আমাদের আজকের যে বিস্তর শাস্ত্রীয় সংগীতের ভুবন—খেয়াল, ঠুমরি কিংবা দাদরা—এই সবকিছুর গোড়ার কথা যদি জানতে চান, তবে আপনাকে ফিরে যেতে হবে একদম শুরুতে। আর সেই সুরের আদি উৎসের নামই হলো ‘ধ্রুপদ’। একে বলা চলে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে প্রাচীন, বনেদি এবং কড়া শাসনমাফিক চলা এক গায়নরীতি।
সোজা বাংলায় বললে, ধ্রুপদ হলো সুরের এমন এক রাজপ্রাসাদ যেখানে নিয়মের কোনো নড়চড় চলে না। এখানে সুর, তাল আর রাগের খাঁটি বিশুদ্ধতাকেই সবচেয়ে উপরে স্থান দেওয়া হয়। খেয়াল বা ঠুমরিতে যেমন শিল্পী নিজের ইচ্ছেমতোন তান-মুড়কি বা নানারকম চপল অলংকার দিয়ে গানকে সাজাতে পারেন, ধ্রুপদের দুনিয়ায় সেসব একদম নিষিদ্ধ! কোনো অতিরিক্ত আবেগ বা সস্তা কারুকার্যকে প্রশ্রয় না দিয়ে, রাগের যে আসল ও আদিম রূপ—তাকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা এই ধারার মূল লক্ষ্য। এর গায়কি একদম সংযত, বীরত্বপূর্ণ, গম্ভীর আর এক অদ্ভুত ধ্যানমগ্ন প্রকৃতির। যেন কোনো এক প্রাচীন মন্দিরে বসে কেউ পরম মনে সাধনা করছেন।
ধ্রুপদের আরেকটি মস্ত বড় পরিচয় লুকিয়ে আছে তার সঙ্গতের মধ্যে। এই ধারার গানে তবলার ছটফটে বোল খাটে না; তালের জন্য এখানে অবধারিতভাবে ব্যবহার করা হয় ‘পাখোয়াজ’। তবলার চেয়ে পাখোয়াজের আওয়াজ অনেক বেশি ভারী, গমগমে এবং চওড়া—যা ধ্রুপদের ওই গম্ভীর মেজাজের সাথে একদম পারফেক্টলি মিলে যায়। এই নিখুঁত ব্যাকরণ আর আভিজাত্যের কারণেই ধ্রুপদকে যুগ যুগ ধরে আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতের আসল ভিত্তি বা “মূলধারা” বলে মনে করা হয়।
ধ্রুপদ । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
জেনে নেয়া যাক ধ্রুপ ও পরিবেশনের বিষয়ে প্রথমিক তথ্য:
আলাপ: রাগ উপস্থাপনার ভিত্তি
ধ্রুপদ পরিবেশনটা শুরুই হয় এক মায়াবী কুয়াশা দিয়ে, যার নাম ‘আলাপ’। এটিকে আপনি কেবল ধ্রুপদের প্রথমাংশ বললে ভুল হবে, এটি আসলে পুরো পরিবেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রাজকীয় আর দীর্ঘতম অংশ।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় কী জানেন? এই দীর্ঘ সময়টায় গানে কিন্তু কোনো তাল, ছন্দ বা বাদ্যযন্ত্রের ঠোকাঠুকির বালাই থাকে না। একদম খোলা আকাশে পাখির ডানা মেলার মতো রাগের বিকাশ ঘটে। তবে যেহেতু কোনো বাণীর কথা বা লিরিকস নেই, শিল্পী তখন সুরের অবয়ব তৈরি করেন কিছু বিশেষ অর্থহীন ধ্বনি দিয়ে—যেমন ‘আ, রে, নি, না, রি, ই, নোম, তোম’। শাস্ত্রীয় সংগীতে একেই বলা হয় বিখ্যাত ‘নোম-তোম আলাপ’।
এই সুরের যাত্রাটা শুরু হয় অত্যন্ত ধীরলয়ে—যাকে আমরা ‘অতি-বিলম্বিত’ বা ‘বিলম্বিত’ লয় বলি। সাধারণত বেস স্বর অর্থাৎ ষড়জ (সা) থেকে আলাপ ধরা হলেও, অনেক সময় রাগের মেইন ক্যারেক্টার বা বাদী স্বর থেকেও এর সূচনা হতে পারে। শিল্পী প্রথমে মন্দ্র সপ্তকে (নিচু সুরে) গিয়ে রাগের গম্ভীর মেজাজটাকে মাটির নিচে শিকড়ের মতো শক্ত করে গেঁথে নেন। এরপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মতো মধ্য আর তারা সপ্তকে উঠে রাগের ডালপালা মেলেন। সবশেষে আকাশের মেঘ ঘুরে আসার মতো এক চক্কর কেটে ফিরে আসেন সেই চেনা মূল ঘরে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। একেকটি স্বরকে পরম মমতায় আলাদা করে সময় দেওয়া হয়। বাদী-সমবাদী স্বরগুলোকে বারবার ছুঁয়ে, রাগের চলন আর বিশেষ স্বর-সংগতির এমন এক আবহ তৈরি করা হয় যে, তালের বোলে পা রাখার আগেই শ্রোতা বুঝে যান তিনি আসলে সুরের কোন রাজ্যে পা রেখেছেন। ধ্রুপদের এই আলাপ অংশটি প্রচণ্ড কঠিন আর কারিগরিভিত্তিক (Technical)। এখানে শিল্পীর সুরের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, দম বা শ্বাসের জোর এবং রাগের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকাটা খুবই জরুরী! এই আলাপের ভেতরেই বোঝা যায় শিল্পী আসলে কতখানি খাঁটি জহুরি এবং তাঁর সাধনার গভীরতা কতখানি।
বাণী ও প্রবন্ধ: ধ্রুপদের কাঠামো
এতক্ষণ ধরে চলা সেই তালহীন আলাপের মায়াজাল যখন শেষ হয়, ধ্রুপদ তখন পা রাখে তার দ্বিতীয় ধাপে। এই প্রথম আসরে গম্ভীর গর্জন নিয়ে প্রবেশ করে পাখোয়াজের বোল। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ধ্রুপদের সুসংগঠিত ‘প্রবন্ধ’—অর্থাৎ গানের ভেতরের সেই রাজকীয় আবয়বটি।
ধ্রুপদ কিন্তু যেমন-তেমন ছড়ানো-ছিটানো কোনো গান নয়, এর পেছনে থাকে সাহিত্য, সুর আর তালের এক নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা। এখানে শুধু সুরের কারসাজি দেখালেই চলে না; গানের কথার (বাণী) ভেতরের সাহিত্যিক অর্থ আর ছন্দের ওপরেও সমান জোর দিতে হয়।
শাস্ত্র অনুযায়ী, ধ্রুপদের এই কাঠামোটি চারটে তলা বা ‘তুক’ নিয়ে তৈরি হয়—স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী এবং আভোগ। এই চার ভাই মিলেই তৈরি করে একটি আস্ত পূর্ণাঙ্গ গানের অবয়ব। ধ্রুপদের বাণীগুলো সাধারণত প্রাচীন হিন্দি, ব্রজভাষা কিংবা উর্দুতে লেখা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো চার লাইনের একটি নিটোল সাহিত্যিক রূপ মেনে চলে। তবে বর্তমান যুগের লাইভ পারফরম্যান্সের রূঢ় বাস্তবে সবসময় এই চারটি অংশই যে গাওয়া হয়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে কিংবা পরিবেশনা সংক্ষেপ করার জন্য শিল্পীরা কেবল ‘স্থায়ী’ আর ‘অন্তরা’—এই দুই অংশ গেয়েই আসর মাত করে দেন।
এখানে পরিবেশনার একটা দারুণ নিয়ম বা ক্রমানুসার (Sequence) আছে, যা বেশ উপভোগ্য। শিল্পী সবার আগে ধরেন ‘স্থায়ী’। এটি হলো পুরো গানের নোঙর বা মাটির ভিত্তি, যা রাগের মূল সীমানাটাকে শ্রোতার কানের ভেতর চট করে গেঁথে দেয়। স্থায়ী গাওয়ার পর শিল্পী পা বাড়ান ‘অন্তরা’-র দিকে। এখানে এসে সুরের পারদ চড়তে শুরু করে, স্বরগুলো একটু ওপরের দিকে প্রসারিত হয়। কিন্তু অন্তরা শেষ করেই শিল্পী কিন্তু সোজা এগিয়ে যান না, তিনি আবার ব্যাক-গিয়ার দিয়ে ফিরে আসেন সেই চেনা ‘স্থায়ী’-র ঘরে, যাতে তৈরি হওয়া সুরের ভিত্তিটা আরও মজবুত হয়।
এর পরের ধাপে আসে ‘সঞ্চারী’ আর ‘আভোগ’। এই দুই অংশের হাত ধরে রাগের পুরো ক্যানভাসটা একদম ষোলো কলায় পূর্ণ রূপ পায়, সবটুকু বৈচিত্র্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গানের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়েও শিল্পী আবার এক চক্কর ঘুরে এসে ল্যান্ড করেন সেই প্রথম ‘স্থায়ী’-র বুকে।
এই যে বারবার স্থায়ীতে প্রত্যাবর্তন, এটা শুধু ব্যাকরণের নিয়ম রক্ষা করা বা কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি আসলে শ্রোতার মনে রাগের মূল স্বরপরিসরকে চিরকালের মতো গেঁথে দেয়। আপনি সুরের দুনিয়ায় যত বড় অলিগলি বা আকাশেই ঘুরে বেড়ান না কেন, দিনশেষে আপনাকে ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে আসতে হবে। এই জাদুকরী চক্রাকার বিন্যাসের কারণেই ধ্রুপদের কাঠামো যেমন থাকে নিরেট ও সুসংহত, তেমনই রাগের উপস্থাপনাও হয় একদম ধাপে ধাপে, এক্কেবারে পরিষ্কার পানির মতো।
তাল, লয় ও পাখোয়াজের ভূমিকা
এবার আসা যাক ধ্রুপদের সেই কড়া আর বিশ্বস্ত পাহারাদারদের কথায়—তাল, লয় আর ছন্দ। ধ্রুপদের আসরে কিন্তু চটুল বা হালকা কোনো তাল একদম খাটবে না। এখানে সাধারণত ৭, ১০ কিংবা ১২ মাত্রার মতো গম্ভীর এবং ওজস্বী তালগুলোর দাপটই সবচেয়ে বেশি থাকে। এর মধ্যে ১০ মাত্রার ‘সাদরা’ আর ১৪ মাত্রার ‘ধামার’ তালের চলন এই গায়নরীতিতে বিশেষভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়। আর আগেই তো বলেছি, এই তালগুলোর পেছনে বাজপাখির মতো কড়া নজর রাখে পাখোয়াাজের সেই ওজনদার, গুরুগম্ভীর আর গমগমে আওয়াজ। তবলার ছটফটে বোলের চেয়ে পাখোয়াজের এই চওড়া ও ভারসাম্যপূর্ণ ধ্বনি ধ্রুপদের রাজকীয় ভাবটাকে এক চুলও নড়তে দেয় না।
এখানে ‘লয়’ বা সুরের গতি নিয়ে যে খেলাটা চলে, তা রীতিমতো পিলে চমকে দেওয়ার মতো। শুরুতে গানটা যখন ডানা মেলে, তখন থাকে এক শান্ত, অলস আর ধ্যানমগ্ন ধীর গতি। কিন্তু গান যত এগোয়, শিল্পী কিন্তু সেই একঘেয়েমিতে আটকে থাকেন না। তিনি খুব চাতুর্যের সাথে ধীরে ধীরে লয়ের স্পিড বা গতি বাড়াতে থাকেন।
বাড়াতে বাড়াতে খেলাটা যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখন শুরু হয় আসল ম্যাজিক! শিল্পী ডাবল (দুন), দেড়গুণ (আড়ি), বা আড়াইগুণ-তিনগুণ লয়ে (কুয়াড়ি, বিয়াড়ি) পৌঁছে পাখোয়াজের সাথে এক মায়াবী কুস্তিতে মেতে ওঠেন। এই যে তালের নির্দিষ্ট খোপের ভেতর সুরের এমন জটিল আর হিসাব-নিকাশের কাটাকুটি খেলা—শাস্ত্রের ভাষায় একেই বলা হয় ‘লয়কারী’।
অলংকার ও স্বরপ্রয়োগ
চলতি ধারার আধুনিক গান, ঠুমরি বা খেয়ালে আমরা কত ধরণের তান, মুড়কি বা জমকালো অলংকারের কারসাজি দেখতে পাই। ধ্রুপদের দুনিয়াটা কিন্তু একদম আলাদা। এখানে অলংকারের ব্যবহার ভীষণ মেপে মেপে, কড়া হিসাব মেনে আর সম্পূর্ণ শাস্ত্রনির্ভর হয়ে করা হয়। একে আপনি বলতে পারেন ‘নো-মেকআপ লুক’—রূপটানের সস্তা চকমকি দিয়ে সুরের আসল রূপ ঢাকা এখানে পাপ!
তবে তার মানে এই নয় যে ধ্রুপদে কোনো অলংকারই লাগে না। অবশ্যই লাগে, তবে সেগুলো ধ্রুপদের রাজকীয় মেজাজের সাথে খাপ খায় এমন ওজনদার অলংকার। যেমন—আশ, ন্যাস, মীড়, মূর্ছনা, স্পর্শন আর কম্পন। আর যার কথা না বললেই নয়, তা হলো ‘গমক’। গমক হলো ধ্রুপদের বুকের ছাতি বা আসল শক্তি। বুক চিরে, কণ্ঠের পুরো জোর খাটিয়ে যখন স্বরকে একধরণের গম্ভীর কম্পন দেওয়া হয়, তখন তাকে গমক বলে। এই গমকের কাজ ধ্রুপদের গায়নরীতিকে এক অন্যধরণের বলিষ্ঠতা, দৃঢ়তা ও রাজকীয় শক্তি এনে দেয়।
ধ্রুপদের সুরপ্রয়োগের আরেকটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো—এর গায়কি কখনো সস্তা তরলতার মতো সরলরেখায় বা সোজা পথে এগোয় না। বরং স্বরের নিখুঁত ওঠানামা, নির্দিষ্ট স্বরের ওপর থিতু হওয়া (স্থিতি) আর গতির চাতুর্যের মাধ্যমেই রাগের ভেতরের আসল চরিত্রটাকে নিংড়ে বের করা হয়। এখানে প্রতিটি স্বরকে একদম কাঁচের মতো স্পষ্ট ও নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করতে হয়, কোনো অপ্রয়োজনীয় বা চটুল অলংকার দিয়ে স্বরকে ধোঁয়াশাপূর্ণ করার কোনো সুযোগই নেই। এই খাঁটি আর নির্ভেজাল স্বরপ্রয়োগই ধ্রুপদকে করেছে অনন্য।
ধ্রুপদ শোনা ও বোঝা
আজকের যুগের ফাস্ট-ফুড বা চটজলদি সবকিছুর ভিড়ে, একজন নতুন শ্রোতার কাছে প্রথম প্রথম ধ্রুপদ একটু খটমটে বা কঠিন মনে হতেই পারে। আর সেটা খুব স্বাভাবিক। কারণ ধ্রুপদ কিন্তু আপনাকে প্রথম শুনতেই সস্তা কোনো চটুল আকর্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না। এটি আসলে হুট করে প্রেমে পড়ার মতো কোনো সুর নয়; ধ্রুপদ হলো ধীরে ধীরে, ভালোবেসে উপলব্ধি করার বিষয়।
এখানে আপনাকে একটু সময় নিয়ে, বুক ভরা ধৈর্য নিয়ে বসতে হবে। শিল্পী কীভাবে পরম মমতায় একটা রাগের বীজ বুনে তাকে ডালপালায় রূপ দিচ্ছেন, সেই বিকাশটাকে খুব মন দিয়ে খেয়াল করতে হয়। এই কারণেই আমাদের সংগীতের দুনিয়ায় একটা অলিখিত নিয়ম আছে—অনেকেই প্রথমে একটু চঞ্চল ও অলংকারময় ‘খেয়াল’ গায়কি শুনে কান তৈরি করেন, আর তারপর কান যখন আরও পরিপক্ব হয়, তখন তারা ধ্রুপদের এই গভীর সমুদ্রের দিকে পা বাড়ান।
তবে বিশ্বাস করুন, একবার যদি ধ্রুপদের প্রতি আপনার এই ‘শ্রবণ-সংবেদন’ বা সুরের কানটা তৈরি হয়ে যায়, তখন এর ভেতরের গভীরতা আর সূক্ষ্মতা আপনার কাছে একদম অন্যভাবে ধরা দেবে। তখন ওই আলাপের ধীরগতির মায়াবী বিস্তার, পাখোয়াজের সেই গমগমে রাজকীয় ছন্দ আর একটা নির্দিষ্ট স্বরের ওপর শিল্পীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা—সবকিছু মিলিয়ে আপনার মনের ভেতর এমন এক অপার্থিব ও পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার জন্ম দেবে, যার স্বাদ আর কোনো কিছুতেই পাবেন না। ধ্রুপদ হলো সুরের সেই ধীরগতির ধ্যান, যা একবার ছুঁয়ে গেলে আর সহজে মন থেকে মোছা যায় না।
পরিবেশনার ভিন্নতা
ওপরে ধ্রুপদ পরিবেশনের যে সুন্দর, গোছানো ধারাবাহিকতা বা নিয়মের কথা আমরা আলোচনা করলাম—তা কিন্তু একটা সাধারণ বা আদর্শ সুর-কাঠামো। খাতার কলমে বা শাস্ত্রের নিয়মে এটা একরকম হলেও, বাস্তবের মঞ্চে ঘরানা, শিল্পী, পরিবেশন করার সময় কিংবা আসরের মেজাজ অনুযায়ী এই চেনা বিন্যাসে মাঝেমধ্যেই কিছু চমৎকার রদবদল ঘটে।
সংগীত তো আসলে কোনো রোবটের কাজ নয়, এটি মানুষের ভেতরের এক জীবন্ত শিল্প। তাই কোনো কোনো ঘরানার শিল্পী হয়তো আলাপের কোনো একটা বিশেষ অংশকে একটু ভিন্ন গতিতে বা নিজের মতো করে অলংকৃত করে গাইতে ভালোবাসেন। আবার কেউ হয়তো প্রবন্ধের অংশগুলো, অর্থাৎ স্থায়ী-অন্তরার কাটাকুটিতে নিজের নিজস্বতা বা ঘরানাধারী সিগনেচার স্টাইল ফুটিয়ে তোলেন।
তবে হ্যাঁ, মূল রাস্তায় কিছুটা এদিক-ওদিক বাঁক নিলেও, ধ্রুপদের এই যে আদি ও মৌলিক খাঁচাটি—এটা কিন্তু সবখানেই এক থাকে। আর এই মূল জ্যামিতিক কাঠামোটা যদি আপনার মাথায় একবার গেঁথে যায়, তবে যেকোনো বড় ওস্তাদের ধ্রুপদ শোনাই হোক না কেন, তা বোঝা আর তা থেকে রস আস্বাদন করা আপনার জন্য জলভাত হয়ে যাবে!
ধ্রুপদ বিষয়ে একটি টিউটোরিয়াল:
ধ্রুপদ বিষয়ে আরও একটি টিউটোরিয়াল:
ধ্রপদের এক ধরনের ইতিহাস:
আদি সুরের অনন্ত যাত্রা
ধ্রুপদ কেবল একটা গায়নরীতি নয়—এটি আসলে পুরো হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই মজবুত ভিত্তিমূল বা শক্ত শিকড়, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সুরের এই বিশাল মহীরুহ। এখানে রাগের খাঁটি বিশুদ্ধতা, একটা নির্দিষ্ট স্বরের ওপর অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি (স্থিতি) আর তালের ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া হয়।
ধ্রুপদ কিন্তু চট করে শিখে ফেলার মতো কোনো সাধারণ বিদ্যা নয়; এটি শিল্পীর কাছ থেকে বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘ কঠোর অনুশীলন, সুরের ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ আর ঋষিসুলভ একাগ্রতা দাবি করে। আর এই অতল সাধনার মধ্য দিয়েই রাগসংগীতের যে সবচেয়ে আদিম, মৌলিক আর খাঁটি রূপ—তা আমাদের মতো সাধারণ শ্রোতাদের সামনে এক অপার্থিব আলো হয়ে ধরা দেয়। ধ্রুপদ তাই সুরের এক অনন্ত যাত্রা, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয়ের গভীরে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি জুগিয়ে চলেছে।
আরও দেখুন:
- অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ সূচি [ গান খেকো ]
- ধ্রুপদ নিয়ে সঙ্গীত গুরুকুলে যা লিখেছি – ধ্রুপদ । গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত [ সঙ্গীত গুরুকুল ]
