আমি একজন আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে এই কথাগুলো লিখছি—বিরোধী হিসেবে নয়, ভেতরের মানুষ হিসেবে। তাই কথাগুলো সরাসরি বলছি, ঘুরিয়ে বলছি না। এবং এই লেখাটি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের কর্মীদের জন্য—অন্য কারও জন্য নয়।
গরিব ও মধ্যবিত্তের দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সবসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। সর্বহারা মানুষের নিঃস্ব ভালোবাসা আর মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি—এই দুই শক্তিই ছিল আওয়ামী লীগের মূল শক্তি। মধ্যবিত্তের আদর্শ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ছিল আওয়ামী লীগের শক্ত শেকড়, আর সর্বহারা মানুষ ছিল আওয়ামী লীগের কাণ্ড-বাহু। এই দুটির শক্তির সমন্বয়ে আওয়ামী লীগ সবসময় ছিল অপ্রতিরোধ্য।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারেরও একই গুরুত্ব ছিল। সেই সময় থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামের অংশ হিসেবে গ্রামে বিদ্যুৎ গেছে, ঘর হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বাস্তব অর্থেই অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। একজন কর্মী হিসেবে আমি বলি—এটি আমাদের ঐতিহাসিক সাফল্য।
কিন্তু এই সাফল্যের মধ্য দিয়েই আমাদের বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতার সূচনা হয়েছে। মাথা গরম না করে একটু ধৈর্য ধরে পড়ুন। এবং এটাও জানবেন যে আমি এই উন্নয়নের বিরোধী নই, সবচেয়ে খুশি মানুষদের একজন। আমার নেত্রীকে বারবার দোয়া করি আমি এই কাজটির জন্য। কিন্তু এখানে আমি বলছি অন্য কথা। সেটাতে মনোযোগ দিন।
খেয়াল করে দেখবেন—চরম দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে যখন প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা করতে হয়, তখন সে রসম-রেওয়াজভিত্তিক ধর্মকর্ম তেমন একটা পালন করে না (সে ধর্মে বিশ্বাসী হলেও)। সে কোনো সামাজিক সংগঠন বা আদর্শের রাজনীতিতেও সেভাবে সক্রিয় হয় না। তার কাছে রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির একমাত্র নাম—“ক্ষুধা নিবারণ, ছোট্ট একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই, ছেলে-মেয়েদের গায়ে কাপড়।” যে দল এসব কথা বলত, এসব নিয়ে কাজ করত, সেটাই ছিল তাদের দল। সেভাবেই আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে ওইসব মানুষের রাজনৈতিক এজেন্সি পেয়েছে। বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ বারবার কথা রাখার কারণেই সেই এজেন্সি আরও পোক্ত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষ প্রতিবার আওয়ামী লীগকে শুধু ভোটই দেয়নি, আন্দোলন-সংগ্রামে জান হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। সবই ঠিক ছিল—এপর্যন্ত সবই ঠিক ছিল।
কিন্তু সেই শ্রমজীবী মানুষের যখন এক মাসের খাবারের নিরাপত্তা তৈরি হয়, তখন কি আর সেই মৌলিক চাহিদার নিরাপত্তা তার কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় থাকে? একবারও কি ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি যে তার মনোজগতে কী কী পরিবর্তন আসে?
বাস্তবতা হলো—যখন ওই মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তখন জনগণের নতুন ক্ষুধা তৈরি হয়। সেটা সমাজের ক্ষুধা, সম্মানের ক্ষুধা, অংশগ্রহণের ক্ষুধা। সে চায় কোথাও বসতে, কথা বলতে, পরিচিত হতে, কেউ তাকে খুঁজুক, কেউ তার অপেক্ষা করুক। সে চায় একটি “নিজেদের সমাজ”, সেই সমাজে তার অংশগ্রহণের স্বীকৃতি।
এই জায়গায় আওয়ামী লীগ—বা স্বাধীনতার স্বপক্ষের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিগুলো—ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়েছি, কিন্তু তার নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষুধা নিবারণের জন্য কোনো উদ্যোগ নিইনি। আমরা এই ক্ষুধাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বীকৃতি দিইনি, এড্রেস করার জন্য কোনো প্রোগ্রাম নিইনি, কোনো প্ল্যাটফর্ম বা সমাজ অফার করতে পারিনি। আমরা তাদের সংগঠিত করিনি, সাংস্কৃতিক পরিসর দিইনি, তাদের নিয়ে নিয়মিত সামাজিক কার্যক্রম দাঁড় করাইনি।
কার্যক্রম তো তখনই নেব, যখন আমরা সমস্যাটিকে বিশ্বাস করব। একবার বলুন তো—সারা দেশে আমরা কয়জন কর্মী এই সংকটটি অনুধাবন করেছি? আমি যে জায়গাগুলোতে এই বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছি, প্রায় সব জায়গাতেই হয় বিরক্তি দেখেছি, অথবা “আঁতেল” খেতাব পেয়েছি।
আমাদের এই অবহেলা আমাদেরই লয়াল সমর্থকদের সঙ্গে আমাদের বন্ধন ক্রমশ ঢিলে করেছে। আমরা যখন তাদের কাছে যাইনি, এনগেজ করিনি, তাদের জড়িয়ে ধরিনি, তখন এর মধ্যে থার্ড পার্টি এসে ঢুকে পড়া স্বাভাবিক। ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো ঠিক এই জায়গাটিই মূলত পূরণ করেছে। তারা প্রতিদিন তাদের সঙ্গে দেখা করেছে, একটি সামাজিক ও ধর্মীয় সার্কেল দিয়েছে, নিয়মিত আড্ডা দিয়েছে, আলোচনা করেছে, একটি কমিউনিটির অংশ হওয়ার অনুভূতি দিয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ তাদের দিকে ঝুঁকেছে। মানুষ সেখানে গেছে, কারণ মানুষ শূন্যতায় থাকে না। এভাবে আমাদের অনেক আপনজন ক্রমশ দূরে সরে গেছে। তাদের জন্য আমরা বছরের পর বছর কাজ করেও “কাঞ্চনমালা”র মতো বঞ্চনায় পড়লাম, আর তারা “কাঁকনমালা’র” মতো শেষে সামান্য আহা-উহু করে জনগণের চোখে উদ্ধারকর্তা এবং নিচের লোক হয়ে গেল।
তার উপরে এই আগুনে ঘি ঢেলেছে আমাদের “হঠাৎ জমিদার হয়ে ওঠা নেতাদের” আচরণ। মাঠের বহু নেতাকে এমন আচরণ করতে দেখেছি যেন তারা জনগণের প্রতিনিধি নন, তারা যেন এলাকার জমিদার। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সাধারণ কর্মীর সালামেরও ঠিকমতো উত্তর দিত না। তাদের এই আচরণ মানুষকে সংগঠনের প্রতি আকর্ষিত করার বদলে বহুগুণ দূরে ঠেলে দিয়েছে। যে নতুন অর্থনৈতিকভাবে উঠে আসা মানুষগুলোকে আমাদের রাজনীতির শক্তি হওয়ার কথা ছিল, তাদের বড় অংশ আমাদের আচরণেই আওয়ামী লীগ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের মনে হতে শুরু করেছে আওয়ামীলীগ তাকে ততটুকু সম্মান করে না, যতটুকু তার প্রাপ্য।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো—এই বাস্তবতা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। উন্নয়ন করেছি আমরা, কিন্তু সেই উন্নয়নের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখার সামাজিক কাঠামো তৈরি করিনি। যারা দলের পদ-পদবি কিনেছে বা নানা ভাবে বাড়িয়েছে, তারাই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির বদলে নিজেদের চারপাশে ছোট ছোট ক্ষমতার বলয় বানিয়েছে। ফলে দল সংগঠন হিসেবে শক্তিশালী হয়নি; বরং অনেক জায়গায় জনতার বিরক্তির কারণ হয়েছে।
আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—শুধু উন্নয়ন করে রাজনীতি টিকে থাকে না। মানুষকে সম্মান দিতে হয়, মানুষের সঙ্গে বসতে হয়, তাদের কথা শুনতে হয়, তাদেরকে “আমাদের মানুষ” বানাতে হয়। যে নেতা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না, মানুষের সঙ্গে বসতে পারে না, মানুষের কষ্ট বুঝতে চায় না—তার আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করাই ভালো।
অর্থনৈতিক মুক্তি আমরা দিয়েছি—এটি সত্য। কিন্তু সেই মুক্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সমাজ, তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, তাদের অংশগ্রহণের জায়গা তৈরি করতে না পারলে কৃতজ্ঞতা ভোটে রূপান্তরিত হয় না, সংগঠনে শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না।
এই কঠিন সত্যটি আমাদের এখনই স্বীকার করতে হবে—নইলে ঘুরে দাঁড়ানো এবং টিকে থাকা যাবে না।
