বসন্ত ঋতুসংগীত নিয়ে আজকের আলোচনা। আজ ফেসবুকে লিখেছি : –
১৯৩২ সালের দিকের কথা।
সেবার ওস্তাদ এনায়েত খাঁ সাহেব লন্ডন সফরে, ছেলে বিলায়েত কে সাথে নিয়েছেন। বিলায়েত খাঁর বয়স তখন ৫ কি ৬।
রয়েল আলবার্ট হলের কনসার্টে, অনেক বিস্তার করে বসন্ত রাগ বাজাচ্ছিলেন খাঁ সাহেব।
শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে যায় ছোট্ট বিলায়েত।
শ্রোতার হাততালির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে দেখে – চারদিকে শুধু হলুদ রঙের সমারোহ।
বিলায়েতের অবাক চোখের দিকে চেয়ে, খাঁ সাহেব বলেছিলেন “বাবা, এটাই বসন্ত রাগের রঙ” !!!
(যদিও গল্প শুনে আমার বউ বলেছিল – ওসব রাগ-ফাগ কিছু না। নিশ্চয় মাথায় গুঁতো লাগায়, সর্ষে ফুল দেখছিল !!!)
আজ আমাদের জীবনে – ঋষি নাই, ঋতু নাই। “ঋ” বর্ণ দিয়ে আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নাই (বিভিন্ন ধরনের “ঋণ” ছাড়া)।
গান (শোনার ধৈর্য) নাই, প্রেম (করার অবসর) নাই, দেখা (করার জায়গা) নাই।
তারপরেও আছে !
ঢাকা শহরে – তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের হলুদ কাপড়ে রঙিন হয়ে যাওয়া, একটি দিন হলেও আছে।
সবাইকে বসন্ত দিনের শুভেচ্ছা !!
আজ সারাদিন বসন্তে, প্রেমে, গানে – চোখে সরষের ফুল দেখতে থাকুন।
বসন্ত ঋতুসংগীত
ভারতীয় ঋতুচক্রে বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ—ঋতুর রাজা। শীতের নিস্তব্ধতা ও ম্লানতার পর যখন প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়, গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চারদিক—তখনই আসে বসন্ত। বাতাসে ভেসে বেড়ায় ফুলের গন্ধ, আকাশে থাকে কোমল আলো, আর মানুষের মনেও জেগে ওঠে নতুন আনন্দ ও সৃষ্টির উদ্দীপনা। এই ঋতুর আবেগ, রঙ ও প্রাণশক্তি ভারতীয় সঙ্গীতেও এক বিশেষ রূপে ধরা পড়েছে।
বসন্তের সঙ্গীতে তাই থাকে আনন্দ, উদ্দীপনা, প্রেম এবং নবজাগরণের সুর। যেন প্রকৃতি নিজেই এক নতুন সঙ্গীত রচনা করছে—কোকিলের ডাক, ফুলের সুবাস, দোলের রঙ আর বাতাসের দোলায় সেই সুর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
এই ঋতুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে কয়েকটি বিশেষ রাগ, যেগুলোকে বসন্তের আবহ প্রকাশের জন্য আদর্শ বলে ধরা হয়।
প্রধান রাগসমূহ:
বসন্ত, বাহার, হিন্দোল, সোহিনী।
রাগ বসন্ত নামের মধ্যেই বসন্তের পরিচয় বহন করে। এই রাগের সুরে আছে এক ধরনের উজ্জ্বলতা ও উচ্ছ্বাস, যেন প্রকৃতির নবজন্মের ঘোষণা। বসন্ত রাগ সাধারণত গম্ভীরতা ও আনন্দের মিশ্র অনুভূতি সৃষ্টি করে—যেখানে পুরোনো শীতের স্মৃতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় এবং নতুন ঋতুর উচ্ছ্বাস সামনে আসে।
রাগ বাহার বসন্তের আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ। “বাহার” শব্দের অর্থই হলো প্রস্ফুটন বা ফুলে ভরা সৌন্দর্য। এই রাগে বসন্তের রঙিনতা, প্রেমের আবেশ এবং প্রকৃতির কোমল আনন্দ খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। অনেক সময় বসন্ত উৎসব বা দোলযাত্রার সঙ্গে এই রাগের সম্পর্কও টানা হয়।
রাগ হিন্দোল বসন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাগ। এর সুরে এক ধরনের দোলায়িত আবহ আছে—যেন বাতাসে দুলছে নতুন পাতা বা ফুলের ডাল। “হিন্দোল” শব্দের অর্থই দোলনা বা দোল। এই রাগের চলনে একদিকে থাকে কোমলতা, অন্যদিকে থাকে গভীর আবেগ।
রাগ সোহিনী বসন্তের রাত্রিকালীন আবহে বিশেষভাবে মানানসই। এর সুরে থাকে এক ধরনের মৃদু উচ্ছ্বাস ও সৌন্দর্য, যা বসন্তের কোমল রাত্রিকে আরও রঙিন করে তোলে।
সঙ্গীতের আবহ
বসন্তের সঙ্গীতের আবহ মূলত রঙের উৎসব, প্রেমের উচ্ছ্বাস এবং সৃষ্টির আনন্দ। প্রকৃতির নতুন প্রাণ যেমন মানুষের মনে নতুন অনুভূতি জাগায়, তেমনি বসন্তের রাগগুলোতেও থাকে সেই নবজাগরণের সুর। কখনো তা মৃদু ও স্নিগ্ধ, আবার কখনো তা উচ্ছল ও উদ্দীপ্ত।
বসন্তের এই সুরকে ঘিরেই বাংলায় জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গান—রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকসংগীত কিংবা আধুনিক গানেও বসন্তের রঙিন আবেগ ধরা পড়েছে। ফাল্গুনের দোল, কোকিলের ডাক, ফুলের সুবাস—সব মিলিয়ে বসন্ত যেন প্রকৃতির এক বিশাল সঙ্গীতানুষ্ঠান, যেখানে প্রতিটি সুর নতুন জীবনের আনন্দকে উদযাপন করে।
যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্ত, তারা শুরুতেই ঘুরে আসতে পারেন বসন্ত রাগের নোট এ।

বসন্ত ঋতুসংগীত
নজরুলের গানে বসন্ত:
১. এলো ওই বনান্তে পাগল বসন্ত (নজরুল সঙ্গীত)
৩. আসে বসন্ত ফুল বনে:
– ফিরোজা বেগম:

রবীন্দ্রনাথের গানে বসন্ত:

আধুনিক বাংলা গানে বসন্ত:
২. মধু বসন্ত আজি এলো ফিরিয়া (দীপালী নাগ)
ভারতের বাংলা ছায়াছবিতে বসন্ত:
১. বসন্ত এসে গ্যাছে [চতুষ্কোণ]
বাংলাদেশি ছায়াছবির গানে বসন্ত:
১. এলো বসন্ত [হারানো প্রেম]
