বামপন্থিদের নাস্তিকতা ও ধর্মবিদ্বেশের অপরাধবোধ থেকেই কী উগ্রবাদী প্রেম? । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

সাধারণ ধারণায় বামপন্থাকে কেবল একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা হিসেবে দেখা হলেও, এর ক্লাসিক্যাল বা মূল ভিত্তিটি শুধ্রমাত্র নাস্তিকতা নয়, বরং একধরনের গভীর ধর্মবিদ্বেষের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের দৃষ্টিতে ধর্ম হলো এমন এক আফিম, যা থেকে মানবজাতিকে মুক্ত না করলে প্রকৃত মুক্তি অসম্ভব। বামপন্থার তাত্ত্বিক গুরু কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন—

“ধর্ম হলো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন বিশ্বের হৃদয় এবং আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা; এটি জনগণের আফিম।”

এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ভ্লাদিমির লেনিন এবং পরবর্তী সোভিয়েত নেতারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে ধর্মকে একটি মারাত্মক বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাদের মূল যুক্তি ছিল, ধর্ম মানুষকে পরকালের আশায় বর্তমানের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখে।

এই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগে বলশেভিক বিপ্লবের পরপরই ১৯১৮ সালে লেনিনের সরকার একটি ডিক্রি জারি করে রাষ্ট্র ও গির্জাকে (Church and State) সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। এই নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রে কোনো দাপ্তরিক বা রাষ্ট্রধর্ম রাখা হয়নি, স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সব ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে জোসেফ স্টালিনের আমলে (১৯২০ ও ৩০-এর দশক) এই দমনপীড়ন আরও চরম আকার ধারণ করে। এ সময় হাজার হাজার অর্থোডক্স গির্জা, মসজিদ, বৌদ্ধবিহার, মন্দির ও সিনাগগ বন্ধ বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক যাজক, পাদ্রি, ইমাম, মোল্লা ও ধর্মগুরুকে গ্রেপ্তার করে সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। এমনকি এশিয়ার মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোতে শরীআহ আদালত নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানের চিনের কমিউনিস্ট পার্টি (CCP)-র ধর্ম সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এই মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী নাস্তিকতার ওপর আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত। চিন রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মকে কেবল কুসংস্কারই মনে করে না, বরং তাদের কিছু নীতি ও কার্যক্রমে ধর্মকে নিয়ন্ত্রণের নামে নির্মূল করার আক্রমণাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অতএব, ক্লাসিক্যাল কমিউনিজম কেবল ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে ধর্মবিদ্বেষী একটি মতাদর্শ।

দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা: ‘মৌলবাদী বামপন্থী!’

সাধারণ মানুষের মনে ধারণা থাকে যে, একজন বামপন্থী মানেই তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং শ্রেণি-সংগ্রামের রাজনীতিতে বিশ্বাসী হবেন। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ধারণা সব সময় সত্যি নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা বারবার বামপন্থীদের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে এবং আদর্শিকভাবে বাম ও ডান মেরুর মধ্যে পেন্ডুলামের মতো ঝুলতে দেখি।

আমাদের এখানে এমন একশ্রেণির ‘মৌলবাদী বামপন্থী’ বা উগ্র বামপন্থী দেখা যায়, যারা আধুনিক প্রগতির মুখোশ পরে উগ্রতা ও মৌলবাদকে শ্রেণি-সংগ্রামের টুপি পরিয়ে উপস্থাপনের জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে নাস্তিকতা এবং জিহাদ বা উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর গ্রহ। কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দুইয়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য ও শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে।

উগ্রপন্থীরা অনেক সময় বামপন্থাকে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য একটি ‘বিপ্লবী খোলস’ বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর পেছনে রয়েছে তাদের কিছু পারস্পরিক মিল ও কৌশলগত সুবিধাবাদ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৪০-এর দশকের পাকিস্তান আন্দোলন ও বামদের ভূমিকা

দক্ষিণ এশীয় বামপন্থার এই পেন্ডুলাম রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্যায়ে।

  • ১৯৪১ সালের পটপরিবর্তন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের নির্দেশে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং যুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটিশ সরকারকে সমর্থন করে।

  • অধিকারীর থিসিস ও মুসলিম লীগকে সমর্থন: এই সময় কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক গঙ্গাধর অধিকারীর ‘অধিকারীর থিসিস’-এর ওপর ভিত্তি করে সিপিআই মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান আন্দোলনকে তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সমর্থন জানায়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের আগেও পাঞ্জাব ও অন্যান্য অঞ্চলের কমিউনিস্ট নেতারা মুসলিম লীগকে সহযোগিতা করেছিলেন।

  • ভ্রম সংশোধন (১৯৪৭): অবশেষে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক আগে তাদের হুশ ফেরে এবং তারা মর্মে মর্মে বুঝতে পারে যে, পাকিস্তান আন্দোলনটি আদতে শ্রমিক বা সাধারণ জনগণের মুক্তির আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি।

পদ্ধতিগত মিল ও ‘অভিন্ন শত্রু’ তত্ত্ব

উভয় চরমপন্থী ধারার মধ্যে উদ্দেশ্যের অমিল থাকলেও কৌশলে প্রচুর মিল রয়েছে:

  • অভিন্ন শত্রু: উভয় পক্ষই পশ্চিমা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখে।

  • রাষ্ট্র দখল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা: দুই পক্ষই অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতা ও পদ্ধতির প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করে। তারা একবারে পুরো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে তারপর নিজেদের মনগড়া মতাদর্শ জোর করে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

  • একমুখী অসহিষ্ণুতা: চরম বামপন্থা এবং উগ্র জিহাদবাদ ভিন্ন মেরুর মনে হলেও উভয়ের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে রয়েছে একরৈখিক অসহিষ্ণুতা এবং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করার জেদ।

এ কারণেই দেখা যায়, আমাদের দেশের হতাশ বামপন্থীদের বড় একটা অংশ আজ ডানপন্থার দিকে আশ্রয় নিয়েছে। ডানপন্থীদের মতোই তাদের আচার-আচরণে একধরনের ‘হোলিনেস’ বা পবিত্রতার অহংকার এবং তীব্র ‘আদর্শগত সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ কাজ করে।

আমদানিকৃত মতাদর্শের সংকট, অস্তিত্বের লড়াই (Existential Anguish) ও অপরাধবোধ

দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতবর্ষে বামপন্থার রাজনীতি আমদানি হয়েছিল প্রতিষ্ঠিত দুটি কমিউনিস্ট পরাশক্তির কাছ থেকে। কিন্তু এই অঞ্চলের সমাজ ও মানুষ ছিল প্রবলভাবে ধর্ম ও সাংস্কৃতিক অনুরাগী। ফলে বহু ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের এই ভূখণ্ডে কমিউনিজম আমদানি করতে গিয়ে তাদের নানামুখী সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়।

সেই বাধার মুখে টিকে থাকার জন্য তারা বিভিন্ন সময় আদর্শিক কম্প্রোমাইজ বা আপস করেছে:

  • কখনো নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর আশায় মৌলবাদী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে (এই অন্ধ আশায় যে, পরবর্তীতে তারা হয়তো ভালো হয়ে যাবে)।

  • কখনো সমসাময়িক রাজনৈতিক স্রোত বা FOMO (Fear of Missing Out)-র শিকার হয়ে ডানপন্থীদের নানাবিধ আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন জুগিয়েছে।

কিন্তু এর কোনোটি থেকেই তারা কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারেনি বা বিপ্লবে সফল হতে পারেনি। উল্টোদিকে, তাদের দলগুলো ক্রমেই সংকুচিত হতে হতে হাতে গোনা কিছু মানুষের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতা এবং অস্তিত্বের সংকট বা Existential Anguish তাদের মধ্যে তীব্র হতাশার জন্ম দেয়।

পাশাপাশি, তাদের অবচেতন মনে নিজেদের নাস্তিকতা এবং আজীবন চালিয়ে যাওয়া ধর্মবিদ্বেশের একধরনের অপরাধবোধ (Guilt) সবসময় কাজ করে, যা তাদের মানসিকভাবে চরম অস্থির রাখে। এই তীব্র অস্থিরতা আর হতাশা থেকেই তারা বারবার মৌলবাদীদের সাথে গিয়ে মেশে, তাদের রাজনৈতিক ভাষা গ্রহণ করে এবং আন্দোলনের প্রকাশভঙ্গিতে মৌলবাদীদের খুব কাছাকাছি চলে যায়।

ইতিহাসের অন্ধত্ব এবং পরিণতি: ইরানের শিক্ষা

কিন্তু এই অন্ধ মিলনের পরিণতি কী হতে পারে, তা তারা ভুলে যায়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে

সে সময় ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি সরকারের পতনের জন্য দেশটির কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলো (যেমন—তুদেহ পার্টি) আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থীদের সাথে ঐতিহাসিক জোটে গিয়েছিল। বামপন্থীদের অন্ধ ধারণা ছিল, ধর্মীয় শক্তিকে কেবল একটি বাহন বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা প্রথমে দেশটিতে ধর্মনিরপেক্ষ বা সমাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু বিপ্লব সফল হওয়ার পরপরই ইসলামপন্থীরা সেই বামপন্থীদের সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেন।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নাস্তিক বা বামপন্থীরা রাজনৈতিক সুবিধার লোভে কিংবা হতাশার তাড়নায় যখনই ধর্মীয় উগ্রপন্থার সাথে হাত মেলায়, পরিণামে তারা নিজেরা সেই পৈশাচিক শক্তিরই প্রথম বলি হয়ে ওঠে।