বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে তিনি ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের প্রথম সোপান। কেবল নারী নয়, বঙ্গবন্ধু শিশুদের সুরক্ষাকল্পেও ছিলেন আপসহীন। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিশুদের সকল অধিকার নিশ্চিত করেন এবং ১৯৭৪ সালে সুদূরপ্রসারী ‘শিশু আইন’ প্রণয়ন করেন। একই সাথে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ প্রশস্ত করেন।
বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শকে ধারণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশের নারী ও শিশু খাত এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকার ব্যাপক ও বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নারীর অধিকার সুরক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং শিশুদের সার্বিক বিকাশে গত দশ বছরে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা আজ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “নারী ও শিশু” খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

পর্ব ১: রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
গত দশ বছরে বাংলাদেশের নারীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এই পর্যায়টি কয়েকটি উপ-বিভাগে আলোচনা করা হলো:
১. আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি
নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী শিক্ষার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
ইউএন উইমেন সম্মাননা: নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য তাকে ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ খেতাব প্রদান করা হয়।
এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড: গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম তাকে ২০১৬ সালে এই সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান করে।
ইউনেস্কো পিস ট্রি পুরস্কার: ২০১৪ সালে নারী শিক্ষা প্রসারে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার পান।
গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড: ২০১৮ সালের এপ্রিলে সিডনিতে তাকে এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
২. রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের শীর্ষ শিখর
বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্ব নারীদের হাতে।
জাতীয় সংসদ: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী স্পিকার জাতীয় সংসদ পরিচালনা করছেন। একই সাথে সংসদ নেতা, উপনেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদেই নারীরা আসীন।
সংসদীয় আসন বৃদ্ধি: জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচিত ২১ জনসহ মোট ৭১ জন নারী সংসদ সদস্য সংসদে নারী অধিকারের পক্ষে কথা বলছেন।
বৈশ্বিক অবস্থান: ২০১৫ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৬ষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছে।
৩. প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় নেতৃত্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
সরকার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নারীদের আসীন করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জেন্ডার বৈষম্য দূর করেছে।
সচিব ও উচ্চপদ: বর্তমানে সচিব পদে ৭ জন এবং অতিরিক্ত সচিব পদে ৭৮ জন নারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রথমবারের নিয়োগ: বর্তমান সরকারের আমলেই প্রথমবারের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ভাইস চ্যান্সেলর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএসএমএমইউ-তে নারী প্রো-ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ও প্রতিরক্ষা: সরকার সর্বপ্রথম নারী রাষ্ট্রদূত, এবং সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে নারীর প্রবেশ নিশ্চিত করেছে।
বিচার বিভাগ ও প্রশাসন: সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে নারী বিচারপতি নিয়োগ, এবং জেলা প্রশাসক (DC) ও পুলিশ সুপার (SP) পদে নারীদের পদায়ন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী ‘নির্বাচন কমিশনার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে নারী নিয়োগের মাধ্যমে আর্থিক খাতেও নারীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৪. তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
নারীকে স্থানীয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করতে সরকার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উপজেলা ও ইউনিয়ন: উপজেলা পরিষদে নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদের সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ৩টি করে সংরক্ষিত আসন রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৪,৫৪০টি ইউনিয়নে সর্বমোট ১৩,৬২০ জন নারী সদস্য সরাসরি তৃণমূলের মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

পর্ব ২: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়—এই দর্শন থেকে সরকার দরিদ্র ও দুস্থ নারীদের জন্য বিশাল এক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।
১. খাদ্য নিরাপত্তা ও ভিজিডি কর্মসূচি
দুস্থ, নির্যাতিত ও অসহায় মহিলাদের জন্য সরকার বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
ভিজিডি উপকারভোগী: গত দশ বছরে ৭১ লক্ষ ভিজিডি উপকারভোগী নারীকে প্রতি ২৪ মাসের সাইকেলে মাসে ৩০ কেজি করে পুষ্টি চাল প্রদান করা হয়েছে।
মেয়াদ বৃদ্ধি: ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর থেকে ১০.৪০ লক্ষ নারীর জন্য এই সাইকেলের মেয়াদ ২৪ মাস থেকে বাড়িয়ে ৩৬ মাস করা হয়েছে, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা পায়।
২. মাতৃত্বকালীন ও দুগ্ধবতী ভাতা
মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করছে।
মাতৃত্বকাল ভাতা: ২৭.৭৬ লক্ষ দরিদ্র গর্ভবতী মহিলাকে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে এই ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা এবং মেয়াদ ২৪ মাস থেকে ৩৬ মাস করা হয়েছে।
ল্যাকটেটিং মা ভাতা: ১১.০৯ লক্ষ দুগ্ধবতী উপকারভোগী মাকে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৮০০ টাকা (৩৬ মাস মেয়াদে) করা হয়েছে।
৩. বিশেষ অনুদান ও জীবিকায়ন প্রকল্প
উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন: নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাগঞ্জের ২২টি উপজেলায় ৫০,০০০ অতি দরিদ্র মহিলাকে ১৫,৫০০ টাকা এবং ৩০,০০০ চাষীকে ১০,৬০০ টাকা করে জীবিকায়নের অনুদান দেওয়া হয়েছে।
ICVGD প্রকল্প: ৭ জেলার ৮টি উপজেলায় ৮ হাজার নারীকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য মাথাপিছু এককালীন ১৫,০০০ টাকা অনুদান এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

পর্ব ৩: উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং ‘জয়িতা’ ও ‘তথ্য আপা’ উদ্যোগ
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কেবল ভাতা প্রদান নয়, বরং তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বৈপ্লবিক কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
১. জয়িতা ফাউন্ডেশন: তৃণমূল উদ্যোক্তাদের আলোকবর্তিকা
নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ এবং তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’ গঠন করেছে।
বাজারজাতকরণ সুবিধা: জয়িতার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১৮০টি স্টলে ১৮,০০০ নারী উদ্যোক্তা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ধানমন্ডি বিক্রয় কেন্দ্র: ঢাকার ধানমন্ডির রাপা প্লাজায় বিশাল পরিসরে ‘জয়িতা’ বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে ১৪টি মহিলা সমিতির উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শিত ও বিক্রয় হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ ও সহায়তা: জয়িতার মাধ্যমে ১৪,৯৬০ জন নারী উদ্যোক্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক সহায়তা এবং ২৩,৫০০ জন উদ্যোক্তাকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া দেশ ও বিদেশে ৭৯৯ জন উদ্যোক্তাকে সরাসরি বাজারজাতকরণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
২. দক্ষতা উন্নয়ন ও আইজিএ (IGA) প্রকল্প
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ব্যাপক কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
তৃণমূল প্রশিক্ষণ: দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩১,২৫০ জন তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাকে সরাসরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘ট্রেনিং অফ উইমেন অ্যাট উপজেলা লেভেল’ (IGA) প্রকল্পের আওতায় ৪২৬টি উপজেলায় ২,১৭,৪৪০ জন সুবিধাবঞ্চিত নারীকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিশাল কর্মযজ্ঞ চলমান রয়েছে।
জাতীয় মহিলা প্রশিক্ষণ একাডেমি: ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১.৮৪ লক্ষ শিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত নারীকে আবাসিক ও অনাবাসিক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিক প্রশিক্ষণ: নারী উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সব মিলিয়ে ৩৩.৪৩ লক্ষ মহিলাকে বিভিন্ন কারিগরি ও সেবামূলক ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
৩. তথ্য আপা: ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা তৃণমূলের নারীর দ্বারে
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে ‘তথ্য আপা’ প্রকল্প এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা: গ্রামীণ মহিলাদের তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ২৫ লক্ষ গ্রামীণ ও শহুরে নারীকে আইসিটি সেবা প্রদান করা হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা: প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯০টি উপজেলায় কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো ১ কোটি নারীকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবার আওতায় আনা। এই কেন্দ্রগুলো থেকে নারী নির্যাতনের শিকার মহিলারাও আইনগত পরামর্শ ও তথ্য সেবা পাচ্ছেন।
পর্ব ৪: নারী ও শিশু সুরক্ষা, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে সরকার কঠোর প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
১. ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (OCC) ও সেল
নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিক সেবা দিতে সরকার ওয়ান স্টপ সেন্টার ব্যবস্থা চালু করেছে।
সেবা প্রাপ্তি: দেশের ৬০টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার হতে ৩৩,৫০৩ জন এবং ৪০টি সদর হাসপাতাল ও ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্রাইসিস সেল হতে ৪০,৮৪৩ জন নারী ও শিশুকে চিকিৎসা, আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ডিএনএ ল্যাবরেটরি: ৪,৬১৯টি মামলায় শিশুর পিতৃপরিচয় নির্ধারণ ও অপরাধী শনাক্তকরণে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে।
ট্রমা কাউন্সিলিং: ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টার থেকে ১,৪৭০ জন এবং কক্সবাজারের উখিয়ায় রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের মনোসামাজিক সেবা দেওয়া হচ্ছে।
২. ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯ ও ‘জয়’ অ্যাপ
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার এখন অনেক বেশি সক্রিয়।
১০৯ হেল্পলাইন: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এই হেল্পলাইনের মাধ্যমে ৯,৮৪,১২৫টি ফোনকল গ্রহণ করে বাল্যবিবাহ বন্ধ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করা হয়েছে।
‘জয়’ মোবাইল অ্যাপ: ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই চালু হওয়া এই অ্যাপটির মাধ্যমে বিপদে পড়া নারী ও শিশুরা তাৎক্ষণিকভাবে ৩টি সংরক্ষিত মোবাইল নম্বরে সাহায্যের সংকেত পাঠাতে পারেন।
৩. বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধ
সামাজিক সচেতনতা: ১১,৬৩৬টি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ১,৫৫,১৭৭ জনকে সচেতন করা হয়েছে। এছাড়া ৬৪টি উপজেলায় বাল্যবিবাহ মনিটরিং কার্যক্রমের ফলে ২,৭৬৩ জন শিশু বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিশোর-কিশোরী ক্লাব: বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে ৪৪টি উপজেলায় ৫২৯টি (পরবর্তীতে ৬৪ জেলায় ৫,২৯২টি) কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন করা হয়েছে।
পর্ব ৫: আবাসন, ক্ষুদ্রঋণ এবং আইনি সংস্কার
১. আবাসন ও কর্মজীবী নারীদের সুবিধা
হোস্টেল সুবিধা: ৮টি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের মাধ্যমে ১৯,৯২৯ জন নারীকে নিরাপদ আবাসনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ডে-কেয়ার সেন্টার: ৭৪টি ডে-কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে ৩৬,১৮৩ জন কর্মজীবী মায়ের শিশুর দিবা যত্ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
সেলাই মেশিন বিতরণ: ১৭,০৫০টি সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে প্রশিক্ষিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে।
২. ক্ষুদ্রঋণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনা
আত্ম-কর্মসংস্থান: ২.৫১ লক্ষ মহিলার মাঝে ৩৪৯০.৬২ লক্ষ টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৬৪ জেলার ৪৯১টি উপজেলায় ৬৩ হাজার দুস্থ মহিলার মাঝে ১০.২৫ কোটি টাকার তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
কল্যাণ তহবিল: অসহায় মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিলের লভ্যাংশ থেকে ১১,৮৪১ জনকে ৫ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
৩. প্রণীত আইন ও বিধিমালা (২০০৯-২০১৮)
নারী ও শিশুর সুরক্ষায় এই দশ বছরে বেশ কিছু যুগান্তকারী আইন ও বিধিমালা প্রণীত হয়েছে:
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ ও জাতীয় শিশু নীতি ২০১১।
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ ও বিধিমালা ২০১৩।
শিশু আইন ২০১৩ ও ডিএনএ আইন ২০১৮।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা ২০১৭ (খসড়া)।
যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৭ (খসড়া) এবং জাতীয় সাইকোলজি কাউন্সিলিং পলিসি ২০১৪ (খসড়া)।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই দশ বছর ছিল বাংলাদেশের নারী ও শিশুদের অগ্রগতির এক স্বর্ণযুগ। “শেখ হাসিনার বারতা, নারী-পুরুষ সমতা”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে সরকার যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তার ফলে নারীর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন এখন সুসংহত। পিতার পাশাপাশি মাতার নাম অন্তর্ভুক্তকরণ এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়সীমা বৃদ্ধি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এই ধারাবাহিক উন্নয়ন বাংলাদেশকে অদূর ভবিষ্যতে একটি জেন্ডার-সমতাভিত্তিক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
