প্রথম বাঙালি যাকে “ভারতের দালাল” ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল

“ভারতের দালাল” – এই শব্দদ্বয় পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে একপক্ষ অপরপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রভাব যতটা, পাকিস্তানে তার থেকে অনেকগুণ বেশি। এমনকি পাকিস্তানে এই ট্যাগ দিয়ে সরকার পতনের ইতিহাসও রয়েছে। এসব অনেকেই জানেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এই ট্যাগটি প্রথম কোনো বাঙালিকে দেওয়া হয়েছিল।

এই ট্যাগের প্রথম শিকার হন পিছিয়ে পড়া সনাতনী বা শিডিউল কাস্ট (ডালিট) নেতা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল (জোগেন মন্ডল)। বরিশালের এই মানুষটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন কেন্দ্রীয় ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তফসিলি (ডালিট) সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা। তিনি পাকিস্তানের প্রথম প্রস্তাবিত সংবিধানের প্রণেতাদের একজন এবং দেশের আইন ও শ্রমমন্ত্রী। এছাড়াও তিনি কমনওয়েলথ ও কাশ্মীর বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রথম আইনমন্ত্রী যোগেন মণ্ডল
পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রথম আইনমন্ত্রী যোগেন মণ্ডল

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ছিলেন ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. ভীমরাও আম্বেডকরের অনুগামী তফসিলি নেতা। দুজনের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, আম্বেডকর নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর যোগেন্দ্রনাথ তার নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে আম্বেডকরকে নির্বাচিত করে নেন। তফসিলি রাজনীতির কারণে দুজনেই উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতৃত্বের বিরোধী ছিলেন। তবে আম্বেডকর হিন্দু-বিরোধী হলেও মুসলিমদের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা ছিল না। বরং তিনি ইসলামিক শাসন বা শরিয়া বিষয়ে সমালোচক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের আগ পর্যন্ত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েরই বিরোধী ছিলেন।

যোগেন মণ্ডল ও বি আর আম্বেদকর
যোগেন মণ্ডল ও বি আর আম্বেদকর

অন্যদিকে, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল মুসলিম নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এজন্য তিনি ১৯৪৩ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। ১৯৪৬ সালে বাংলার সোহরাওয়ার্দির মন্ত্রিসভায়ও তিনি মন্ত্রী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মুসলমানরা ভারতে সংখ্যালঘু হওয়ায় সংখ্যালঘুদের সমস্যা সম্পর্কে অবগত এবং ভবিষ্যতে সহানুভূতিশীল থাকবে। এই অধিকার নিয়ে মুসলিম লীগ তার সঙ্গে চুক্তিও করেছিল। এসব বিবেচনায় রেখে তিনি মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

যোগেন্দ্রনাথ সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিন্নাহর ‘তুরুপের তাস’ ছিলেন। পাশাপাশি তার তফসিলি সম্প্রদায়ের মধ্যে একক রাজনৈতিক অবস্থান ছিল। এজন্য জিন্নাহ তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন এবং আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইতেন। এই গুরুত্বের কারণে পূর্ববাংলার মুসলিম নেতারা তাকে একটু বাঁকা চোখে দেখতেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি করাচিতে বসবাস শুরু করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য যোগেন্দ্রনাথকে যতটা প্রয়োজন ছিল, প্রতিষ্ঠার পর সেই গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তাছাড়া যোগেন্দ্রনাথ সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে নানা দাবি-দাওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন, যা নতুন পাকিস্তানের শাসকদের চোখে একটা অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা মনে হয়। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম নেতাদের সঙ্গে ক্ষমতার লড়াই তো ছিলই।

ফজলুর রহমান ও খাজা নাজিমুদ্দিনের পাশে বসে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল
ফজলুর রহমান ও খাজা নাজিমুদ্দিনের পাশে বসে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল

বিহার, হায়দ্রাবাদ, ডেক্কানের মুসলিম নেতাদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মিলমিশ ভালোই চলছিল। মাঝখানে কাবাব মে হাড়্ডি হয়ে দাঁড়ান যোগেন্দ্রনাথ। এখানেই শুরু হয় খেলা। প্রথমে শুরু হয় তার প্রতি সন্দেহ। এই সন্দেহ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ক্যাবিনেট সভায় কাশ্মীর বিষয়ে আলোচনার সময় অন্য মন্ত্রীরা যোগেন্দ্রনাথকে রাখার বিষয়ে আপত্তি জানান। তখনই যোগেন্দ্রনাথ হয়ে যান “ভারতের দালাল”। এবং তিনিই হন বাঙালিদের মধ্যে প্রথম যাকে এই ট্যাগ দেওয়া হয়।

এই “ভারতের দালাল” ক্যাম্পেইনের মাধ্যমেই যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের পাকিস্তানে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র তিন বছরের মাথায় (১৯৫০ সালে) তিনি পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে ফিরে আসতে বাধ্য হন এবং পশ্চিমবঙ্গে বসতি গড়েন।

পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পর সঙ্গত কারণেই তার আর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। পাবলিক লাইফ তার জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে, কারণ তার নিজের সম্প্রদায়ের (দলিত) অনেকে তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখতেন এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাকে পাকিস্তানপন্থী বলে অভিযুক্ত করতেন। ফলে তিনি যতদিন ভারতে বেঁচে ছিলেন, ততদিন আত্মগোপনে বা অজ্ঞাতবাসে জীবনযাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের কাজে নীরবে কিছু কাজ করেছিলেন।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

এরপর ১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয় (উত্তর ২৪ পরগনা) রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিছু সূত্রে বলা হয় হার্ট অ্যাটাক হয়েছে (নৌকায় নদী পার হওয়ার সময়), আবার অনেকে বিষক্রিয়া বা অপমৃত্যুর সন্দেহ করেন। এভাবেই অবসান ঘটে এক বিরাট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনের। আজ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের মৃত্যু দিবসে এই কথাগুলো মনে এসেছে বলেই লেখাটি লিখলাম।

এরপর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে শুরু করে বাংলার প্রতি বিশ্বস্ত ও আন্তরিক বা বাংলাপন্থী রাজনীতিক প্রত্যেকেই পাকিস্তানপন্থীদের কর্তৃক “ভারতের দালাল” ট্যাগ খেয়েছেন। এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককেই এই ট্যাগ দেয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রত্যেক স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশিকে পাকিস্তানপন্থীরা জনসভা এবং মিডিয়ায় “ভারতের দালাল” বলেই ট্যাগ করেছেন।

স্বাধীনতার পর পাকিস্তানপন্থীরা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর পুনরায় “ভারতের দালাল” গল্পটি নতুন উদ্যমে শুরু করে। তবে সেই সময় এই অস্ত্রটি খুব কার্যকর ছিল না। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি অত্যন্ত ধারালো ও কার্যকর হয়ে ওঠে স্বাধীনতাপন্থীদের কিছু লোকের দোষে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের কিছু লোক এই অস্ত্রটাকে নিজেদের মধ্যেকার কোন্দলে ব্যবহার করতে শুরু করেন। একজন অন্যজনকে এই ট্যাগ দিয়ে আহত করার চেষ্টা করেন। আর শক্তিশালীরা যখন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করে, তখন তার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তেমনটাই হয়েছে।

“ভারতের দালাল” ট্যাগ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্লট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর এটি ব্যবহার করা হয়েছে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যায়। এই অস্ত্রের উপর ভর করে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি সামনের দিকে এগিয়েছে। ক্রমশো এই অস্ত্রটি অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়ছে।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

যারা নিজেদের দেশপ্রেমিক মনে করেন, তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইতিহাস পড়ুন। এরপর মিলিয়ে দেখুন যাদের “ভারতের দালাল” ট্যাগ দেওয়া হয়েছে, তারা বাংলাদেশকে কী কী দিয়েছেন। এছাড়া তারা ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য কী কী এনে দিয়েছেন এবং বিপরীতে কী কী দিয়েছেন। কারও বক্তৃতা, বিবৃতি বা আত্মজীবনী নয়, কাগজপত্র মিলিয়ে দেখুন। আর সেই বিবেচনার সময় – ক্রিকেটে ভারতের কোনো খেলোয়াড় বা ফ্যান কী করেছে, বা আপনার সঙ্গে একজন ভারতীয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা – এগুলো বাইরে রাখুন, কারণ স্টেট বিজনেস ওগুলো দিয়ে হিসাব হয় না।

ভারত বা পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। দেশপ্রেমিক তারা যারা দেশের পক্ষে কাজ করে।  দেশপ্রেমিক তারা যারা দেশের পক্ষের ভালো কাজ করা মানুষগুলোকে সম্মান দেয়, খারাপ করা মানুষদের সমালোচনা করে। তারা দেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বিচক্ষণ হয়, ঘটনার মোমেন্টামে ভেসে যায় না।