পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর শাস্ত্রীয় গানবাজনার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ছিল না। বরং তাঁর আধুনিক বাংলা গান দিয়েই আমার শোনার শুরু। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে যায় তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর জগতে। আজ তাঁর জন্মদিনে, সেই আবিষ্কারের পথটাকেই মনে করে শ্রদ্ধা জানাই।
অজয় চক্রবর্তী জন্মগ্রহণ করেন ২৫ ডিসেম্বর ১৯৫২ সালে, কলকাতায়। সংগীত যেন তাঁর জীবনের প্রথম ভাষা। তাঁর পিতা অজিত কুমার চক্রবর্তী দেশভাগের সময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে বসবাস শুরু করেন। শ্যামনগরের সেই পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠা—যেখানে সংসার, সংগ্রাম আর সংগীত একসঙ্গে মিশে ছিল।
শৈশবেই তাঁর সংগীতের ভিত তৈরি হয় পিতার হাত ধরে। অজিত কুমার চক্রবর্তীই ছিলেন তাঁর প্রথম গুরু। এরপর তিনি শ্রী পান্নালাল সামন্ত ও শ্রী কানাইদাস বৈরাগীর কাছে সংগীতের প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের তালিম নেন। এই ধারাবাহিক শিক্ষার পরবর্তী বড় অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দীক্ষা নেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ-এর কাছে।
এরপর তিনি তালিম নেন উস্তাদ মুনাওয়ার আলী খান-এর কাছে, যিনি ছিলেন উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান-এর পুত্র। এই ধারার মধ্য দিয়ে তিনি পটিয়ালা ঘরানার গায়কি গভীরভাবে আয়ত্ত করেন।
তবে তাঁর বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি কোনো একক ঘরানায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পটিয়ালা ঘরানার পাশাপাশি ইন্দোর, দিল্লি, জয়পুর, গোয়ালিয়র, আগ্রা, কিরানা, রামপুর—এমনকি দক্ষিণ ভারতের কার্নাটিক সংগীতের ধারাতেও তাঁর অনায়াস বিচরণ। ফলে তাঁর গায়কি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক ও সমন্বয়ধর্মী।
শিক্ষাজীবনে তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৭৭ সালে যোগ দেন আইটিসি সঙ্গীত গবেষণা অকাদেমি-তে। সেখানে তিনি একমাত্র স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হিসেবে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন এবং পরবর্তীকালে জ্যেষ্ঠ গুরু হিসেবে শিক্ষা নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শিল্পী হিসেবে তাঁর বিস্তারও অসাধারণ। শতাধিক গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে—ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে। তাঁর রেকর্ডে যেমন বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত রয়েছে, তেমনি ঠুমরি, দাদরা, ভজন, শ্যামাসঙ্গীত—সব ধারার গানই সমান দক্ষতায় পরিবেশিত হয়েছে।
বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তাঁর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতও গেয়েছেন তিনি গভীর নিষ্ঠায়।
শুধু শিল্পী নয়—গুরু হিসেবেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৩ সালে গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের অনুপ্রেরণায় তিনি টালিগঞ্জে “শ্রুতিনন্দন” প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান আজ ভারতীয় রাগসংগীতের চর্চা ও বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বহু নবীন প্রতিভা এখানে তাঁর কাছে তালিম নিচ্ছে। তাঁর কন্যাও তাঁরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন।
সম্মাননার ক্ষেত্রেও তাঁর প্রাপ্তি বিস্তৃত। ২০১১ সালে তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী লাভ করেন। এর আগে ১৯৯৯-২০০০ সালে সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে কুমার গৌরব পুরস্কার এবং ১৯৮৯ সালে চলচ্চিত্র “ছন্দনীড়”-এর জন্য শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার অর্জন করেন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি সমানভাবে সমাদৃত। পাকিস্তান ও চীনের সরকারের আমন্ত্রণ পাওয়া প্রথম ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। নিউ অরলিয়েন্সে সঙ্গীত পরিবেশনের পর তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
নিজ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকেও তিনি একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১২ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাত থেকে “মহাসঙ্গীত সম্মান” ও বঙ্গভূষণ লাভ করেন। একই বছরে “আলভাস বিরাসাত” পুরস্কারও পান। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় তানসেন সম্মান প্রদান করে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চন্দনা চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ। তাঁদের কন্যা কৌশিকী চক্রবর্তী আজ নিজেও প্রথিতযশা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। পুত্র অঞ্জন চক্রবর্তী সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।
সবশেষে ফিরে আসি আমার নিজের জায়গায়। তাঁর গান শুনে আমার যে যাত্রা শুরু—আধুনিক বাংলা গান থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকে—তা যেন এক শিক্ষার পথও বটে।
তাঁর জন্মদিনে তাঁকে প্রণাম জানানো মানে, সেই সেতুটির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো।