বোলান গান বা বোলান হলো প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের লোকগান তথা বাংলার এক প্রাচীন লোকগান। বোলান গান বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অনন্য অবদান। এক সময় বীরভূম, নদিয়া, বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই গান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
বোলান গান: বাংলার লোকঐতিহ্য
উৎপত্তির প্রেক্ষাপট
বোলান শব্দের উৎপত্তি মূলত ‘বোল’ বা ‘বলানো’ থেকে। এটি মূলত গাজন উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবের গাজন উপলক্ষে সন্ন্যাসীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান গাইতেন, যা পরবর্তীকালে একটি স্বতন্ত্র লোকসঙ্গীতের রূপ নেয়। আদি পর্যায়ে এটি ধর্মীয় থাকলেও পরে এতে লৌকিক ও সামাজিক উপাদান যুক্ত হয়।
গানের গঠন ও পরিবেশন রীতি
বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক ওয়াকিল আহমেদ তাঁর ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ বইতে লিখেছেন, বোলান গান বাঁধা হয় পালার আকারে। এতে লঘু ও গুরু—উভয় বিষয়েরই স্থান আছে।
- খণ্ডগীতি: আধ্যাত্মিক বা পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর গুরুগম্ভীর গান।
- রঙপাঁচালি: সামাজিক সমস্যা বা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে রচিত হালকা রসের গান।
পরিবেশনার সময় শিল্পীরা নানা পৌরাণিক চরিত্রে সজ্জা গ্রহণ করেন। এখানে একটি মূল গায়েন দল গান ধরে এবং অন্য দল ‘ধুয়া’ বা পাল্টাসুর দেয়। খোল, করতাল এবং হারমোনিয়াম এই গানের প্রধান অনুসঙ্গ।
বোলান গানের শ্রেণিবিভাগ
বোলান গানকে তার পরিবেশন ভঙ্গি অনুযায়ী চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
- দাঁড় বোলান: শিল্পীরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে এই গান পরিবেশন করেন।
- বসা বোলান: এই ধারায় কোনো অঙ্গভঙ্গি ছাড়াই আসরে বসে ধীর লয়ে গাওয়া হয়। এতে তাত্ত্বিক ও মারফতি গানের প্রভাব বেশি দেখা যায়।
- পালা বোলান: অনেকটা যাত্রাপালার মতো সাজসজ্জা ও অভিনয়ের মাধ্যমে কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়।
- স্মশান বোলান: এটি সবচেয়ে প্রাচীন ও আদিম রূপ। চৈত্র সংক্রান্তির গভীর রাতে শ্মশানে বা নির্জনে তান্ত্রিক প্রথা মেনে এই গান গাওয়া হয়।
সামাজিক গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা
বোলান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি ছিল তৎকালীন গ্রামীণ সংবাদ মাধ্যম ও সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার। ‘রঙপাঁচালি’র মাধ্যমে সমাজের অসংগতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গান গাওয়া হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে আলকাপ বা ভাদুর মতো এই শিল্পটিও আধুনিক বিনোদনের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বর্ধমান ও বীরভূমের কিছু গ্রামীণ এলাকায় গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে এই গানের প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলছে।
তথ্যসূত্র:
১. ওয়াকিল আহমেদ — ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ (বোলান গানের গঠন ও খণ্ডগীতি/রঙপাঁচালি বিভাজন সংক্রান্ত)।
২. বরুণকুমার চক্রবর্তী — ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’ (বোলানের ভৌগোলিক বিস্তার ও শ্রেণিবিভাগ সংক্রান্ত)।
৩. সুধীর চক্রবর্তী — ‘বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারা’ (গাজন উৎসব ও শ্মশান বোলানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট)।