীকালে তলোয়ান্ডির সঙ্গীতধারা সুফি দরগাহ, গুরুদ্বারা এবং অবিভক্ত পাঞ্জাবের দরবারগুলোতে লালিত-পালিত হয়। মোগল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের পর লাহোর, পাটিয়ালা এবং অমৃতসরের সাঙ্গীতিক আদান-প্রদানে তলোয়ান্ডি ঘরানা এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। গুরু নানক দেব প্রবর্তিত গুরুমুখী সঙ্গীতেও এই ঘরানার তাত্ত্বিক ও সাঙ্গীতিক প্রভাব গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়।

বাণী পরম্পরা ও তলোয়ান্ডির ওজস্বী শৈলী

ধ্রুপদ সঙ্গীতের প্রথাগত চার বাণী—গওহার, খণ্ডার, নওহার ও ডাগরবাণী-র মধ্যে খণ্ডার বাণী হলো বীররস, শক্তি এবং জটিল তালকৌশলের প্রতীক। তলোয়ান্ডি ঘরানা মূলত এই খণ্ডার বাণীর ব্যাকরণকেই নিজেদের মূল সাঙ্গীতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।

খণ্ডার বাণী (বীররস ও ক্ষিপ্রতা) ──> তলোয়ান্ডি ঘরানা ──> ওজস্বী আলাপ, বোল-বাট ও লয়কেন্দ্রিক গায়কী

গওহার বা ডাগরবাণীর শান্ত ও ধ্যায়নী সুরমন্ডলের বিপরীতে তলোয়ান্ডি ঘরানায় স্বরপ্রক্ষেপণ হয় অত্যন্ত তীব্র, প্রখর ও গমকপ্রধান। শারীরিক সক্ষমতা, ফুসফুসের প্রচ্ছাদপট (Diaphragm) থেকে গভীর স্বরপ্রক্ষেপণ এবং গলার নিখুঁত তানপ্রয়োগ এই ঘরানার অন্যতম শক্তি।

তলোয়ান্ডি ঘরানার বিশেষ সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য

তলোয়ান্ডি ঘরানার গায়কী অন্যান্য প্রথাগত ধ্রুপদী ধারা থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে আলাদা। এর প্রধান বৈচিত্র্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. অনন্য ওজস্বী আলাপ ও দ্রুত গতিময়তা

অধিকাংশ ধ্রুপদ ঘরানায় আলাপের অংশটি অত্যন্ত বিলম্বিত লয়ে দীর্ঘায়িত করা হয়। কিন্তু তলোয়ান্ডি ঘরানায় আলাপের প্রাথমিক স্বরপ্রক্ষেপণ ধীর থাকলেও তা দ্রুত গতিশীল ও ছান্দসিক রূপ ধারণ করে। আলাপের শেষভাগে যে ক্ষিপ্র ও ছন্দময় তানপ্রবাহ তৈরি করা হয়, তা ধ্রুপদী সঙ্গীতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

২. জিকির ও ইসলামী আধ্যাত্মিক ভাবধারা

ধ্রুপদ সঙ্গীত মূলত পৌরাণিক বৈদিক মন্ত্র ও সংস্কৃত স্তোত্রনির্ভর হলেও, তলোয়ান্ডি ঘরানা এতে এক অপূর্ব ধর্মীয় ও দার্শনিক বৈচিত্র্য এনেছে। ঐতিহ্যবাহী ‘নোম-তোম’ উচ্চারণের সাথে এই ঘরানার শিল্পীরা আলাপের সময় “আল্লাহ”, “হক”, “মৌলা” ইত্যাদি আধ্যাত্মিক শব্দের মন্ত্রধর্মী জিকির বা ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটি ধ্রুপদকে অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মানবিক আবেদনে উন্নীত করেছে।

৩. জটিল লয়কারি ও বোল-বাটের পারদর্শিতা

তলোয়ান্ডি ঘরানার গায়কী অত্যন্ত তালকেন্দ্রিক। বন্দিশের পদকে বিভিন্ন জটিল ছন্দে ভেঙে দুগুণ, তি গুণ, চৌগুণ থেকে শুরু করে ‘আড়’ ও ‘কুয়াড়’ লয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই ঘরানার শিল্পীরা প্রজ্ঞার পরিচয় দিতেন।

৪. পখাওয়াজ ও সঙ্গতের প্রখর সংলাপ

কণ্ঠশিল্পী ও পখাওয়াজী (Mridangist)-র মধ্যে একপ্রকার প্রতিযোগিতা বা সুষম সংলাপ গড়ে তোলা তলোয়ান্ডি পরিবেশনার মূল আকর্ষণ। শিল্পী কেবল রাগের রূপায়ণেই মগ্ন থাকেন না, বরং তালচক্রের জটিল গাণিতিক বিন্যাসের মাধ্যমে পখাওয়াজের ক্ষিপ্র বোলের সাথে নিখুঁত সংগীতে লিপ্ত হন।

ধ্রুপদের প্রধান ঘরানাগুলোর সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী ধারায় তলোয়ান্ডি ঘরানার স্থান বোঝার জন্য অন্যান্য প্রখ্যাত ঘরানার সাথে এর পার্থক্য নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:

ঘরানা/ধারামূল মেজাজ ও গতিআলাপের প্রকৃতিপ্রধান সাঙ্গীতিক ফোকাস
ডাগরবাণীঅত্যন্ত ধীর, ভাবগম্ভীর ও শান্ত।অত্যন্ত বিলম্বিত, ধ্যায়নী ও স্বরকেন্দ্রিক।আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও বিশুদ্ধ স্বরপ্রক্ষেপণ।
দরভাঙ্গা ঘরানাওজস্বী ও ছন্দময়।গতিশীল ও স্বরভিত্তিক।দ্রুত লয়কারি, ধামার ও শক্তিপ্রদর্শন।
বেতিয়া ঘরানামিষ্টি সুরময় ও বৈচিত্র্যময়।মধুরাঙ্গ ও অলঙ্কারপ্রধান।বহু বাণীর সংমিশ্রণ ও সাহিত্যিক রূপ।
তলোয়ান্ডি ঘরানাপ্রখর বীররসাত্মক, ক্ষিপ্র ও গতিময়।দ্রুত গতিসম্পন্ন, জিকিরযুক্ত ও ছান্দসিক।খণ্ডার বাণীর শক্তি, জটিল লয় ও পখাওয়াজ সঙ্গত।

গুরু-শিষ্য পরম্পরা ও আধুনিক কালের পরিস্থিতি

বিংশ শতাব্দীতে তলোয়ান্ডি ঘরানার সাঙ্গীতিক মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় সাধক ওস্তাদদের বংশধরেরা। এদের মধ্যে উস্তাদ মুহাম্মদ হাফিজ খাঁ এবং উস্তাদ মুহাম্মদ আফজাল খাঁ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে পাকিস্তানে পাকিস্তান টেলিভিশন (PTV) এবং রেডিও পাকিস্তানের মাধ্যমে এই ঘরানার কিছু রেকর্ড সংরক্ষিত হয়।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তন, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অবসান এবং আধুনিক সঙ্গীতের প্রসারের কারণে তলোয়ান্ডি ঘরানা চরম সংকটের মুখে পড়ে। যোগ্য শিষ্যের অভাব এবং প্রচারের অভাবে আজ এই ঘরানাটি প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। তবে ধ্রুপদের সাঙ্গীতিক ইতিহাসে খণ্ডার বাণীর খাঁটি ঐতিহ্য এবং ওজস্বী গায়কীর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে তলোয়ান্ডি ঘরানা চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

 

SufiFaruq.com, Logo - 252x68 (1)

 

তলোয়ান্ডি ঘরানা প্রমাণ করে যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদী ধারা কতটা বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মহিমান্বিত হতে পারে। সুরের প্রখরতা, ছন্দের কঠিন গণিত এবং আধ্যাত্মিক উদারতার মেলবন্ধনে তলোয়ান্ডি ঘরানা হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য ও অনন্য সংযোজন।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. পাকিস্তানি সঙ্গীত সংস্কৃতি ও ধ্রুপদ ঐতিহ্য — ড. মুবাশশির হাসান।
২. ধ্রুপদ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য — রামচতুর মল্লিক ও ড. সুভদ্রা চৌধুরী।
৩. উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি — পণ্ডিত ভাতখণ্ডে।
৪. জাতীয় সঙ্গীত নাটক আকাদেমি কালচারাল আর্কাইভ — নতুন দিল্লি।
আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।