আমার বড় ফাতেহ আলী খান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

পাটিয়ালা ঘরানার সঙ্গীতের যে মশাল কয়েক শতাব্দী ধরে উপমহাদেশের আকাশ আলোকিত করেছে, ওস্তাদ বড় ফাতেহ আলী খান [১৯৩৫ – ৪ জানুয়ারি ২০১৭] ছিলেন সেই অগ্নিশিখার শেষ সার্থক প্রতিনিধি। আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো তাঁর নাম কিছুটা অচেনা ঠেকতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তিনি এক অবিস্মরণীয় সত্তা। আমাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অমোঘ নেশা যিনি সত্যিকার অর্থে ধরিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ওস্তাদ বড় ফাতেহ আলী খান। তাঁর ত্রিমাত্রিক একতালের ওপর দরবারি কানাড়া রাগে গাওয়া সেই বিখ্যাত বন্দিশ—“ন্যায়নে সো ন্যায়ান…”। এই একটি গান প্রথমবার শুনেই আমি সুরের অতল সাগরে ডুবে গিয়েছিলাম। তাঁর সেই কণ্ঠের জাদুকরী প্রভাবের কাছে আমার আজীবনের কৃতজ্ঞতা।  এটা গল্প দিয়ে তাঁর কথা শুরু হোক।

একটি মৃত্যুঞ্জয়ী সুরের গল্প

বড় ফাতেহ আলী খানের জীবন মানেই সুরের প্রতি একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণ। একটি গল্প দিয়ে তাঁর সুর-সাধনার গভীরতা বোঝা যায়। সময়টি ছিল গত শতাব্দীর মাঝামাঝি। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী একটি ফ্লাইটে চড়ে নেপালের রাজাকে গান শোনাতে যাচ্ছিলেন পাটিয়ালার দিকপাল ভ্রাতৃদ্বয়—ওস্তাদ আমানত আলী ও ওস্তাদ ফাতেহ আলী খান। মাঝ আকাশে হঠাৎ বিমানটি প্রচণ্ড দুর্যোগের মুখে পড়ে। বিমানে থাকা যাত্রীরা যখন মৃত্যুভয়ে হাহাকার আর প্রার্থনা করছেন, ফাতেহ আলী অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর বড় ভাই আমানত আলী চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে আপন মনে গুনগুন করছেন।

কিছুক্ষণ পর আমানত আলী চোখ মেলে ছোট ভাইকে বললেন, “একটা অদ্ভুত সুর এসেছে মাথায়, কম্পোজিশনটাও করে ফেললাম। দ্রুত শিখে নাও তো!” বিস্মিত ফাতেহ আলী জিজ্ঞেস করলেন, “খাঁ সাহেব, তেনু ডর নেই লাগদা?” (খাঁ সাহেব, আপনার কি একটুও ভয় লাগছে না?) আমানত আলী শান্ত স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন— “যদি আমরা দুজনেই মারা যাই, তবে তো শেষই। কিন্তু কেউ একজন যদি বেঁচে ফিরি, তবে যেন এই সুরটা পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকে।” সুরের প্রতি এই যে দায়বদ্ধতা, এটাই ছিল তাঁদের জীবনের দর্শন।

পাটিয়ালা ঘরানার মশালবাহী

পাঞ্জাবের পাটিয়ালা ঘরানার এই দুই কৃতি সন্তান বালক বয়সেই অবিশ্বাস্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে তাঁরা পাটিয়ালা স্টেটের সভাগায়ক বা ‘স্টেট মিউজিশিয়ান’ হিসেবে নিযুক্ত হন। ভারতের সঙ্গীত দুনিয়ায় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স’। সেই বিশাল মঞ্চ কাঁপিয়ে তাঁরা জয় করেছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্তদের হৃদয়। দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই দুই ভাই জুটি বেঁধে উপমহাদেশের আকাশ-বাতাস সুরের মূর্ছনায় ভরিয়ে রেখেছিলেন।

১৯৭৪ সালে বড় ভাই আমানত আলী খানের অকাল প্রয়াণে একা হয়ে পড়েন ফাতেহ আলী। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। শোককে শক্তিতে পরিণত করে একাই বয়ে চলেছেন পাটিয়ালার গৌরবময় মশাল। ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন আসলে অবসান ঘটে পাটিয়ালার শেষ ‘অর্থডক্স খলিফা’ বা বিশুদ্ধ উত্তরাধিকারী যুগের।

ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর বিশেষ ভক্ত হওয়ার কারণ তাঁর অসামান্য কণ্ঠের গভীরতা। তাঁর গাওয়া সেই কালজয়ী বন্দিশ “ন্যায়নে সে ন্যায়ান” প্রথমবার শুনে আমার মনে হয়েছিল—এর আগে সম্ভবত আমি প্রকৃত কোনো গানই শুনিনি। তাঁর গান আমাকে শিখিয়েছে গান কেবল বিনোদন নয়, গান হলো এক ধরণের ধ্যান বা ‘ইবাদত’। তিনি চলে গেলেও তাঁর সুরের রেশ আজীবন আমাদের মতো অগণিত সঙ্গীতানুরাগীর হৃদয়ে অনুরণিত হবে।

 

বড় ফাতেহ আলী খান এর আর্টিকেল ছাড়াও আরও পড়ুন: