তথ্য প্রযুক্তি পেশাজীবীদের বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে যারা প্রতিনিধিত্ব করে তাদের কাজের আওতা ও কাজের সাথে পরিচয় থাকা দরকার। আইটি খাতের বিকাশ, নীতি নির্ধারণ এবং এই শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু বাণিজ্যিক সংগঠন বা ট্রেড বডি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এই সংগঠনগুলো সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বর্তমানে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
নিচে বাংলাদেশের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি ট্রেড বডিগুলোর পরিচিতি ও তাদের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. বেসিস (BASIS – Bangladesh Association of Software and Information Services)
বেসিস হলো বাংলাদেশের সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের জাতীয় বাণিজ্য সংগঠন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি বর্তমানে দেশের আইটি খাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী বডি।
পরিচিতি: এটি মূলত সফটওয়্যার তৈরি, আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস (ITES) এবং ইন্টারনেট ভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রধান কার্যক্রম:
- দেশের সফটওয়্যার খাতের জন্য সরকারের কাছ থেকে নীতি সহায়তা ও কর ছাড় (Tax Exemption) নিশ্চিত করা।
- ‘বেসিস সফটএক্সপো’ (BASIS SoftExpo)-এর মতো বড় প্রদর্শনীর আয়োজন করা।
- বিদেশে বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পের ব্র্যান্ডিং এবং বাজার সম্প্রসারণ করা।
- আইটি উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা।
২. বিসিএস (BCS – Bangladesh Computer Samity)
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিসিএস বাংলাদেশের আইটি খাতের প্রাচীনতম এবং সর্ববৃহৎ সংগঠন।
পরিচিতি: এটি মূলত কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্কিং পণ্য বিক্রেতা, আমদানিকারক এবং পরিবেশকদের সংগঠন।
প্রধান কার্যক্রম:
- কম্পিউটার পণ্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক কমানোর জন্য সরকারের সাথে লবিং করা।
- দেশব্যাপী ‘আইসিটি মেলা’ বা কম্পিউটার মেলার আয়োজন করে সাধারণ মানুষের কাছে প্রযুক্তি পণ্য পৌঁছে দেওয়া।
- হার্ডওয়্যার ব্যবসার মান উন্নয়ন এবং সদস্যদের ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধান করা।
৩. বাক্কো (BACCO – Bangladesh Association of Contact Center & Outsourcing)
আগে এটি ‘বিপিও কাউন্সিল’ নামে পরিচিত ছিল। এটি মূলত বাংলাদেশের কল সেন্টার এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO) খাতের সংগঠন।
পরিচিতি: যারা দেশের বাইরে বা দেশের ভেতরে কল সেন্টার সেবা, ডেটা এন্ট্রি বা ব্যাক-অফিস সাপোর্ট প্রদান করে, তারা এই সংগঠনের সদস্য।
প্রধান কার্যক্রম:
- বিপিও (BPO) খাতকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
- তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের সাথে কাজ করা।
- আন্তর্জাতিক বিপিও সামিটের আয়োজন করা।
- বিপিও খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৪. আইএসপিএবি (ISPAB – Internet Service Providers Association of Bangladesh)
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সংগঠন হলো আইএসপিএবি।
পরিচিতি: সারা দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা (ISP) প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংগঠনের সদস্য। ডিজিটাল কানেক্টিভিটির মেরুদণ্ড হিসেবে তারা কাজ করে।
প্রধান কার্যক্রম:
- ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথের দাম কমানো এবং সেবার মান উন্নত করতে বিটিআরসি (BTRC)-এর সাথে কাজ করা।
- সবার জন্য সাশ্রয়ী ও উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা।
- ইন্টারনেট নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা।
৫. ই-ক্যাব (e-CAB – e-Commerce Association of Bangladesh)
বাংলাদেশে ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার বিপ্লব ঘটাতে এই সংগঠনটি কাজ করছে।
পরিচিতি: অনলাইনে পণ্য বা সেবা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: চালডাল, দারাজ ইত্যাদি) জাতীয় সংগঠন।
প্রধান কার্যক্রম:
- ই-কমার্স খাতের জন্য গাইডলাইন এবং আইনি কাঠামো তৈরিতে সরকারকে সহায়তা করা।
- অনলাইন কেনাকাটায় গ্রাহকদের আস্থা বৃদ্ধি এবং প্রতারণা রোধে কাজ করা।
- ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের লজিস্টিক এবং পেমেন্ট গেটওয়ে সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা।
৬. বিএমপিএ (BMPA – Bangladesh Mobile Phone Importers Association)
এটি বাংলাদেশে মোবাইল ফোন আমদানিকারক এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন।
পরিচিতি: স্যামসাং, টেকনো বা ওয়ালটন-এর মতো যারা মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসা করে, তারা এর সদস্য।
প্রধান কার্যক্রম:
দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহিত করতে নীতি সহায়তা প্রদান।
অবৈধ হ্যান্ডসেট আমদানি রোধে এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা করা।
বাংলাদেশের এই ট্রেড বডিগুলো মূলত একটি ইকোসিস্টেম হিসেবে কাজ করে। বেসিস সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করলে বিসিএস কাজ করে হার্ডওয়্যার নিয়ে, আবার আইএসপিএবি নিশ্চিত করে ইন্টারনেট সংযোগ। সরকারের আইসিটি বিভাগ এই সকল সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে বিভিন্ন জাতীয় নীতি প্রণয়ন করে। আপনি যদি এই খাতের একজন উদ্যোক্তা হতে চান, তবে আপনার ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্য হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
