১৯৭১ সাল। বাংলাদেশে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন পড়শি দেশ হিসেবে অকৃত্রিম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ভারত। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি ভারতের সরকার ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর। সে সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত অত্যাচারে প্রাণের তাগিদে প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত কেবল আশ্রয়ই দেয়নি, বরং তারা আমাদের স্বাধীনতার রক্তাস্নাত যুদ্ধের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের মাটি এবং মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে। ভারত সরকার একদিকে যেমন শরণার্থীদের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয়ের সংস্থান করেছিল, অন্যদিকে তাদের রাজ্যের বিভিন্ন কৌশলগত স্থান পরিণত হয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। এভাবেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক অনন্য অবদান রাখতে শুরু করে।

বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সীমান্ত ও শরণার্থী চ্যালেঞ্জ
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত পৃথিবীর মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। ১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানিদের সেনা অভিযানে বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশত্যাগীদের সিংহভাগই ভারতে প্রবেশ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বমোট ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন শরণার্থী প্রবেশ করেন। বিপুল এই ছিন্নমূল ও সর্বস্বান্ত মানুষের দায়িত্ব নেওয়া ভারত সরকারের জন্য ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ভারতের সাধারণ মানুষ ও সরকারের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের দিকে মানবিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিল।
রক্তঋণের মৈত্রী: ১৪ হাজার ভারতীয় জওয়ানের আত্মত্যাগ
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অমোচনীয়। প্রায় ১৪ হাজারের অধিক ভারতীয় জওয়ান বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের মাটিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং অবশেষে বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ইতিহাসে যার যতটুকু ভূমিকা, তা যথাযথভাবে স্বীকার করা এবং কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বঙ্গবন্ধুর কোর্ট মার্শাল প্রতিহতে ভারতের ভূমিকা
১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কোর্ট মার্শালে বিচারের আয়োজন করেছিল পাকিস্তানি জান্তারা। কিন্তু তা প্রতিহত করতে তৎকালীন ভারত সরকার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তা ইতিহাসে বিরল। পাকিস্তান সরকারের এই নাটকীয় কোর্ট মার্শাল নিয়ে ১০ আগস্ট ১৯৭১ সালে ভারত সরকার জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব উ থান্টকে একটি জরুরি বার্তা প্রেরণ করে। সেই বার্তার ভাষান্তরিত রূপ ছিল নিম্নরূপ:
“আগামীকাল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। রাওয়ালপিন্ডির এই ঘোষণায় আমরা বিপন্ন ও বিস্মিতবোধ করছি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিভিন্ন বিবৃতি অনুযায়ী—‘শেখ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছেন’—এই অজুহাতে বিচার করা হচ্ছে।
শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, তাদের অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়। ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে এমন অভূতপূর্ব বিজয় সম্প্রতি পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সরকারের অভিযানে আমাদের জন্য যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও ব্যক্তির ওপর চূড়ান্ত কিছু ঘটলে এই সংকটের তীব্রতা ১০ গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আমাদের জনগণ, গণমাধ্যম, পার্লামেন্ট এবং সরকার মনে করে। আপনার মহানুভবতার কাছে আমাদের আবেদন, অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাকিস্তান সরকারকে বলুন তারা যেন এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ না করেন। যদি তারা মুজিবের কিছু করে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর ও দুর্বিষহ।”

ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী কূটনীতি ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তিপ্রসঙ্গ
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি ও বাংলাদেশের জনযুদ্ধের বিজয়ে যে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তা বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। তিনি কেবল একজন প্রতিবেশী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নন, বরং বিশ্ববিবেক জাগ্রত করতে নিরলস কাজ করেছেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে এক ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, পাকিস্তানের মিত্রদের প্রস্তাবিত কিছু প্রান্তিক উদ্যোগ যে সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হতে বাধ্য, তা সাধারণভাবে পশ্চিমা বিশ্বের সিভিল সোসাইটি এবং জনমত বুঝতে পেরেছে।
ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন:
“ঐসব দেশের নেতৃবৃন্দের অনেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক উদ্যোগ কেবল ঐ সংকট সমাধানের একমাত্র পথ এবং এ জন্যে The Release of Sheikh Mujib is essential.”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এখন এটা স্পষ্ট যে বিষয়টি আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় কিংবা ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক ইস্যুও নয়। কারণ:
“Pakistan efforts to side-track and cloud the basic issue by seeking to involve the United Nation and to transform the struggle of the people of Bangladesh into an Indo-Pakistan confrontation and conflict have been exposed.”
বিজয় অর্জনে নিজের শক্তির ওপর গুরুত্ব
ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত বিজয় আসতে হবে নিজের শক্তিতেই। তিনি বলেছিলেন, আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে সহানুভূতি ও সমর্থন পেতে পারি, তবে সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের তাদের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না; বরং বাংলাদেশকে নিজের শক্তিতে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে এবং ভারত পূর্ণ শক্তি নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়াবে। তাঁর এই বিশ্লেষণ ছিল নির্ভুল। কারণ ১৯৭১-এর বাঙালির সামাজিক ঐক্য ছিল পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার সম্মিলিত স্রোতের চেয়েও বেগবান।

নিউজউইক–এ ইন্দিরা গান্ধীর সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার
১৫ নভেম্বর ১৯৭১, ‘নিউজউইক’ (Newsweek) পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের জনযুদ্ধ যে ন্যায়সংগত, গণতান্ত্রিক এবং একটি পরিপূর্ণ সংগ্রাম, তার এক সংক্ষিপ্ত অথচ চিত্তাকর্ষক বিবরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
“As you know, the majority of the guerrillas are the para-military force of East Bengal. … And they are the ones who are training new people… the Pakistani Army will have to kill all the 75 million people in East Bengal Before they can have control over them. … And I have absolutely no hesitation in saying that if I were placed in a situation like the Bengalis, I certainly would fight.”
পশ্চিম জার্মানির বন–এ ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করা
ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিম জার্মানির বনস্থ ‘বিথোভেন হলে’ এক বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ভারত বাংলাদেশের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না কিংবা তাদের কোনো পরামর্শও দেয় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—ভারতের পক্ষে তিনি যদি ইয়াহিয়া খানের সাথে বাংলাদেশকে আপস করার পরামর্শও দেন, তবে তারা তা কেন গ্রহণ করবে? ইতিহাসের পরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের বামপন্থী, মধ্যপন্থী ও দক্ষিণপন্থী—সকল রাজনৈতিক দলের অভূতপূর্ব সমর্থন লাভ করেছিলেন।
অটল বিহারী বাজপেয়ী ও লোকসভার সমর্থন
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে দলমত নির্বিশেষে ভারতীয় নেতাদের ঐক্য ছিল বিস্ময়কর। গোয়ালিয়র থেকে নির্বাচিত তৎকালীন জনসংঘ (বর্তমানে বিজেপি)-এর সংসদ সদস্য অটল বিহারী বাজপেয়ী ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় তার ভাষণে যা উল্লেখ করেছিলেন, তার জন্য বাংলাদেশ চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে। ২০১৫ সালের ৭ জুন বাংলাদেশ সরকার অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করে। ভারতের লোকসভায় সেদিন তিনি বলেছিলেন:
“স্পিকার মহাশয়, দেরিতেই হোক না কেন, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নিয়তি এই সংসদ, এই দেশকে এমন গুরুত্বপূর্ণ কালপর্যায়ে এনে উপস্থিত করেছে যখন আমরা মুক্তিসংগ্রামে আত্মহুতি দানকারী লোকদের সমভিব্যাহারে যুদ্ধ করছি, আমরা কিন্তু ইতিহাসের গতির নতুন দিকনির্দেশের জন্যও সচেষ্ট রয়েছি।… আমি মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী সত্যি ধন্যবাদের পাত্রী।”

সীমান্তের একাত্মতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল
একাত্তরে ভারত বিশ্ববাসীকে এই স্পষ্ট আভাস দিয়েছিল যে, সীমান্তের ওপারের মানুষ এপাড়ের বিপন্ন মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম। ভারতের এই দৃঢ় অবস্থান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ডভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ভারতের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রসদ জোগান দিয়ে শুধু মুক্তিসেনাদের উৎসাহিতই করেনি, বরং এর ফলে তাদের বাহুতে নতুন করে যুদ্ধজয়ের বল সংযোজিত হয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয় রসদ পাঠানো হয়েছিল। একইসঙ্গে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র এবং আহতদের জন্য রক্তদানের ব্যবস্থা করতে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ করা হয়নি।
শরণার্থী শিবিরের জীবন ও মানবিক সাহায্য
শুরুর দিকে সীমিত সম্পদের কারণে কিছুটা প্রতিকূলতা থাকলেও ধীরে ধীরে শরণার্থী শিবিরে আশ্রিতদের জন্য পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। প্রতিটি শরণার্থীকে কলেরার ভ্যাকসিন, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, দুধ এবং সবচেয়ে বড় জীবনরক্ষা—অর্থাৎ দু’বেলা পেটপুরে ভাতের জোগান দিতে ভারত সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। ভারতের সাধারণ মানুষ নিজেদের অভাব ভুলে ভাগ করে নিয়েছিল তাদের আহার।

লন্ডনের বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধীর হুঁশিয়ারি
৩১ অক্টোবর ১৯৭১ সালে লন্ডনে এক বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থী সমস্যার গভীরতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন:
“শরণার্থী সমস্যা ছোট করে দেখার উপায় নেই। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু শরণার্থী সমস্যা নয়, বরং এর চেয়ে অনেক গভীর। ভারতের জন্য শরণার্থী সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং এটা ভারতের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার জন্য বিরাট হুমকি। শরণার্থীদের ওপর যে বর্বরোচিত নির্যাতন হচ্ছে বিশ্ব তা জানে না, কিন্তু প্রতিদিন শরণার্থীরা ভারতে আসছে।”
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে আরও বলেছিলেন:
“মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, কতদিন এই ভার আমরা বহন করতে পারব? আমি বলছি, সেই সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি, জানি না কখন সেটা উদগীরণ শুরু করবে? আমরা সংযত, কিন্তু কতটা সংযত থাকব বিষয়টি নির্ভর করছে সীমান্তে কী ঘটছে তার ওপর। আমরা মনে করি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এর সমাধান খুঁজে বের করা। সবচেয়ে ভালো হয় এবং সেটা মানবিক, তা হলো এর রাজনৈতিক সমাধান বা বাংলাদেশে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।”
আক্রমণাত্মক কূটনীতি ও সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি
শরতের শুরুতে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে এক ‘আক্রমণাত্মক’ কূটনৈতিক সফরে পশ্চিমা বিশ্বে যান। তিনি কঠোর পরিশ্রমে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে ভারতের পক্ষে আনতে সমর্থ হন। উল্লেখ্য যে, এই দুই রাষ্ট্র ছিল নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য এবং মার্কিন বলয়ের মিত্র; কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে তারা ভারতকে সমর্থন দেয়। ওই সময় ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয় ছিল ৯ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২০ বছর মেয়াদি ‘বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল একটি বড় আঘাত। এই চুক্তির ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে চীনের সরাসরি অংশগ্রহণের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য হয়ে যায়।

নিক্সনের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক দৃঢ়তা
চীন তখন পাকিস্তানকে নৈতিক সমর্থন বা সামান্য সামরিক সাহায্য দিলেও ভারত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ ঘটানোর সাহস করেনি। ওই সফরকালেই ইন্দিরা গান্ধী ওয়াশিংটন যান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁকে ততটা গুরুত্ব দেননি বা আমলে নিতে চাননি। তবে শ্রীমতি গান্ধী দমে যাননি। হোয়াইট হাউসের ‘রোজ গার্ডেনে’ বসেই তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে—আমেরিকা না চাইলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। ইন্দিরা গান্ধীর জীবনীগ্রন্থ ‘মাই ট্রুথ’-এ বাংলাদেশের এই ঘটনাবলি অত্যন্ত বিশদভাবে বিবৃত আছে।

ভারতের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ও জেনারেল জ্যাকবের জবানবন্দী
২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এরপরই শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য ভারতের সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা সীমান্তে অসংখ্য শরণার্থী শিবির খোলা হয়। ভারত কেবল আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নির্বাসিত বাংলাদেশি সেনা অফিসার ও স্বেচ্ছাসেবীরা ওইসব ক্যাম্প থেকেই মুক্তিবাহিনীর সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত হন।
ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বেসরকারিভাবে ভারত এপ্রিল মাস থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘটেছিল আরও পরে। জেনারেল জ্যাকব অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বলেছিলেন—
“এপ্রিল থেকেই ভারত মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং দিতে শুরু করে। তবে এটা ছিল মূলত বাংলাদেশের মানুষের লড়াই; ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে ভালোবেসে যে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, আমরা কেবল তার পাশে ছিলাম।”
ভারতীয় পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক যৌথ অধিবেশন
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভা একাধিকবার যৌথ অধিবেশনে বসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে সমর্থন প্রদানের বিষয়ে কতটা সুসংহত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ৩১ মার্চ ১৯৭১ সালে রাজ্যসভা ও লোকসভায় ‘Recent Development in East Bengal’ শিরোনামে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন ইন্দিরা গান্ধী এবং উভয় সভায় প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।
একইভাবে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে রাজ্যসভা ও লোকসভার আরেকটি যৌথসভা বসে, যার শিরোনাম ছিল— “Statement by Prime Minister Re : Recognition of Bangladesh.” এর আগে ৩ ডিসেম্বর লোকসভায় জরুরি অবস্থা ঘোষণাবিষয়ক প্রস্তাব পাস করা হয়। সেই প্রস্তাব উত্থাপনকালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাঁর কালজয়ী বক্তৃতায় বলেন—
“We have stood for peace, but peace itself has to be defended.”

৬ ডিসেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ: বাংলাদেশকে স্বীকৃতি
ভারতীয় পার্লামেন্টে ইন্দিরা গান্ধীর দেওয়া বক্তৃতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা ছিল বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, লোকসভায় তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে তিনি নিম্নোক্ত ঘোষণাটি পাঠ করেন—
“I am glad to inform the House that in light of the existing situation and in response to the repeated requests of the Government of Bangladesh the Government of India have after the most careful consideration, decided to grant recognition to the GANA PRAJATANTRI BANGLADESH.”
সেদিনকার বক্তৃতায় তিনি আরও এক গভীর আবেগের কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের চিন্তা এবং যাবতীয় কর্মকাণ্ড এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের (Father of New State) সাথে রয়েছে। এখানে একটি বিশেষ বিষয় লক্ষণীয়—৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ভারতে এই গৌরবময় উপাধি তাঁর নিজের পিতা জওহরলাল নেহরুরও ছিল না (ভারতের জাতির পিতা হিসেবে মহাত্মা গান্ধীকে গণ্য করা হয়)।
বঙ্গবন্ধুর বিশালতা ও ইন্দিরা গান্ধীর মূল্যায়ন
৬ নভেম্বর ১৯৭১, যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত উদারচিত্তে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর নিজের চেয়েও বিশাল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে—
“I am congratulated on my great majority. But it was nothing compared to the majority which Sheikh Mujibur Rahman gained in the election in Pakistan. It was a tremendous victory for him. And he is not an extremist. He was a moderate person.”
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি
মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি, তখনই শুরু হয় চূড়ান্ত অসহযোগ আন্দোলন। ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে গণহত্যা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান রেডিওতে সেই ঘোষণা পাঠ করেন। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘ শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছিল। তিনি হিসাব করেছিলেন যে, এই বিপুল শরণার্থীর ভার চিরকাল বহন করার চেয়ে পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা বেশি যুক্তিযুক্ত ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

সরাসরি যুদ্ধ ও মিত্রবাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তান অকস্মাৎ ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালালে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ভারত কালক্ষেপণ না করে পাল্টা আঘাত হানে এবং শুরু হয় আনুষ্ঠানিক ও সর্বাত্মক যুদ্ধ। ভারতের তিনটি সামরিক কর্পস তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে, যাদের সঙ্গে ছিল প্রায় তিন ব্রিগেড বীর মুক্তিযোদ্ধা। অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলে ভারতীয় বিমান বাহিনী মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। পশ্চিম রণাঙ্গনেও ভারতীয় নৌবাহিনী প্রায় একই সময়ে অর্ধেক পাকিস্তানি নৌবহর ও তেলের ট্যাঙ্কার ধ্বংস করে দেয়। জাতিসংঘে বারবার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব আনা হলেও পরম বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভেটো’তে তা বানচাল হয়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে পাকিস্তান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।
৯৩ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণ ও একটি নতুন রাষ্ট্রের উদয়
পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারত তখন সর্বাত্মক সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। তা সত্ত্বেও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে তাঁর শান্তির প্রতি অবিচল আস্থার প্রমাণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিহাসে এই প্রথম একসঙ্গে ৯৩ হাজার সৈন্য মাথা নিচু করে প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণ করে। লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। পৃথিবীর মানচিত্রে সপ্তম জনবহুল ও চতুর্থ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ জন্ম নেয়। তবে এই পরাজয়ের গ্লানি ও আক্রোশে পরাজয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পাকিস্তানিরা স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় ১৪ ডিসেম্বর নির্মম বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ও পাকিস্তানের গ্লানি
ইন্দিরা গান্ধী ও বিশ্ব নেতাদের প্রবল চাপে পাকিস্তান অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, তিনি বিজয়ী বেশে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। যদিও চীন তখন ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আটকে দিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করে যে, দখলদার বাহিনী ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা এবং ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে। পাকিস্তানের জন্য এই পরাজয় ছিল অবমাননাকর। তারা তাদের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা হারায় এবং জিন্নাহর ‘টু-নেশান থিওরি’ ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
সিমলা চুক্তি ও ভারতের উদারতা
পরাজিত পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় আসেন। ১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘সিমলা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ভারত যুদ্ধবন্দিদের ১৯২৫ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তদারকি করে এবং ৯৩ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়। এমনকি যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ২০০ সেনাকেও ক্ষমা করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পশ্চিম রণাঙ্গনে দখলকৃত ১৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড ভারত পাকিস্তানকে ফেরত দেয়—যা ভারতের মহানুভবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে ভারতের অকৃত্রিম সহায়তা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশের মৈত্রী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ধাবিত হয়। ১৯৭২-৭৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ভারত ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে। শুধু খাদ্য বা ভোগ্যপণ্য নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থা মেরামত, রেল যোগাযোগ এবং শিল্প-কারখানার কাঁচামাল সরবরাহেও ভারত ছিল অগ্রণী। ভারত নিজে তেলের আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জ্বালানি তেল শোধনাগারের (রিফাইনারি) জন্য জরুরি ভিত্তিতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করেছিল। নতুন দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য সংকট। ১৯৭২-এর শুরুতে ভারত ৪ লাখ টন খাদ্যশস্য সহায়তার পাশাপাশি তা পরিবহনেও সরাসরি সাহায্য করে। প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের প্রাপ্ত মোট খাদ্য সহায়তার ৭৪ শতাংশই এসেছিল ভারত থেকে।

আর্থিক অনুদান ও ইতিহাসের অমর বন্ধন
১৯৭১-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২-এর জুনের মধ্যে ভারত ২০ কোটি মার্কিন ডলার সরাসরি দান হিসেবে এবং ৪.২ কোটি মার্কিন ডলার অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদান করে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে ভারত মোট ৩০.৮ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা করে, যা তখনকার বৈশ্বিক দাতা দেশগুলোর মধ্যে ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (যুক্তরাষ্ট্রের পরেই)। ভারতের সর্বস্তরের মানুষ—রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী—যেভাবে পরম মমতা দিয়ে বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীকে বরণ করে নিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের এক অনন্য অমলিন অধ্যায়। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বাংলাদেশের মাটি, যা দুই দেশের সম্পর্কের এক অমোচনীয় ভিত্তি। ভারতের মানুষের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও ত্যাগ বাংলাদেশের মানুষ কোনো দিনও ভুলতে পারবে না।
আরও দেখুন:
