১৭ মার্চ ১৯৭২: ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিদায়: বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায় । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জান্তারা যখন বাংলার আপামর জনতার ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা ও ধর্ষণের বর্বরতা শুরু করে, তখন প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক কোটি বিপন্ন মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার যেভাবে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়ে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনি আমাদের পূর্বপুরুষদের চরম দুঃসময়ে ভারত সরকার ও সেদেশের জনগণ কেবল সীমান্তই খুলে দেয়নি, বরং পরম মমতায় এক কোটি বাঙালিকে আগলে রেখেছিল।

 

১৭ মার্চ ১৯৭২: ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিদায়: বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়

 

কথা রেখে ভারতীয় সৈন্যদের বিদায়

 

বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত

৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর, একটি নবজাত রাষ্ট্রকে তার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে নিরাপদ ও নিশ্চিত করে মিত্রবাহিনীর প্রস্থান বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় ঘটনা। সাধারণত কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের যুদ্ধে সহযোগিতা করলে বা দখলমুক্ত করলে সেখানে তাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর সরকার প্রমাণ করেছিলেন যে, তাঁদের লক্ষ্য ছিল কেবল একটি জাতির মুক্তি, ভূখণ্ড দখল নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি ভারতবাসীর পর্বতসম শ্রদ্ধা এবং ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী রাজনীতির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর অটল অবস্থান ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা ও মুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একীভূত করতে ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বময় সফর করেছেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানি জান্তারা যখন ভারতকে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের টোপ দিয়েছিল, তখন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন শ্রীমতি গান্ধী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “ইয়াহিয়ার সঙ্গে আমার আলোচনার কিছু নেই। শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনাই কার্যকর সমাধান হতে পারে; কারণ তিনিই বাঙালি জনগণের নির্বাচিত নেতা।”

এর আগেও ১৩ মে, বিশ্বশান্তি সংঘের সম্মেলনে পাঠানো বার্তায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, “বাংলাদেশের জনসাধারণের ন্যায্য দাবি—তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দেশ শাসন করবেন। আশা করি, বিশ্বের মানুষ এই দাবি সমর্থন করবেন।”

গণহত্যার বিরুদ্ধে সতর্কতা ও চূড়ান্ত বিজয়

বাংলার রণাঙ্গনে পাকিস্তানি সেনারা যখন রক্তের হোলি খেলায় মত্ত, তখন পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছিল। এই বিপদ আঁচ করতে পেরে ২১ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ ব্রোজ টিটো এক যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তানকে চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।

বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর ‘অপরাধে’ ৩ ডিসেম্বর ভারত ভূখণ্ডে বোমা হামলা চালায় পাকিস্তান। এর ৩ দিন পর, ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত এবং আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে মিত্রবাহিনী হিসেবে অংশগ্রহণ করে। ১০ ডিসেম্বর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “ভারত তখনই পুরোপুরি বিজয়ী হবে, যখন বাংলাদেশ ও তার নেতারা মুক্ত হবে এবং ১ কোটি শরণার্থী স্বদেশে ফিরে যাবে।”

১৬ ডিসেম্বর ও একটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে, সেদিনই ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, এই নতুন দেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জনগণের মধ্যে যথাযোগ্য স্থান গ্রহণ করে বাংলাদেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন।”

ভারত সরকার তাদের কথা রেখেছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু ফেরার মাত্র দুই মাস সাত দিনের মাথায়, ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর শেষ দলটি বাংলাদেশ ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধজয়ী মিত্রবাহিনীর এত দ্রুত বিদায় নেওয়ার নজির আর দ্বিতীয়টি নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশকে নির্বাচিত নেতার হাতে রেখে চলে গেলো ভারতীয় সেনারা
স্বাধীন বাংলাদেশকে নির্বাচিত নেতার হাতে রেখে চলে গেলো ভারতীয় সেনারা

১৭ মার্চ কেবল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনই নয়, এটি মিত্রবাহিনীর প্রস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব প্রাপ্তিরও দিন। আজ যারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে অপপ্রচার করেন, তাঁদের জন্য এই দিনটি একটি বড় শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যকার সম্পর্ক ছিল দুই দেশের আত্মমর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে গড়া এক অনন্য ঐতিহাসিক মৈত্রী।

 

আরও পড়ুন: