ধ্রুপদে মেওয়াতি ঘরানা (Mewati Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে মেওয়াতি ঘরানা একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বতন্ত্র ধারা, যদিও এটি সরাসরি ধ্রুপদ ঘরানা হিসেবে পরিচিত নয়—বরং খেয়াল গায়কির মধ্যে বিকশিত একটি ঘরানা, যার ভেতরে ধ্রুপদের গভীর প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এই ঘরানার উৎপত্তি রাজস্থান ও হরিয়ানা অঞ্চলের মেওয়াত এলাকায়, এবং এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাধারণভাবে উস্তাদ ঘাগে নাজির খাঁ-এর নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে এই ঘরানাকে সর্বাধিক পরিচিতি ও উচ্চতায় নিয়ে যান পণ্ডিত জসরাজ

মেওয়াতি ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর ভক্তিমূলক ও ভাবনির্ভর সংগীতচিন্তা। ধ্রুপদের মতোই এখানে সংগীতকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। রাগ পরিবেশনায় একটি অন্তর্মুখী ধারা বজায় থাকে, যেখানে প্রতিটি স্বরের মধ্যে আবেগ, অর্থ এবং ভক্তি মিশে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি ধ্রুপদের আরাধনামূলক চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

ধ্রুপদের প্রভাব মেওয়াতি ঘরানার আলাপচর্চা ও স্বরবিন্যাসে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যদিও এটি খেয়াল গায়কি, তবুও আলাপের সূচনা অনেক সময় ধীর, বিস্তৃত এবং স্বরকেন্দ্রিক হয়—যা ধ্রুপদীয় আলাপের অনুরূপ। স্বরের শুদ্ধতা, দীর্ঘায়িত মীড়, এবং সংযত অলংকার প্রয়োগ—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। তবে ধ্রুপদের তুলনায় এখানে কিছুটা বেশি আবেগপ্রকাশ এবং লিরিকালতা লক্ষ্য করা যায়।

মেওয়াতি ঘরানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বন্দিশের ভাবপ্রকাশ। এখানে গানের কথার অর্থ এবং আবেগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিল্পী শুধু সুর নয়, শব্দের মধ্যকার অনুভূতিকেও শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট থাকেন। এই দিকটি ধ্রুপদের প্রবন্ধধর্মী ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি করে।

এই ঘরানায় সারগম, বোল-আলাপ ও তান ব্যবহারের একটি স্বতন্ত্র ধারা রয়েছে। তানগুলো সাধারণত অত্যন্ত সুষম, স্পষ্ট এবং আবেগময়। অতিরিক্ত জটিলতার পরিবর্তে এখানে স্বরের সৌন্দর্য ও মাধুর্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে মেওয়াতি ঘরানার সংগীত একদিকে যেমন শাস্ত্রনিষ্ঠ, অন্যদিকে তেমনি শ্রুতিমধুর ও হৃদয়গ্রাহী।

মেওয়াতি ঘরানাকে বুঝতে হলে ধ্রুপদের অন্যান্য বাণী ও ঘরানার সঙ্গে এর সম্পর্কও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ধ্রুপদের চারটি প্রধান বাণী—গওহার, খণ্ডার, নওহার ও ডাগরবাণী—এর মধ্যে বিশেষ করে ডাগরবাণীর ধ্যানমুখী ও স্বরকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেওয়াতি ঘরানার মিল লক্ষ্য করা যায়। তবে মেওয়াতি ঘরানা ধ্রুপদের কঠোর কাঠামো অনুসরণ না করে, খেয়াল গায়কির স্বাধীনতার মধ্যে থেকে সেই দর্শনকে গ্রহণ করেছে।

এই ঘরানার বিকাশে পণ্ডিত জসরাজ-এর অবদান অসামান্য। তিনি ভক্তিমূলক সঙ্গীত, হাভেলি সংগীত এবং শাস্ত্রীয় গায়নকে একত্রিত করে মেওয়াতি ঘরানাকে এক নতুন মাত্রা দেন। তাঁর গায়নে ধ্রুপদের গাম্ভীর্য, খেয়ালের লাবণ্য এবং ভজনের আবেগ—এই তিনের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে এই ধারা আজও জীবন্ত রয়েছে।

সব মিলিয়ে, মেওয়াতি ঘরানা ধ্রুপদের সরাসরি ঘরানা না হলেও, এর ভেতরে ধ্রুপদের আত্মা গভীরভাবে নিহিত। এটি এমন একটি সংগীতধারা, যেখানে শাস্ত্র, ভক্তি এবং আবেগ একত্রে মিলিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নান্দনিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। ধ্রুপদের গাম্ভীর্যকে আধুনিক শ্রোতার কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে মেওয়াতি ঘরানার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও দেখুন: