বাংলাদেশের তরুণদের উপর আসলে কোন সংস্কৃতিক হেজিমনি চলছে?

বাংলাদেশে তরুণদের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি পরিচিত অভিযোগ সামনে আসে—“ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন”। এই অভিযোগটি এত ঘনঘন ব্যবহৃত হয়েছে যে, সেটি প্রায় একটি স্বতঃসিদ্ধ সত্যে পরিণত হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, এই অভিযোগটি বর্তমান সময়ের তরুণদের সাংস্কৃতিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। আজকের বাংলাদেশের তরুণদের দৈনন্দিন জীবন, ভাষা, রুচি, বিনোদন, পোশাক কিংবা চিন্তার জগতে ভারতীয় চিরায়ত সংস্কৃতির প্রভাব খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং এই অভিযোগটি অনেক ক্ষেত্রে একটি আরামদায়ক ব্যাখ্যা—যার মাধ্যমে আমরা নিজেদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, শিক্ষা-সংকট এবং রুচিহীনতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারি।

 

Table of Contents

বাংলাদেশের তরুণদের উপর আসলে কোন সংস্কৃতিক হেজিমনি চলছে?

 

আমাদের সহজ ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে হবে —বাংলাদেশের তরুণদের উপর সত্যিকারের যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য চলছে, তা কি আদৌ ভারতীয়? নাকি আমরা একটি ভিন্ন, আরও গভীর ও বিপজ্জনক হেজিমনির ভেতর বাস করছি?

 

কালচারাল হেজিমনি: জোর নয়, সম্মতির শাসন

সংস্কৃতিক হেজিমনি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় এমন একটি আধিপত্য, যা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতির মাধ্যমে কাজ করে। ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি এই ধারণাটি সামনে এনেছিলেন। তাঁর মতে, আধিপত্যশীল গোষ্ঠী সমাজের মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন, রুচি ও স্বাভাবিকতার ধারণা এমনভাবে নির্মাণ করে যে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই আধিপত্যকে গ্রহণ করে নেয়। এখানে কাউকে বাধ্য করা হয় না; বরং মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এটিই আধুনিক, এটিই স্বাভাবিক, এটিই কাঙ্ক্ষিত।

আজকের দিনে এই হেজিমনি সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করে মিডিয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা, বিনোদন শিল্প এবং সর্বোপরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। তরুণদের চোখের সামনে নিরবচ্ছিন্নভাবে যে ভাষা, ছবি, গল্প ও জীবনধারা হাজির করা হয়, সেগুলিই ধীরে ধীরে তাদের মানসিক মানচিত্র গড়ে তোলে।

 

হেজিমন কারা এবং তারা কীভাবে কাজ করে

বর্তমান বিশ্বে হেজিমনি আর শুধু রাষ্ট্রের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গ্লোবাল কর্পোরেশন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, পপ কালচার ইন্ডাস্ট্রি এবং ধর্মীয়–রাজনৈতিক প্রভাবক গোষ্ঠীগুলো মিলেই আজকের হেজিমন। নেটফ্লিক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব বা টিকটকের অ্যালগরিদম তরুণদের কী দেখবে, কী শুনবে, কী পছন্দ করবে—তার একটি বড় অংশ নির্ধারণ করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় তরুণদের সামনে বিকল্প সংস্কৃতি বা গভীর সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।

বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা ভিন্ন নয়। তবে এখানে হেজিমনির চরিত্র একরৈখিক নয়; বরং শ্রেণিভিত্তিক ও বিভক্ত।

 

শ্রেণিভেদে ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক আধিপত্য

বাংলাদেশের সচ্ছল ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত তরুণদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জগৎ মূলত ওয়েস্টার্ন পপ ও কনজ্যুমার কালচারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হলিউড সিনেমা, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সিরিজ, গ্লোবাল ব্র্যান্ডের লাইফস্টাইল এবং ইনস্টাগ্রামভিত্তিক সৌন্দর্যবোধ তাদের কাছে আধুনিকতার প্রতীক। অন্যদিকে আর্থিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকা তরুণদের বড় অংশ বসবাস করছে ফেসবুক ও টিকটকনির্ভর এক ভিন্ন জগতে—যেখানে ভাইরাল হওয়াই সাফল্য, আর কনটেন্টের মান নয়, তার দ্রুততা ও চমকই মুখ্য।

এই দুই জগতের মাঝখানে রয়েছে আরেকটি শক্তিশালী প্রভাব—আরব, পাকিস্তানি ও বলিউড-প্রভাবিত ধর্মীয় ও ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতি। হিজাব, নেকাব, পাকিস্তানি লন কিংবা ভারী মেকআপ এখানে পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক সংস্কৃতির গভীর বোঝাপড়ার ফল নয়; বরং মিডিয়ানির্ভর এক ধরনের স্টাইলাইজড অনুকরণ।

 

ভারতীয় সংস্কৃতি: বাস্তব প্রভাব নাকি সুবিধাজনক ভিলেন

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে—ভারতীয় সংস্কৃতি কোথায়? বাস্তবতা হলো, আজকের বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, সাহিত্য, থিয়েটার বা দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য তরুণদের পাঠ্যজগতে অনুপস্থিত। যা কিছু ভারতীয় প্রভাব বলা হয়, তার বেশিরভাগই বলিউডের গ্লোবালাইজড পপ সংস্কৃতি—যা নিজেই একটি হাইব্রিড ও কনজ্যুমার প্রোডাক্ট, যার সাথে ভারতের শেকড়ের সংস্কৃতির সম্পর্ক খুবই সামান্য।

তবুও ভারতীয় সংস্কৃতিকে ভিলেন বানানো সুবিধাজনক। কারণ এতে নিজেদের সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হয় না।

 

সবচেয়ে ভয়ংকর হেজিমনি: অশিক্ষা ও অপরিশীলিততার আধিপত্য

বাংলাদেশে বর্তমানে যে হেজিমনি সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তা কোনো দেশের সংস্কৃতি নয়—বরং অশিক্ষা ও অপরিশীলিততাকে ‘অথেন্টিক’ বা ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা। বই পড়াকে এলিটিজম বলা হচ্ছে, পরিশীলিত ভাষাকে ভণ্ডামি হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর গালাগালিপূর্ণ ভাষা ও ভাড়ামি কমেডিকে ‘রিয়েল’ বা “কুল” হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অশিক্ষার হেজিমনিকে অনেক সময় ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধিতার নামে ন্যায্যতা দেওয়া হচ্ছে। যেন পড়াশোনা করা, শিল্পচর্চা করা বা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা করা মানেই কোনো বিদেশি প্রভাবের কাছে নত হওয়া।

 

অশিক্ষা কোনো সংস্কৃতি নয়

অশিক্ষার সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান বা আরব বিশ্বের সংস্কৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো দেশের অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আচরণ সংস্কৃতি নয়, ঐতিহ্য নয় এবং অনুসরণযোগ্যও নয়। সংস্কৃতি মানে সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, ভাষা ও চিন্তার গভীরতা। আর এই গভীরতা অর্জন করতে হলে পড়তে হয়, শুনতে হয়, শিখতে হয়।

আজকের তরুণদের বড় অংশ রবীন্দ্রনাথ পড়ে না, নজরুল পড়ে না, সৈয়দ শামসুল হক পড়ে না, এমনকি ফররুখ আহমদও পড়ে না। যারা নিজেদের ইসলামি সংস্কৃতির ধারক বলে দাবি করে, তাদের বড় অংশ আরবি জানে না, সমসাময়িক আরবি সাহিত্য পড়েনি, উর্দু ভাষা বা কাওয়ালির সংগীততত্ত্ব বোঝে না। ফলে তারা কোনো সংস্কৃতিরই প্রকৃত ধারক হয়ে উঠতে পারছে না।

 

ওয়েস্টার্ন পপ ও কনজ্যুমার কালচার: আধুনিকতার ছদ্মনাম

বাংলাদেশের সচ্ছল পরিবারের তরুণদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, রুচি ও স্বপ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তাদের উপর সবচেয়ে প্রভাবশালী যে সাংস্কৃতিক শক্তিটি কাজ করছে, সেটি মূলত আমেরিকান ও ওয়েস্টার্ন পপ-কনজ্যুমার কালচার। এখানে সংস্কৃতি আর মানবিক চর্চা হিসেবে উপস্থিত নয়; এটি মূলত পণ্য, ব্র্যান্ড ও লাইফস্টাইলের সমষ্টি। কী পরা হবে, কী খাওয়া হবে, কী দেখা হবে, এমনকি কীভাবে কথা বলতে হবে—সবকিছুই নির্ধারিত হচ্ছে গ্লোবাল মার্কেটিং ও ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে।

এই তরুণদের কাছে আধুনিকতা মানে ইংরেজি উচ্চারণ, পশ্চিমা ফ্যাশন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সিরিজ এবং ব্র্যান্ডনির্ভর পরিচয় (যেটাও অশিক্ষার কারণে তারা ঠিকমতো (অথেনটিক) ধরতে পারছে না)। এতে সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই আধুনিকতার ধারণাটি নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করে তোলে। বাংলা গান শোনা বা বই পড়া যেন ‘আউটডেটেড’, অথচ একই তরুণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটফ্লিক্স সিরিজ দেখে নিজের সময় ও মনোযোগ নিঃশেষ করে দেয়—এটিকে তারা প্রগতিশীলতা বলে মনে করে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ওয়েস্টার্ন প্রভাবটি কোনো গভীর দার্শনিক বা মানবিক ঐতিহ্য বহন করে না। এটি মূলত ভোগবাদী—যেখানে মানুষ তার মূল্য পায় সে কী কিনতে পারে এবং কী প্রদর্শন করতে পারে তার মাধ্যমে। এই সংস্কৃতি তরুণদের শেখায় ভোগ করতে, কিন্তু ভাবতে শেখায় না।

 

সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যালগরিদম: রুচিহীনতার কারখানা

ওয়েস্টার্ন কালচারের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের উপর যে শক্তিটি সবচেয়ে দ্রুত ও গভীরভাবে কাজ করছে, তা হলো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম। Instagram Reels, YouTube Shorts ও TikTok আজ আর শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়—এগুলোই তরুণদের সাংস্কৃতিক শিক্ষক। কিন্তু এই শিক্ষকরা কোনো মূল্যবোধ শেখায় না; তারা শেখায় কীভাবে ভাইরাল হতে হয়।

অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে পুরস্কৃত করে, যা দ্রুত মনোযোগ কাড়ে—তা সে অশ্লীল হোক, ভাড়ামি হোক বা ঘৃণাপূর্ণ হোক। ফলে তরুণরা ধীরে ধীরে বুঝে যায়, গালি দিলে, কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দিলে বা অন্যকে অপমান করলে লাইক বাড়ে, ফলোয়ার বাড়ে। এই প্রক্রিয়ায় একটি ভয়ংকর মানসিকতা তৈরি হয়—সংবেদনশীলতা নয়, চমকই সাফল্যের মাপকাঠি।

এর ফল হলো, ভাষা ক্রমে অপরিশীলিত হয়ে উঠছে। আগে শুদ্ধ বা পরিশীলিত বাংলা বলাকে সামাজিকভাবে মর্যাদার বিষয় মনে করা হতো; এখন সেটিকে অনেক সময় ‘নাটক’ বা ‘ভণ্ডামি’ বলা হয়। বিপরীতে, গালাগালিপূর্ণ, অদ্ভুত উচ্চারণভিত্তিক বাংলা হয়ে উঠেছে ‘রিয়েল’। এটি কোনো স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিবর্তন নয়; এটি অ্যালগরিদমিক হেজিমনির ফল।

 

কে-পপ ও কে-ড্রামা: নিরীহ বিনোদন নয়

কে-পপ ও কে-ড্রামার জনপ্রিয়তা অনেকেই নিরীহ বিনোদন হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক রপ্তানি ব্যবস্থা—যাকে কোরিয়ান রাষ্ট্র নিজেই সফট পাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব লক্ষণীয়, বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে।

এখানে সমস্যাটি কে-পপ শোনা বা কে-ড্রামা দেখায় নয়। সমস্যা হলো, এই ফ্যানডম অনেক সময় নিজস্ব সংস্কৃতির জায়গা দখল করে নেয়। সৌন্দর্যের মানদণ্ড থেকে শুরু করে সম্পর্কের ধারণা, এমনকি আবেগ প্রকাশের ভাষাও কোরিয়ান মডেলে রূপ নিতে থাকে। অথচ এই তরুণদের বড় অংশ বাংলা সংগীত, বাংলা কবিতা বা নাটকের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই তৈরি করতে পারেনি।

ফলে একটি শূন্যতা তৈরি হয়—নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড় দুর্বল হয়ে যায়, আর সেই শূন্যতা পূরণ করে বিদেশি পপ আইডল ও ফিকশনাল চরিত্র।

 

বাংলা সংস্কৃতির জায়গা কোথায় হারালো

এই সব প্রভাবের ভিড়ে সবচেয়ে করুণ পরিণতি হয়েছে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির। নব্বইয়ের দশকে যে ব্যান্ড সঙ্গীত তরুণদের ভাষা ও মনন গড়ে তুলেছিল, আজ তা প্রায় ইতিহাস। একসময় নাটকের চরিত্রগুলো মানুষের জীবন্ত রেফারেন্স ছিল—বাকের ভাই, হেলাল, নীলু বা মফিজ ছিল সামাজিক আলোচনার অংশ। আজকের তরুণদের বড় অংশ এই নামগুলোই চেনে না।

এর পেছনে শুধু প্রযুক্তি দায়ী নয়। দায়ী সেই সামাজিক পরিবেশও, যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারে গান শেখা, ছবি আঁকা, বিতর্ক করা বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকা ক্রমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক অনুষ্ঠান, নাটক বা সাহিত্যচর্চা আজ অনেক জায়গায় শুধু আনুষ্ঠানিকতা।

 

সংস্কৃতি চর্চা মানে পরিশ্রম

একটি অস্বস্তিকর সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে—ভালো সংস্কৃতি উপভোগ করার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হয়। গান বুঝতে শুনতে হয়, সাহিত্য বুঝতে পড়তে হয়, শিল্প বুঝতে চোখ ও মন তৈরি করতে হয়। এই প্রস্তুতির জায়গাটিই আজ প্রায় অনুপস্থিত। ফলে বইয়ের সাথে সেলফি তোলা হচ্ছে, কিন্তু বই পড়া হচ্ছে না। সংস্কৃতির জায়গায় এসেছে ভিজ্যুয়াল প্রদর্শন।

এই পরিস্থিতিতে ভারত, পাকিস্তান বা আরবকে গালাগালি করে দেশপ্রেম প্রমাণ করা সবচেয়ে সহজ পথ। কিন্তু এই সহজ পথ আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকে আরও গভীর করছে।

 

অশিক্ষার হেজিমনি: সবচেয়ে বিপজ্জনক আধিপত্য

বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের উপর যে হেজিমনিটি সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে, সেটি আসলে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সংস্কৃতি নয়—এটি অশিক্ষার হেজিমনি। ভয়ংকর বিষয় হলো, এই অশিক্ষাকে আজ একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে: “ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধিতা”। বাস্তবে এই বিরোধিতার সাথে ভারতীয় চিরায়ত সংস্কৃতির কোনো সম্পর্কই নেই; বরং এটি এক ধরনের বুদ্ধিবিরোধী মনোভাব, যেখানে পড়াশোনা, পরিশীলন, শিল্প-সংস্কৃতির গভীর চর্চা—সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

এখানে অশিক্ষা মানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির অভাব নয়। অশিক্ষা মানে চিন্তার অভাব, রুচির অভাব, জিজ্ঞাসার অভাব। অশিক্ষার হেজিমনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে বই না পড়াকে গর্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, জটিল চিন্তাকে “এলিটিজম” বলে খারিজ করা হয়, আর পরিশীলিত ভাষাকে “ভণ্ডামি” হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এই মানসিকতাকে দেশপ্রেমের মোড়কে বিক্রি করা হচ্ছে।

 

ভারতবিরোধিতা আর সংস্কৃতি: কৃত্রিম সংযোগ

ভারতীয় রাষ্ট্রনীতি বা রাজনৈতিক আধিপত্যের সমালোচনা করা এক জিনিস, আর সংস্কৃতির নামে অশিক্ষা প্রমোট করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দুটোকে আজ একাকার করে ফেলা হয়েছে। ফলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—যে যত বেশি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করবে, যত বেশি শুদ্ধ বাংলা নিয়ে বিদ্রূপ করবে, যত বেশি “গাঁইয়া” আচরণকে উদযাপন করবে, সে তত বেশি দেশপ্রেমিক।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা কি আদৌ কোনো বিকল্প সংস্কৃতি দাঁড় করাতে পেরেছি? বাস্তবতা হলো—না। আমরা বরং এমন একটি শূন্যতা তৈরি করেছি, যেখানে জায়গা নিয়েছে অপরিশীলিত গালি-গালাজ, সস্তা গান, ভাড়ামি কমেডি ও ঘৃণাপূর্ণ ভাষা।

এই সংস্কৃতির সাথে ভারতের, পাকিস্তানের বা আরব বিশ্বের কোনো পরিশীলিত সাংস্কৃতিক ধারারও সম্পর্ক নেই। পাকিস্তানের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে অশিক্ষিত, রুচিহীন সংস্কৃতি দেখা যায়—তা কোনো সংস্কৃতি নয়, বরং সামাজিক পশ্চাৎপদতার ফল। সেটি অনুকরণযোগ্য তো নয়ই, বরং আমাদের জন্য সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।

 

ধর্মের নামেও সংস্কৃতিহীনতা

আরও একটি ভয়ংকর প্রবণতা হলো—ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে সাংস্কৃতিক অজ্ঞতাকে বৈধতা দেওয়া। যারা নিজেদের ইসলামি সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে দাবি করেন, তাদের বড় অংশ আরবি ভাষা জানেন না, সমসাময়িক আরবি সাহিত্য পড়েননি, এমনকি ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য সম্পর্কেও তাদের ধারণা সীমিত।

উর্দুকে অনেকেই “ইসলামি ভাষা” মনে করেন, কিন্তু বাস্তবে খাঁটি উর্দু বোঝার সক্ষমতা তাদের নেই। উর্দু নাস্তালিক লিপি পড়া তো দূরের কথা, কোনো উর্দু কবির শের, মার্সিয়া বা আফসানা তারা জীবনে পড়েননি। কাওয়ালি ভালো লাগে বললেও রাগ, তাল, বোল বা বানীর কোনো ধারণা নেই। ফলে এখানে ধর্মীয় সংস্কৃতির চর্চা নয়, বরং প্রতীকি ও ভাসা-ভাসা অনুকরণ চলছে।

এটি কোনো সংস্কৃতির হেজিমনি নয়; এটি সংস্কৃতিহীনতার হেজিমনি।

 

পরিশীলিত সংস্কৃতির জায়গা কেন সংকুচিত হলো

একসময় মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে গান শেখা, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, বিতর্ক বা নাটক করা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির কেন্দ্র। সেই প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই তৈরি হতো পরিশীলিত নাগরিক। আজ সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে।

কারণ পরিশীলিত সংস্কৃতি চর্চা সময় চায়, পরিশ্রম চায়, ধৈর্য চায়। আর বর্তমান হেজিমনি তরুণদের শেখাচ্ছে—সবকিছু দ্রুত চাই, সহজ চাই, বিনা পরিশ্রমে চাই। ফলে বইয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি করার বদলে বইয়ের সাথে ছবি তোলাই যথেষ্ট হয়ে গেছে।

 

বাঙালি হিসেবে সামনে এগোনোর পথ

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি অশিক্ষার হেজিমনির সাথে আপস করব, নাকি পরিশীলিত ও সৃষ্টিশীল বাঙালি সংস্কৃতির নতুন হেজিমনি তৈরি করব?

ভারত বা পাকিস্তানকে গালাগালি করে দেশপ্রেম প্রমাণ করা যাবে না। দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হয় ভাষায়, শিল্পে, সাহিত্যে, চিন্তায়। আমাদের প্রয়োজন বাংলা ভাষাকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, বাংলা সাহিত্যকে তরুণদের জীবনের সাথে যুক্ত করা, সংগীত, নাটক ও শিল্পকলাকে আবার সামাজিক জীবনের কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনা।

কালচারাল হেজিমনি বদলাতে চাইলে বিকল্প হেজিমনি তৈরি করতে হয়। সেই হেজিমনি হতে হবে পরিশীলিত, শিক্ষাভিত্তিক, সৃষ্টিশীল এবং আত্মবিশ্বাসী। যেখানে বাঙালি হওয়া মানে সংকীর্ণতা নয়, বরং চিন্তার গভীরতা; যেখানে বাংলা বলা মানে পশ্চাৎপদতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা।

এই লড়াই সহজ নয়। কিন্তু এই লড়াই ছাড়া বাঙালি হিসেবে আমাদের সামনে এগোনোর আর কোনো পথও নেই।