বাংলাদেশে সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying, Cyberbullying or Cyberharassment ] কী, কেন, কিভাবে ?

একটা ফেসবুক প্রোফাইল, একটা সাধারণ ব্লগ কিংবা একটা ইউটিউব চ্যানেল—আজকের দিনে একজন অতি সাধারণ মানুষকেও কোনো টাকা-পয়সা খরচ করা ছাড়াই একটা শক্তিশালী মিডিয়ার মালিক বানিয়ে দিতে পারে। শুধু মিডিয়া কেন, আস্ত একটা মাল্টিমিডিয়ার মালিক! সেখানে দিনে যতবার খুশি, একদম নিখরচায়, নিজের ইচ্ছেমতো নিজেকে প্রকাশ করা যায়। শুধু তাই নয়, প্রকাশের পর যেকোনো সময় আবারো দেখার জন্য সেটা পাবলিক প্লেসে বছরের পর বছর জমাও রাখা যায়। আর নিজের কনটেন্টের পাঠক বা দর্শকের সাথে ইচ্ছেমতো যতবার খুশি আড্ডা বা মিথস্ক্রিয়া করা যায়, তাও আবার মাল্টিমিডিয়া ফরম্যাটেই।

cyberbullying pixabay বাংলাদেশে সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying, Cyberbullying or Cyberharassment ] কী, কেন, কিভাবে ?

আপনার তৈরি করা কনটেন্ট যদি সত্যিই ভালো আর কাজের হয়, তবে কোনো লাইসেন্স বা পাসপোর্ট ছাড়াই সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করে নেওয়ার একটা দারুণ সুযোগ থাকে। এখানে কোনো বর্ডার ব্যারিয়ার নেই, নেই কোনো অবকাঠামো বা রেগুলেটরি মেইনটেইন্যান্সের বাড়তি খরচ। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা আমাদের চিরাচরিত কোনো গণমাধ্যম (পত্রিকা বা টিভি) আজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে নিজেকে প্রকাশের এই নিখরচায় স্বাধীনতার একটা ছোট্ট অংশও দিতে পারেনি। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি, এই সাইবার জগৎ আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সেই ক্ষমতাটা এনে দিয়েছে।

তবে মুদ্রার যেমন ওপিঠ থাকে, তেমনি প্রতিটি কল্যাণমুখী প্রযুক্তিই নিজের চরিত্রের অংশ হিসেবে কিছু অকল্যাণের ঝুঁকিও সাথে করে নিয়ে আসে। একটা প্রযুক্তি তার সঠিক ব্যবহারে যতটা কল্যাণ করতে পারে, তার অপব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতি করতে পারে তার চেয়ে ঠিক দশগুণ বেশি। ইন্টারনেট বা সাইবার জগতের এই কুৎসিত আর অন্ধকার দিকটাই হলো ‘সাইবার বুলিং’ এবং ‘সাইবার ক্রাইম’।

Table of Contents

সাইবার বুলিং কি শুধু আমাদের দেশের রোগ?

না, সাইবার বুলিং কোনো লোকাল সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মহামারী। প্রযুক্তির চাকা যত দ্রুত সামনের দিকে এগোচ্ছে, এই আপদটাও ঠিক ততটাই ডালপালা মেলছে। বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিংয়ের প্রধান শিকার কিন্তু ছোট ছোট শিশুরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান খতিয়ান ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় ৪৩% শিশুই কোনো না কোনোভাবে অনলাইনের এই নোংরামির মুখোমুখি হয়, অনেকে তো শিকার হয় বারবার। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে মাত্র ১০% শিশু সাহস করে পরিবার বা অন্য কাউকে বিষয়টি জানায়, বাকি ৯০% চরম মানসিক ট্রমা নিয়ে মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করে যায়। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এই অনলাইন হ্যারাজমেন্টের শিকার হয় প্রায় দ্বিগুণ। আর এর প্রভাব এতটাই মারাত্মক যে, ভিকটিমদের ২০ শতাংশেরই মানসিক অবস্থা ডিপ্রেসিভ হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়।

বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া এই বাচ্চাদের মধ্যে চরম হতাশা, স্কুল-কলেজে না যাওয়ার অজুহাত, ইনসোমনিয়া বা রাতের পর রাত ঘুম না আসা এবং অদ্ভুত সব মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। এখন পর্যন্ত হওয়া একাধিক আত্মহত্যার পেছনের জট খুলতে গিয়ে দেখা গেছে, অনলাইনে দিনের পর দিন কুৎসিত হেনস্তা হওয়া এবং সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে শেষমেশ আত্মহত্যার পথটাই বেছে নিয়েছে ভিকটিমরা। আমাদের দেশে এই ধরনের ঘটনাগুলো এখনও লোকলজ্জা আর সামাজিক ভয়ের কারণে সঠিকভাবে থানায় বা মিডিয়ায় রিপোর্ট হয় না, তাই অফিশিয়ালি আমরা অনেক লমহর্ষক ট্র্যাজেডির কথাই জানতে পারি না।

সাইবার বুলিং আসলে কী?

সহজ কথায়, সাইবার বুলিং হলো অনলাইনের এমন কিছু আচরণ (তা হতে পারে কোনো কুৎসিত লেখা, অডিও বা ভিডিও কমেন্ট, কিংবা ছবি বিকৃত করে পোস্ট করা) যা অন্য কোনো মানুষকে চরম লজ্জা, ভয়, হুমকি, অপদস্থ বা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেয়।

ডিজিটাল দুনিয়ায় এর রূপ বহু রকমের হতে পারে। যেমন:

  • কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ইচ্ছে করে কোনো ক্লোজ মেসেজিং গ্রুপ থেকে ঘাড় ধরে বাদ দিয়ে তাকে ছোট ফিল করানো।
  • ইনবক্সে বা কমেন্ট বক্সে গিয়ে মা-বোন তুলে নোংরা গালিগালাজ করা।
  • কোনো সম্পর্কের খাতিরে বা চেনা-জানার সুযোগে অনুপযুক্ত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলা।
  • টেক্সট পাঠিয়ে বা অডিও নোটে কাউকে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া বা ভয় দেখানো।
  • কারো একান্ত ব্যক্তিগত বা গোপন কোনো তথ্য কিংবা ছবি ইন্টারনেটে লিক করে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।
  • কারো সরলতার সুযোগ নিয়ে তার পার্সোনাল আইডি-পাসওয়ার্ড বা গোপন ছবি-ভিডিও হাতিয়ে নেওয়া (এমনকি সেটা অন্য কোথাও পাবলিশ না করলেও এটা এক ধরনের মানসিক টর্চার)।
  • কারো প্রোফাইল হ্যাক করে বা সুযোগ পেয়ে আজেবাজে স্ট্যাটাস দিয়ে তার ইমেজ নষ্ট করা।
  • কারো ছবি চুরি করে তার নামে ফেক প্রোফাইল বা ফেক আইডি খুলে প্রতারণা করা।
  • কারো শরীরের গঠন, গায়ের রং, পড়াশোনা বা যেকোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে অনলাইনে সবার সামনে ট্রল বা তামাশার পাত্র বানানো।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাইবার বুলিং: মাঠপর্যায়ের রুক্ষ বাস্তব চিত্র

আমাদের বাংলাদেশের মাটিতে এই সাইবার বুলিংয়ের ধরন আর ভিকটিমদের মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি বেশ কিছু অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করেছি। বৈশ্বিক চিত্রের সাথে আমাদের দেশের মিল তো আছেই, তবে আমাদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থার কারণে এখানে বেশ কিছু বড় ও সূক্ষ্ম পার্থক্যও চোখে পড়ে। পার্থক্যগুলো একটু ভেতর থেকে বোঝা দরকার:

প্রথমত: রুচি, মূল্যবোধ আর সংস্কৃতির বিরাট ফারাক

উন্নত বিশ্বে যে ধরণের অনলাইন আচরণকে নির্দ্বিধায় ‘সাইবার বুলিং’ বা অপরাধ বলে চিনে নেওয়া হয়, আমাদের সমাজে তার অনেক কিছুই এখনও ‘নরমাল রসিকতা’ বা সাধারণ খাতিরদারি হিসেবে বেশ পার পেয়ে যায়। আবার আমাদের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই বুলিং চেনার মাপকাঠিও আলাদা।

এর ফলে যেটা হচ্ছে—আমাদের সমাজের অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত, রুচিশীল এবং সংবেদনশীল মানুষগুলো অনলাইনের এক শ্রেণির নিম্নরুচির ট্রলার বা সাইবার-বুলিদের কাছে নিয়মিত হ্যারাজমেন্টের শিকার হচ্ছেন। আর সবচেয়ে ট্র্যাজিক ব্যাপার হলো, যারা এই নোংরা ট্রল বা বুলিংগুলো করছে, তারা নিজেরাও অনেক সময় বুঝতে পারে না যে তারা একটা জঘন্য সামাজিক অপরাধ করছে!

যেমন ধরুন, আমাদের দেশে ফেসবুকে কারো লাইভ বা ছবির নিচে গিয়ে প্রকাশ্য কমেন্টে ‘মোটা হয়ে যাওয়া’, ‘বয়স বেশি লাগা’ কিংবা ‘মাথার চুল পড়ে যাওয়া’ নিয়ে বিদ্রূপ করাটাকে অনেকেই নিতান্তই নিরীহ রসিকতা ভাবেন। আবার কারো ওয়ালে গিয়ে হুট করে এমন কিছু অযাচিত উপদেশ দিয়ে আসা—যা আক্ষরিক অর্থেই বোঝায় যে উনি আসলে এই মুহূর্তে ওই উপদেশের একদম উল্টো পথে চলছেন—সেটাকেও লোকে ‘ভালো মনে গাইড করা’ হিসেবে জায়েজ করে নেয়। অথচ সাইবার সাইকোলজির পরিভাষায় এগুলো রীতিমতো সাইবার বুলিং। কারণ আপনার এই একটা কমেন্ট অন্য একজন মানুষকে মানসিকভাবে কতটা ছোট বা ডিপ্রেসড করে দিচ্ছে, তার কোনো ধারণাই আপনার নেই।

দ্বিতীয়ত: শিশুদের চেয়ে বড়রাই এখানে বেশি টার্গেট

পশ্চিমা বিশ্বে সাইবার বুলিংয়ের মূল টার্গেট যেখানে স্কুলের বাচ্চারা, আমাদের দেশে কিন্তু চিত্রটা উল্টো—এখানে প্রাপ্তবয়স্করাই অনলাইনের এই হ্যারাজমেন্টের শিকার হন বেশি, বিশেষ করে নারীরা। এর প্রধান কারণ হলো, আমাদের দেশের একদম ছোট বাচ্চাদের একটা বড় অংশের কাছে এখনও প্রযুক্তির অবাধ অ্যাক্সেস পৌঁছায়নি, যা পৌঁছায় মূলত কলেজ বা ইউনিভার্সিটি লাইফে পা রাখার পর।

আমাদের দেশের তথ্য-উপাত্ত ঘাটলে দেখা যায়—অনলাইনে সচল থাকা নারীদের একটি বিশাল অংশই কোনো না কোনোভাবে সাইবার নিপীড়ন বা ইনবক্স হ্যারাজমেন্টের শিকার হন। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২৬% নারী বা মেয়ে এই হেনস্তার বিষয়টি প্রকাশ করে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা অভিযোগ জানান। বাকি সিংহভাগ মেয়েই আমাদের এই তথাকথিত ‘সামাজিকতার ভয়’ আর লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে সবকিছু মনের ভেতর চেপে রাখেন, যা তাদের ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই বুলিংয়ের মূল উপাদান বা টার্গেটটাই থাকে কুৎসিত যৌনতা এবং ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন (চরিত্র হনন)। আর আমাদের দেশের জাতীয় ক্রিকেটার, অভিনয়শিল্পী কিংবা অনলাইন সেলিব্রেটিদের যেভাবে নিয়মিত গণ-বুলিংয়ের শিকার হতে হয়, তার খবর তো আমরা রোজই খবরের কাগজে দেখি।

তৃতীয়ত: সংঘবদ্ধ বা ‘দলবেঁধে’ আক্রমণ করার প্রবণতা

আমাদের বাংলাদেশে ইন্ডিভিজুয়াল বা একা একা বুলিং করার চেয়ে ‘সিন্ডিকেট বা গ্যাং’ তৈরি করে দলবেঁধে আক্রমণ করার নোংরা কালচারটা অনেক বেশি। আর এই দলবদ্ধ সাইবার বুলিংয়ের সবচেয়ে বড় ফুয়েল বা জ্বালানি হলো—ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধ রাজনীতি এবং উগ্র ধর্মান্ধতা।

অনলাইনে কেউ যদি প্রচলিত প্রথা বা রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিজের কোনো যৌক্তিক বা স্বাধীন মতামত প্রকাশ করেন, অমনি একটা নির্দিষ্ট গ্রুপ আইডি বা পেজ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতা বা দেশদ্রোহিতার ভুয়া ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শয়ে শয়ে ফেক আইডি এসে তাঁর কমেন্ট বক্সে কুৎসিত গালিগালাজ আর মৃত্যুর হুমকি দিতে শুরু করে। এই অর্গানাইজড বা প্রাতিষ্ঠানিক বুলিংয়ের মুখে পড়ে অনেক ভালো ভালো মানুষ অনলাইন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

চতুর্থত: টেকনিক্যাল শিক্ষার অভাব এবং ‘স্বেচ্ছা-সহযোগিতা’

আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী আর ভিকটিম—উভয় পক্ষেরই প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়মকানুন এবং সিকিউরিটি নিয়ে সঠিক জানাশোনার বড় অভাব রয়েছে। এর ফলে অনেক সাইবার বুলিংয়ের সূচনা হয় মূলত ভিকটিমের এক ধরণের ‘স্বেচ্ছা-সহযোগিতা’র মাধ্যমে।

এর মানে এই নয় যে ভিকটিম নিজে নিজের ক্ষতি হবে জেনেও অপরাধীকে সাহায্য করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হয়—সম্পর্কের শুরুর দিকে আবেগের বশে বা অন্ধ বিশ্বাসে মানুষ যখন নিজের পার্সোনাল ছবি, ভিডিও বা ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড অন্যের সাথে শেয়ার করে, তখন সে এর সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ ইমপ্যাক্ট সম্পর্কে মাথাতেই নেয় না। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা একটু ফাটল ধরলেই ওই বিশ্বাসের জিনিসগুলোই ব্ল্যাকমেইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বা সাইবার বুলিংয়ের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

 

সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying ]
সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying ]

সাইবার বুলিংয়ের সমাধান: কীভাবে রুখে দাঁড়াবেন এই বিষাক্ততার বিরুদ্ধে?

সাইবার বুলিংয়ের মতো একটা জটিল সামাজিক ব্যাধিকে স্রেফ দু-একটা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ বা শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। এর জন্য আমাদের একটা ‘হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ বা চারপাশ থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। চলুন ধাপে ধাপে সমাধানগুলো বুঝে নেওয়া যাক:

১. আমাদের চিন্তার জগৎ ও মানসিকতার আমূল পরিবর্তন

আমাদের প্রধান সমস্যাটা আসলে আমাদের মগজে। আমরা এখনও সাইবার জগৎ বা এই ইন্টারনেট দুনিয়াকে আমাদের চারপাশের বাস্তব সমাজের মতোই একটা ‘বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ সমাজ’ হিসেবে মেনে নিতে পারি না। আমাদের অবচেতন মন এখনও ভাবে—সোশ্যাল মিডিয়া বুঝি ঘরের দেয়ালের একটা সাধারণ জানালার মতো, যা চাইলেই ধপাস করে বন্ধ করে দেওয়া যায়; কিংবা মাঝরাতে ঘরের লাইট নিভিয়ে কম্বলের নিচে বসে ল্যাপটপ খুললে বুঝি আর কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না!

অনেকে তো সাইবার জগৎকে ক্লাসরুমের সেই পুরনো ব্ল্যাকবোর্ডের মতো ভাবেন, যেখানে একটা আজেবাজে কথা চক দিয়ে লিখে হাত দিয়ে মুছে দিলেই সব সাফ! অথচ ডিজিটাল দুনিয়ার রুঢ় বাস্তবতা হলো—ইন্টারনেট একটা অমোঘ ও চিরস্থায়ী মহাফেজখানা। বাস্তব জগতের চেয়েও সাইবার জগতে আপনাকে দেখার চোখ হাজার গুণ বেশি। আর এখানে একবার একটা কটু কথা বা কুৎসিত ছবি পোস্ট করে দিলে, তা সার্ভার থেকে চিরতরে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব; কোথাও না কোথাও তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা প্রমাণ থেকেই যায়।

এই ধারণাটুকু আমাদের পরিষ্কার নয় বলেই আমরা অনলাইনের কমেন্ট বক্সে এমন সব নোংরা আচরণ বা গালিগালাজ করে বসি, যা সামনাসামনি বাস্তব সমাজে করতে আমরা লজ্জায় বা ভয়ে মরে যেতাম। এই সাধারণ গণসচেতনতা তৈরি করাটাই সাইবার বুলিং মোকাবিলার প্রথম ও প্রধান শর্ত।

বাংলাদেশে সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying ] - how-to-prevent-cyberbullying-family support
পরিবারের সাহায্যটা খুব জরুরী
২. পরিবারের ভূমিকা: অভিভাবককে হতে হবে সেরা বন্ধু

অনলাইনে কোনো ধরণের হ্যারাজমেন্ট বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভিকটিমের প্রথম কাজ হতে হবে নিজের পরিবারকে জানানো। লোকলজ্জা বা বকা খাওয়ার ভয়ে পরিবারকে না জানিয়ে নিজে নিজে বা কোনো থার্ড পার্টির সাহায্য নিয়ে আগ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে অধিকাংশ সময়ই হিতে বিপরীত হয়। কারণ দিনশেষে নিজের মা-বাবা বা পরিবারের চেয়ে আপন আর নিরাপদ আশ্রয় আর কেউই হতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আপনাকে সবার আগে আপনার সন্তানের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হতে হবে, যেন সে যেকোনো বিপদে সবার আগে আপনার বুকে এসে কাঁদতে পারে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বুঝিয়ে বলতে হবে—সাইবার বুলিং কী, কেন নাছোড়বান্দা অনলাইন বন্ধুরা বা অচেনা আইডিগুলো বিপজ্জনক হতে পারে এবং কেন তাদের সাথে নিজের কোনো পার্সোনাল ছবি, ভিডিও বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না।

সম্ভব হলে বাবা-মা হিসেবে সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত থাকুন। তবে তা যেন ‘গোয়েন্দাগিরি’র মতো না হয়, বরং একটা সুস্থ ও স্বাভাবিক নজরদারি রাখুন। সন্তানকে এই আত্মবিশ্বাস দিন যে—সে জীবনে যতই বড় বা ওলটপালট ভুল করে বসুক না কেন, বাইরের কোনো প্রতারক নয়, বরং আপনিই তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা আর আন্তরিকতা দিয়ে আগলে রাখবেন। আর কোনো কারণে যদি পরিবারকে জানাতে প্রচণ্ড ভয় বা দ্বিধা হয়, তবে এমন কোনো কাছের বিশ্বস্ত বন্ধু বা মেন্টরকে জানান, যে পাশে দাঁড়িয়ে এই মানসিক লড়াইটা লড়তে সাহায্য করবে।

৩. আইন প্রয়োগকারী সংস্থা: কঠিন কাজকে সহজ করার আইনি উপায়

অনেক সময় সাইবার বুলিংয়ের মাত্রা যখন পারিবারিক বা সামাজিক গণ্ডি পেরিয়ে যায়, তখন আইনি অ্যাকশন নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আমাদের দেশে অনেকেই ভাবেন—আইনি ঝামেলায় যাওয়া মানেই এক বিশাল ঝক্কি! পুলিশ, ডিটেকটিভ, কোর্ট-কাচারির চক্কর কাটার ভয়ে অনেকে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করেন। কিন্তু কিছু সাধারণ আর সঠিক নিয়ম মেনে চললে এই কঠিন কাজটাই কিন্তু এক নিমেষে পানির মতো সহজ হয়ে যায়।

  • প্রথম কাজ (জিডি করা): হয়রানির শিকার হলে প্রথমেই নিজের নাম, ঠিকানা ও বাবা-মায়ের নাম দিয়ে একটি লিখিত আবেদনপত্র তৈরি করে স্থানীয় থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি (GD) করুন।
  • ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ: থানায় যাওয়ার সময় শুধু মুখে বললে হবে না, সাথে করে সাইবার হ্যারাজমেন্টের অকাট্য ডিজিটাল প্রমাণ নিয়ে যেতে হবে। যে মেসেজ, ইমেইল, কুৎসিত কমেন্ট বা যে ফেক পেজ/আইডি থেকে আপনাকে হ্যারাজ করা হচ্ছে, সেগুলোর স্পষ্ট স্ক্রিনশটের প্রিন্ট কপি সাথে রাখুন। লিঙ্কের ইউআরএল (URL) কপি করে রাখুন। স্ক্রিনশটে যেন ভিকটিম ও অপরাধী উভয়ের মেসেজের চ্যাট হিস্ট্রি পরিষ্কার থাকে, যাতে পুলিশ ঘটনার সত্যতা সহজেই বুঝতে পারে।
  • বিশেষায়িত সাইবার ক্রাইম বিভাগ: শুধু জিডি করেই বসে থাকবেন না। জিডির কপিটি রিসিভ করানোর পর আপনি সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত উইং যেমন—ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ওমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন’ (নারীদের জন্য বিশেষায়িত) কিংবা সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (CPC)। এ ছাড়া বিটিআরসি (BTRC) থেকেও এই ধরণের ফেক আইডি বা পেজ ডাউন করার ক্ষেত্রে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়। তাছাড়া সরকারি হেল্পলাইন যেমন—৯৯৯ বা সাইবার হেল্পলাইনের সাহায্যও নেওয়া সম্ভব।

 

সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying ] - Cyberbullying or cyberharassment legal action
সাইবার বুলিং [ Cyber Bullying ] Legal Action

চূড়ান্ত কথা: চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়

আমাদের দেশে সাইবার সচেতনতার সংস্কৃতিটা এখনও নতুন। কিন্তু এখনই যদি আমরা সমন্বিতভাবে এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে এই ডিজিটাল বিষাক্ততা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেবে।

অনলাইনে হ্যারাজমেন্টের শিকার হলে অনেক সময় নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা চারপাশের মানুষজন এসে জ্ঞান দেবে—“আরে বাদ দাও তো, কে কী বলল তা নিয়ে মাথা ঘামিও না, ঝামেলা বাড়ানোর দরকার নেই!” কিন্তু একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আপনাকে মনে রাখতে হবে—অন্যায়ের মুখে চুপ করে থাকা কোনো সমাধান নয়। আপনি চুপ থাকলে অপরাধীর সাহস কমবে না, বরং আরও দশগুণ বাড়বে। আজ যদি আপনি সাহসের সাথে রুখে দাঁড়ান এবং একটা আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তবে আগামীতে আরেকজন ভিকটিমকে হাত দেওয়ার আগে ওই অপরাধী হাজার বার ভাববে।

আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি। সবার অনলাইন জীবন ও সাইবার যাপন সুন্দর, নিরাপদ আর সুস্থ হোক।

আপনাদেরই,

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর