বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি: কী, কেন ও কীভাবে? | ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি একটি অনস্বীকার্য এবং রূঢ় বাস্তবতা। একটি রাজনৈতিক উপাদান (Political Element) হিসেবে আন্তর্জাতিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্কের নীতিতে এর ভেতরে আসলে কোনো যৌক্তিক শক্তি কিংবা বাস্তবিক ভিত্তি থাকুক আর না-থাকুক—আমাদের দেশের রাজনীতির মাঠে এর এক বিশাল ও শক্তিশালী অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। এই রাজনীতির প্রেক্ষাপট কিন্তু স্রেফ ওপর ওপর ভেসে থাকা কোনো সাময়িক উত্তেজনা নয়; এর শেকড় অত্যন্ত গভীর এবং এর জন্ম-ইতিহাস আমাদের এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে যুক্ত।

একটা বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তান নামক সেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে ‘পাকিস্তানপন্থা’র নোংরা রাজনীতি যেদিন আবার এ দেশের মাটিতে পুনর্বাসিত হয়ে ফেরত এসেছে, ঠিক সেদিন থেকেই পাকিস্তানের সেই পুরনো বিষাক্ত উত্তরাধিকার হিসেবে এই ‘ভারত-বিরোধী’ রাজনীতিটাও এ দেশে আমদানি করা হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী, এ দেশের মাটিতে এই পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি ও তার দোসররা রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং সমাজে যত বেশি নিজেদের আখের গুছিয়েছে আর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে—ঠিক ততটাই সুপরিকল্পিতভাবে এ দেশে ‘ভারত-বিরোধী’ একটা কৃত্রিম জুজু তৈরি করা হয়েছে। আর এই অবাস্তব প্রোপাগান্ডাকে লালন-পালন করে টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজ ও রাজনীতির মাঠে একটি বৃহৎ জনগোষ্টিও তৈরি করা হয়েছে, যাদের মূল কাজই হলো দিন-রাত মানুষের মনে এক ধরণের কাল্পনিক ভয় ঢুকিয়ে রাখা।

তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কেউ যদি বাংলাদেশের আসল রাজনৈতিক সমীকরণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর ভোটের হিসাব-নিকাশ বুঝতে চান, তবে এই ভারত-বিরোধী রাজনীতির ভেতরের কুৎসিত বাস্তবতা আর তার পেছনের চতুর মেকানিজমটা বোঝা তাঁর জন্য অত্যন্ত জরুরী। এটি কোনো দেশের স্বার্থের লড়াই নয়, এটি মূলত এ দেশের বুকে পাকিস্তানি ভাবধারাকে বাঁচিয়ে রাখার এক সুগভীর রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। এর সাথে দেশপ্রেমের কোন সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২) বা ইন্দিরা মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান

Table of Contents

ভারতবিরোধী রাজনীতি কী, কেন ও কিভাবে?

১. এর জন্ম কোথায় এবং প্রেক্ষাপট কী?

আমাদের এই অঞ্চলে ভারতবিরোধী রাজনীতির আসল বীজটা কিন্তু বপন করা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের সেই কৃত্রিম আর সাম্প্রদায়িক ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ ভেতর। পাকিস্তান রাষ্ট্রটা তৈরি করার জন্য উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে যেভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার পেছনে আসলে কোনো বাস্তব বা গঠনমূলক দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি ছিল না। স্রেফ ধর্মের দোহাই দিয়ে বা সাময়িক ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করে একটা নতুন রাষ্ট্র হয়তো বানিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু একটা আধুনিক রাষ্ট্রকে একক জাতি হিসেবে যুগের পর যুগ ঐক্যবদ্ধ রাখতে যে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ—ইতিহাস আমাদের সেটাই দেখিয়েছে। পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকরা রাষ্ট্র গঠনের পর সাধারণ মানুষের কল্যাণে কোনো প্রগতিশীল রাজনৈতিক বা আদর্শিক রূপরেখা (Vision) তৈরি করতেই পারেননি।

দেশভাগের ঠিক পর পর আমাদের এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যখন সব হারিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব আর বিপর্যস্ত, তখনই তাদের মনে দেশভাগের আসল সুফল নিয়ে বড় ধরণের সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। চারিদিকে ছড়াতে থাকে তীব্র জনঅসন্তোষ। আর ঠিক এই গণবিক্ষোভ থেকে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্যই পাকিস্তানি শাসকরা দেশের উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে না হেঁটে, বেছে নেয় এক নোংরা পথ—তা হলো মানুষের মনে ‘ভয়’ আর ‘শত্রু’র জন্ম দেওয়া।

একটা বিভক্ত জাতিকে কৃত্রিমভাবে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখতে তারা ভারতকে একটি চিরস্থায়ী ও পরম শত্রু হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে ব্র্যান্ডিং করতে শুরু করে। এর সুবিধাটা ছিল দারুণ; দেশে সবসময় একটা কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা বা জরুরি অবস্থা জারি রাখার চমৎকার অজুহাত পাওয়া যেত। আর এই ডামাডোলের সুযোগে সাধারণ নাগরিকরা যাতে তাঁদের নিজেদের অর্থনৈতিক অধিকার, ভাতের অধিকার বা গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে কোনোভাবেই সোচ্চার হতে না পারেন—সেই ব্যবস্থা পাকা করা হতো।

তখনকার দিনে কেউ যদি সরকারের কোনো চরম ব্যর্থতা, দুর্নীতি বা বৈষম্য নিয়ে একটাও যৌক্তিক প্রশ্ন তুলত, শাসকগোষ্ঠী খুব সহজেই তার গায়ে ‘ইসলামবিরোধী’, ‘পাকিস্তানবিরোধী’ কিংবা ‘ভারতের দালাল’ তকমা সেঁটে দিয়ে তাকে চিরতরে দমন করত। এই নোংরা দমনমূলক কৌশলটাই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের ভারতবিরোধী রাজনীতির আসল চালিকাশক্তি। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র দিন-রাত এক করে সাধারণ মানুষের মগজে এই বিষ ঢুকাত যে—ভারত হলো একটা ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ এবং এটি পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য এক চিরকালীন বড় হুমকি।

রাজনীতির খুব সহজ একটা কুৎসিত থিওরি হলো—আপনি যখন জনগণকে অধিকার, অন্ন, বস্ত্র বা সুশাসন দিতে পারবেন না, তখন তাদের ভেতরে অন্য কারো প্রতি তীব্র ঘৃণা দিন, চারপাশের মানুষের প্রতি অবিশ্বাস দিন আর নিজেদের প্রতি হীনমন্যতা ঢুকিয়ে দিন; তারা বোকার মতো এগুলো নিয়েই কামড়াকামড়ি করে ব্যস্ত থাকবে, আপনার ব্যর্থতার হিসাব নেওয়ার কথা ভুলেই যাবে! পাকিস্তান আমলের ভারত-বিরোধী রাজনীতির মূল সারমর্ম ছিল ঠিক এটাই।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট (১৯৭২–১৯৭৫):

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কটা শুরুর দিকে ছিল অত্যন্ত নিবিড়, ঘনিষ্ঠ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। বিজয়ের পর পর আমাদের এই স্বাধীন মানচিত্র থেকে স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী অপশক্তিগুলোর রাজনীতির সব ধরণের আদর্শিক ভিত্তি এক লহমায় তছনছ হয়ে যায়। দেশের মূলধারার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়া এই পরাজিত শক্তি তখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং সমাজে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে ‘ভারত বিরোধিতাকেই’ তাদের পুনরুত্থানের একমাত্র ম্যাজিক কার্ড বা পথ হিসেবে বেছে নেয়।

নতুন স্বাধীন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলতে তারা একের পর এক স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মাঠে নামে এবং শুরু করে ভয়াবহ অপপ্রচার। জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন, ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে নিজেদের মতো করে দেওয়া ভুল ব্যাখ্যা কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ করা নিয়ে তারা সাধারণ মানুষের মনে একের পর এক বিভ্রান্তির বীজ বুনতে থাকে।

এই প্রচারণায় সবচেয়ে বড় হাওয়া লাগে ১৯৭৪ সালে। একদিকে ঐতিহাসিক ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’র (বিশেষ করে বেরুবাড়ি হস্তান্তর) ভুল রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, আর অন্যদিকে তৎকালীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বন্যার কারণে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভিক্ষ—এই দুটি বাস্তব সংকটকে পুঁজি করে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দেশে প্রথম বড় আকারের ভারতবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মওলানা ভাসানী (যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ভারতে থেকে যাওয়ার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জমির আবেদন করেছিলেন) তিনি হয়ে ওঠেন ভারত-বিরোধিতার পোস্টার বয়। ভাসানী হুজুর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে ছিলেন, স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন, রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর মুরুব্বি হবার কারণে তাঁর রাজনীতি না থাকলেও একটি পজিশন ছিল। তাঁকে হুট করে বাধা দেবার কেউ ছিল না। তার এই অবস্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পর্দার আড়ালে থাকা সেই চতুর স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীগুলো খুব দ্রুতই সমাজে নিজেদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের রাস্তাটা একদম পরিষ্কার করে ফেলে। যে ভারত-বিরোধিতার শেকড় লুকিয়ে ছিল মুসলিম লীগের পাকিস্তানি মগজে, তা-ই একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন রূপ নিয়ে হাজির হয়।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ:

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি তার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস ট্র্যাজেডির পর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শিক দিক উল্টে দেওয়া হয়। পরবর্তী সামরিক শাসনামলগুলোতে (জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের সময়) রাষ্ট্রীয় মদতে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টকে উৎসাহিত করা হয়। এই সময়ে আবির্ভূত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের ‘ভারত-ঘনিষ্ঠতা’র বিপরীতে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ‘ভারত বিরোধিতাকে’ একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। মূলত এই পর্যায় থেকেই ভারতবিরোধী প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি শক্তিশালী মেরুকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, নয়াদিল্লি, ১৯৮০

২. কেন ও কিভাবে ভারতবিরোধী রাজনীতি করা হয়?

আমাদের দেশের ভারত-বিরোধী রাজনীতিটা আসলে অনেকটা তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’ বা কাল্পনিক কোনো ধর্মরাষ্ট্রের সস্তা বিজ্ঞাপনের মতো। এই ধারার রাজনীতিকরা সবসময় জোরেশোরে প্রচার করে যে, এই ভারত-বিরোধিতার মডেলটা বাস্তবায়ন করতে পারলেই দেশ নাকি সুখ-সমৃদ্ধিতে একেবারে ভেসে যাবে! কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই প্র্যাক্টিক্যালি তা করে দেখাতে পারেনি। বরং ইতিহাস ঘাঁটলে এর উল্টো ফল বারবার প্রমাণিত হওয়ার পরেও, তারা বছরের পর বছর ধরে জনমনে ওই একই বিজ্ঞাপনের টেপরেকর্ডার চালিয়ে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, এই গোষ্ঠীটি যখনই কোনোভাবে ক্ষমতায় আসে, তখন নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য পর্দার আড়ালে সেই ‘শত্রু’ প্রতিবেশীকে সম্ভব-অসম্ভব সবকিছু উজাড় করে দিয়ে দেয়; আর তা না পারলে অনর্থক যুদ্ধ-বিগ্রহের পরিস্থিতি তৈরি করে দেশের অর্থনীতিটাকে পুরো ধ্বংস করে দেয়।

পৃথিবীর ইতিহাস খুব স্পষ্ট করে একটা কথা বলে—যে দেশই নিজের প্রতিবেশীর সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার বদলে স্রেফ অন্ধ শত্রুতার মডেলে হেঁটেছে, তাদের ভাগ্যেই জুটেছে বিপুল ও অনর্থক সামরিক ব্যয়। আর এই ধরণের আকাশচুম্বী সামরিক বাজেটের শেষ পরিণতি হলো নিশ্চিত দারিদ্র্য। অন্যদিকে, যে দেশগুলো তাদের প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিতে এগিয়েছে, তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের সামরিক খরচ কমিয়ে আনতে পেরেছে, নিজেদের ভেতর ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে পেরেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।

তাই ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে দেখা যাবে, কোনো প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং বুদ্ধিমান বাংলাদেশি কখনোই নিজের ভেতর এই অন্ধ ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট লালন করতে পারেন না। আমাদের দেশে ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট মূলত ওরাই বাঁচিয়ে রাখতে চায়, যাদের নিজেদের স্বার্থে এ দেশের মাটিতে পাকিস্তানি ঘরানার পেছনের সারির রাজনৈতিক ধারাটিকে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।

তবে আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গাটা কোথায় জানেন? আমরা এখনো এ দেশের অধিকাংশ মানুষকে সঠিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারিনি। আর এই দুর্বলতার সুযোগেই সাধারণ মানুষ খুব সহজে যেকোনো চতুর গুজবে কুপোকাত হয়ে যায়।

বাস্তবতা হলো, ভারত-বিরোধী রাজনীতির নেপথ্যে যেসব ইস্যু (যেমন: সীমান্ত সমস্যা, পানি বণ্টন ইত্যাদি) সামনে আনা হয়, সেগুলো আসলে যেকোনো দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার একেবারেই স্বাভাবিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। যেকোনো দুটি দেশের সীমান্ত থাকলেই সেখানে কিছু সমস্যা থাকবে, যা আলোচনার টেবিলে সমাধান করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই স্বাভাবিক ইস্যুগুলোকেই ইচ্ছাকৃতভাবে কুৎসিতভাবে টুইস্ট করা হয়, সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয় এবং একে একটি বিশেষ ‘রাজনৈতিক ক্যাপিটাল’ বা ভোটের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এর পেছনের মূল কারণ ও মেকানিজমগুলো চলুন নিচে বিস্তারিত দেখে নেওয়া যাক:

ক. ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা (Superiority & Identity Complex):

বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত হওয়ায় একটি ‘অবরুদ্ধ মানস’ বা Siegementality কাজ করে। যেহেতু আমরা অবিভক্ত ভারত থেকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা হয়েছি, তাই “কে বেশি ভালো আছে” বা “কার সংস্কৃতি শ্রেষ্ঠ”—এটি নিয়ে একটি অবচেতন প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। দুই দেশের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও ভাষার মিল থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে এক ধরনের ‘সুপেরিয়র কমপ্লেক্স’ কাজ করে। বিশেষ করে, ধর্মান্তরিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রমাণের তাগিদে এক ধরনের সুপ্ত হিন্দু-ঘৃণা বা ‘Anti-Hindu’ সেন্টিমেন্টকে ভারত বিরোধিতার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়।

খ. পানিবণ্টন ও রাইপেরিয়ান রাইটস (Riparian Rights):

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫৭টি অভিন্ন নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের এই নদীগুলোর পানির ওপর এক ন্যায্য ও আইনগত অধিকার রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘রাইপারিয়ান রাইটস’ (Riparian Rights)। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্পেসের রূঢ় বাস্তবতা হলো—কাগজে-কলমে অধিকার থাকলেই তা এমনি এমনি ঘরে এসে ধরা দেয় না, তা আদায় করে নিতে হয়।

একটা বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার; এই পানিবণ্টন নিয়ে ঝামেলা কিন্তু শুধু বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ভেতরেও বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে (যেমন: কর্ণাটক বনাম তামিলনাড়ু কিংবা তিস্তা নিয়ে সিকিম বনাম পশ্চিমবঙ্গ) নদী নিয়ে মারাত্মক কামড়াকামড়ি ও বিরোধ চলে। এই জটিল আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে নিজেদের ন্যায্য হিস্যা পেতে গেলে একমাত্র পথ হলো—পারস্পরিক সুসম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক নেগোসিয়েশন এবং আইনি চুক্তি। ফাঁকা মাঠ গরম করে বা ঝগড়া-বিবাদ করে নদী থেকে এক ফোঁটা পানিও আনা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশের একদল সুবিধাবাদী রাজনীতিক এই মোক্ষম সত্যটি চেপে গিয়ে, সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে পানি নিয়ে সস্তা রাজনীতি করতে ভালোবাসেন।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু এই নদী ইস্যুতে সবার ক্ষেত্রে সমান নীতি বজায় রাখে না। এখানেও তারা খাটাবে চরম দ্বিচারিতা! যেমন ধরুন—বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী রাজনীতির প্রধান আইকন কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর শাসনামলেই ভারতের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন, সরাসরি রেল যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ ট্রানজিট এবং বেশ কিছু বড় বড় বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তিগুলো নিয়ে এই ঘরানার রাজনীতিতে কোনো টুঁ শব্দ নেই, ওগুলো যেন একেবারে ‘মহাপবিত্র’ চুক্তি ছিল! অথচ, ঠিক একই ধরণের চুক্তি বা তাঁরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার যখন দেশের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদী কোনো চুক্তি সই করে, তখনই সেটা রাতারাতি ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ হয়ে যায় এবং তা নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করা হয়।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার কারণে আমাদের মধ্যে এরকম অসংখ্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। আর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এর মধ্যকার অনেকগুলো ইস্যু দীর্ঘ মেয়াদে অমীমাংসিত (যেমন বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তি) রয়ে গেছে। আর এই অমীমাংসিত সংকটগুলোই হলো আমাদের দেশের ভারত-বিরোধী রাজনীতির প্রধান জ্বালানি। এই ইস্যুগুলোকে পুঁজি করে পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক ক্রীড়নকরা বিষয়টিকে ভারতের ‘একতরফা দাদাগিরি’ হিসেবে রঙচঙ মেখে সাধারণ মানুষের সামনে চিত্রায়িত করে এবং তাঁদের ভেতরের সরল দেশপ্রেমের ক্ষোভকে নিজেদের ভোটের স্বার্থে উসকে দেয়। এর পেছনে দেশের পানির স্বার্থ থাকে না, থাকে কেবল ক্ষমতার স্বার্থ।

গ. সীমান্ত হত্যা ও সার্বভৌমত্বের আবেগ:

বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ স্থল সীমান্তে দুই দেশের অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যের কারণে চোরাচালান বা অবৈধ পণ্যের কারবার একটি অত্যন্ত রূঢ় ও তিতো বাস্তবতা। এই অবৈধ চোরাচালান যেন বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেজন্য দুই দেশের সরকার ইতিমধ্যেই নানা ধরণের ‘সীমান্ত হাট’ (Border Haat) চালু করাসহ দুই দেশের মানুষের বৈধ যাতায়াতের জন্য নানা আইনি সুযোগ তৈরি করেছে। আবার বাস্তবতার খাতিরে সীমান্ত অপরাধ রুখতে মাঝেমধ্যেই বিএসএফ (BSF) এবং বিজিবি (BGB)-র মধ্যে অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরণের অলিখিত বা কৌশলগত সমঝোতাও তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন এই সব আইনি নিয়মকানুন বা সমঝোতার বাইরে গিয়ে কিছু লোক স্রেফ আর্থিক লোভের বশে বা চোরাকারবারের উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে কাঁটাতার গলে ভারতের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ঢুকে পড়ে। আর তখনই কখনো তারা বিএসএফ-এর হাতে আটকে পড়ে, আবার কখনো কখনো বিএসএফ-এর নির্মম গুলিতে এ দেশের সাধারণ মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটে।

ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বুঝবেন, দুই দেশের সীমানা যদি পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তিতে নিশ্ছিদ্রভাবে সুরক্ষিত থাকত, তবে এই ঘটনাগুলো হয়তো ঘটতই না বা ঘটলেও তার সংখ্যা হতো অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু আমাদের দুই দেশের বর্ডারই মূলত বিশাল এবং বহুলাংশে উন্মুক্ত। আর এই ভৌগোলিক সুযোগের কারণেই যেকোনো সময় গোপনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আসা-যাওয়ার একটা চোরাই পথ খোলা থেকে যায়। ফলে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই অবৈধ পারাপার আর সীমান্ত হত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকটকে রাজনীতিতে কীভাবে ব্যবহার করা হয়? যখনই সীমান্তে এমন কোনো মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তখন আমাদের দেশের ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একে স্রেফ একটি দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত অপরাধ ও আইনি সংকট হিসেবে দেখে না। তারা এটাকে সরাসরি ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর ভারতের নগ্ন আক্রমণ’ হিসেবে রঙচঙ মেখে বাজারে ছেড়ে দেয়। একজন অপরাধী চোরাচালান করতে গিয়ে মারা গেলেও তাকে রাতারাতি জাতীয় বীর বা সার্বভৌমত্বের প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়। সাধারণ মানুষের ভেতরের খাঁটি দেশপ্রেম আর সংবেদনশীল আবেগকে পুঁজি করে তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি করার জন্য—এটি এই রাজনীতির অন্যতম সফল ও মোক্ষম একটি হাতিয়ার। এর পেছনে সীমান্তের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বা চোরাচালান বন্ধের কোনো গঠনমূলক চিন্তা থাকে না, থাকে স্রেফ মানুষের ক্ষোভ ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কুৎসিত মেকানিজম।

ঘ. বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ:

ভারতের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন শিল্পের কারণে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য উৎপাদন করতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সীমিত শিল্পায়ন এবং কাঁচামালের পরনির্ভরশীলতার কারণে আমাদের দেশীয় শিল্প ভারতের সেই বিশাল অর্থনীতির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খায়। শুধু পণ্যসামগ্রীই নয়, ভারতে তুলনামূলক উন্নত ও সস্তা চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর এ দেশের লাখ লাখ মানুষ সেখানে চিকিৎসার জন্য যান। আবার পর্যটনের (Tourism) ক্ষেত্রেও ভারতে বহু ধরণের বৈচিত্র্যময় এবং সস্তা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন থাকার কারণে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পর্যটকদের দেশের বাইরে প্রথম টার্গেট ডেসটিনেশনই থাকে ভারত।

এই যে পণ্য, চিকিৎসা আর পর্যটন—সবদিক থেকে আমাদের টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে, এর ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি বিশাল বাণিজ্যিক ঘাটতি তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশের ভারত-বিরোধীরা এই স্বাভাবিক বৈশ্বিক অর্থনীতির সরল সমীকরণটিকে সাধারণ মানুষের সামনে সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করে। তারা এই বাণিজ্য ঘাটতিকে ভারতের ‘অর্থনৈতিক শোষণ’ এবং বাংলাদেশকে ‘ভারতের সস্তা বাজার’ বানানোর এক সুগভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের উগ্র ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ (Economic Nationalism) উসকে দেয়।

আসল ট্র্যাজেডিটা এখানেই। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত ছিল নিজেদের ভেতর খাঁটি দেশপ্রেম জাগ্রত করে দেশি শিল্পের বিকাশ ঘটানো, আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন করা এবং দেশের ভেতরের ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ও পর্যটক-বান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এই ভারত-বিরোধী রাজনীতির কারবারিরা সেই গঠনমূলক ও পজিটিভ দিকে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে, স্রেফ অন্ধ ‘ভারত-বিরোধিতা’ উসকে দেয়। এর ফলে মাঠপর্যায়ে তাদের সস্তা কর্মী-সমর্থকদের সাময়িক ক্ষোভ বাড়ে, অবুঝ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে তাদের ভোটের পাল্লাও হয়তো একটু ভারী হয়—কিন্তু দিনশেষে এই দেশের অর্থনৈতিক বা কাঠামোগত কোনো লাভই হয় না।

সবচেয়ে দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয় হলো, আমাদের দেশের কিছু অতি-উৎসাহী পর্যটক যখন ভারতের দেওয়া ভিসা পকেটে নিয়ে সে দেশেই ঘুরতে যান, সেখানকার সস্তা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং হোটেল রুমে বসে ফেসবুকে বসে তীব্র ভারত-বিরোধী ও উগ্র প্রচারণায় লিপ্ত হন। এর পরিণতিতে যখন আইনগতভাবে তাদের ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয় এবং ভারতের মূলধারার খবরের কাগজে সেই লজ্জাজনক খবর আমাদের দেশের নামসহ প্রকাশ করা হয়—তখন একজন সচেতন বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। সস্তা প্রোপাগান্ডার রাজনীতি আমাদের জাতীয় বিবেককে কতটা অন্ধ আর হীনমন্য করে তুলেছে, এটি তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

ঙ. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণ (Communal Symbiosis):

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে উগ্র ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মূলত একে অপরের পরিপূরক বা ‘বিজনেস পার্টনার’ হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশের একদল চরমপন্থী ইসলামপন্থী রাজনীতিক ভারতের বর্তমান ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত, মুসলিমবিদ্বেষ বা উগ্রতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চায় যে—যেহেতু ভারতে মুসলমানদের ওপর অবিচার হচ্ছে, তাই বাংলাদেশেও তাদের মতো উগ্র ইসলামপন্থীদের টিকে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।

ঠিক একই মেকানিজমে, সীমান্তের ওপারে ভারতের হিন্দুত্ববাদী দলগুলোও বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের ভেতরের ছোটখাটো ধর্মীয় কোন্দল, মণ্ডপে হামলা বা সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোকে নিজেদের দেশের ভোটারদের দেখায়। তারা সেখানে প্রচার করে—”দেখো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হিন্দুরা কত অনিরাপদ, তাই নিজেদের বাঁচাতে আমাদের (উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের) ভোট দিয়ে শক্তিশালী করো।”

অর্থাৎ, দুই দেশের এই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো মুখে একে অপরকে দিন-রাত যতই গালিগালাজ করুক না কেন, বাস্তবে তারা একে অপরের ওপর ভর করেই টিকে থাকে। এক দেশের উগ্রতা, অন্য দেশের উগ্রতাকে সমাজে টিকে থাকার এক ধরণের কৃত্রিম যৌক্তিকতা বা ‘মিউচুয়াল জাস্টিফিকেশন’ তৈরি করে দেয়। সহজ কথায়, ওদিকের ব্যবসা ভালো চললে, এদিকের জোগান বাড়ে; আর এদিকের উন্মাদনা বাড়লে, ওদিকের ভোটব্যাংক মজবুত হয়। এই নোংরা সিম্বায়োসিস বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার রাজনীতি মূলত দুই দেশের সাধারণ ও সরলমনা ধার্মিক মানুষদের আবেগকে শোষণ করে নিজেদের ক্ষমতার আখের গোছানোর এক সুগভীর বৈশ্বিক কৌশল মাত্র।

চ. ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি ও সার্বভৌমত্বের ভীতি:

আজকের এই গ্লোবালাইজেশন বা বৈশ্বিক যুগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য পারস্পরিক আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি (Connectivity) বা যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের যেমন তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে সহজে যোগাযোগের জন্য আমাদের দেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট বা করিডোর প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থেই নেপাল বা ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড (চারিদিকে স্থলবেষ্টিত) রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধা পেতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন। এমনকি খুব সাধারণ একটা উদাহরণ দিলে বলা যায়—আমাদের দেশের মানুষ যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বল্প খরচে আকাশপথে যাতায়াত করতে চান, তখনো কিন্তু আমাদের ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করতেই হয়। এটাই হলো আধুনিক পৃথিবীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার স্বাভাবিক নিয়ম।

কিন্তু আমাদের দেশের একদল সংকীর্ণমনা ভারত-বিরোধী রাজনীতিক এই বিশাল অর্থনৈতিক সমীকরণটিকে সম্পূর্ণ আড়াল করে যান। তারা ভারতকে ট্রানজিট বা করিডোর দেওয়াকে বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ না করে, সাধারণ মানুষের সামনে একে ‘সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’ বা ‘দেশ বিক্রি’র জুজু হিসেবে উগ্রভাবে প্রচার করে। এই ট্রানজিট সুবিধা দেওয়াকে তারা ভারতের ‘একতরফা সুবিধা’ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সামরিক নিরাপত্তার জন্য এক মস্ত বড় হুমকি হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করে। মানুষের মনে এক ধরণের কৃত্রিম ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear) তৈরি করে সস্তা রাজনীতি টিকিয়ে রাখাই মূলত এদের মূল উদ্দেশ্য। তারা এটা বুঝতে চায় না যে, কানেক্টিভিটি কোনো পরাধীনতা নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।

ছ. খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (The New Frontier):

আজকের দিনে ক্রিকেট খেলা এখন আর কেবল মাঠের ১১ জনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদের এক ভার্চুয়াল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। বিশাল জনসংখ্যার কারণে বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাজার আমাদের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সবার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। আর বিশ্ব পুঁজিবাদের খুব স্বাভাবিক নিয়মেই—যার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত বেশি, ক্রিকেট বিশ্বের নীতিনির্ধারণে (যেমন আইসিসি বা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলে) তাদের এক ধরণের একচ্ছত্র প্রভাব বা ইনফ্লুয়েন্স তৈরি হবেই। এই বাণিজ্যিক প্রভাবটা যখন মাঝেমধ্যে অতি-প্রকাশ্য রূপ নেয়, তখন তা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে বেশ খটকা তৈরি করে।

তাছাড়া, ভারতের মতো জায়ান্টদের তুলনায় আমাদের মতো যাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ক্রিকেটের বাজার ছোট, তাদের এক বড় অংশের ফ্যানদের মনে অবচেতনভাবেই এক ধরণের সূক্ষ্ম হীনমন্যতা কাজ করে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হলো—সোশ্যাল মিডিয়ার আমজনতা বা ক্রিকেট ফ্যানরা কিন্তু কোনো দেশের অফিশিয়াল প্রতিনিধি নন। ফলে কোনো রকম দায়বদ্ধতা না থাকায় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ধরণের সস্তা, উগ্র কিংবা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ট্রোল করার অবাধ সুযোগ পান এবং দিন-রাত তার চর্চা করেন। আর ওপারের ফ্যানদের এই সস্তা উগ্রতা স্বাভাবিকভাবেই এপারের ক্রিকেট ফ্যানদের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও জেদ তৈরি করে। এর ফলে মাঠের ভেতরের সাধারণ কোনো ভুল আম্পায়ারিং বা বিসিসিআই-এর প্রভাব নিয়ে তৈরি হওয়া যেকোনো ছোটখাটো ইস্যুকেও রাতারাতি এক বিশাল রূপ দিয়ে ভারত-বিরোধী রাজনীতির মোক্ষম অস্ত্র বানিয়ে ফেলা হয়।

ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই আগুন আরও বেশি ছড়াচ্ছে কিছু সস্তা ইউটিউবার, টিকটকার ও ভ্লগারদের কারণে। এরা মূলত দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা, ট্রোলিং আর উত্তেজনা ছড়িয়ে স্রেফ নিজেদের ভিডিওর ‘ভিউ’ এবং ডলার অর্জন করতে চায়। এই তথাকথিত ভিউ-বাণিজ্যের ডিজিটাল কনটেন্টগুলো দুই দেশের নতুন ও তরুণ প্রজন্মের অবুঝ মগজে এক ভয়াবহ বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অবচেতন মনে ভারত-বিরোধী অন্ধ ক্ষোভ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর হাওয়া দিচ্ছে। খেলাধুলার মতো একটি নির্মল বিনোদনকে এরা স্রেফ নিজেদের স্বার্থে নোংরা রাজনীতির নতুন এক সীমান্তে (New Frontier) পরিণত করেছে।

অটল বিহারী বাজপেয়ী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেন, ২০০২

৩. বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি কীভাবে এটি প্রাসঙ্গিক থাকে?

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি কেবল একটি সাময়িক আবেগ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে। এই প্রাসঙ্গিকতার মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

ক. আদর্শিক ও রাজনৈতিক দ্বিমেরুকরণ (Bipolar Politics):

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুটি একদম বিপরীতমুখী মেরুতে বা ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর এই বিভাজনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ মূলত এক প্রধান এবং অলিখিত বিভাজক রেখা (Line of Division) হিসেবে কাজ করে আসছে।

১. ভারত-বন্ধুত্বপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী ধারা

এই ধারার নেতৃত্বে রয়েছে মূলত আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধপন্থী অসাম্প্রদায়িক বা সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের প্রধান রাজনৈতিক দর্শন হলো—ভৌগোলিক ও বাস্তবসম্মত রিয়ালিটির কারণেই ভারতের মতো একটি বিশাল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তারা ভারতকে স্রেফ একটা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে দেখে না, বরং নিজেদের এক বিশ্বস্ত ‘কৌশলগত অংশীদার’ (Strategic Partner) হিসেবে বিবেচনা করে।

২. ভারত-সংশয়ী ও জাতীয়তাবাদী ধারা

এই মেরুর মূল চালিকাশক্তি হলো বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং দেশের অন্যান্য ছোট-বড় ইসলামপন্থী দলসমূহ। তাদের পুরো রাজনীতিটাই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের প্রতি এক ধরণের চিরন্তন অবিশ্বাস আর সংশয়ের ওপর। তারা সাধারণ মানুষের সামনে ভারতকে একটি ‘আধিপত্যবাদী শক্তি’ (Hegemonic Power) হিসেবে চিত্রায়িত করতে ভালোবাসে। তাদের বয়ান হলো—ভারতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ধারাটি অনেক সময় আমাদের খাঁটি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে এক ধরণের অন্ধ ‘ভারত-বিরোধিতা’র সমার্থক হিসেবে বাজারে ছেড়ে দেয়। দেশপ্রেমের এই কৃত্রিম ভীতি উসকে দিয়েই মূলত তারা সমাজ ও রাজনীতির মাঠে নিজেদের বিশাল এক ভোটব্যাংক বছরের পর বছর ধরে সুরক্ষিত রাখছে।

খ. ক্ষমতার বৈধতা ও ভারতের সমর্থন নিয়ে বিতর্ক:

নির্বাচনী রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বা ভারতের তুষ্টি ছাড়া বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়—বিরোধী দলগুলোর এরকম একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ন্যারেটিভটি প্রচার করে, যার রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক নেই।

একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার গঠন ও পরিবর্তনের একমাত্র আইনি ও কার্যকর পথ হলো জাতীয় নির্বাচন। এ দেশের প্রতিটি আসনের সাধারণ মানুষ, পাড়া-মহল্লার ভোটার এবং আপামর জনগণই দিনশেষে ভোটকেন্দ্রে যান এবং ব্যালট পেপারের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। ভারতের কোনো কর্মকর্তা বা নাগরিক এসে বাংলাদেশের ভোটকেন্দ্রে লাইন দিয়ে ভোট দিয়ে যান না। সুতরাং, জনগণের সমর্থন ও ভোট ছাড়া কেবল বাইরের কোনো দেশের আর্শীবাদ বা সমর্থনে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকা যায়—এই তত্ত্বটি রাজনৈতিকভাবে একটি সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং অবাস্তব ধারণা।

কূটনৈতিক স্পেসে বা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে (International Space) বড় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের জাতীয় স্বার্থে কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পারে বা আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক সমর্থন জোগাতে পারে। এটা বিশ্বরাজনীতির খুব সাধারণ একটি প্র্যাকটিস। ভারত বড়জোর বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক মঞ্চে একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকারকে রাজনৈতিক ডেস্কে সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ব্যবস্থা, ভোটারদের সেন্টিমেন্ট, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং পোলিং এজেন্টের মতো লোকাল নির্বাচনী মেকানিজমে হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ভৌগোলিক সুযোগ ভারতের নেই। লোকাল রাজনীতিতে দিনশেষে স্থানীয় কোন্দল, উন্নয়ন এবং সাংগঠনিক শক্তির ওপরেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়।

বিরোধী দলগুলোর এই ‘ইন্ডিয়া আউট’ (India Out) বা ভারত-বিরোধী ক্যাম্পেইন মূলত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা ঢাকার একটি সহজ কৌশল বা অজুহাত। যখন কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের ম্যান্ডেট আদায়ে ব্যর্থ হয়, শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে না কিংবা সাধারণ ভোটারের মন জয় করতে পারে না—তখন তারা নিজেদের এই দুর্বলতার দায় চাপানোর জন্য একটি ‘বিদেশী শত্রু’ বা ‘ভারত জুজু’র জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিভ্রান্তি ছড়ানো সহজ যে, “আমরা তো ঠিকই আছি, কিন্তু ভারত সব নিয়ন্ত্রণ করছে।” এটি মূলত ভোটারদেরকে আসল রাজনৈতিক সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটি চতুর প্রোপাগান্ডা মাত্র।

বাংলাদেশে ভারতের কথায় সরকার আসে আর যায়—এই কথাটি প্রকারান্তরে এ দেশের সচেতন জনগণ এবং আমাদের মহান সার্বভৌমত্বকে অপমান করার শামিল। যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে, সে জাতির ভোটাররা এতটা অবুঝ বা পরাধীন নন যে দিল্লির কথায় নিজেদের শাসক নির্বাচন করবেন। বাংলাদেশের জনগণ বরাবরই অত্যন্ত রাজনীতি-সচেতন। তাঁরা যখন যাকে চান, ভোটের মাধ্যমে বা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকেই ক্ষমতায় বসান।

অতএব, ভারতবিরোধী রাজনীতির এই সাম্প্রতিক ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইনটি কোনো বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আন্তর্জাতিক মহলে কোনো দেশের ভালো লবিং বা কূটনৈতিক বন্ধুত্ব থাকতেই পারে, কিন্তু দিনশেষে সরকার নির্বাচিত করে এ দেশের জনগণই। মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতাকে অস্বীকার করে স্রেফ ভূ-রাজনৈতিক জুজু তৈরি করে বাংলাদেশে কোনোদিন ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকা সম্ভব নয়।

গ. ‘শূন্যস্থান পূরণ’ ও রাজনীতির বিকল্প ক্ষেত্র:

বাংলাদেশে যখনই বিরোধী দলগুলোর জন্য সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার মতো গঠনমূলক বা ‘উন্নয়নের রাজনীতি’র পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে, কিংবা তাদের নিজেদের কোনো স্পষ্ট ভিশন বা এজেন্ডা থাকে না—তখনই তারা এই ‘ভারত-বিরোধিতা’কে তাদের সবচেয়ে নিরাপদ, সস্তা এবং সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বেছে নেয়। এটা মূলত তাদের রাজনীতির এক ধরণের শূন্যস্থান পূরণ (Filling the Vacuum)। এর মাধ্যমে তারা দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষের সরল ধর্মীয় আবেগ এবং অবুঝ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে খুব সহজেই এক ছাতার নিচে এনে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটা কৃত্রিম ক্ষোভ তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

সহজ কথায়, সরকারের যেকোনো ধরণের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, কূটনৈতিক দরকষাকষির জটিলতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলেই—বিরোধী দলগুলো তাকে স্রেফ প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে না দেখিয়ে, রাতারাতি ‘ভারতের কাছে নতিস্বীকার’ বা ‘দেশ বিক্রির নগ্ন চেষ্টা’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে বাজারে ছেড়ে দেয়। নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে এবং মাঠপর্যায়ে ভোটার ও কর্মীদের চাঙা রাখতে—এটি আমাদের দেশের বিরোধী দলগুলোর জন্য যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী ও পরীক্ষিত একটি চতুর কৌশল।

ঘ. ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা (ভারত বনাম চীন):

বর্তমানে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যকার তীব্র ও রুদ্ধশ্বাস ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা (Geo-political Rivalry) বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত-বিরোধিতাকে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে এবং আমাদের এই অঞ্চলে চীন এখন এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি। ফলে, আমাদের দেশের রাজনীতির মাঠে যারা যেকোনো কারণে ভারতকে চরম অপছন্দ করে কিংবা ভারতের প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তারা স্বভাবতই চীনকে ভারতের এক শক্তিশালী বিকল্প শক্তি (Alternative Power) হিসেবে দেখে।

এর ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে; বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেইজিং বা চীনের সাথে অতি-ঘনিষ্ঠতা চাওয়া এবং যেকোনো মূল্যে দিল্লির বা ভারতের অন্ধ বিরোধিতা করা—এই দুটি বিষয় এখন আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত-বিরোধী দলগুলো এখন স্রেফ একা নয়, তারা চীনের এই আঞ্চলিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষাকে আড়ালে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা সাধারণ মানুষের সামনে এই বয়ান তৈরি করে যে—ভারতকে রুখতে হলে চীনের বন্ধু হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি নেই। এটি মূলত দুই পরাশক্তির লড়াইকে এ দেশের রাজনীতির মাঠে ভোটের ক্যাপিটাল বানানোর এক সুগভীর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।

ঙ. নাগরিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন:

আমাদের এই অঞ্চলে (বিশেষ করে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের অবুঝ জনগণের মধ্যে) অবচেতনভাবেই এক ধরণের গভীর সামাজিক ও মানসিক হীনম্মন্যতা তৈরি করে রাখা হয়। আর এই হীনম্মন্যতা বা ব্যাকফুটে থাকার মানসিকতাকেই আমাদের দেশের চতুর রাজনৈতিক দলগুলো খুব বড় করে ‘সার্বভৌমত্বের সংকট’ হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে ব্র্যান্ডিং করে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যক্তিগত হতাশা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক কষ্ট কিংবা সামাজিক ক্ষোভগুলোকে তারা সুপরিকল্পিতভাবে চ্যানেল বা ডাইভার্ট করে দেয় একটা কাল্পনিক শত্রুর দিকে; এবং একে খুব সুশৃঙ্খলভাবে রূপান্তর করে এক উগ্র ‘ভারত-বিরোধী’ রাজনৈতিক আন্দোলনে। মানুষ তখন নিজের অধিকারের কথা ভুলে গিয়ে এক কৃত্রিম সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের ঘোরে মেতে থাকে।

এই ধরণের নোংরা ও চতুর মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সমাজ ও মনস্তত্ত্বকে চিরতরে দুটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। এর সবচেয়ে বড় কুফল হলো—দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কারিগরি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির যে বাস্তব হিসাব-নিকাশ, তার চেয়ে সাধারণ মানুষের অন্ধ আবেগ এবং নেতাদের নোংরা রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। রাষ্ট্র তখন বাস্তবতার চেয়ে হুজুগে চলে। আর সমাজ ও নাগরিকের ভেতরের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনই মূলত এই ‘ভারত-বিরোধী’ রাজনীতিকে দশকের পর দশক ধরে কোনো বাস্তব ভিত্তি ছাড়াই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল কেন্দ্রে লাইফ-সাপোর্ট দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে।

নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন বেগম খালেদা জিয়া

 

৪. ভারতবিরোধী রাজনীতি বনাম জাতীয় স্বার্থ: একটি বাস্তববাদী বিশ্লেষণ

আমাদের দেশের এই চিরন্তন ভারত-বিরোধী রাজনীতিতে আসলে একজন সাধারণ নাগরিক বা সচেতন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রকৃত অবস্থান কী হওয়া উচিত, তা এবার সব ধরণের অন্ধ আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে খুব ঠান্ডা মাথায় বিচার করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রথম এবং প্রধান রূঢ় নিয়ম হলো—পৃথিবীর কোনো দেশই চাইলেই তার নিজের প্রতিবেশীকে নিজে বেছে নিতে পারে না। আপনি আপনার বন্ধু বদলাতে পারেন, কিন্তু প্রতিবেশী নয়।

আমাদের চিরন্তন ভৌগোলিক বাস্তবতা হলো—মানচিত্রের তিন দিক থেকেই আমরা সম্পূর্ণভাবে ভারতবেষ্টিত। এই বাস্তবতাকে চলুন খুব সহজ এবং আমাদের চেনা একটা সামাজিক উদাহরণের মাধ্যমে দেখা যাক:

ধরুন, আপনার বাড়ির ঠিক পাশেই এমন একজন অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিবেশী আছেন, যাঁর আঙিনার টিউবওয়েল থেকে প্রতিদিন আপনাকে রান্নার পানি আনতে যেতে হয়। যাঁর ব্যক্তিগত সীমানা বা রাস্তা ব্যবহার না করে আপনার নিজের মূল গন্তব্যে বা বাজারে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প পথ নেই। এমনকি আপনার দৈনন্দিন জীবনের বহু সুযোগ-সুবিধা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান যাঁর মর্জির ওপর আংশিক বা পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

এখন প্রশ্ন হলো—এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই প্রতিবেশীর সাথে একটি ন্যূনতম সুসম্পর্ক ও বোঝাপড়া বজায় রাখা কি আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়? আপনি চাইলে তো প্রতিদিন সকালে উঠে ঘরের জানালা খুলে তাঁকে ইচ্ছেমতো গালিগালাজ করতে পারেন, তাঁর বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লায় সস্তা কুৎসা রটাতে পারেন। কিন্তু তাতে দিনশেষে ক্ষতিটা কার হবে? আপনার নিজের ঘরের পানি আনাই বন্ধ হয়ে যাবে, আপনার যাতায়াতের রাস্তাটা ব্লক হয়ে যাবে।

কারণ, সেই প্রভাবশালী প্রতিবেশীকে শক্তি দিয়ে, লাঠিসোঁটা দিয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে পরাজিত করার মতো বৈষয়িক সামর্থ্য বা ক্ষমতা তো আপনার নেই। স্রেফ মনের ভেতরের অন্ধ ঘৃণা বা গোপনে তাঁর ক্ষতি করার সস্তা চেষ্টা চালিয়ে কোনোদিন নিজের বা নিজের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী লাভ কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমীকরণটা ঠিক এতটাই সরল ও নিষ্ঠুর।

ভারত বিরোধিতার লাভ বনাম সুসম্পর্কের সম্ভাবনা:

সামরিকভাবে ভারতকে পরাস্ত করা বা তাদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়ানো কোনো অবস্থাতেই আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে না। পানির অধিকার বা ‘রাইপারিয়ান রাইটস’ (Riparian Rights) নিয়ে আমরা হয়তো আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে মামলা ঠুকে দিতে পারি, কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতায় ভারত যদি সেই রায় মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আমাদের কিছুই করার থাকবে না।

অন্যদিকে, কোনো ছদ্মবেশী ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) বা ভারতের ভেতরের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে আমরা বড়জোর তাদের সাময়িকভাবে একটু বিরক্ত বা উত্যক্ত করতে পারি; কিন্তু তার বিনিময়ে পাল্টা আঘাত হিসেবে আমাদের নিজেদের রাষ্ট্রকে যে চরম মূল্য দিতে হবে, তা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেবে।

বিপরীত দিকে, ভারতের সাথে একটি মর্যাদাশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ সুসম্পর্ক আমাদের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে:

  • পানির অধিকার আদায়: ফাঁকা মাঠ গরম না করে, আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও কূটনৈতিক দেনদরবারের মাধ্যমেই অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথ সুগম হয়।
  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ভারতের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে আমাদের একেবারে নিকটবর্তী ও ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আমাদের দেশীয় পণ্য রপ্তানি করে এক বিশাল বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়া সম্ভব।
  • ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি: ভারতের আকাশসীমা, সড়ক ও রেলপথ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ পেলে নেপাল বা ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য বহুগুণ বেড়ে যাবে।
  • বন্দর ব্যবহার: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পণ্য পরিবহনের জন্য আমাদের চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়ার বিনিময়ে আমরা প্রতি বছর বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি, যা দেশে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
  • সফট পাওয়ার ও কূটনৈতিক সমর্থন: বহির্বিশ্বে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ভারতের মতো একটি উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তির ‘সফট পাওয়ার’ ও কূটনৈতিক প্রভাবকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে আমরা আমাদের বহু জাতীয় স্বার্থ হাসিল করতে পারি।
  • জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা: সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের বিশাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের শিল্পায়নকে দ্রুত সমৃদ্ধ করতে পারি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা কূটনীতি কোনো দিনই অন্ধ আবেগের বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ একটি খাঁটি বাস্তববাদী দর্শন, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik)। এখানে সস্তা আবেগের চেয়ে নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়।

রাজনীতিতে আবেগের তাস খেলে বা ‘ভারত জুজু’র ভয় দেখিয়ে সাময়িক সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভোট হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় প্রখর বাস্তবজ্ঞান দিয়ে। ইতিহাস সাক্ষী, এই অন্ধ ভারত-বিরোধী রাজনীতি আমাদের দেশের জন্য কোনো সুফল তো বয়ে আনেইনি, বরং আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নকে মন্থর করেছে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি প্রতিবেশীর সাথে অনর্থক ঝগড়া করে নিজেদের অর্থনৈতিক সুযোগগুলো হাতছাড়া করব, নাকি সুসম্পর্ক বজায় রেখে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিজের দেশকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করব? আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি স্মার্ট ও দূরদর্শী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা, যেখানে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা এক চুলও বিসর্জন না দিয়েও—ভারতের কাছ থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে নিতে পারে।

আরও দেখুন: