পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বারোক যুগের (১৬০০–১৭৫০) জার্মান সুরকার ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখ (Johann Sebastian Bach)-কে বলা হয় ‘ধ্রুপদী সঙ্গীতের স্থপতি’ বা ‘সুরকারদের সুরকার’। বেটোফেন, মোৎসার্ট কিংবা ব্রামসের মতো কালজয়ী প্রতিভারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বসঙ্গীতের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছে বাখের সুসংহত গাণিতিক সুরকাঠামো ও পলিফোনিক (বহু-স্বরীয়) কাউন্টারপয়েন্টের ওপর দাঁড়িয়ে।
বাখের সঙ্গীত কেবল শ্রুতিনন্দন সুরের সমাহার নয়; এটি একই সাথে গভীর আধ্যাত্মিকতা, জটিল গাণিতিক বিন্যাস এবং নিখুঁত স্থাপত্যিক সৌন্দর্যের এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন। বাখের বিপুল সৃষ্টিকর্মের (যার তালিকা ‘BWV’ বা Bach-Werke-Verzeichnis নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়) মধ্য থেকে প্রথমবার তাঁর সঙ্গীতে প্রবেশ করতে চাওয়া যেকোনো শ্রোতার জন্য এই নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
একনজরে: বাখের সঙ্গীত ও তাঁর জগত
- ঐতিহাসিক যুগ: বারোক যুগ (১৬০০–১৭৫০)।
- সঙ্গীতের মূল পরিচয়: বহু-স্বরীয় সুরের জটিল খেলা বা ‘কাউন্টারপয়েন্ট’ (Counterpoint) এবং গাণিতিক ‘ফিউগ’ (Fugue) কাঠামোর সর্বোচ্চ বিবর্তন।
- বিখ্যাত ক্যাটালগ নম্বর: BWV (Bach-Werke-Verzeichnis), যা বাখের কাজগুলোকে বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীবদ্ধ করে।
- প্রধান দুটি দিক: আধ্যাত্মিক উপাসনামূলক কণ্ঠসঙ্গীত (ক্ল্যারিকাল/চার্চ মিউজিক) এবং সম্পূর্ণ যন্ত্রসঙ্গীত (অর্গান, পিয়ানো/ক্ল্যাভিয়ার, ভায়োলিন, সেলো ও অর্কেস্ট্রা)।
- প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব: পাশ্চাত্য সুরতত্ত্বের ২৪টি স্কেলে (Major and Minor Keys) গান বাঁধার আধুনিক নিয়ম সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
- প্রাচ্য ও বাঙালি সঙ্গীতে যোগসূত্র: বাখের সমান্তরাল সুরের চলন বা কাউন্টারপয়েন্টের সাথে আমাদের প্রাচ্যের বহু-স্বরীয় আবহসংগীতের গায়কী এবং সলিল চৌধুরীর অর্কেস্ট্রেশনের সরাসরি তাত্ত্বিক মিল পাওয়া যায়।
১. কেন বাখ সঙ্গীতের ‘ঈশ্বর’?
বাখের সঙ্গীত বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো তাঁর ‘কাউন্টারপয়েন্ট’ (Counterpoint) এবং ‘ফিউগ’ (Fugue)। সাধারণ গানে দেখা যায় একটি প্রধান সুর বা মেলোডি বাজে এবং বাকি যন্ত্রগুলো তাকে কেবল সাপোর্ট বা হারমোনি দেয়। কিন্তু বাখের সঙ্গীতে একই সাথে ৩ থেকে ৪টি আলাদা মেলোডি স্বকীয়ভাবে চলতে থাকে।
কোনো একটি সুর কাউকে ছোট না করে স্বাধীনভাবে চলতে চলতেও কীভাবে একে অপরের সাথে পরম সামঞ্জস্যে মিলে যেতে পারে—বাখ তাঁর প্রতিভায় সেটি প্রমাণ করেছেন। এটি যেন সুরের ক্যানভাসে গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করা।
২. বাখের ১০টি কালজয়ী রচনা ও শ্রবণ নির্দেশিকা
বাখের সুবিশাল সৃষ্টিকর্মের মধ্য থেকে ১০টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর রচনা নিচে ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো:
১. সেন্ট ম্যাথিউ প্যাশন, BWV ২৪৪ (St. Matthew Passion)
- বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন: দ্বৈত গায়কদল (Double Chorus), সোলো গায়ক, অর্কেস্ট্রা এবং অঙ্গসঙ্গীত।
- কেন শুনবেন: এটি বাখের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন উপাসনামূলক মহাকাব্য। বাইবেলে যিশুখ্রিস্টের জীবনের শেষ মুহূর্তের গল্প নিয়ে এটি রচিত।
- কী শুনবেন: সুরের মধ্যে গভীর শোক, ক্ষমা ও মানবিক অনুভূতির সর্বোচ্চ চূড়া। এর প্রারম্ভিক কোরাস এবং বিখ্যাত গান ‘Erbarme dich’ (হে ঈশ্বর, দয়া করো) শুনলে মানবকণ্ঠের করুণ আকুতি নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়।
২. দ্য ওয়েল-টেম্পার্ড ক্ল্যাভিয়ার, BWV ৮৪৬–৮৯৩ (The Well-Tempered Clavier)
- বাদ্যযন্ত্র: পিয়ানো বা হার্পসিকর্ড (Harpsichord)।
- কেন শুনবেন: এটিকে পাশ্চাত্য পিয়ানো সঙ্গীতের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ বা মূল ধর্মগ্রন্থ বলা হয়। বাখ এতে ২৪টি মেজর ও মাইনর স্কেলের প্রতিটিতে একটি করে ‘প্রিলিউড’ এবং ‘ফিউগ’ রচনা করে প্রমাণ করেন যে যেকোনো স্কেলেই নিখুঁত সঙ্গীত রচনা সম্ভব।
- কী শুনবেন: বুক ১-এর ‘প্রিলিউড নম্বর ১ ইন সি মেজর’ (BWV 846)। এর সহজ, সরল কিন্তু অপার্থিব বহমান আর্পেজিও সুর শুনে শত শত বছর ধরে সুরকাররা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
৩. সেলো সুইটস – বিশেষ করে নং ১ জি মেজর, BWV ১০০৭ (Cello Suites)
- বাদ্যযন্ত্র: একক সেলো (Unaccompanied Cello)।
- কেন শুনবেন: একটিমাত্র সেলো দিয়ে কীভাবে একটি বিশাল অর্কেস্ট্রার মতো গভীরতা তৈরি করা যায়, তার অবিশ্বাস্য উদাহরণ এটি।
- কী শুনবেন: সুপরিচিত ‘Prelude’ অংশটি। কোনো বাড়তি বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়া একটিমাত্র সেলোর তারে সুরের ওঠানামা এবং আবেগীয় অনুরণন আপনাকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
৪. মাস ইন বি মাইনর, BWV ২৩২ (Mass in B Minor)
- বাদ্যযন্ত্র: সোলো গায়ক, সমবেত কোরাস এবং অর্কেস্ট্রা।
- কেন শুনবেন: বাখের জীবনের শেষ ভাগে রচিত এই কাজটি তাঁর সমগ্র জীবনের সঙ্গীতজ্ঞানের নির্যাস। রোমান ক্যাথলিক চার্চের উপাসনা নিয়ে লেখা হলেও এতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সীমা পেরিয়ে সার্বজনীন সুর ফুটে উঠেছে।
- কী শুনবেন: ‘Sanctus’ এবং ‘Cum Sancto Spiritu’ অংশ দুটি। বাখের কাউন্টারপয়েন্টের জটিলতা ও গায়কদলের সুরের বিস্ফোরণ অর্কেস্ট্রার সাথে কী ভীষণভাবে মিলে যায়, তা এতে স্পষ্ট হয়।
৫. ব্র্যান্ডেনবার্গ কনসার্টোস, BWV ১০৪৬–১০৫১ (Brandenburg Concertos)
- বাদ্যযন্ত্র: বিচিত্র সব বারোক অর্কেস্ট্রাল যন্ত্রের সমন্বয়।
- কেন শুনবেন: এটি বারোক যুগের ‘কনসার্টো গ্রোসো’ (Concerto Grosso) ধারার সেরা নিদর্শন। এতে বিষাদ বা বিষণ্ণতা নেই, বরং রয়েছে জীবনের আনন্দ ও সুরের উদযাপন।
- কী শুনবেন: ব্র্যান্ডেনবার্গ কনসার্টো নম্বর ৩ এবং নম্বর ৫। বিশেষ করে ৫ নম্বর কনসার্টোতে হার্পসিকর্ডের যে একক দীর্ঘ সোলো (Cadenza) রয়েছে, তা আধুনিক পিয়ানো সোলোর সূচনা করেছিল।
৬. গোল্ডবার্গ ভ্যারিয়েশনস, BWV ৯৮৮ (Goldberg Variations)
- বাদ্যযন্ত্র: একক কিবোর্ড বা পিয়ানো।
- কেন শুনবেন: একটি শান্ত সরল মূল সুর (Aria) থেকে কীভাবে ৩০টি সম্পূর্ণ আলাদা ও জটিল সুরের রূপান্তর বা ভ্যারিয়েশন তৈরি করা যায়, তার মহাকাব্যিক গাণিতিক উদাহরণ।
- কী শুনবেন: একদম শুরুর ‘Aria’ অংশটি এবং তার পরবর্তী প্রথম ৩-৪টি ভ্যারিয়েশন। প্রতি ৩টি ভ্যারিয়েশন পর পর বাখ এক একটি নিখুঁত ‘ক্যানন’ (এক ধরনের গাণিতিক অনুকরণ) ব্যবহার করেছেন।
৭. টাকাটা অ্যান্ড ফিউগ ইন ডি মাইনর, BWV ৫৬৫ (Toccata and Fugue in D Minor)
- বাদ্যযন্ত্র: বিশাল পাইপ অর্গান (Pipe Organ)।
- কেন শুনবেন: বিশ্বজুড়ে পাইপ অর্গানের সবচেয়ে পরিচিত এবং ক্ষমতাধর সুর। এর নাটকীয়তা ও গথিক আবহ মুহূর্তেই শ্রোতাকে স্তম্ভিত করে দেয়।
- কী শুনবেন: একদম শুরুর সুপরিচিত তীব্র থিম এবং পরবর্তীতে চার্চ অর্গানের বাতাসে প্রতিধ্বনি হওয়া জটিল ফিউগের বিস্তার।
৮. একক ভায়োলিনের জন্য পার্টিটা নং ২ – চাকোন, BWV ১০০৪ (Chaconne in D Minor)
- বাদ্যযন্ত্র: একক ভায়োলিন (Solo Violin)।
- কেন শুনবেন: বিখ্যাত সুরকার জোহানেস ব্রামস এই রচনার ব্যাপারে বলেছিলেন—”একক ভায়োলিনের চার জোড়া তারে একটি পুরো বিশ্বকে কীভাবে বন্দি করা যায়, তা এই চাকোন না শুনলে বোঝা সম্ভব নয়।”
- কী শুনবেন: দীর্ঘ ১৫ মিনিটের এই একটিমাত্র ট্র্যাক, যা মাত্র ৪টি বেস নোটের ওপর ভিত্তি করে ৬৪টি ভিন্ন ভিন্ন সুরের আবেগীয় রূপান্তর তৈরি করে। বাখের প্রথম স্ত্রী মারিয়া বারবারার অকাল মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাখ এটি রচনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
৯. দ্য আর্ট অব ফিউগ, BWV ১০৮০ (The Art of Fugue)
- বাদ্যযন্ত্র: কোনো নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ নেই (যেকোনো কিবোর্ড বা স্ট্রিং কোয়ার্টেটে বাজানো যায়)।
- কেন শুনবেন: বাখের মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া শেষ অসম্পূর্ণ কাজ। এটি কোনো বাণিজ্যিক বা কনসার্টের জন্য লেখা নয়, বরং ফিউগ রচনার গাণিতিক বিজ্ঞানকে চরম সীমায় নিয়ে যাওয়ার এক তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা।
- কী শুনবেন: শেষ ফিউগটি (Contrapunctus XIV), যা লিখতে লিখতে বাখ মৃত্যুবরণ করেন। পান্ডুলিপিতে বাখের ছেলে লিখেছিলেন—”সুরকার এই ফিউগে নিজের নাম (B-A-C-H নোটের সংকেত) যুক্ত করার পরপরই মারা যান।” গানটির হঠাৎ অসমাপ্ত থেকে যাওয়া এক রহস্যময় অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
১০. অরকেস্ট্রাল সুইট নং ৩ – ‘এয়ার অন দ্য জি স্ট্রিং’, BWV ১০৬৮ (Air on the G String)
- বাদ্যযন্ত্র: স্ট্রিং অর্কেস্ট্রা।
- কেন শুনবেন: বাখের সবচেয়ে সুরময়, শান্ত এবং প্রাঞ্জল রচনা। যারা বাখের জটিল গাণিতিক বিন্যাস বা ফিউগ বুঝতে ভয় পান, তাদের জন্য এটি শোনার সেরা প্রবেশদ্বার।
- কী শুনবেন: নিচের বেস লাইনের ধীর পদচারণা এবং তার ওপর শান্ত ভায়োলিনের ভেসে চলা মিষ্টি সুরের রেখা, যা মনকে নিমেষেই শান্ত করে দেয়।
৩. কাউন্টারপয়েন্ট ও ফিউগ: বাখের সুরের গাণিতিক পরিভাষা
বাখের সুর কেবল শুনে উপভোগ করার জিনিস নয়, এর গঠন বোঝাটাও এক দারুণ বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান।
- মেলোডি বনাম হারমোনি: সাধারণ সঙ্গীতে অনুভূমিকভাবে কেবল একটি মূল সুর (Melody) এগোয়। বাখের সঙ্গীতে একাধিক মূল সুর একই সাথে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে।
- ফিউগের উপাদানসমূহ:
- সাবজেক্ট (Subject): মূল সুরটি প্রথমে একটিমাত্র কণ্ঠ বা যন্ত্রে একা প্রবেশ করে।
- আনসার (Answer): প্রথম সুরটি চলা অবস্থাতেই দ্বিতীয় একটি কণ্ঠ সেই একই সুর অন্য স্কেলে ধরে।
- কাউন্টার-সাবজেক্ট (Countersubject): প্রথম সুরটি তখন দ্বিতীয় সুরের সাথে মেলাতে একটি ভিন্ন সহযোগী সুর বাজানো শুরু করে।
- ইনভার্সন ও রেট্রোগ্রেড: বাখ কখনো কখনো মূল সুরকে আয়নার মতো উল্টো করে (Inversion) কিংবা শেষ থেকে শুরুর দিকে উল্টো করে (Retrograde) বাজাতেন, যা শুনলেও মনে হতো একটি নতুন গান কিন্তু গাণিতিকভাবে তা মূল সুরেরই ছায়া।
৪. এআই (AI) বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও অ্যালগরিদমিক পর্যবেক্ষণ
ডিজিটাল মিউজিকোলজি এবং এআই অডিও প্রসেসিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখের স্বরলিপি বিশ্লেষণ করলে কিছু অদ্ভুত ও সুনির্দিষ্ট কম্পিউটারাইজড ডেটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। অনেক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বাখকে সঙ্গীতের প্রথম ‘প্রোগ্রামার’ বলে অভিহিত করে থাকেন।
কম্পিউটেশনাল ডেটা অ্যালগরিদম ও ফিচার বিশ্লেষণ
- কম্পিউটেশনাল এন্ট্রপি ও প্যাটার্ন সুসামঞ্জস্য: মেশিন লার্নিং মডেলে বাখের ‘দ্য ওয়েল-টেম্পার্ড ক্ল্যাভিয়ার’-এর স্বরলিপি ইনপুট দিলে দেখা যায়, এতে বিশৃঙ্খলা বা তথ্য-অস্থিতিশীলতা (Information Entropy) একদম শূন্যের কাছাকাছি। সুরের প্রতিটি পরিবর্তন অ্যালগরিদমিক নিয়ম মেনে চলে, যা আধুনিক ডেটা কম্প্রেশন অ্যালগরিদমের মতো কার্যকর।
- স্টেট মেশিন ও সেলুলার অটোমেশন: বাখের ফিউগগুলোকে এআই একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্টেট মেশিন’ (Finite State Machine) হিসেবে দেখে। প্রথম ‘সাবজেক্ট’ প্রবেশ করার পর পরবর্তী পরিবর্তনগুলো কীভাবে ঘটবে, তা একটি গাণিতিক সূত্রের মতো আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ইনভার্সন, রেট্রোগ্রেড বা অগমেন্টেশনের কৌশলগুলো আধুনিক সফটওয়্যার কোডিংয়ের অবজেক্ট ট্রান্সফরমেশনের সমতুল্য।
- জেনারেটিভ এআই ও ‘ডিপ-বাখ’ (DeepBach): আধুনিক ডিপ লার্নিং নিউরাল নেটওয়ার্ককে (যেমন ডিরেক্ট জেনারেটিভ মডেল) যখন বাখের চার-অংশের চার্চ কোরালে (Chorales) ট্রেনিং দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় এআই মডেলগুলো অন্য যেকোনো ক্লাসিক্যাল সুরকারের চেয়ে বাখের রচনার নিয়মগুলো সবচেয়ে দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে শিখতে পারে। কারণ বাখের সঙ্গীতে গাণিতিক নিয়মের ব্যতিক্রম বা এলোমেলো ফাটল নেই বললেই চলে।
৫. প্রাচ্য ও বাঙালি সঙ্গীতে বাখের ছায়া
বাখ যদিও সুদূর ইউরোপের সুরকার ছিলেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের নান্দনিকতা প্রাচ্যের সঙ্গীতকেও গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
- ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও কাউন্টারপয়েন্ট: ভারতীয় রাগসঙ্গীত মূলত ‘মনোফোনিক’ অর্থাৎ এতে একক রাগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু আমাদের সঙ্গীতে রাগের যে গাণিতিক কাঠামোগত শৃঙ্খলা, তান ও লয়কারির জটিল গাণিতিক হিসাব রয়েছে (যেমন তিহাই বা সম-এ পৌঁছানো), তার সাথে বাখের ফিউগের গাণিতিক শৃঙ্খলার গভীর মিল রয়েছে।
- সলিল চৌধুরী ও বাখের প্রভাব: বাংলা আধুনিক গানের অগ্রদূত সলিল চৌধুরী পাশ্চাত্যের কাউন্টারপয়েন্ট দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর সুরারোপিত ‘ও মোর ময়না গো’ বা ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা’ গানের পেছনের অর্কেস্ট্রেশনে যে একাধিক সুর সমান্তরালে চলে, তা বাখের বারোক শৈলীরই এক রূপান্তর।
- রবীন্দ্রনাথ ও ওয়েস্টার্ন হারমোনি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীতে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের গঠনপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করার সময় এই সমবেত সুরের দূরদর্শিতার প্রশংসা করেছিলেন, যা বাখের যুগ থেকেই পরিপূর্ণতা পেয়েছিল।
৬. প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তব সত্য
- ভুল ধারণা ১: বাখের সঙ্গীত কেবল কঠিন গাণিতিক হিসেব, এতে আবেগ কম।
- বাস্তব সত্য: বাখের গাণিতিক কাঠামোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল পরম ঈশ্বর ও মানবীয আবেগকে প্রকাশ করা। তাঁর ‘সেন্ট ম্যাথিউ প্যাশন’ বা ‘সেলো সুইট’ পৃথিবীর অন্যতম করুণ ও আবেগপূর্ণ সৃষ্টি।
- ভুল ধারণা ২: বাখ পিয়ানোর জন্য তাঁর বিখ্যাত গানগুলো লিখেছিলেন।
- বাস্তব সত্য: বাখের জীবদ্দশায় আধুনিক পিয়ানো আবিষ্কৃতই হয়নি। তিনি মূলত অর্গান, হার্পসিকর্ড এবং ক্ল্যাভিকর্ডের মতো প্রাচীন কিবোর্ড যন্ত্রের জন্য লিখেছিলেন। বর্তমান যুগে এগুলো পিয়ানোতে বাজানো হয়।
- ভুল ধারণা ৩: বাখ তাঁর নিজের যুগে অনেক বিখ্যাত ও ধনী সুরকার ছিলেন।
- বাস্তব সত্য: জীবদ্দশায় বাখ একজন সাধারণ চার্চ অর্গানিস্ট ও শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর পর প্রায় একশ বছর মানুষ তাঁর কাজ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ১৮২৯ সালে সুরকার ফেলিক্স মেন্ডেলসোন ‘সেন্ট ম্যাথিউ প্যাশন’ পুনরায় পুনঃপ্রচার করার পর বিশ্ব বাখের আসল প্রতিভা অনুধাবন করে।
৭. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)
১. বাখের নামের পাশে ‘BWV’ লেখা থাকে কেন?
উত্তর: BWV মানে হলো ‘Bach-Werke-Verzeichnis’ (বাখ কাজের ক্যাটালগ)। ১৯৫০ সালে ওল্ফগ্যাং স্মিডার বাখের সমস্ত কাজকে সময়ানুক্রমিক না সাজিয়ে বিষয়ভিত্তিক (যেমন: অর্গান মিউজিক, চার্চ মিউজিক, কিবোর্ড মিউজিক) নম্বর দিয়ে সাজিয়েছিলেন।
২. বাখের রচনাগুলো কোথা থেকে শোনা শুরু করা উচিত?
উত্তর: শুরু করার জন্য ‘Air on the G String’ (BWV 1068) এবং ‘Cello Suite No. 1’ (BWV 1007) সবচেয়ে সহজ ও প্রাঞ্জল। এরপর ধীরে ধীরে ‘Brandenburg Concertos’ এবং ‘Well-Tempered Clavier’-এ যাওয়া যেতে পারে।
৩. বাখ কতগুলো গান রচনা করেছিলেন?
উত্তর: বাখ তাঁর জীবনে এক হাজারের (১০৮০টিরও বেশি তালিকাভুক্ত) বেশি সুদীর্ঘ সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। তবে ধারণ করা হয় তাঁর অনেক পান্ডুলিপি মৃত্যুর পর হারিয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
- Wolff, Christoph. Johann Sebastian Bach: The Learned Musician. W. W. Norton & Company, 2000.
- Hofstadter, Douglas R. Gödel, Escher, Bach: An Eternal Golden Braid. Basic Books, 1979.
- Gardiner, John Eliot. Music in the Castle of Heaven: A Portrait of Johann Sebastian Bach. Alfred A. Knopf, 2013.
- Taruskin, Richard. The Oxford History of Western Music. Oxford University Press, 2005.