ঝড়ের পরিপেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর প্রদানকৃত বিবৃতি

ঝড়ের পরিপেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর প্রদানকৃত বিবৃতি : এই দীর্ঘ তেইশ বছর পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাংলাদেশকে একটা উপনিবেশ এবং বাজার হিসেবে গণ্য করে এসেছে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকের অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত বিষয়ের সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় পিন্ডি বা ইসলামাবাদে। ক্ষমতা সবই কেন্দ্রের আমলাদের হাতে ।

তারা দিনের পর দিন উপেক্ষা করে চলেছে বাংলাদেশকে। তাদের দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে আমরা বারবার প্রকৃতির মর্জির সহজ শিকার হচ্ছি। আজও বণ্যা নিয়ন্ত্রনের পরিকল্পনা হয়নি। আজো জলোচ্ছাস রোধের চেষ্টা হয়নি। দশবছর আগে উপকূলবর্তী গ্রামগুলোর পুনর্বিন্যাস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রকল্প পেশ করা হয়েছিল, দশ বছর পরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ঘূর্ণিঝড়ের থেকে রেহাই পাবার জন্য যে আশ্রয় শিবির নির্মাণ করার কথা ছিল, তার জন্য প্রয়োজনীয় কুড়ি কোটি টাকা আজো পাওয়া যায়নি। এখানকার অতি প্রয়োজনে, মানুষের বাঁচার প্রয়োজনে যেখানে মাত্র কুড়ি কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে না, ইসলামাবাদের সৌধ নির্মাণ এবং সাজসজ্জার বন্য দুইশত কোট টাকা ইতোমধ্যেই মঞ্জুর হয়ে গেছে। আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাই আজ পর্যন্ত হল না, অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মঙ্গল ও তারবেলা ড্যাম্প তৈরির জন্য এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশী অর্থ মঞ্জুর করা হয়েছে।

প্রকৃতি করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে চাই পূর্ণ স্বায়ত্ব শাসন। নির্বাচনের মাধ্যমেই হোক আর নির্বাচন বানচাল হলে জাগ্রত জনগণের শক্তির মাধ্যমেই হোক, জনগণকে ক্ষমতা দখল করতেই হবে।

স্বায়ত্বশাসনের জন্য বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্খাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দশ লাখেরও বেশী লোক মারা গেছে। শাসকদের মধ্যে যারা ভাবছেন জনগণের দাবীকে অবহেলা করা চলে-তাদের সাবধান হবার সময় এসেছে। বাংলাদেশ জেগে উঠেছে। নির্বাচন যদি বানচাল করে দেওয়া না হয়, তবে স্বাধীনভাবে বসবাস করার জন্য বাংলাদেশ যাতে নিজের ভাগ্য নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে-তার জন্য দরকার হলে আরো দশ লক্ষ লোক প্রাণ দিকে।

পশ্চিম পাকিস্তানে প্রভূত গম উৎপন্ন হয়েছে, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত অঞ্চলে খাদ্য বোঝাই প্রথম জাহাজটি এসেছে বিদেশ থেকে। আমাদের পয়সায় পশ্চিম পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ সৈন্য পোষা হলেও আজ দাফনের কাজ করছে বিদেশীরা। এই বিপদের দিনে যেখানে বিদেশীরা তাদের হেলিকপ্টারে খাদ্য পাঠাচ্ছে দূর্গম অঞ্চলগুলোতে সেখানে আমাদের হেলিকপ্টারগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে পড়ে রয়েছে অলস হয়ে।

যারা পাকিস্তানে বাইশটি পরিবার জনগণের উপর সমৃদ্ধি লাভ করলেও, তারা এখনো ঘূর্ণিঝড়ে ছিন্নমুল মানুষের উল্লেখযোগ্য সাহায্য কিছুই পাঠায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের কাপড়ের কলের মালিকরা প্রধান বাজার হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করলেও, মৃত্যুদেহে কাফনের জন্য এক টুকরা কাপড়ও দেয়নি। বাংলাদেশ আর কারো উপনিবেশ হয়ে থাকবে না। তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করবে।

ইসলাম ও জাতীয় সংহতির স্বয়ম্ভু প্রভূর দল-মাওলানা মাসুদী খান, কাইয়ুম খান, মিয়া মমতাজ দৌলতানা, নবাবজাদা নাসিরুল্লাহ খান এবং অন্যান্য পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা আজ কোথায়? তাঁরা কি একটা দিনের জন্যও এসে যাঁরা বেঁচে রয়েছে তাদের প্রতি কি সহানুভূতি দেখাতে পারতেন না? আমাদের বর্তমান অভিজ্ঞতা একটা কথাই হারে হারে টের পাইয়ে দিচ্ছে। কথাটা হলো, বাংলাদেশকে উপনিবেশ ও বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিকের জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত। কেন্দ্রীয় সরকারে এবং তাঁর আমলাদের হাতেই সব ক্ষমতা এক চেটিয়া করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে চরম অবহেলা ও বিমাতৃসুলভ আচরণের জন্য আমি তাদেরই দায়ী করছি। ইসলামাবাদে বিলাসবহুল স্মৃতিস্তম্ভ গড়বার জন্য ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

অথচ ১০ বছরের সাইক্লোন নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কুড়ি কোটি টাকাও জোটেনা। তাই আমরা স্থির নিশ্চিৎ, বাংলাদেশকে যদি রক্ষা করতে হয় তবে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে আর্থিক উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীন পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। আমাদের আমরাই শাসন করব। সব সিদ্ধান্ত আমরাই নেব। আমাদের টাকা আমরাই খরচ করব। আমরা আর পশ্চিম পাকিস্তানের আমলা, পূঁজিপতি ও সামন্তপ্রভূদের স্বার্থে কষ্ট স্বীকার করব না। শক্তিশালী কেন্দ্র ঢের দেখলাম। জাতীয় সংহতির নামে আমরা অনেক অপরাধ করেছি; কিন্তু আর নয়।