শচীন ভৌমিক আমার প্রিয় লেখকদের একজন। খুব ছোটবেলায় অন্যরকম আগ্রহ থেকে পড়ে ফেলেছিলাম তাঁর “ফর অ্যাডাল্টস অনলি”। অসংখ্য বই কিনলেও এই জীবনে আমার আর বইয়ের সংগ্রহশালা হলো না; অন্যসব বইয়ের মতো সেই প্রিয় বইটি কেন জানি হারিয়ে গিয়েছিল। আজ এক সুহৃদ ভদ্রলোক আমাকে বইটি উপহার দিলেন। আমার মনে হলো, হারানো রত্ন ফিরে পাওয়ার এই আনন্দ একা উপভোগ না করে আপনাদের সাথে ভাগ করে নিই। আজ দিচ্ছি এই সংগ্রহের সবচাইতে আলোচিত ও বিতর্কিত রচনা — “বচন ফকিরের কল্কে”।
শচীন ভৌমিকের ‘বচন ফকিরের কল্কে’ কেবল একটি রম্যরচনা নয়, এটি একাধারে স্বীকারোক্তি, সমাজতত্ত্ব আর জীবনদর্শনের এক অদ্ভুত কোলাজ। যৌবনের সেই ‘ভূত ও জাদুকর’-এর গল্প থেকে শুরু করে বিলেতের পাব ক্রলিং কিংবা দামী দামী হুইস্কির আভিজাত্য—লেখক আমাদের নিয়ে যান এক মদিরার মায়াজালে। কিন্তু কেবল আমোদ-প্রমোদেই তিনি থেমে থাকেননি; সুরা বা মদের এই ‘তরল অগ্নি’ কীভাবে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে, উর্দু শায়েরিতে তার জয়গান কীভাবে গাওয়া হয়েছে, আর শেষমেশ এই নেশাই কীভাবে অকালে কেড়ে নিয়েছে বহু প্রতিভা—সবটাই তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর স্বভাবজাত হাস্যরস আর তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। লিভারের কাজ থেকে শুরু করে সিরোসিসের আতঙ্ক—সবই এখানে উপস্থিত এক ‘বচন ফকির’-এর সাবধানবাণী হয়ে।
চলুন পড়ে নিই…
বচন ফকিরের কল্কে – শচীন ভৌমিক
![Sachin Bhowmick Story Script Writer 800px Hindi Film Cinema by Mustafa Khargonewala alias Camaal Mustafa Sikandera বচন ফকিরের কল্কে - শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Sachin Bhowmick - For Adults Only 1 বচন ফকিরের কল্কে - ফর অ্যাডাল্টস ওন্লি | শচীন ভৌমিক - Sachin Bhowmick, Story Script Writer, 800px-Hindi Film Cinema by Mustafa Khargonewala, alias Camaal Mustafa Sikandera](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2009/03/Sachin-Bhowmick-Story-Script-Writer-800px-Hindi-Film-Cinema-by-Mustafa-Khargonewala-alias-Camaal-Mustafa-Sikandera-200x300.jpg)
মদিরা যৌবন আসার আগেই যৌবনের দুই চর চলে আসে। দুই চর বলতে পারেন দুই চড়ও বলতে পারেন। সে দুজন হল একটি ভূত ও একটি ম্যাজিসিয়ান। দেহে ঢুকে পড়ে ভূত, আর মনে এসে ঢোকে সেই জাদুকর। ভূতটা এসে ছেলেদের নার্ভ আর মেয়েদের কার্ভ নিয়ে পিংপং খেলা শুরু করে, আর জাদুকর মশাই মনটাকে নিয়ে যায় এক স্বপ্নের জাদুঘরে। সে ফ্যাণ্টাসীর জগতে নিজেকে মনে হয় ফ্যান্টাসটিক। কখনও কিং মনে হয়, কখনও কিংকং।
সে বয়েসে আমার স্বপ্ন ছিল –
উত্তম কুমারের বাড়িতে, ক্যাডিলাক গাড়িতে ও সুচিত্রা সেনের শাড়িতে ঢোকার। স্বপ্ন ছিল হেমন্ত মুখার্জির কণ্ঠ, তারাশঙ্করের চরণ, রবিশঙ্করের অঙ্গুলি, নেহেরুর হস্ত, সোফিয়া লোরেনের স্তন, এলিজাবেথ টেলরের নিতস্ব স্পর্শ করার।
স্বপ্ন ছিল দেখবারও- প্যারিসের ইফেল টাওয়ার আর ল্যুভর মিউজিয়াম, লন্ডন শহর, রাশিয়ার ইলিয়া এরেনবুর্গ, মায়কোভস্কী ও টিউব ট্রেনের স্টেশন, আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, মেরিলিন মনরো, হলিউড, এলভিস প্রেসলে আর ন্মার্ট কিং কোল, স্পেনের ষাঁড়ের লড়াই, মিশরের পিরামিড আর জাপানের গাইসা মেয়ে, আগ্রার তাজমহল, বীরভুমের শান্তিনিকেতন, সিংহগড়ের ভগ্নস্তুপ আর বৈজয়ন্তীমালার নগ্নরূপ-এই সবকিছুই দেখবার ইচ্ছে হত।
সে এক অদ্ভুত বয়েস। সব যৌবনবতী মেয়েই যেন বাসনার সোনা, সব নারীর জানুসন্ধির ক্ষেত্রই যেন তীর্থক্ষেত্র। সেই বয়েসে,মধ্যবিত্ত ঘরের সাধারণ একটি ছেলের ফ্যান্টাসীর জগতে আরও একটা স্বপ্ন গুনগুন করে। আমার অন্তত করত। যখনই চৌরঙ্গীর গ্র্যাণ্ড হোটেলের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছি, ভাবতাম কখনও কি ঢুকতে পারব গ্র্যাণ্ডে?
গ্র্যাণ্ডের পাশে ও পার্ক স্ট্রীটের বিলিতি মদের বার-এর সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই ভাবতাম কখন সে সময় আসবে যে চট্ করে বার-এ ঢুকে অর্ডার দেব-এক পেগ হুইস্কি লাও। ভাবতেই কেমন ভয় আনন্দ কৌতুহল মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হত। সেই বয়েসের সেই অনুভুতি এখন বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না। বাথরুমের ফুটোয় চোখ কোন নিকট আত্মীয়ার নগ্নদেহ এক ঝলক দেখার পর যে প্রচণ্ড অপরাধ-বোধ সেই বয়সী ছেলেদের জ্বর-গ্রস্ত করে দেয়, সেইরকম অপরাধ-বোধেই জ্বলেছি যখন লুকিয়ে এসব মদিরালয়ের ভেতরে লোভাতুর দৃষ্টিক্ষেপণ করেছি। সে বয়েস এখন অনেক পিছনে।
হুইস্কি-টক শুরু হলে ঝগড়া করি ‘জনি ওয়াকার’, ‘ব্লাক লেবেল’ আর ‘সিভাজ রিগ্যালের’ মধ্যে কোন্টা উত্তম, বলি ‘হাণ্ড্রেডে পাইপার্স’ থেকে “কাটি সার্ক’ লাইটার হুইস্কি, বলি ‘কিং অফ কিংস’ ঠিক আছে, কিন্তু নাথিং লাইক ‘ডিম্পল’,বলি, ‘এন্টিকোয়েরী’ ট্রাই কর, মাচ বেটার দ্যান ‘সামথিং স্পেশাল’। বলি, বেস্ট ইন দা ওয়ার্লড নো ডাউট হল ‘রয়েল স্মালুট”।
আপনাদের জনান্তিকে বলে রাখি, এসব বলি বটে, বলে ইমপ্রেসও করি, কিন্তু ড্রিংক্স সম্পর্কে আমার জ্ঞান অভিনয় সম্পর্কে দেব আনন্দের জ্ঞানের মতই। বুঝলেন না? আমি বলতে চাই খুবই সামান্য। আমি কনোসিউর নই, নেহাতই এমেচার। মদ ও মাতালদের ভিড়ে থেকে এখনও আমার পানবিদ্যা আয়ত্ত হয় নি। ‘রয়েল স্যালুট’ হুইস্কির বট্ম্স্ আপ এর চাইতে এখনও আমার কোন সুন্দরীর বট্ম্স্ আপ অনেক বেশী সুস্বাদু, না, স্যরি, অনেক বেশী লোভনীয় মনে হয়।
মদ সভ্যতার আদিমতম আবিষ্কার। মনে হয় আগুন আর মদ একই সময়ে আবিস্কৃত হয়েছিল। মদও তো আগুন, তরল অগ্নি বলতে পারেন। এখন অবশ্য এই অগ্নি-পান সোসাইটির একটি বৃহৎ সোপান হয়ে দাঁড়িয়েছে-স্ট্যাটাস সিম্বল্। আগে ছিল বর্বর যুগ বা বারবারিক এজ। আর এখন হল বার এজ। নাকি বলব বারিক্ এজ (যাঁদের পদবী বারিক তারা কিছু মনে করবেন না।) এখন ধনীদের গৃহে গৃহে বার। আমার এক বন্ধুর মতে এ যুগ হল বার আর বারাঙ্গনার। তাকিয়ে দেখুন ধনীপুত্রদের। চুল দেখে মনে হয় ছ’মাস কোন বারবারের কাছে যায় নি, কিন্তু গন্ধে টের পাবেন রোজ বোধ-হয় দু’বেলাই বারে যাতায়াত আছে।
সাহিত্যজগৎ, নাট্যজগৎ, চিত্রজগৎ, শিল্পীজগৎ, সংগীতজগৎ- সর্বত্র মদিরার মত্ততা, সর্বত্র সুরার ফোয়ারা। শিল্পজীবনের গৌরব সুরার সৌরভ ছাড়া যেন হয়ই না। ‘দেবদাস’ একসময়ে ভগ্নহৃদয়ের জন্য মদ্যপান যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এই রকম একটা বিশ্লেষণ প্রচারিত করেছিল। ফলে কাঁকন পরা হাতের ধাক্কা খেয়েই সে যুগের যুবকরা সোজা সান্তনা খুঁজত মদের গ্লসে, দুঃখ ভোলার জন্য যোগ দিত মাতালের ক্লাসে।
এটা কিছু নয়, শুধু ওমর খৈয়ামী রোমান্তিকতা, আত্মনিধনের মর্বিড আতুরতা, নেগেটিভ জীবনদর্শনের ডেস্ট্রাকঠিভ বুদ্ধিহীনতা। দেবদাসের সেই প্রভাব অবশ্য এখন কমে গেছে। এখন ভগ্নহৃদয়ে আর বড় কেউ পানপাত্র তুলে নেয় না। বরং দেখা যাচ্ছে যুগ্ম হৃদয়ে আজকাল নারী পুরুষ একসঙ্গেই পান- পাত্র তুলে গ্লাসে ঠোকাঠুকি করে বলে, ‘চিয়ার্স, ফর আওয়ার এটার্নেল লাভ’ বা ‘চিয়ার্স, টু আওয়ার ম্যারেজ’। যুগ পাল্টাচ্ছে।
অতি উদারতার যুগ এটা। সেক্স এখন শয্যার মশীরীতে নেই, সেক্স এখন সজ্জার পসারীতে। আগে ছিল ‘চিয়ার্স টু আওয়ার লাভ’ এখন হয়ে গেছে ‘চিয়ার্স টু আওয়ার-চার অক্ষরের সেই অতি জৈবিক শব্দ। এখন cocktail আর cock tale-এ কোন তফাত নেই।
ওমর খৈয়াম সম্ভবত প্রথম কবি, যাঁর জীবনদর্শন ছিল সুরা,সাকী আর ভাগ্য নিয়ে। তাঁর রুবাইয়ৎ-এর প্রতি ছত্রে ছত্রে সুরার জয়গান। (কান্তি ঘোষ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর সফল অনুবাদ বাংলা ভাষায় পাওয়া যায়।) ওঁরই অনুপ্রেরণায় উর্দু কবিতার গালিব থেকে শুরু করে অনেক আধুনিক কবির প্রিয় বিষয়বস্তু হল মদিরা। সুরার প্রচারপত্র এইসব কবিতায় অনেক মণিমুক্তা ছড়ানো আছে। সাহিত্যজগতে সুরার এই অবদান ভোলা যায় না। কিছু জ্ঞান দেবার লোভ সামলাতে পারছি না।
[ উর্দু শের ১ ]
শুনুন-
ইয়ে কালী কালী বোতলে যো হ্যায় শরাব কি
রাতে হ্যায় ইনমে বন্ধু হমারে শবার কি। — রিয়াজ
কালো কালো সুরার বোতল, যেন যৌবনের মাতাল রাত্রির দল এখানে বন্দী হয়ে রয়েছে। চমৎকার কাব্য নয় কি?
[ উর্দু শের ২ ]
আরও শুনুন-
তওবাসে মেরে বোতল অহি
যব টুটি হ্যায় জাম তো গই হ্যায়। — রিয়াজ
দিব্যির চাইতে অনেক ভাল আমার এই বোতল।
দিব্যি যদি ভেঙে ফেলি, কি হয়? কিছুই না।
কিন্তু বোতল যখন ভেঙে যায় তখন ভাঙা কাঁচের টুকরোতে পেয়ালা হয়ে যায়। তাতে মদিরা কিছু কিছু টলটল অন্তত তো করে।
সবটাই তো আর লোকসান নয়।
[ উর্দু শের ৩ ]
আরেকটি–
ওহ জাম হুঁ খুনে তমন্না সে ভর চুকা
এ মেরা জর্ফ হ্যায় কি ছলকতা নহীঁ হুঁ ম্যায়–ফনা লক্ষ্ণৌভী।
আকাক্ষার বিক্ষভ রক্তে জীবনের পানপাত্র আমার কানায় কানায় ভরে গেছে।
এ তো আমার সহ্যশক্তির ক্ষমতা যে এক বিন্দুও ছলকে পড়ে নি।
[ উর্দু শের ৪ ]
আরেকটি–
ইয়ে ময়কাদা হ্যায়,তেরা মাদ্রাসা নহীঁ বাইজ
এহাঁ শরাব সে ইনসাঁ বনায়ে যাতে হ্যায়।-সাগর নিজামী
হে সাধু, হে পণ্ডিত,এটা সুরাবিপনি, তোমার বিদ্যালয় নয়।
এখানে তো সুরা দিয়ে মানুষ তৈরি করা হয়।
জ্ঞানের বিদ্যালয় তোমার জ্ঞানদানে মানুষ মানুষ হয়, আর সুরার শিক্ষালয়ে মানুষ তৈরি হয় সুরাপানে।
[ উর্দু শের ৫ ]
আরেকটি-
দেখা কিয়ে ওহ্ মস্ত নিগাহোঁ সে বার বার
যব্ তক্ শরাব আয়ে কই দৌর হো সায়ে।-শাদ আজীমাবাদী
সাকী বার বার মদির চোখে আমাকে দেখেছে। মদিরার
পাত্র হাতে আসার আগেই অনেক মদের নেশা আমার হয়ে গেছে।
সে আঁখির চাহনিতে পানপাত্রের চাইতে অনেক বেশী নেশা-কবির আর কি দোষ বলুন?
[ উর্দু শের ৬ ]
শুনুন-
অঙ্গুর মে থী ইয়ে ময়পানী কী চান্দ বুন্দে
যিস্ দিন খিচ গই হ্যায়, তলোয়ার হো গই হ্যায়।-অমীর
মীনাই আঙুরের মধ্যে ছিল গোবেচারা রসের কয়েকটি বিন্দু,সে রসকে নিংড়ে নিয়ে যখন সুরার রূপ নিল।
তখন সেই শান্ত রসবিন্দুরাই তরোয়ালের মত ধারালো অস্ত্র হয়ে দাঁড়ালো।
[ উর্দু শের ৭ ]
আরেকটি-
ছলক্তী হ্যায় যো তেরে জামসে উস ম্যায় কা ক্যায়া কহনা
তিরে শাদাব হোঠোঁ কী মগর কুহু ঔর হ্যায় সাকী। -মজাজ
হে প্রেয়সী, তোমার হাতের, পানপাত্রের ছলকে যাওয়ার তুলনা হয় না।
কিন্তু তোমার রক্তিম উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ সে তো তোমার ছলকানো হাতের মদিরার চাইতে আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
সে তো অন্য এক অনুভব, অন্য এক স্বর্গ।
[ উর্দু শের ৮ ]
এটা শুনুন-
পিলা দে ওক্সে সাকী গর হামসে নফরৎ হ্যায়
পেয়ালা গর নহীঁ দেতা না দে, শরাব তো দে। –গালিব
সাকী, আমার ওপর তোমার যদি অভিমান হয়ে থাকে, ঘেন্না হয়ে থাকে, সামনে মদিরা গ্লাসে না ঢেলে দিতে চাও দিও না।
মদের পেয়ালা না হয় না-ই দিলে। অঞ্জলি পেতে দিচ্ছি, সেই হাতের অঞ্জলিতে সুরা ঢেলে দাও।
[ উর্দু শের ৯ ]
আরেকটি–
মসজিদমে বুলাতে হ্যায় হামে জামিদে নাফহম্
হোতা কুছ হোস আগর তো ময়কানে না যাতে। —অমীর
ভ্রান্ত পণ্ডিত, তুমি আমাকে বলছ মসজিদে আসতে।
আমাকে তুমি চিনতেই পারনি।
আরে, আমার যদি হুঁশ থাকত তাহলে এতক্ষণে পানালয়ে চলে না যেতাম?
এই মেজাজের আরেকটি শের দিয়ে কবিতার ক্লাস বন্ধ করছি।
[ উর্দু শের ১০ ]
জিগর মুরাদাবাদী লিখেছেন–
কিধর সে বর্ক চমকতী হ্যায়,দেখ ইয়ে বাইজ
ম্যায় আপনা জাম উঠাতা হুঁ,তু কিতাব উঠা।
বিদ্যুৎ কেন চমকায় কোথা থেকে চমকায় এই গভীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সাধু মহারাজ, তুমি তোমার শাস্ত্র তুলে নাও, আমি আমার পানপাত্র তুলে নিচ্ছি।
সব রহস্যের উত্তর তুমি হয়তো শাস্ত্রে পাও, কিন্তু আমি পাই এই অমৃতের গ্লাসে, এই সুরার বিন্দুতে।
বলেছি না দাগ, মীর থেকে সব আধুনিক উর্দু কবিরাই প্রচুর মদ্যপদ্য রচনা করেছেন। উর্দুতে সর্ মানে ফ্যাসাদ আর অব মানে জল।
তাহলে শরাব-এর মানে দাঁড়াল যে জল ফ্যাসাদ বাধায়,তাই না? সত্যি,হাঙ্গামা ফ্যাসাদের উৎসই হল এই শরাব,মদ,সুরা,কারণ,মদিরা। কাব্য সাহিত্য ছাড়া সুরা আরেক সাহিত্য শাখাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেটা হল হাস্যরসের কৌতুক সাহিত্য। রম্যরসের অনেক উপাদান যুগিয়েছে এই দ্রাক্ষারস।
তারও নমুনা সরবরাহ করছি কিছু –
[ বাংলা কৌতুক ১ ]
এক ভদ্রলোক বার-এ একসঙ্গে দু গ্লাস মদ নিয়ে বসেছেন।
একজন প্রশ্ন করল, একসঙ্গে দু গ্লাস কেন?
এক গ্লাস আমার জন্য, এক গ্লাস আমার মৃত বন্ধুর স্মরণে খাচ্ছি। সে ড্রিংক্স খুব পছন্দ করত। রোজই আমি ওর আর আমার দুজনের কোটা খাই।
মাস চারেক পরে দেখা গেল। সেই ভদ্রলোক বার্-এ বসে মদ খাচ্ছেন, কিন্তু অবাক কাণ্ড সামনে মাত্র একটিই গ্লাস।
সেই ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, আজকে একটাই গ্লাস কেন?
ভদ্রলোক : আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। ডাক্তার মানা করেছেন। সেজন্য শুধু মৃত বন্ধুর গ্লাসটাই খাচ্ছি।
[ বাংলা কৌতুক ২ ]
আরেকটি-
স্বামী স্ত্রী বাড়িতে ককটেল পার্টি দিয়েছিল। সারারাত হৈ-হুল্লোড় গেছে। পরদিন স্বামী স্ত্রীকে ডেকে প্রশ্ন করল,লিলি,একটা কথা জিজ্ঞেস করছি কিছু মনে কর না। ড্রিঙ্ক-ট্রিঙ্কের পর তো হুঁশ থাকে না। লাইব্রেরী ঘরের সোফার পিছনে কাল রাতে যে মেয়েটির সঙ্গে সহবাস করেছি সেটা তুমিই ছিলে তো?
স্ত্রী চিন্তিত মুখে জবাব দিল, টাইমটা কখন বল তো-রাতের গোড়ার দিকে, না শেষ রাতে, না মাঝ রাতে?
[ বাংলা কৌতুক ৩ ]
আরেকটি শুনুন-
এক মাতাল এসে লাইট পোস্টের গোড়ায় চাবি দিয়ে খোলার চেষ্টা করছিল।
একজন পুলিশ এসে বলল, কি করছ কি?
ঘরের দরজা খুলছি, জবাব দিল মাতাল।
এটা কি তোমার বাড়ি নাকি? প্রশ্ন করল পুলিশ।
হ্যাঁ বাবা, তুমি অন্ধ নাকি বাপু? দেখছ না দোতলার আলো জ্বেলে গিয়েছিলাম, এখনও সেটা জ্বলছে।
[ বাংলা কৌতুক ৪ ]
আরেকটা–
দুই মাতাল প্রচুর মাল টেনেছে। তিনতলার ঘর একজনের পেচ্ছাপ পেতেই জানালা দিয়ে রাস্তায় হিসি করতে শুরু করল। অপরজন বলল, এই বাওয়া, কি করছিস? যদি কোন চোর তোর পেচ্ছাপ বেয়ে বেয়ে ওপরে চলে আসে?
প্রথমজন : আমাকে সেরকম বোকা পেয়েছিস নাকি,আমি মাঝে মাঝে বন্ধ করে করে ছাড়ছি। যে চোর এটা বেয়ে ওঠবার চেষ্টা করবে সে বেটা চিৎপটাং হয়ে নীচে পড়ে যাবে না বুঝি? কি রকম বুদ্ধি বল আমার?
[ বাংলা কৌতুক ৫ ]
আরেকটা-
একজন পর পর পাঁচ পেগ খেয়ে গেল। এক ভদ্রমহিলা বললেন, আপনি রোজ এরকম ড্রিঙ্ক করেন?
ভদ্রলোক : হ্যাঁ।
ভদ্রমহিলা : আপনি কি জানেন আপনি নিজেকে শ্লো পয়জন করে চলেছেন?
ভদ্রলোক : সে ঠিক আছে। মরবার জন্য আমার তেমন তাড়াহুড়ো নেই।
[ বাংলা কৌতুক ৬ ]
আরেকটা-
মাতাল স্বামী বাড়ি ফিরে দেখে স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। পা টিপে টিপে বাথরুমে গেল। দেখল তার মাথার কাছে একটু কেটে গেছে,রাস্তায় আছাড় খেয়েছিল। তাড়াতাড়ি ষ্টিকিং প্লাস্টার এনে মাথায় লাগিয়ে চুপি চুপি স্ত্রীর পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল বেলা স্ত্রী চেঁচিয়ে জাগাল স্বামীকে,বলল,কাল রাতে আবার তুমি ড্রিঙ্ক করে এসেছ?
স্বামী : না, আলবৎ না।
স্ত্রী : না,তাহলে এস আমার সঙ্গে বাথরুমে এস, দেখ-বাথরুমে এই আয়নায় ষ্টিকিং প্লাস্টার তাহলে কে লাগিয়েছে?
[ বাংলা কৌতুক ৭ ]
আরেকটা-
ব্যাচেলার ড্রিঙ্ক ঢালতে ঢালতে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল,Say when?
মেয়েটি লজ্জিত কণ্ঠে বলল, After second peg.
ছেলেটি মদের মাত্রা জানতে চেয়েছিল,মেয়েটি শয্যাযাত্রার সময় ভেবে বসেছিল।
[ বাংলা কৌতুক ৮ ]
আরেকটা–
একজন বার-এ ঢুকে বলল, বারটেণ্ডার, আমার একাউণ্টে এখানে সবাইকে একটা করে ড্রিঙ্ক দাও। ম্যানেজার সাহেবকেও দাও।
সবাই খুশি হয়ে ডিঙ্ক করল। এইবার বিল্ চাইতেই লোকটা বলল, আমার কাছে একটা পয়সাও নেই।
ম্যানেজার লোকটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে মারল। ধুলো ঝেড়ে রাস্তা থেকে উঠে সে আবার বার-এ ঢুকে পড়ল। ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল, বারটেণ্ডার, আমার একাউণ্টে সবার জন্য একটা করে ড্রিঙ্ক দাও। কিন্তু ম্যানেজার সাহেবকে দিও না। মদ খেলেই ম্যানেজার বড্ড মিসবিহেভ করে।
[ বাংলা কৌতুক ৯ ]
আরেকটা–
এক মাতাল রাস্তায় টলছিল। একজন পুলিশ তাকে ধরে বলল, আপনি বড্ড টেনেছেন। আসুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।
পুলিশ লোকটাকে নিয়ে এল একটা বাড়ির সামনে।
পুলিশ : এটা আপনার বাড়ি তো?
লোকটা : আমার বাড়ি। মাই হাউস। কাম ইন। এই দেখুন, এটা আমার ড্রইংরুম। এটা আমার সোফা, সেটি, রেডিও। আসুন স্যার, বাড়ি দেখবেন আসুন। এই দেখুন, এটা আমার স্টাডি, এগুলো আমার বই। এবার আসুন স্যার,এই দেখুন,এটা আমার বেডরুম,এটা আমার বেড, আর ঐ দেখুন বেডে শুয়ে আছে ওটা আমার স্ত্রী,মাই ওয়াইফ, আর ঐ যে লোকটা আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে আদর করছে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করছে, ওটা কে জানেন? ওটা হল আমি। পুলিশ একেবারে ফুলিশ।
[ বাংলা কৌতুক ১০ ]
সর্বশেষ কৌতুকীটা শুনুন।
নইলে এ ভাণ্ডার তো শেষ হবার নয়।
একটি ক্লাব। সবাই ড্রিংক করছিল। একজন মাতাল দাঁড়িয়ে উঠে বলল, স্রেফ এক চুমুক খেয়ে আমি হুইস্কির ব্র্যাণ্ড বলে দিতে পারি। চ্যালেঞ্জ করছি আমি, নিয়ে আসুন এনি হুইস্কি, কাম অন্। মাতাল ছেলেমেয়েরা ঘিরে ধরল। যে যখনই যে গ্লাস দিচ্ছে সে এক চুমুক খেয়েই বলে দিচ্ছে এটা হোয়াইট হর্স, এটা জনি ওয়াকার, এটা লং জন, এটা ওল্ড স্মাগলার, এটা ভ্যাট, এটা সিভাজ রিগ্যাল, এটা দেশী ব্লাক্ নাইট, এটা কুইন এন্। ক্ষমতা দেখে সবাই অবাক। এমন সময় ক্লাবের ডান্সার মালি হেমানী বাথরুমে ঘুরে এল গ্লাস নিয়ে। সে গ্লাস বাড়িয়ে বলল মাতালকণ্ঠে, এটা চেখে বলুন তো?
লোকটা : সিওর। তারপর এক ঢোক খেয়েই মুখ বাঁকিয়ে থু থু করে থুথু ফেলে বলল লোকটা, মাই গড্। এটা তো পেচ্ছাপ।
সেটা তো জানি,–বলল সেই মত্ত নর্তকী, এবর বলুন কার এটা? হুজ?
এই ইউনিক জোকের পর এবার আসুন সিরিয়াস প্রসঙ্গে। হুইস্কি টক্ সিরিয়াস কি হয়? নিশ্চয়ই হয়। হুইস্কি থেকেই তো সিরোসিস হয়। আর সিরোসিসের চাইতে সিরিয়াস আর কি হতে পারে বলুন।
প্রস্তর যুগ থেকেই সম্ভবত সুরা মানব সভ্যতার আবিষ্কার। আমাদের প্রাচীন কাব্যে সাহিত্যে সুরার অনেক উল্লেখ রয়েছে। আমাদের ঈশ্বরদের মধ্যে সুরা-রসিকের বৃত্তান্ত রয়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী মদের ব্যবসার জন্য কারখানার স্থাপনা প্রথম হয়েছিল জার্মানীতে। ১০৪০ খ্রীস্টাব্দে। আরও কিছু তথ্য জানতে চান। তবে এই নিন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব্রুয়ারী হল আমেরিকার সেণ্ট লুইতে। নামে Anheuser Busch inc .১৯৭১ সালে এই কোম্পানি ২৪৩০৮৭৯৪ ব্যারেল মদ বিক্রি করেছে। এই কোম্পানি ৯৫ একর জমিতে অবস্থিত। ভাবুন কি এলাহী ব্যাপার। দ্বিতীয় বৃহৎ ব্রুয়ারী হল গিনেস ব্রুয়ারী। আয়ারল্যাণ্ডে সেন্ট জেম্স গেটে হল এই ব্রুয়ারীর আস্তানা। ৫৮.৩ একর জমিতে কারখানাটি বিস্তৃত।
মদের শক্তির উপর নেশা নির্ভর করে জানেন বোধহয়। শক্তি যত বেশী তত বেশী কড়া তার স্বাদ। নির্ভেজাল এলকোহলের শক্তি হল ২০০। রাম ১৯৪ শক্তি পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে। পোল্যাণ্ডের এক জাতীয় ভডকা ৯৭.২ পর্যন্ত তৈরি হয়েছিল। তবে বাজারে ১৬০ শক্তির বেশী মদ বিক্রি করা হয় নি। পোল্যাণ্ডের সরকারী ব্রুয়ারী দ্বারা তৈরি ‘হেয়াইট স্পিরিট ভড্কা’-ই হল পৃথিবীতে সবচেয়ে ষ্ট্রং মদ। এটা ১৬০ শক্তিসম্পন্ন।
পৃথিবীর সবচেয়ে দামী লিকিওর হল ফরাসী কমলালেবুর গন্ধওয়ালা le Grand Marnier Coronation ৪৪ ফ্রাংক মানে ধরুন ১২৫ টাকার মত। দামটা ফরাসী দেশের। পৃথিবীতে যে ওয়াইন সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়েছে তার নাম Chatean Manton ১৯২৯ সালের। দাম ৯২০০ ডলার মানে ৬৩৪০০ হাজার টাকা। এই বোতলটা বড় ছিল, সাধারণ পাঁচ বোতলের সমান। সে হিসাবে এক গ্লাসের দাম দাঁড়ায় ২১০০ টাকা, মানে এক এক চুমুকের দাম ১৭৫ টাকা! এখনো জেগে আছেন না অজ্ঞান হয়ে গেলেন?…
নেশাটা কি? যখন আমরা মদ খাই সেটা সোজা পাকস্থলীর দেয়াল টেনে নেয় ও সেখান থেকে রক্তস্রোতে গিয়ে মেশে। লিভারের কাজ হল রক্তশুদ্ধি। সুতরাং লিভারের উপর চাপ পড়ে ও লিভার রক্ত থেকে এই বিষ আলাদা করে রক্তকে সুরামুক্ত করতে থাকে। লিভার মদের সারাংশকে ধ্বংস করে দেয়। মাত্র ২% পার্সেন্ট শেষ পর্যন্ত রক্তে ও প্রস্রাবে চলে আসে। মদ রক্তস্রোতে মিশলে স্বভাবতই রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়,সেজন্য শরীরে সাময়িক উষ্ণতা এনে দেয়। কিন্তু স্নায়ুর ওপর অত্যাচারই সুরার বেশী হয়। স্নায়বিক প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে যায়। মস্তষ্কে সুরার প্রকোপ আমাদের চিন্তা ও বুদ্ধিবুত্তিতে সাময়িকভাবে বিনষ্ট করে।
সেজন্যই ব্যবহার, চলা-বলা থেকে বিচারশক্তি সব হারিয়ে ফেলি আমরা। সেটাকেই স্থূলভাষায় বলা হয় মাতলামী। স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলার নামই নেশা। মদ কারুর রক্তস্রোতে দ্রুত প্রবেশ করে, কারুর বিলম্বিত লয়ে। সে অনুযায়ী এক একজনের নেশা কম বেশী হয়। এলকোহলের শক্তির উপর, ব্যক্তিবিশেষের স্বাস্থ্যের উপরও নির্ভর করে পানোন্মত্তার মাত্রা। এবার সুরারসিকদের মধ্যে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণার উল্লেখ করব। এই ‘মিথ্” সব ভিত্তিহীন্
এক : After But Whisky, Very Risky মানে মদ মেশাতে নেই, মেশালেই নেশা বড্ড বেড়ে যায় বা শরীর খারাপ করে। এটা ভুল। নেশা মদের শক্তির উপর নির্ভর করে। বিয়ারে এলকোহল ৬ বা ৭ বা ৮ পার্সেন্ট, হুইস্কিতে ৬০ বা ৭০ পার্সেন্ট, সুতরাং বিয়ার খেলে শ্লো চড়বে, এক পেগ হুইস্কিতেই মনে হবে টনক নড়ে গেছে। কারণ এলকোহলের মাত্রার জন্য। সুতরাং যার পর যেটা খুশি খান কোন ক্ষতি নেই। আপনার সিস্টেম এলকোহল যেভাবে গ্রহণ করবে সে অনুযায়ী নেশা হবে। হুইস্কি ও জলের বদলে হুইস্কি সোডাতে বেশী নেশা হয়। কেননা সোডা পেটকে ইরিটেট্ করে ও হুইস্কিকে তাড়াতাড়ি হজম করায়। পেটে খাবার থাকলে নেশা আস্তে আস্তে হয়। খালি পেটে নেশা দ্বিগুণ হয়।
দুই : হ্যাংগওভার কাটাবার জন্য ব্লাক কফি, লস্যি, কাঁচা ডিম খুব ভাল। এটাও বাজে কথা। লিভার রক্তকে সম্পুর্ণভাবে এলকোহলন্ডমুক্ত করতে যতটা সময় লাগে তার উপর নির্ভর করে হ্যাংগওভার। কফি বা নেবু কোন কাজ করে না। এগুলো মানসিক শান্তির জন্য মাতালরা ভেবে নেয়। ডাক্তারদের মতে এক পেগ হুইস্কি বা অর্ধ বোতল বিয়ার রক্তস্রোত থেকে নির্মূল করতে সুস্থ একটি লিভারের সময় লাগে এক ঘণ্টাটাক। বেশী মদ খেলে লিভার কাজ করতে করতে শ্লথ হয়ে যায়। সেজন্যই হ্যাংগওভার। ধীরে ধীরে লিভার শরীরকে সুস্থ করে দেয়।
তিন : ড্রিংকস্ যৌন উত্তেজনা বাড়ায় ও যৌন সম্ভোগকে দীর্ঘতর করে। ভুল এটা। সামান্য নেশা যৌনক্রীড়ায় ফলদায়ক হয়, কেননা স্নায়ুর শ্লথচারিতায় যৌন অনুভুতি দীর্ঘ হয়। না হলেও, মনের জোর ও সাহস বেড়ে যায় বলে যৌনভীতি কমে যায়। কিন্তু অধিক মদ্যপান যৌনশক্তিকে সত্যি বলতে, অপহরণ করে। রাজা মহারাজা থেকে জমিদাররা নেশার পর যৌনক্ষেত্রে এত বিফল হতেন যে ডাক্তার বদ্যি হাকিমী থেকে তুক্তাক্ কুসংস্কারের প্রচুর কাণ্ড-কারখানা করেও তাঁরা হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে পারেনি নি। ইংরেজীতে বলে Rich drinkers are poor lovers.
মদ্যপানের অগুণ শুনে যদি ভয় পেয়ে থাকেন তবে ভালই। লিভার যদি কথা বলতে পারত তাহলে এ প্রবন্ধের জন্য আমাকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করত। মানুষের শরীরে দুটো অঙ্গ সবচেয়ে নামজাদা ও শক্তিশালী। সে দুটো কি কি জানেন? অঙ্গতারকার মধ্যে এ দুজন হল ধর্মেন্দর ও অমিতাভ বচ্চন। এই দুটি হল হার্ট ও লিভার। ছেলেদের এই দুই অঙ্গের প্রধান শত্রুও হল দুটি। হার্টের শত্রু নারী, আর লিভারের শত্রু হল মদ-Woman আর Wine. মানব শরীরের সবচেয়ে বৃহৎ অঙ্গ হল লিভার। শৈশবে-শরীরের এক অষ্টমাংশ ও যৌবনে ৫০ ভাগের এক অংশ। লিভার দু’ভাগে বিভক্ত। ডানদিকের অংশ বাঁদিকে অংশের চাইতে ছ’গুণ বড়। লিভারের কাজ কি জানতে চান?
শুনুন-
Regulation of blood volume and manufacture ofcertain blood clotting factor, storage of glycogen, copper, iron,the metabolism of proteins, carbohydrates and fats, the production of heat, removing ofpoisonous effects ofcertain foreign substances in the blood, destrution of old red blood cell and formation of bile.
দেখলেন তো? শরীরের প্রধানমন্ত্রী যেন। কতগুলো পোর্ট-ফোলিও নিজের হাতে রেখেছে দেখছেন তো।
অত্যধিক মদ্যপানের সঙ্গে ক্ষুধামান্দ্য অঙ্গাঙ্গী জড়িত। দ্বিমুখী এই আক্রমণে লিভার অকেজো হয়ে যায়। সে আর সামান্যতম খাদ্যও হজম করাতে পারে না, রক্ত দূষিত হয়ে যায়। লিভার যেদিন তার কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করে তখনই দেখা দেয় সিরোসিস রোগ। এ রোগ গোড়াতে ধরা পড়লে হয়তো ডাক্তাররা এক-আধজনকে বাঁচাতে পারেন, নইলে cirrhosis মানেই মৃত্যু।
চিত্রজগতে সায়গল, শৈলেন্দ্র, জয়কিষণ, গীতা দত্ত, মীনাকুমারী সবাই এই রোগে মারা গেছেন। সবাই সুরার শিকারী, সবাইকে অতলে তলিয়ে দিয়েছে বোতল,গেলাসেই খালাস। আমার তো ধারণা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ মুজতবা আলীকেও আমরা এভাবেই হারিয়েছি। শিল্পীজগতে (অঙ্কন, সাহিত্য, চিত্র) এই রোগদানবের সাফল্যের সম্পূর্ণ তালিকা খুঁজে বার করলে খুবই দীর্ঘ হবে সে তালিকা। মুশকিল হল এই,প্রথমে শুরুতে বোতল আপনার দাস, ক্রমে ক্রমে ফ্রাংকেস্টাইন হয়ে ওঠে সে বোতল,তখন মানুষই বোতলের দাস। এলকোহলিক তখন আপনি। সেটাই সর্বনাশ। এক-আধটু কখনো-সখনো মন্দ নয়।
মদ তখন উর্দু কবিতার শরাব। মদ তখন মদিরা। মাত্রাজ্ঞান হারালেই মদ হয়ে ওঠে বদ তখন সে বদ আপনাকে বধ করে ছাড়বে। আমার মতে মদ আর মেয়ে অল্পবিস্তর দুটোই ভাল। দুটোর সঙ্গেই মাঝে-মাঝে ফ্লার্ট করুন, কিন্তু ধরা দেবেন না। নইলে মেয়ে আর মদ নাছোড়বান্দা হয়ে যাবে। শেষে দেখবেন আপনিই এই দুই আলেয়ার বান্দা হয়ে গেছেন। সাবধান হয়ে যান।
জানি সুরার bottle আর নারীর bottom খুবই লোভনীয়। দু বস্তুই বর্টম্ আপ মানে খৈয়ামী নন্দনকানন। কিন্তু মনে রাখবেন, আজকে যেটা নন্দনকানন, কাল সেটাই ক্রন্দনকানন, আজকে যেটা স্বর্গ কাল সেটাই বিসর্গ। মদের বিন্দু আর সিনেমার বিন্দু দুটো থেকেই দূরে থাকবেন। কেননা আজকে বিন্দুতে লোভ দিলে, কালকে সে বিন্দুই আপনার নামের আগে চন্দ্রবিন্দু হয়ে যাবে।
উর্দু কবি যতই বলুক–
“দোকানে ময়পে পৌঁছকর খুলি হকিকৎ এ হাল
হায়াৎ বেচ রাহা থা,ওহ্ ময়ফরোশ নহী থা।”
মদের দোকানে পৌঁছবার পর আমি বুঝতে পেরেছি, সুরা-ব্যাপারী সুরা নয়, জীবন বিক্রি করছিল।
মিথ্যে কথা। জীবন নয়, মৃত্যু বিক্রি করছিল। বিশ্বাস করুন। বচন ফকিরের কথা অমৃত সমান, চিয়ার্স, আজ থেকে নো মদ্যপান।
আরও দেখুন: