নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় । নুরুলদীনের সারাজীবন । সৈয়দ শামসুল হক । কবিতা সংগ্রহ

সৈয়দ শামসুল হকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কালজয়ী কাব্যনাট্য ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল আবৃত্ত অংশ হলো—“নুরুলদীনের কথা মনে পইড়া যায়।” এই কবিতা বা কাব্যাংশটির প্রেক্ষাপট যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

এই কবিতার মূল চরিত্র এবং প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে আজ থেকে প্রায় আড়াইশত বছর আগের এক ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথা চালু করার আগে, তারা ইজারাদারদের মাধ্যমে বাংলার কৃষকদের ওপর নির্মমভাবে খাজনা আদায় করত।

১৭৮১ সালে উত্তরবঙ্গের (বিশেষ করে রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে) দেবী সিংহ নামে এক অত্যাচারী ইজারাদারকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দেবী সিংহ এবং তার পেয়াদা-লাঠিয়ালরা কৃষকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। ঘরের ধান, গরু-বাছুর কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে নারীদের ওপর নির্যাতন—সব সীমারেখা অতিক্রম করে তারা।

এই চরম শোষণের বিরুদ্ধে ১৭৮৩ সালে উত্তরবঙ্গের সাধারণ কৃষক সম্প্রদায় একতাবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি ও জমিদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা ইতিহাসে ‘রংপুর বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। আর এই ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহের মহানায়ক ও প্রধান নেতা ছিলেন নুরুলদীন (স্থানীয় উচ্চারণে নূুরউদ্দীন)। তিনি সাধারণ কৃষকদের ডাক দিয়েছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত স্লোগানে—“জাগো বাহে, কোনঠে সবায়!” (ওহে ভাইরা, আপনারা সবাই কোথায়? জেগে উঠুন!)। ব্রিটিশদের সাথে এক সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে নুরুলদীন শহীদ হন।

নূরলদীনের কথা মনে পইড়া যায় – সৈয়দ শামসুল হক

নিলক্ষা আকাশ নীল, হাজার হাজার তারা ঐ নীলে অগণিত আর

নিচে গ্রাম, গঞ্জ, হাট, জনপদ, লোকালয় আছে উনসত্তর হাজার ।

ধবল দুধের মতো জ্যোৎস্না তার ঢালিতেছে চাঁদ-পূর্ণিমার ।

নষ্ট ক্ষেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট, বড় নষ্ট যখন সংসার

তখন হঠাৎ কেন দেখা দেয় নিলক্ষার নীলে তীব্র শিস

দিয়ে এত বড় চাঁদ?

 

অতি অকস্মাৎ

স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি? কোন শব্দ? কিসের প্রপাত ?

গোল হয়ে আসুন সকলে,

ঘন হয়ে আসুন সকলে,

আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে ।

অতীত হঠাৎ হাতে হানা দেয় মানুষের বন্ধ দরোজায় ।

এই তীব্র স্বচ্ছ পূর্ণিমায়

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় ।

কালঘুম যখন বাংলায়

তার দীর্ঘ দেহ নিয়ে আবার নূরলদীন দেখা দেয় মরা আঙিনায় ।

 

নূরলদীনের বাড়ি রংপুরে যে ছিল,

রংপুরে নূরলদীন ডাক দিয়েছিল

১১৮৯ সনে ।

আবার বাংলার বুঝি পড়ে যায় মনে,

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়;

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়;

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়;

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায় ।

 

আসুন, আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে;

যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে,

তখন কে থাকে ঘুমে? কে থাকে ভেতরে?

কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে?

সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে ।

নূরলদীনেরও কথা যেন সারা দেশে

পাহাড়ি ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়,

অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়

যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,

আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়

দিবে ডাক, “জাগো, বাহে, কোনঠে সবায় ?”

 

– সৈয়দ শামসুল হক (নূরলদীনের সারাজীবন)

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

সৈয়দ শামসুল হক ১৯৭৪ সালে এই কাব্যনাট্যটি লেখার কাজ শুরু করেন এবং এটি প্রকাশিত ও মঞ্চস্থ হয় ১৯৮২ সালে। এই সময়কালটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারী শাসন—সব মিলিয়ে দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

চারিদিকে যখন এক সামরিক স্বৈরাচারী অন্ধকার, মানুষের ওপর যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ চলছে, অথচ ভয়ের সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষ রাজপথে নামতে পারছে না—ঠিক সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে কবি সৈয়দ শামসুল হকের মনে পড়েছিল ১৭৮৩ সালের সেই প্রতিবাদী নায়ক নুরুলদীনকে। কবি সমসাময়িক বাংলাদেশের অবদমিত, নিথর ও নিস্তব্ধ সমাজের বুকে নুরুলদীনের সেই বজ্রকণ্ঠের ডাক ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment