“প্রিয় কবিতার তালিকায় ‘পৃথিবী’ কবিতাটি সব সময়ই ওপরের দিকে থাকবে। এতবার পড়েছি যে, একসময় পুরোটা মুখস্থ ছিল। আমার জীবনে মুখস্থ হয়ে যাওয়া দীর্ঘতম কবিতাও সম্ভবত এটিই। আমাদের জন্য এটি ছিল এক ধরণের ‘টাং টুইস্টার’। নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করতে, পৃথিবীর বিশালতার সাথে নিজের সম্পর্ক বুঝতে কিংবা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে এই কবিতাটি পড়তে পারেন। পড়ার গভীরে গেলে একসময় এটি আপনার কাছে এক অনন্য প্রার্থনা হিসেবে ধরা দেবে।

পৃথিবী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী,
শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদীতলে।
মহা বীর্যবতী তুমি, বীরভোগ্যা;
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,
মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে;
মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দুঃসহ দ্বন্দ্বে।
ডান হাতে পূর্ণ কর সুধা, বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র;
তোমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত কর অট্টবিদ্রূপে।
দুঃসাধ্য কর বীরের জীবনকে মহৎ জীবনে যার অধিকার;
শ্রেয়কে কর দুর্মূল্য; কৃপা কর না কৃপাপাত্রকে।
তোমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম;
ফলে শস্যে তার জয়মাল্য হয় সার্থক।
জলে স্থলে তোমার ক্ষমাহীন রণরঙ্গভূমি,
সেখানে মৃত্যুর মুখে ঘোষিত হয় জয়ী প্রাণের জয়বার্তা।
তোমার নির্দয়তার ভিত্তিতে উঠেছে সভ্যতার জয়তোরণ;
ত্রুটি ঘটলে তার পূর্ণ মূল্য শোধ হয় বিনাশে।
তোমার ইতিহাসের আদিপর্বে দানবের প্রতাপ ছিল দুর্জয়;
সে পুরুষ, সে বর্বর, সে মূঢ়।
তার অঙ্গুলি ছিল স্থূল, কলাকৌশলবর্জিত;
গদাহাতে মুষলহাতে লণ্ডভণ্ড করেছে সে সমুদ্র পর্বত;
অগ্নিতে বাষ্পেতে দুঃস্বপ্ন ঘুলিয়ে তুলেছে আকাশে।
জড়রাজত্বে সে ছিল একাধিপতি;
প্রাণের পরে ছিল তার অন্ধ ঈর্ষা।
দেবতা এলেন পরযুগে; মন্ত্র পড়লেন দানবদমনের—
জড়ের ঔদ্ধত্য হল অভিভূত,
জীবধাত্রী বসলেন শ্যামল আস্তরণ পেতে।
ঊষা দাঁড়ালেন পূর্বাচলের শিখরচূড়ায়,
পশ্চিম সাগরতীরে সন্ধ্যা নামলেন মাথায় নিয়ে শান্তিঘট।
নম্র হল শিকলে-বাঁধা দানব,
তবু সেই আদিম বর্বর আঁকড়ে রইল তোমার ইতিহাস।
ব্যবস্থার মধ্যে সে হঠাৎ আনে বিশৃঙ্খলতা;
তোমার স্বভাবের কালো গর্ত থেকে
হঠাৎ বেরিয়ে আসে এঁকেবেঁকে।
তোমার নাড়ীতে লেগে আছে তোমার পাগলামি—
দেবতার মন্ত্র উঠেছে আকাশে বাতাসে অরণ্যে
দিনে রাত্রে উদাত্ত অনুদাত্ত মন্দ্রস্বরে;
তবু তোমার বুকের পাতাল থেকে আধ-পেষা নাগদানব
ক্ষণে ক্ষণে উঠেছে ফণা তুলে,
তার তাড়নায় তোমার আপন জীবকে করেছ আঘাত,
ছারখার করছ আপন সৃষ্টিকে।
শুভে-অশুভে স্থাপিত তোমার পাদপীঠে
তোমার প্রচণ্ড সুন্দর মহিমার উদ্দেশে
আজ রেখে যাব আমার ক্ষতচিহ্নলাঞ্ছিত জীবনের প্রণতি।
বিরাট প্রাণের, বিরাট মৃত্যুর, গুপ্ত সঞ্চার তোমার যে মাটির তলায়
তাকে আজ স্পর্শ করি, উপলব্ধি করি সর্ব দেহে মনে।
অগণিত যুগযুগান্তরের অসংখ্য মানুষের লুপ্ত দেহ পুঞ্জিত তার ধুলায়।
আমিও রেখে যাব কয়েক-মুষ্টি ধূলি, আমার সমস্ত সুখ-দুঃখের শেষ পরিণাম—
রেখে যাব এই নামগ্রাসী আকারগ্রাসী সকল-পরিচয়-গ্রাসী
নিঃশব্দ ধূলিরাশির মধ্যে।
অচল অবরোধে আবদ্ধ পৃথিবী, মেঘলোকে উধাও পৃথিবী,
গিরিশৃঙ্গমালার মহৎ মৌনে ধ্যাননিমগ্না পৃথিবী,
নীলাম্বুরাশির অতন্দ্র তরঙ্গে কলমন্দ্রমুখরা পৃথিবী,
অন্নপূর্ণা তুমি সুন্দরী, অন্নরিক্তা তুমি ভীষণা।
এক দিকে আপক্বধান্যভারনম্র তোমার শস্যক্ষেত্র—
সেখানে প্রসন্ন প্রভাতসূর্য প্রতিদিন মুছে নেয় শিশিরবিন্দু
কিরণ-উত্তরীয় বুলিয়ে দিয়ে;
অস্তগামী সূর্য শ্যামশস্যহিল্লোলে রেখে যায় অকথিত এই বাণী
‘আমি আনন্দিত’।
অন্য দিকে তোমার জলহীন ফলহীন আতঙ্কপাণ্ডুর মরুক্ষেত্র
পরিকীর্ণ পশুকঙ্কালের মধ্যে মরীচিকার প্রেতনৃত্য।
বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল
কালো শ্যেন-পাখির মতো তোমার ঝড়—
সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠল যেন কেশর-ফোলা সিংহ;
তার লেজের ঝাপটে ডালপালা আলুথালু করে
হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উবুড় হয়ে;
হাওয়ার মুখে ছুটল ভাঙা কুঁড়ের চাল
শিকল-ছেঁড়া কয়েদি-ডাকাতের মতো।
আবার ফাল্গুনে দেখেছি তোমার আতপ্ত দক্ষিণ হাওয়া
ছড়িয়ে দিয়েছে বিরহ-মিলনের স্বগত-প্রলাপ আম্রমুকুুলের গন্ধে;
চাঁদের পেয়ালা ছাপিয়ে দিয়ে উপচিয়ে পড়েছে স্বর্গীয় মদের ফেনা;
বনের মর্মরধ্বনি বাতাসের স্পর্ধায় ধৈর্য হারিয়েছে
অকস্মাৎ কল্লোলোচ্ছ্বাসে।
স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্র তুমি, পুরাতনী তুমি নিত্য-নবীনা,
অনাদি সৃষ্টির যজ্ঞ-হুতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে
সংখ্যা-গণনার-অতীত প্রত্যুষে;
তোমার চক্রতীর্থের পথে পথে ছড়িয়ে এসেছে
শত শত ভাঙা ইতিহাসের অর্ধ-লুপ্ত অবশেষ;
বিনা বেদনায় বিছিয়ে এসেছে তোমার বর্জিত সৃষ্টি
অগণ্য বিস্মৃতির স্তরে স্তরে।।
জীবপালিনী, আমাদের পুষেছ
তোমার খণ্ডকালের ছোট ছোট পিঞ্জরে,
তারই মধ্যে সব খেলার সীমা, সব কীর্তির অবসান।।
আজ আমি কোন মোহ নিয়ে আসি নি তোমার সম্মুখে;
এতদিন যে দিনরাত্রির মালা গেঁথেছি বসে বসে
তার জন্য অমরতার দাবি করব না তোমার দ্বারে।
তোমার অযুত নিযুত বৎসর সূর্যপ্রদক্ষিণের পথে
যে বিপুল নিমেষগুলি উন্মীলিত নিমীলিত হতে থাকে
তারই এক ক্ষুদ্র অংশে কোন-একটি আসনের
সত্যমূল্য যদি দিয়ে থাকি,
জীবনের কোন-একটি ফলবান খণ্ডকে
যদি জয় করে থাকি পরম দুঃখে
তবে দিয়ো তোমার মাটির ফোঁটার একটি তিলক আমার কপালে;
সে চিহ্ন যাবে মিলিয়ে
যে রাত্রে সকল চিহ্ন পরম অচিনের মধ্যে যায় মিশে।।
হে উদাসীন পৃথিবী,
আমাকে সম্পূর্ণ ভোলবার আগে
তোমার নির্মম পদপ্রান্তে
আজ রেখে যাই আমার প্রণতি।।
একালে কিছুটা কম-ব্যবহৃত শব্দের সহজ মানে:
- প্রণতি / শেষ নমস্কার: অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে মাথা নত করে সালাম বা সম্মান জানানো।
- দিনাবসানের বেদীতলে: দিন শেষ হওয়ার সময় বা সূর্যাস্তের মুহূর্তকে এখানে একটি পবিত্র মঞ্চের (বেদী) সাথে তুলনা করা হয়েছে।
- বীরভোগ্যা: কবি বলছেন পৃথিবী সাহসী মানুষের জন্য; অর্থাৎ যে লড়াই করে টিকে থাকে, পৃথিবী তার।
- ললিতে কঠোরে: একই সাথে নরম (সুন্দর) এবং শক্ত (কঠিন) স্বভাবের।
- অট্টবিদ্রূপে: বড় ধরণের হাসাহাসি বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
- রণরঙ্গভূমি: যুদ্ধের ময়দান। কবি বুঝিয়েছেন প্রকৃতিতে সবসময় টিকে থাকার লড়াই চলছে।
- জয়তোরণ: বিজয়ের গেট বা তোরণ।
- আদিপর্ব: ইতিহাসের একদম শুরুর সময়।
- মুষলহাতে: হাতুড়ির মতো এক ধরণের ভারী অস্ত্র নিয়ে।
- জড়রাজত্ব: প্রাণের অস্তিত্বহীন যে জগত (পাথর, আগুন, বাষ্প)।
- জীবধাত্রী: যিনি জীবনকে ধারণ বা লালন করেন (এখানে পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে)।
- শান্তিঘট: শান্তি বা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে জলভরা কলস।
- আধ-পেষা: অর্ধেক পিষে ফেলা হয়েছে এমন (এখানে অবদমিত অশুভ শক্তিকে বোঝানো হয়েছে)।
- অন্নপূর্ণা ও অন্নরিক্তা: পৃথিবী একদিকে মা অন্নপূর্ণার মতো খাবার দেয় (সুন্দর), অন্যদিকে সে অন্নহীন বা ভীতিজাগানিয়া (ভীষণা)।
- আপক্বধান্যভারনম্র: পেকে যাওয়া ধানের ভারে নুইয়ে পড়া (শস্যক্ষেত)।
- আতঙ্কপাণ্ডুর: ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
- মরীচিকার প্রেতনৃত্য: মরুভূমিতে জলের ভ্রম বা মরিচীকাকে কবি ভূতের নাচের সাথে তুলনা করেছেন।
- বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ: বজ্রপাত বা বিদ্যুৎকে মনে হচ্ছে যেন বাজপাখির ধারালো ঠোঁট, যা আকাশকে বিঁধে ফেলছে।
- বনস্পতি: অনেক বড় বা বিশাল গাছ।
- পুরাতনী ও নিত্য-নবীনা: পৃথিবী অনেক পুরনো, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সে নতুন (সূর্যোদয় বা নতুন প্রাণের মাধ্যমে)।
- চক্রতীর্থ: বার বার ঘুরে আসা যাত্রাপথ (পৃথিবী যেমন সূর্যের চারদিকে ঘোরে)।
- বিস্মৃতির স্তরে স্তরে: ভুলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পরতে পরতে।
- খণ্ডকাল: সময়ের খুব ছোট একটা অংশ।
- পিঞ্জর: খাঁচা। কবি বলছেন আমরা সময়ের এই ছোট খাঁচায় বন্দি।
- সূর্যপ্রদক্ষিণ: সূর্যের চারপাশে ঘোরা।
- উন্মীলিত ও নিমীলিত: চোখ খোলা এবং চোখ বন্ধ করা (বোঝানো হয়েছে সময়ের আসা-যাওয়া)।
- পরম অচিন: মৃত্যু বা এমন এক জগত যা আমাদের চেনা নয়।
- নির্মম পদপ্রান্ত: পৃথিবীর নির্দয় পায়ের নিচে (কারণ পৃথিবী কারও জন্য থেমে থাকে না)।
