প্রেস মেশিন হারাম বলে যখন ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল, সেই ফতোয়া কিন্তু তৎকালীন ইসলামের সর্বোচ্চ অথরিটি, শাইখ-উল-ইসলাম দিয়েছিলেন। রেডিও, ইংরেজি শিক্ষা, লাউডস্পিকার, অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা, ছবি তোলা, ভিডিও করা কিংবা অর্গান রিপ্লেসমেন্ট-এর (অঙ্গ প্রতিস্থাপন) বিপক্ষের ফতোয়াগুলোও ছিল একই পর্যায়ের।
এসব ফতোয়া দিয়েছিলেন সেই যুগের প্রথিতযশা বড় বড় আলেমরা। তাঁরা কোরআন-হাদিস নিয়ে গবেষণা জানতেন না—এমন দাবি কি কেউ করবেন? নিশ্চয়ই করবেন না! তার মানে, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে ফতোয়াগুলো কোরআন-হাদিস অনুযায়ী সম্পূর্ণ ‘ইসলামিক’ ছিল। সেই যুগে ওই সব ফতোয়ার বিরোধিতা করা মানে ছিল সরাসরি ইসলামবিরোধিতা, যার পরিণাম ছিল ‘কাবিলে গারদানজানি’ (শিরশ্ছেদযোগ্য অপরাধ)।

প্রেস মেশিন হারাম
শায়খরা ফতোয়া দিয়েছেন, আর সেই ফতোয়া শুনে সাধারণ মুসলমানরা জান-প্রাণ দিয়ে সেই ফতোয়া বাস্তবায়ন করেছেন। বাস্তবায়নের জন্য যেমন চাপ প্রয়োগ দরকার, তা সামর্থ্য অনুযায়ী করেছেন। সেসব করেছেন “আল আমরু বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার” স্লোগান দিয়েই।
প্রেস মেশিন হারাম থেকে হালাল হতে প্রায় ৩০০ বছর লেগেছিল। বাকিগুলো আপনারা জানেন। একালের শায়খরা করোনা টিকা প্রথমে হারাম করে, এরপর হালাল করে, নিজেরা সেই টিকা নিয়ে দিব্যি ওয়াজ করে বেড়াচ্ছেন (মহান আল্লাহ উনাদের দীর্ঘ হায়াত দিন)।
যখন এসব হারাম হিসেবে ঘোষিত হলো, তখন সাধারণ মুসলিম কেউ এই সিদ্ধান্তের ইসলামিক রেকর্ড-দাগ-খতিয়ান জানতে চাননি। হালাল হবার পরেও কিছু জানতে চাননি। আর তারা নিজেরা যে দলিল-দস্তাবেজ উল্টে দেখবেন, সেটার তো প্রশ্নই আসে না। শোনা কথায় সহজ—আমান্না, সাদ্দাকনার লাইন নিয়েছেন। এই যে বিচার-বুদ্ধিহীন অন্ধ অনুসরণ (তাকলিদ), এটি কি আমাদের আকলকে অপদস্থ করা নয়?

আমাদের কারো সাহস হয় না জিজ্ঞেস করার—কুরআন ও হাদিসের বিধান যেখানে অপরিবর্তনীয়, সেখানে ইজতিহাদ বা কিয়াসের দোহাই দিয়ে একটি সময় যা ‘হারাম’ ছিল, তা কয়েক দশক পর ‘হালাল’ হয় কীভাবে?
কীভাবে সীমিত পরিসর থেকে বৃহৎ পরিসরে সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যায়? মহান আল্লাহর দেওয়া “আল-কিতাব”, তাঁর নেয়ামত চক্ষু-মাথা দিয়ে মিলিয়ে দেখার সময় হয়নি!
ইসলামী ফিকহ্ শাস্ত্রের একটি স্বীকৃত নীতি হলো: “লা ইয়ুনকারু তাগায়্যুরুল আহকাম বি তাগায়্যুরিল জামান” (কালের পরিবর্তনে ইজতিহাদী বিধানের পরিবর্তন অনস্বীকার্য)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘ইজতিহাদী ভুলের’ কারণে একটি জাতি যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে কয়েকশ বছর পিছিয়ে যায়, সেই ‘সামষ্টিক ক্ষতির’ দায় কে নেবে?
ওই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমি জানি।
আলেমদের হিসাব মহান আল্লাহ নেবেন, সেটা তাদের ও আল্লাহর মধ্যের বিষয়। কিন্তু আমার জিজ্ঞাসা হলো—এসব ফতোয়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে ‘শোনা মুসলমানগণ’ যুগের পর যুগ প্রগতিশীল মানুষদের ওপর অত্যাচার করেছেন, সমাজচ্যুত করেছেন, আধুনিক শিক্ষাকে রুখে দিয়েছেন—তাদের সেই উগ্রতার দায় কি কিয়ামতের দিন উক্ত আলেমরা নেবেন?
সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত এই ‘টাইম ল্যাগ’ বা সময়ের অপচয় কি ইসলাম সম্মত? যারা অন্যের ওপর ফতোয়া চাপিয়ে দিয়ে জীবন অতিষ্ঠ করেছেন, কিয়ামতের ময়দানে তারা কি ‘ভুল ইজতিহাদের’ দোহাই দিয়ে পার পাবেন?
এনি আইডিয়া?
আহলে এলেম এবং যারা ‘সাহেবে হ্যাসিয়াত’, তাদের কাছে এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রত্যাশা করছি।

এই লেখাটি প্রকাশের পরে দেখলাম অনেকেই ফেসবুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একে আমার মনগড়া কথা বলে। আমি লেখা ছোট রাখতে রেফারেন্স (সূত্র) আলাদা করে দিই না; তার মানে এই নয় যে কথাগুলো আমার মনগড়া। যারা এই সন্দেহ প্রকাশ করছেন, আমি তাঁদের একটু পড়তে অনুরোধ করব। গালাগালির সময়টুকু পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করুন, এতে আপনারই উপকার হবে। অন্তত ভবিষ্যতে পুনরায় এই গালাগালির পাপ থেকে বিরত থাকতে পারবেন। যাঁদের রেফারেন্স দরকার, তাঁদের জন্য সূত্রগুলো দিয়ে দিলাম।
সূত্র:
১. মুদ্রণযন্ত্র বা প্রেস মেশিন বিতর্ক:
১৪৫৫ সালে জোহানেস গুটেনবার্গ প্রেস মেশিন আবিষ্কার করলেও মুসলিম বিশ্বে তা গ্রহণ করতে প্রায় ৩০০ বছর সময় লেগেছে। ১৪৮৫ সালে অটোমান সুলতান বায়েজিদ (দ্বিতীয়) একটি ফরমান জারি করে আরবি হরফে মুদ্রণ নিষিদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ১৫১৫ সালে সুলতান প্রথম সেলিম এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।
তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা শাইখ-উল-ইসলাম এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে ধর্মীয় যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পবিত্র কুরআন মুদ্রণ করলে তার পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে এবং ক্যালিগ্রাফিস্টদের (যাঁরা হাতে কুরআন লিখতেন) রুটিরুজি বন্ধ হবে।
সোর্স: “The Printing Press and the Ottoman Empire” – Stanford J. Shaw. এছাড়াও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইব্রাহিম মুতাফাররিকা (যিনি ১৭২৭ সালে প্রথম তুর্কি প্রেস স্থাপনের অনুমতি পান) তার লেখায় এই দীর্ঘ সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন।
২. লাউডস্পিকার ও মাইক্রোফোন বিতর্ক
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন লাউডস্পিকার আসে, তখন একে ‘শয়তানের আওয়াজ’ হিসেবে অনেক আলেম ফতোয়া দিয়েছিলেন। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক আলেম এবং ভারতের দেওবন্দি ঘরানার অনেক আলেম শুরুতে এটি হারাম বলেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, এটি মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং প্রতিধ্বনি বা যান্ত্রিক শব্দ, তাই এটি দিয়ে নামায হবে না। পরবর্তীতে যখন এর উপযোগিতা প্রমাণিত হয়, তখন ফতোয়া পরিবর্তন করা হয়।
সোর্স: “Fatwa on the use of Loudspeakers in Mosques” – Journal of Islamic Studies (Oxford).
৩. ছবি তোলা ও ভিডিও (ফটোগ্রাফি)
এক সময় ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলাকে ‘মূর্তি তৈরির’ সাথে তুলনা করে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ ইবনে বায (রহ.) দীর্ঘ সময় ছবি তোলাকে হারাম মনে করতেন (পাসপোর্ট বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া)। কিন্তু পরবর্তীতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের যুগে বর্তমান মুফতিরা ভিডিও এবং ডিজিটাল ছবিকে ‘ছায়া’ বা ‘প্রতিফলন’ হিসেবে অভিহিত করে জায়েজ ফতোয়া দিয়েছেন।
সোর্স: “Ruling on Photography” – Permanent Committee for Scholarly Research and Ifta, Saudi Arabia.
৪. ইংরেজি শিক্ষা ও স্যার সৈয়দ আহমদ খান
উপমহাদেশে ১৮৩৫ সালের দিকে ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞান শেখাকে ‘কুফর’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। দিল্লির ১২৪ জন আলেম স্যার সৈয়দ আহমদ খানের বিরুদ্ধে কুফরির ফতোয়া দিয়েছিলেন কারণ তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিখতে উৎসাহিত করেছিলেন।
সোর্স: “Sir Syed Ahmad Khan and the Muslim Renaissance” – M. Ikram.
#Islam #IslamicHistory #FatwaDebate #HalalHaram #MuslimRenaissance #SelfReflection
আরও দেখুন:
